
গাজায় বাসিন্দাদের সরিয়ে না নিয়েই জনবসতিপূর্ণ ভবন ও ঘরবাড়িতে ভারী বোমা হামলার নির্দেশ পেয়েছিলেন ইসরাইলি সামরিক গোয়েন্দা বিভাগের চার সেনা। তাঁদের ভাষ্য, এসব হামলায় শত শত ফিলিস্তিনি নিহত ও আহত হয়েছেন। সোমবার ইসরাইলি দৈনিক হারেৎজকে দেয়া সাক্ষাৎকারে তাঁরা এ কথা জানান।
মিডলইস্ট মনিটর সোমবার (১২ অক্টোবর) এ খবর জানায়।
গাজায় হামলার আগে বেসামরিক লোকজনকে সরে যাওয়ার সতর্কবার্তা দেয়া হয় বলে বারবার দাবি করে আসছে ইসরাইলি সেনাবাহিনী। প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুসহ দেশটির কর্মকর্তারা প্রকাশ্যেও এ দাবি করেছেন। কিন্তু চার সেনার বক্তব্যে ভিন্ন চিত্র উঠে এসেছে। তাঁদের ভাষ্য, ২০২৩ সালের অক্টোবরে যুদ্ধ শুরুর পর হামলার নিয়মে বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হয়। সে সময় গাজায় প্রায় ২৪ লাখ ফিলিস্তিনি বসবাস করতেন।
হামাসের সামরিক শাখার সদস্য ও কমান্ডারদের অবস্থান শনাক্ত করার দায়িত্বে ছিলেন ‘এ’ নামে পরিচিত এক গোয়েন্দা সেনা। পূর্ণ পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছুক এই সেনা বলেন, ‘মাঠপর্যায়ে হামাস ও তাদের সামরিক শাখা সম্পর্কে আমাদের প্রায় কিছুই জানা ছিল না।’
তিনি বলেন, ‘২০২৩ সালের অক্টোবরে হামাসের সদস্য ও যোদ্ধারা কোথায় আছে, তা শনাক্ত করার কাজ আমরা প্রায় শূন্য থেকে শুরু করি।’
ওই সেনার ভাষ্য, এরপর হামলার লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণের নিয়ম দ্রুত শিথিল করা হয়। একই সাথে কতটা সামরিক শক্তি প্রয়োগ করা হবে এবং বেসামরিক মানুষের প্রাণহানির ঝুঁকির তুলনায় হামলার গুরুত্ব কতটা—সেই বিবেচনাতেও বড় পরিবর্তন আসে। যুদ্ধে বেসামরিক মানুষের মৃত্যু বা আহত হওয়াকে ‘পার্শ্বক্ষয়ক্ষতি’ হিসেবে মেনে নেয়ার ক্ষেত্রেও নীতি অনেক বেশি শিথিল করা হয়।
হামলার লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণে শিথিলতা
হারেৎজ বলেছে, চার সেনার বক্তব্যে যুদ্ধ পরিচালনার এমন একটি চিত্র উঠে এসেছে, যেখানে তুলনামূলকভাবে ছোট লক্ষ্যবস্তুকে হত্যা করতেও বড় ধরনের হামলা চালানো হতো। এতে বেসামরিক মানুষের প্রাণহানির আশঙ্কা থাকলেও তা হামলা চালানোর পথে বাধা হয়ে দাঁড়াত না।
পত্রিকাটির ভাষ্য, সামরিক বাহিনীর হিসাবে বিপুলসংখ্যক বেসামরিক মানুষের মৃত্যু শুধু ভুল বা লক্ষ্যবস্তু শনাক্তে ব্যর্থতার ফল ছিল না। বরং সর্বোচ্চ মাত্রায় সামরিক শক্তি প্রয়োগের নীতিও এসব প্রাণহানির কারণ ছিল।
হারেৎজ আরো জানায়, যুদ্ধের তিন বছর ধরে একই ধরনের বিবরণ পাওয়া গেছে। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের গোয়েন্দা ব্যর্থতার ঘাটতি পুষিয়ে নেয়ার চেষ্টা বেসামরিক মানুষের প্রাণহানির ক্ষেত্রে নজিরবিহীন সহনশীলতা তৈরি করেছিল।
এর একটি উদাহরণ উত্তর গাজার জাবালিয়া শরণার্থীশিবিরে ২০২৩ সালের ৩১ অক্টোবর ইসরাইলি বিমান হামলা। একটি বড় আবাসিক ভবনসমষ্টিতে চালানো ওই হামলার ঘোষিত লক্ষ্য ছিলেন জাবালিয়ায় হামাসের একটি ব্যাটালিয়নের কমান্ডার ইব্রাহিম বিয়ারি।
