বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতি বেড়ে ১০.৯ শতাংশে পৌঁছানোর আশঙ্কা
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। সংগৃহীত

চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি কমে ৩ দশমিক ২ শতাংশে দাঁড়াতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। যা গত এপ্রিলে বলা হয়েছিল ৪ দশমিক ৩ শতাংশ। পাশাপাশি মূল্যস্ফীতি নিয়েও আশঙ্কাজন পূর্বাভাস দেয়া হয়েছে সংস্থাটির পক্ষ থেকে। বলা হয়েছে, দেশের গড় মূল্যস্ফীতি বেড়ে ১০ দশমিক ৯ শতাংশে পৌঁছাতে পারে।

Advertisement

মঙ্গলবার প্রকাশিত আইএমএফের ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুক (ডব্লিউইও) প্রতিবেদনে বাংলাদেশের অর্থনীতি সম্পর্কে এ পূর্বাভাস দেয়া হয়েছে।

আইএমএফের গত এপ্রিলে প্রকাশিত পূর্বাভাসে চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ৩ শতাংশ হতে পারে বলে জানানো হয়েছিল। নতুন পূর্বাভাসে তা কমিয়ে ৩ দশমিক ২ শতাংশ করা হয়েছে। অর্থাৎ কয়েক মাসের ব্যবধানে প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমেছে ১ দশমিক ১ শতাংশীয় পয়েন্ট। জুলাইয়ে সংস্থাটির পূর্বাভাস ছিল ৩ দশমিক ৫ শতাংশ। ধারাবাহিকভাবে পূর্বাভাস কমানোর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের গতি নিয়ে উদ্বেগের বিষয়টি সামনে এসেছে।

অন্যদিকে, মূল্যস্ফীতি নিয়ে আইএমএফের আশঙ্কা আরো বেশি। এপ্রিলে চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশের গড় মূল্যস্ফীতি ৬ শতাংশ হতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছিল সংস্থাটি। নতুন হিসাবে তা বাড়িয়ে ১০ দশমিক ৯ শতাংশ করা হয়েছে। অর্থাৎ আগের পূর্বাভাসের তুলনায় মূল্যস্ফীতির হার ৪ দশমিক ৯ শতাংশীয় পয়েন্ট বেশি হতে পারে।

মূল্যস্ফীতি দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চপর্যায়ে থাকলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ে এবং প্রকৃত আয় কমে যায়। বিশেষ করে নির্দিষ্ট আয়ের মানুষ, নিম্ন আয়ের পরিবার ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা এতে বেশি চাপে পড়েন। খাদ্য, পরিবহন, বাসস্থান ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ব্যয় বেড়ে গেলে পরিবারের সঞ্চয় কমে এবং ভোগব্যয় সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। এর প্রভাব পড়ে সামগ্রিক বাজার চাহিদা ও ব্যবসা-বাণিজ্যে।

প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমে যাওয়াও অর্থনীতির জন্য উদ্বেগজনক। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি দুর্বল হলে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান এবং নতুন ব্যবসা সম্প্রসারণের সুযোগ সীমিত হতে পারে। বেসরকারি খাতে বিনিয়োগের অনিশ্চয়তা, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং আর্থিক খাতের দুর্বলতা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে প্রভাব ফেলতে পারে। তবে আইএমএফের প্রতিবেদনে প্রবৃদ্ধি কমার নির্দিষ্ট কারণগুলো আলাদাভাবে বিশ্লেষণ না করে শুধু এই পূর্বাভাসের ভিত্তিতে কোনো একটি কারণকে দায়ী করা যায় না।

বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি নিয়ে আইএমএফের পূর্বাভাস অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থার তুলনায়ও কম। বিশ্বব্যাংক চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৪ শতাংশ হতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে। অন্যদিকে, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) পূর্বাভাস ৪ শতাংশ। অর্থাৎ তিনটি সংস্থার পূর্বাভাসেই প্রবৃদ্ধির গতি নিয়ে সতর্কতার আভাস থাকলেও আইএমএফের হিসাব সবচেয়ে কম।

আইএমএফের হিসাবে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ছিল ৩ দশমিক ৬ শতাংশ। এর আগের অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ৩ দশমিক ৫ শতাংশ। নতুন পূর্বাভাস বাস্তবায়িত হলে চলতি অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি আরো কমে যাবে। ফলে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের গতি বাড়ানো এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ- দু’টি বিষয়ই নীতিনির্ধারকদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠবে।

দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের সাথে তুলনা করলেও বাংলাদেশের পূর্বাভাসের দুর্বলতা স্পষ্ট হয়। আইএমএফের পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে ভারতের প্রবৃদ্ধি ৭ শতাংশ এবং ভুটানের ৬ দশমিক ৯ শতাংশ হতে পারে। এই ব্যবধান থেকে বোঝা যায়, আঞ্চলিক অর্থনীতিগুলোর মধ্যে প্রবৃদ্ধির গতিতে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য রয়েছে। তবে দেশগুলোর অর্থনৈতিক কাঠামো, নীতিগত পরিস্থিতি ও প্রবৃদ্ধির চালিকাশক্তি ভিন্ন হওয়ায় সরাসরি তুলনার ক্ষেত্রে এসব বিষয় বিবেচনায় নেয়া প্রয়োজন।

ব্যাংককে চলমান আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক বৈঠকের মধ্যেই সংস্থাটির নতুন পূর্বাভাস প্রকাশিত হলো। বৈঠকে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, সংস্কার কর্মসূচি এবং উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে অর্থায়ন পাওয়ার বিষয়গুলো গুরুত্ব পাচ্ছে।

অর্থনীতিবিদদের জন্য এখন বড় প্রশ্ন হলো, উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপ কমিয়ে কিভাবে বিনিয়োগ ও উৎপাদন বাড়ানো যায়। একইসাথে রাজস্ব আয় বৃদ্ধি, আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং ব্যবসার পরিবেশ উন্নত করার মতো বিষয়গুলোও গুরুত্বপূর্ণ। প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর উদ্যোগের পাশাপাশি মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া না গেলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ওপর চাপ আরও দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।

আইএমএফের নতুন পূর্বাভাস বাংলাদেশের অর্থনীতির সামনে থাকা চ্যালেঞ্জগুলোকে আরো স্পষ্ট করেছে। এখন সরকারের নীতিগত পদক্ষেপ, সংস্কারের অগ্রগতি এবং বিনিয়োগ পরিস্থিতি অর্থনীতির গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।