প্রবৃদ্ধি ৪ শতাংশ, শঙ্কা ৯ শতাংশ মূল্যস্ফীতির

  বিশেষ সংবাদদাতা

Advertisement


* ভরসা রেমিট্যান্স ও ভোগে, ঋণের উচ্চ ব্যয়
* বিনিয়োগ-শিল্পে বাধা জ্বালানি ঘাটতি

বাংলাদেশের অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়ানোর ইঙ্গিত মিলছে, কিন্তু স্বস্তির খবর নেই মানুষের। চলতি  ২০২৬-২৭ অর্থবছরে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বেড়ে ৪ শতাংশে দাঁড়াতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে আন্তর্জাতিক ঋণদাতা এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)। সংস্থাটি পূর্বাভাসে বলছে, একই সময়ে মূল্যস্ফীতির হার ফের বেড়ে ৯ শতাংশে পৌঁছতে পারে। অর্থাৎ প্রবৃদ্ধির গতি বাড়লেও মানুষের জীবনযাত্রার খরচ কমার সম্ভাবনা আপাতত দেখছে না সংস্থাটি। এডিবি জানায়, গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৩ দশমিক ৫ শতাংশ। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা সামান্য বেড়ে ৩ দশমিক ৭ শতাংশ হতে পারে। হালনাগাদ ‘এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট আউটলুক সেপ্টেম্বর ২০২৬’ বা এশিয়ার উন্নয়নবিষয়ক পূর্বাভাসে বুধবার এ কথা বলা হয়েছে।
পূর্বাভাসে এডিবি বলছে, মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্ঘাতের জেরে সরবরাহ শৃঙ্খলে বিঘœ ঘটায় গত অর্থবছরের শেষ প্রান্তিকে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড কিছুটা মন্থর হয়ে পড়েছিল। তবে এর প্রভাব সীমিত থাকবে বলে তাদের ধারণা। উল্টো দিকে, ২০২৬ সালের শুরুতে অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনের পর রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা কমে যাওয়ায় ভোগ ও বিনিয়োগ বেড়েছে। যা প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাসকে ইতিবাচক করে তুলেছে। তবে প্রবৃদ্ধি বাড়লেও মূল্যস্ফীতির চিত্রে তেমন স্বস্তি নেই। এডিবির হিসাবে, ২০২৫ অর্থবছরে ১০ শতাংশ থাকা মূল্যস্ফীতি ২০২৬ অর্থবছরে কমে আনুমানিক ৮.৭ শতাংশে নামতে পারে। কিন্তু ২০২৭ অর্থবছরে তা আবার বেড়ে ৯ শতাংশে ওঠার পূর্বাভাস দিয়েছে সংস্থাটি।
এডিবির মতে, জ্বালানি ঘাটতি, উৎপাদন ও পরিবহনের উচ্চ ব্যয়, সম্ভাব্য জাহাজ চলাচলে বিঘœ, খাদ্যপণ্যের দামে এল নিনোর বিলম্বিত প্রভাব এবং আর্থিক পরিস্থিতি ধীরে ধীরে শিথিল হওয়ার কারণে মূল্যস্ফীতি উচ্চই থাকতে পারে।
ভোগ বাড়বে, শিল্প ও বিনিয়োগে টান
এডিবির পূর্বাভাসে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির প্রধান ভরসা হিসেবে উঠে এসেছে ব্যক্তিগত ভোগ। রেমিট্যান্সের প্রবাহের কারণে মানুষের ব্যয় করার সক্ষমতা কিছুটা বাড়বে বলে মনে করছে সংস্থাটি। পরিষেবা ও কৃষি খাতও ২০২৭ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধিতে সহায়তা করবে। কিন্তু শিল্প ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ছবিটা ভিন্ন। উচ্চ ঋণ ব্যয়, ঋণের সীমিত সুযোগ, জ্বালানি ঘাটতি, দুর্বল বৈদেশিক চাহিদা এবং দীর্ঘদিনের কাঠামোগত সমস্যার কারণে শিল্প উৎপাদন ও বিনিয়োগে গতি সীমিত থাকতে পারে। অর্থাৎ অর্থনীতির পুনরুদ্ধার যদি হয়ও, তার বড় অংশ আসতে পারে ভোগ ও পরিষেবা খাত থেকে। উৎপাদন ও বিনিয়োগের ভিত শক্ত না হলে সেই পুনরুদ্ধার কতটা টেকসই হবে, সেই প্রশ্নও থেকেই যাচ্ছে।