‘ডি’ নামে পরিচয় গোপন রাখা এক সেনা বলেন, ‘আমরা জানতাম, বিয়ারি বড় বড় ভবনের নিচে ভূগর্ভে অবস্থান করছেন। কিন্তু ঠিক কোন ভবনের নিচে, তা জানতাম না।’
তিনি বলেন, ‘তাই তারা এমন ভবন বেছে নেয়, যেগুলোতে তখনো মানুষ বসবাস করছিল। এরপর বিয়ারি যে সুড়ঙ্গে ছিলেন, তার ওপরের সব ভবন ধ্বংস করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। তাঁকে পালানোর সুযোগ না দিয়ে হত্যা করা জরুরি মনে করায় বাসিন্দাদের সরিয়ে নেয়া হয়নি।’
অভিযানে অংশ নেয়া ‘এ’ বলেন, হামলার লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তারা জানতেন, এতে বিপুলসংখ্যক বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি ঘটতে পারে।
তিনি বলেন, ‘সামরিক গোয়েন্দাদের হিসাবে, হামলায় পার্শ্বক্ষয়ক্ষতি হিসেবে ২৫০ থেকে ৩০০ জনের মৃত্যুর আশঙ্কা করা হয়েছিল। এ কারণে সিদ্ধান্তটি সরাসরি অনুমোদনের জন্য সেনাপ্রধানের কাছে পাঠানো হয়।’
ওই সেনার ভাষ্য, হামলার পর সময় গড়ানোর সাথে সাথে তাঁরা বুঝতে পারেন, নিহতের সংখ্যা প্রায় ২৫০। তিনি ফিলিস্তিনি বেসামরিক মানুষের মৃত্যুর কথাই বলছিলেন।
তিনি আরো বলেন, ‘আমার মনে আছে, কয়েকটি ঘনবসতিপূর্ণ ভবন গুঁড়িয়ে দিয়ে শত শত মানুষকে হত্যা করায় আমি হতবাক হয়ে গিয়েছিলাম। অথচ মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগেও একজন ব্যাটালিয়ন কমান্ডারকে হামলার লক্ষ্যবস্তু হিসেবেই বিবেচনা করা হতো না।’
জাবালিয়ায় ওই হামলার বিষয়ে ইসরাইলি সেনাবাহিনীর দাবি, বেসামরিক মানুষের ক্ষয়ক্ষতি কমাতে হামলার পরিকল্পনা কয়েকবার নতুন করে করা হয়েছিল। তাদের ভাষ্য, হামলায় শত শত বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি হবে বলে আশঙ্কা করা হয়নি। তবে হামলার পর দেখা যায়, ক্ষয়ক্ষতি প্রাথমিক হিসাবের চেয়ে বেশি হয়েছে।
বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি
ইসরাইলের বামপন্থী সংগঠন ব্রেকিং দ্য সাইলেন্সের নির্বাহী পরিচালক নাদাভ ওয়েইমান গাজায় সেনাবাহিনীর কর্মকাণ্ডের নিন্দা জানিয়েছেন।
তিনি বলেন, ‘একজন ব্যাটালিয়ন কমান্ডারকে হত্যা করতে আমরা ৩০০ বেসামরিক মানুষকে মরতে দিতে পারি না। হামাসের প্রত্যেক ট্রাকচালককে হত্যা করতে গিয়ে ২০ জন বেসামরিক মানুষকেও হত্যা করতে পারি না। এরপর প্রকাশ্যে দাবি করতে পারি না যে নিরীহ মানুষের ক্ষতি ঠেকাতে আমরা সম্ভাব্য সবকিছু করেছি।’
ওয়েইমান বলেন, ‘যাঁরা এসব নির্দেশ দিয়েছেন, এখন তাঁদের দায় নিতে হবে। সত্য প্রকাশের সাহস দেখানো সেনাদের সরিয়ে দিয়ে দায় এড়ানোর চেষ্টা বন্ধ করতে হবে।’
২০২৪ সালের নভেম্বরে গাজায় যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু এবং সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োভ গ্যালান্টের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত।
জাতিসংঘের প্রধান বিচারিক সংস্থা আন্তর্জাতিক বিচার আদালতেও ইসরাইলের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগে মামলা চলছে। দক্ষিণ আফ্রিকার করা এ মামলায় আরো কয়েকটি দেশ যোগ দিয়েছে।
