
ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী সম্প্র্রতি ঢাকায় বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন ২০২৬-এ বলেছেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনাকে আশ্রয় দেয়া ছাড়া নয়াদিল্লির সামনে বাস্তবে খুব বেশি বিকল্প ছিল না। সেই মুহূর্তে হাসিনা বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন; তাকে নিয়ে এসেছিল বাংলাদেশের একটি সামরিক উড়োজাহাজ, ভারতীয় বাহিনী নয়। প্রতিবেশী হিসেবে বাস্তবতা মেনে নেয়া ছিল ভারতের দায়িত্ব। প্রত্যর্পণের সময়সীমাও তিনি দেননি। বলেছেন, বিষয়টি একটি কাঠামোবদ্ধ আইনি প্রক্রিয়ায় আছে, সময়সীমা কেউ দিতে পারে না।
কূটনীতির ভাষায় বক্তব্যটি পরিমিত, পরিস্থিতিনির্ভর ও মানবিক শোনাতে পারে; কিন্তু রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও গভর্ন্যান্স তত্ত্বে রাষ্ট্রের দায় সঙ্কট মুহূর্তের ব্যবস্থাপনায় শেষ হয় না। দায়িত্বের প্রকৃত পরীক্ষা হয় জবাবদিহি, আইনের শাসন, নীতি-সামঞ্জস্য এবং যাদের নামে সিদ্ধান্ত নেয়া হয় সেই জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতায়। ভারতের ‘প্রতিবেশীর দায়’ কি শুধু একটি পতিত সরকার প্রধানের অবতরণের মুহূর্তে প্রযোজ্য, নাকি বাংলাদেশের জনগণের জীবন, সম্পদ, ন্যায়বিচার, সার্বভৌম সিদ্ধান্ত ও অভিন্ন নদীর ন্যায্য হিস্যার প্রতিও।
দায়িত্বের তিন পাঠ : আন্তর্জাতিক সম্পর্কে দায়িত্বকে অন্তত তিনভাবে পড়া যায়। কেনেথ ওয়ালৎসের কাঠামোগত বাস্তববাদে রাষ্ট্র প্রথমে নিজের নিরাপত্তা ও কৌশলগত স্থিতিশীলতা দেখে (ওয়ালৎস, ১৯৭৯)। উদার-প্রাতিষ্ঠানিক পাঠে প্রতিবেশীসুলভ আচরণের মানদণ্ড চুক্তি পালন, তথ্য ভাগাভাগি ও পারস্পরিক প্রত্যাশা (কেওহান, ১৯৮৪)। মানবাধিকারকেন্দ্রিক পাঠে তাৎক্ষণিক বিপদে আশ্রয় একটি সীমিত কর্তব্য হতে পারে; কিন্তু এই তৃতীয় পাঠও শর্তহীন নয়। জাতিসঙ্ঘের দুর্নীতিবিরোধী সনদ এবং পারস্পরিক আইনি সহায়তার রীতি বলে, গুরুতর অপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে নিরাপদ আশ্রয়ে পরিণত করা প্রতিবেশীর দায়ের পরিপন্থী।
ত্রিবেদীর যুক্তির শক্তিশালী অংশ এই যে, ৫ আগস্ট ২০২৪ ছিল একটি ধসের মুহূর্ত। দুর্বল অংশ এই যে, সেই মুহূর্তের সিদ্ধান্তকে তিনি স্থায়ী নৈতিক অবস্থানে উন্নীত করেছেন। অথচ প্রত্যর্পণ, ভারতের মাটি থেকে রাজনৈতিক কার্যক্রম বন্ধ এবং বাংলাদেশের বিচারপ্রক্রিয়ায় সহযোগিতার প্রশ্ন সময়সীমাহীন প্রক্রিয়ার আড়ালে রয়ে গেছে। আইনি প্রক্রিয়া যদি অনির্দিষ্ট বিলম্বের সমার্থক হয়, তবে গভর্ন্যান্সের ভাষায় তা কার্যপ্রণালীগত দীর্ঘসূত্রতা মূলত সারবস্তুগত অস্বীকৃতির আরেক নাম। ১৭ নভেম্বর ২০২৫-এ ঢাকার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল শেখ হাসিনাকে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে তার অনুপস্থিতিতে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন। তিনি অভিযোগ অস্বীকার করেছেন; জাতিসঙ্ঘ মানবাধিকার দফতর রায়কে ভুক্তভোগীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত বললেও মৃত্যুদণ্ড ও ন্যায্য বিচারের মান নিয়ে সতর্কতা জানিয়েছে। সেই বিতর্ক থেকে ভারতের দায় মুক্ত হয় না। প্রশ্ন হলো— একটি অনুপস্থিতির রায়কে অগ্রাহ্য করার নামে প্রত্যর্পণ-প্রক্রিয়া কি অনির্দিষ্টকাল স্থগিত থাকবে?