আমদানি বাড়বে, বাড়বে চলতি হিসাবের ঘাটতিও
এডিবি জানিয়েছে, ২০২৭ অর্থবছরে আমদানি প্রবৃদ্ধি রফতানিকে ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে এডিবি। এর ফলে চলতি হিসাবের ঘাটতি জিডিপির ০.৩ শতাংশ থেকে বেড়ে ০.৬ শতাংশে পৌঁছতে পারে। তবে রেমিট্যান্স প্রবাহ স্থিতিশীল থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। শক্তিশালী রেমিট্যান্স এবং তুলনামূলক উচ্চ বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাংলাদেশের বৈদেশিক খাতের স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সহায়তা করবে বলে সংস্থাটির ধারণা। এখানে এই স্থিতিশীলতা নির্ভর করবে পর্যাপ্ত বৈদেশিক অর্থপ্রবাহ, বিনিময় হারের নমনীয়তা এবং বিচক্ষণ সামষ্টিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার ওপর।
মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্ঘাত বড় ঝুঁকি
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারকে এখনো ঝুঁকিমুক্ত মনে করছে না এডিবি। মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘস্থায়ী সঙ্ঘাত, তেলের উচ্চমূল্য, আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলে আরো বিঘœ, কঠোর বাণিজ্য বিধিনিষেধ এবং প্রধান রফতানি বাজারগুলোতে দুর্বল প্রবৃদ্ধি বাংলাদেশের অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
এর সাথে রয়েছে বিনিময় হারের ওপর চাপ, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা, রাজস্ব সংস্কারে বিলম্ব, প্রত্যাশার তুলনায় কম সরকারি উন্নয়ন ব্যয় এবং জলবায়ুজনিত অভিঘাত। এসব ঝুঁকি বাস্তবায়িত হলে প্রবৃদ্ধির গতি আরো কমতে পারে এবং মূল্যস্ফীতি দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে বলে সতর্ক করেছে এডিবি।
‘পুনরুদ্ধার শুরু, কিন্তু ঝুঁকি রয়ে গিয়েছে’
এডিবির বাংলাদেশ কান্ট্রি ডিরেক্টর চিংফেং ঝাং বলেছেন, বাংলাদেশের অর্থনীতি পুনরুদ্ধার হতে শুরু করেছে। কিন্তু বাহ্যিক ধাক্কা এবং অভ্যন্তরীণ সীমাবদ্ধতার কারণে এই পুনরুদ্ধার এখনো ঝুঁকিপূর্ণ।
তার মতে, সামষ্টিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা, আর্থিক খাত, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং ব্যবসায়িক পরিবেশে সংস্কার দ্রুত করা জরুরি। এসব সংস্কার বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানো, মানসম্মত কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং আরো স্থিতিশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
সব মিলিয়ে এডিবির পূর্বাভাসে বাংলাদেশের সামনে একই সাথে দুই ধরনের ছবি ফুটে উঠেছে। এক দিকে তিন বছরের মধ্যে প্রবৃদ্ধি ৩.৫ শতাংশ থেকে ৪ শতাংশে ফেরার সম্ভাবনা, অন্য দিকে মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশে আটকে থাকার আশঙ্কা। অর্থাৎ অর্থনীতির পরিসংখ্যানের উন্নতি হলেও তার সুফল সাধারণ মানুষের জীবনে কতটা পৌঁছবে, তা নির্ভর করবে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বিনিয়োগ পুনরুদ্ধার, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং আর্থিক খাতের সংস্কারের ওপর।