এআই, আইএমএফ, জ্বালানি সঙ্কট
এশিয়ার উন্নত অর্থনীতিগুলোর ক্ষেত্রে এআই বিনিয়োগের সম্ভাব্য প্রভাব তুলনামূলক বেশি। ইন্টারনেট

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই অবকাঠামো খাতে ব্যাপক বিনিয়োগ বিশ্ব অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। জ্বালানি সরবরাহের ধাক্কায় যখন বিশ্ব অর্থনীতির ওপর চাপ বাড়ছে, তখন এআই খাতে বিনিয়োগ নতুন চাহিদা ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের গতি সঞ্চার করছে। এর সুফল বিশেষভাবে পাচ্ছে এশিয়ার দেশগুলো, বিশেষ করে এআই প্রযুক্তির হার্ডওয়্যার উৎপাদন ও সরবরাহের সাথে যুক্ত অর্থনীতিগুলো।

Advertisement

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা বলেছেন, এআই অবকাঠামোতে বিনিয়োগের উত্থান এশিয়ার বিভিন্ন দেশের অর্থনীতির জন্য বড় ধরনের সুফল বয়ে আনছে। এর ফলে, এশিয়ার উন্নত অর্থনীতিগুলোর প্রবৃদ্ধি শূন্য দশমিক ৫ থেকে ১ শতাংশীয় পয়েন্ট পর্যন্ত বাড়তে পারে। আর উদীয়মান অর্থনীতিগুলোর প্রবৃদ্ধি বাড়তে পারে শূন্য দশমিক ২ থেকে শূন্য দশমিক ৮ শতাংশীয় পয়েন্ট।

সোমবার থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককের কুইন শিরিকিত ন্যাশনাল কনভেনশন সেন্টারে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংক গ্রুপের বার্ষিক সভার উদ্বোধনী আয়োজনে তিনি এসব কথা বলেন।

জর্জিয়েভার বক্তব্য অনুযায়ী, বিশ্ব অর্থনীতিতে বর্তমানে দু’টি বিপরীতমুখী প্রবণতা কাজ করছে। একদিকে জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তা ও সরবরাহজনিত ধাক্কা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে নিচের দিকে টানছে। অন্যদিকে এআই অবকাঠামো খাতে দ্রুত বাড়তে থাকা বিনিয়োগ নতুন চাহিদা তৈরি করে অর্থনীতিকে বাড়তি গতি দিচ্ছে। এই দুই প্রভাবের মধ্যে এআই খাতের বিনিয়োগ বিশ্ব অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি প্রায় ৩ শতাংশে ধরে রাখতে সহায়তা করছে।

এআই বিনিয়োগে লাভবান এশিয়া
এআই প্রযুক্তির বিস্তারের সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে উন্নত চিপ, সার্ভার এবং অন্যান্য প্রযুক্তিগত সরঞ্জামের চাহিদা। এআই মডেল তৈরি ও পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় তথ্যপ্রযুক্তি অবকাঠামো গড়ে তুলতে বিপুল বিনিয়োগ হচ্ছে। ফলে এসব পণ্য উৎপাদন ও সরবরাহের সাথে যুক্ত এশিয়ার দেশগুলোর সামনে অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হওয়ার নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে।

জর্জিয়েভা বলেন, এআই প্রযুক্তির হার্ডওয়্যার সরবরাহকারী দেশগুলো এ বিনিয়োগের প্রবণতা থেকে বিশেষভাবে উপকৃত হচ্ছে। থাইল্যান্ডও এ ধরনের সুবিধা পাওয়া দেশগুলোর একটি।

এশিয়ার উন্নত অর্থনীতিগুলোর ক্ষেত্রে এআই বিনিয়োগের সম্ভাব্য প্রভাব তুলনামূলক বেশি। এসব অর্থনীতিতে প্রবৃদ্ধি বৃদ্ধির সম্ভাব্য পরিমাণ শূন্য দশমিক ৫ থেকে ১ শতাংশীয় পয়েন্ট। অন্যদিকে এশিয়ার উদীয়মান অর্থনীতিগুলোতে এই বৃদ্ধি শূন্য দশমিক ২ থেকে শূন্য দশমিক ৮ শতাংশীয় পয়েন্ট হতে পারে। অর্থাৎ, এআই খাতে বিনিয়োগ শুধু প্রযুক্তি খাতের সম্প্রসারণ ঘটাচ্ছে না; সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর উৎপাদন, সরবরাহব্যবস্থা ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলার সুযোগ তৈরি করছে।