নীতি-সামঞ্জস্যের ফাটল
অভিযুক্ত ব্যক্তিরা ভারতে দীর্ঘদিন থাকলেও ভারতীয় আইন একই কঠোরতায় প্রয়োগ হচ্ছে কি না। একজনের ক্ষেত্রে ‘অবৈধ প্রবেশ’, অন্যদের ক্ষেত্রে নীরবতা— এটি আইনের শাসন নয়, পছন্দমতো নীতি প্রয়োগ। প্রতিযোগিতামূলক স্বৈরতন্ত্র যেখানে নির্বাচন ও আনুষ্ঠানিক গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান থাকে; কিন্তু ক্ষমতাসীনরা রাষ্ট্রীয় সুবিধা কাজে লাগিয়ে প্রতিপক্ষকে অসম প্রতিযোগিতায় ফেলে। কর্তৃত্ববাদী স্থিতি শুধু অভ্যন্তরীণ দমন দিয়ে টিকে থাকে না। বহিরাগত স্বীকৃতি, কূটনৈতিক স্বাভাবিকীকরণ ও নিরাপদ বহির্গমনপথ তাকে স্থিতি দেয়।
কর্তৃত্ববাদী স্থিতির তিনটি স্তম্ভ— দমন, আত্মীকরণ ও বৈধতা। যখন বৈধতার একটি অংশ প্রতিবেশী রাজধানী থেকে আসে, তাকে ‘কর্তৃত্ববাদী স্থিতিস্থাপকতার বাহ্যিক বৈধায়ন’ বলা যায়। ২০১৪ সালে জাতীয় নির্বাচনে প্রধান বিরোধী দল ও জোটের অনুপস্থিতি, ২০১৮ সালের নির্বাচনে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ, যা রাতের ভোট নামে পরিচিতি পায়, ২০২৪ সালের নির্বাচন বর্জন ও অল্প অংশগ্রহণ— এই তিনটি নির্বাচন নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলের উদ্বেগ ছিল প্রকাশ্য। তবে এতে ভারতের অবস্থান ছিল ভিন্ন। ভারত বলতে পারে, কে ক্ষমতায় থাকবে তা বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়; কিন্তু ধারাবাহিক কৌশলগত সমর্থন যদি এমন একটি শাসনকে স্বাভাবিক করে, যার বিরুদ্ধে গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা ও বিরোধী মত দমনের গুরুতর অভিযোগ ছিল, তবে সেটি নিরপেক্ষ প্রতিবেশী নয়।
অর্থপাচার : জবাবদিহির অনুপস্থিতি
প্রশান্ত কুমার হালদারের ঘটনা এ অসামঞ্জস্যকে আরো নগ্ন করেছে। দুদকের মামলা ও আদালতির নথি অনুযায়ী, তার বিরুদ্ধে আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে বিপুল ঋণ আত্মসাৎ ও পাচারের অভিযোগ আছে। ঢাকার আদালত ২০২৩ সালের অক্টোবরে কানাডায় প্রায় ৮০ কোটি টাকা পাচার এবং প্রায় ৪২৬ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ-সংক্রান্ত মামলায় তাকে অনুপস্থিতিতে ২২ বছরের কারাদণ্ড দেন। ভারতের এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট তাকে ২০২২ সালের ১৪ মে পশ্চিমবঙ্গে গ্রেফতার করে; কলকাতার আদালত ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে জামিন দেয়। সেই সাথে তিনি ২৪ ডিসেম্বর কারাগার থেকে বের হন। আদালতের যুক্তির একটি অংশ ছিল, বাংলাদেশের রায়ের প্রয়োজনীয় কাগজ সময়মতো পাওয়া যায়নি। প্রত্যর্পণ বা সম্পদ ফেরতে দৃশ্যমান অগ্রগতি এখনো জনসমক্ষে স্পষ্ট নয়।