হারেৎজ জানায়, সেনাদের বর্ণনায় আরেকটি ঘটনা উঠে এসেছে ২০২৩ সালের ১৩ অক্টোবরের। সেদিন হামাস কমান্ডার আলি কাদিকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছিল।
পত্রিকাটির তথ্য অনুযায়ী, গাজা ডিভিশনের এক গোয়েন্দা সেনা সতর্ক করেছিলেন, কাদির আচরণ অস্বাভাবিক মনে হচ্ছে। কিন্তু ডিভিশনের গোয়েন্দা কর্মকর্তা সেই সতর্কতা উপেক্ষা করেন।
‘এ’ বলেন, ‘যুদ্ধ শুরুর কয়েক দিন পর কাদি হামলার লক্ষ্যবস্তু হন এবং তাঁর ওপর ব্যাপক গোলাবর্ষণ করা হয়।’
তিনি আরো বলেন, ‘তিনি পরিবারের সাথে বাড়িতে ছিলেন। তাঁকে হত্যা করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। সেনাবাহিনী দ্রুত ঘোষণা করে, কাদি নিহত হয়েছেন। কিন্তু বাস্তবে হামলা থেকে একমাত্র তিনিই বেঁচে যান। যাঁরা নিহত হয়েছিলেন, তাঁদের কারো সাথেই লক্ষ্যবস্তুর কোনো সম্পর্কই ছিল না।’
বাসিন্দাদের সরিয়ে না নিয়েই হামলা
‘বি’ নামে পরিচয় গোপন রাখা ড্রোন ইউনিটের এক সেনা জানান, যুদ্ধ শুরুর পর তাঁর ডিভিশনকে হামলার ক্ষেত্রে আরো বিস্তৃত ক্ষমতা দেয়া হয়। এর ফলে কোনো হামলায় যোদ্ধা নন, এমন সর্বোচ্চ ২০ জনের আহত হওয়ার আশঙ্কা থাকলেও লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণকারী দলের বাইরের কোনো জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার অনুমোদন লাগত না।
‘সি’ নামে পরিচয় গোপন রাখা সামরিক গোয়েন্দা বিভাগের আরেক সেনা বলেন, ২০২৩ সালের ২৭ অক্টোবর গাজায় স্থল অভিযান শুরুর কয়েক মাস পর তাঁদের ইউনিটকে গাজা সিটিতে সেনাদের অগ্রসর হওয়ার পথ তৈরির দায়িত্ব দেয়া হয়।
ওই এলাকার কয়েকটি বহুতল ভবনকে ইসরাইলি সেনাদের জন্য হুমকি হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছিল। গোয়েন্দা মূল্যায়নে বলা হয়, ভবনগুলোর বাসিন্দাদের প্রায় ২৫ শতাংশ তখনো নিজেদের বাড়িতে ছিলেন।
তিনি বলেন, ‘কতজন বাসিন্দা সেখানে রয়ে গেছেন এবং তাঁদের সেখানে থাকা যুক্তিসংগত কি না, তা জানতে চাইলে আমাদের বলা হয়, ওই বাসিন্দারাও মাটিতে থাকা সেনাদের লক্ষ্যবস্তু। এত বিপুলসংখ্যক মানুষকে নিয়ে এমন কথা বলা হচ্ছে, তা আমি বুঝতে পারছিলাম না, বিশ্বাসও করতে পারছিলাম না।’
ওই সেনার ভাষ্য, এলাকায় প্রবেশের পরিকল্পনাকারী বাহিনী চাইলে হামলার অনুমোদন দেয়ার আগে আরো অনেকটা সময় অপেক্ষা করতে পারত।
তিনি বলেন, ‘তাই শুরুর দিকে আমরা বাসিন্দাদের পুরোপুরি সরিয়ে না নিয়েই হামলা চালাই। সেনাদের সুরক্ষাকে অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছিল, যা বোধগম্য। কিন্তু বেসামরিক মানুষের প্রাণহানির সংখ্যা ক্রমেই বাড়তে থাকে এবং একপর্যায়ে তা অগ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে।’
২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে গাজায় ইসরাইলের যুদ্ধে ৭৪ হাজার ৩০০-এর বেশি ফিলিস্তিনি নিহত এবং ১ লাখ ৭৫ হাজার ৪০০-এর বেশি আহত হয়েছেন। নৃশংস এ যুদ্ধে পুরো উপত্যকা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