জ্বালানি সঙ্কট বনাম প্রযুক্তি বিনিয়োগ
বিশ্ব অর্থনীতির সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে জ্বালানি সরবরাহের ধাক্কা। জ্বালানির সরবরাহে অনিশ্চয়তা উৎপাদন ও ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে চাপ তৈরি করতে পারে। একই সাথে জ্বালানিসংক্রান্ত ব্যয় বৃদ্ধি বিভিন্ন অর্থনীতির জন্য বাড়তি বোঝা হয়ে দাঁড়ায়।

এই পরিস্থিতিতে এআই অবকাঠামো খাতের বিনিয়োগ বিশ্ব অর্থনীতিতে নতুন চাহিদার উৎস হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। প্রযুক্তিগত সরঞ্জামের চাহিদা বৃদ্ধি এবং সংশ্লিষ্ট উৎপাদন ও সরবরাহব্যবস্থার সম্প্রসারণ এশিয়ার অর্থনীতিগুলোর জন্য বাড়তি প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা তৈরি করছে।

তবে এআই বিনিয়োগের সুফল সব দেশের জন্য সমান হবে, এমন নয়। প্রযুক্তিগত সরঞ্জাম উৎপাদন ও সরবরাহে যেসব দেশের সক্ষমতা রয়েছে, তারা সরাসরি সুবিধা পাওয়ার তুলনামূলক ভালো অবস্থানে থাকতে পারে। অন্য দেশগুলোর ক্ষেত্রে এ সুযোগ কাজে লাগানোর জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, বিনিয়োগ ও দক্ষতা উন্নয়নের গুরুত্ব বাড়বে।

কর্মসংস্থানের জন্য হুমকি নয় এআই : বিশ্বব্যাংক প্রেসিডেন্ট
এদিকে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে মানুষের কর্মসংস্থানের জন্য অনিবার্য হুমকি হিসেবে না দেখে দক্ষতা বৃদ্ধি ও নতুন কাজের সুযোগ তৈরির প্রযুক্তি হিসেবে ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন বিশ্বব্যাংক গ্রুপের প্রেসিডেন্ট অজয় বঙ্গা।

তিনি বলেছেন, সঠিক নীতিমালা ও কার্যকর ব্যবহারের মাধ্যমে এআই মানুষের কাজের পরিধি বাড়াতে, দক্ষতা উন্নত করতে এবং নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে।

বিশ্ব অর্থনীতিতে এআইয়ের ক্রমবর্ধমান প্রভাবের মধ্যে কর্মসংস্থানের প্রশ্নটি বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। একদিকে প্রযুক্তির ব্যবহার উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি করছে, অন্যদিকে কর্মক্ষেত্রে পরিবর্তনের সাথে তাল মেলাতে কর্মীদের নতুন দক্ষতা অর্জনের প্রয়োজন হতে পারে। এ ক্ষেত্রে কার্যকর নীতিমালা, দক্ষতা উন্নয়ন এবং প্রযুক্তির উপযুক্ত ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া জরুরি।

আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংক গ্রুপের বার্ষিক সভায় এআই বিনিয়োগের অর্থনৈতিক প্রভাব এবং কর্মসংস্থানে প্রযুক্তিটির সম্ভাব্য ভূমিকা নিয়ে আলোচনার মধ্য দিয়ে বিশ্ব অর্থনীতির সামনে থাকা নতুন সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জের বিষয়টি সামনে এসেছে। জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তার মধ্যে এআই বিনিয়োগ এশিয়ার অর্থনীতিকে বাড়তি গতি দেয়ার সুযোগ তৈরি করলেও সেই সুযোগ কতটা টেকসই প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানে রূপান্তরিত হবে, তা নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর বিনিয়োগ সক্ষমতা, নীতিমালা ও প্রযুক্তি ব্যবহারের কার্যকারিতার ওপর।