প্রশ্ন হলো— বাংলাদেশের আমানতকারীর অর্থ ফেরত ও অভিযুক্তের মুখোমুখি হওয়ার বিষয়ে ভারত কতটা দৃশ্যমান পারস্পরিক আইনি সহায়তা দিয়েছে। প্রতিবেশীর দায়িত্ব যদি ব্যক্তি-আশ্রয়ে সীমাবদ্ধ থাকে, আর জনগণের লুণ্ঠিত সম্পদে নীরব থাকে, তবে দায়িত্বের ভাষা নৈতিকভাবে ফাঁপা।
নদী : পানি-আধিপত্য ও দ্বিস্তরীয় খেলা
অভিন্ন নদীর পানিতে সম্পর্কের কাঠামোগত অসমতা সবচেয়ে স্পষ্ট। ১২ ডিসেম্বর ১৯৯৬-এ নয়াদিল্লিতে শেখ হাসিনা এবং এইচ ডি দেবেগৌড়া ৩০ বছরের গঙ্গা পানিবণ্টন চুক্তি সই করেন। মেয়াদ ১২ ডিসেম্বর ২০২৬-এ শেষ হচ্ছে। চুক্তি অনুযায়ী, ফারাক্কায় পয়লা জানুয়ারি থেকে ৩১ মে পর্যন্ত শুষ্ক মৌসুমের পানিপ্রবাহ ১০ দিনের গড়ে ভাগ করে : ৭০ হাজার কিউসেক বা তার কম হলে ৫০-৫০; ৭০ থেকে ৭৫ হাজারে বাংলাদেশ ৩৫ হাজার; ৭৫ হাজারের বেশি হলে ভারত ৪০ হাজার, বাকি বাংলাদেশ পাবে। ১১ মার্চ থেকে ১০ মে পর্যন্ত তিনটি পালাক্রমিক ১০ দিনে প্রত্যেকের জন্য ৩৫ হাজার কিউসেকের নিশ্চয়তা আছে। প্রবাহ ৫০ হাজার কিউসেকের নিচে নামলে জরুরি পরামর্শের কথা আছে। কিন্তু বাধ্যতামূলক ন্যূনতম বার্ষিক প্রবাহ নেই, স্বয়ংক্রিয় নবায়ন নেই, বিরোধে বাধ্যতামূলক সালিস নেই। অনুচ্ছেদ ১২ নবায়নকে পারস্পরিক সম্মতিতে সীমাবদ্ধ রাখে। ১৯৭৭ সালের ব্যবস্থায় যে ৮০ শতাংশ নির্ভরযোগ্যতার নিশ্চয়তাধারা ছিল, ১৯৯৬-এ তা বাদ যায়। ৫৪টি অভিন্ন নদীর মধ্যে এটি একমাত্র পূর্ণাঙ্গ পানিবণ্টন চুক্তি; তিস্তাসহ বাকিগুলো চুক্তিহীন। টিপাইমুখ নিয়ে উদ্বেগও থেকে গেছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ একসময় গুমের পর ভারতে উদ্ধার হলে তার বিরুদ্ধে বিনা ভিসায় সীমান্ত অতিক্রমের অভিযোগে মামলা হয়েছিল। আইন যদি ব্যক্তিনিরপেক্ষ হয়, তা হলে প্রশ্ন ওঠে : বাংলাদেশে লুণ্ঠন, সহিংসতা, মানবাধিকার লঙ্ঘন, পানি-আধিপত্য কাঠামো এখানে প্রাসঙ্গিক। উজানের রাষ্ট্র শক্তি প্রয়োগ না করেও তথ্য, অবকাঠামো ও সময় নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে ভাটির ন্যূনতম প্রবাহকে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে পরিণত করতে পারে (জাইতুন অ্যান্ড ওয়ার্নার,২০০৬)। পাটনামের দ্বিস্তরীয় খেলা (টু-লেভের গেম) ব্যাখ্যা করে, কেন বিহারের জনতা দল (ইউনাইটেড) নেতা সঞ্জয় কুমার ঝা চুক্তি এই রূপে নবায়ন না করার আহ্বান জানিয়েছেন। কেন পশ্চিমবঙ্গ দীর্ঘদিন পরামর্শ ছাড়া নবায়নের বিরোধিতা করেছে (পাটনাম, ১৯৮৮)। অভ্যন্তরীণ রাজনীতির এটি সত্যিই একটি সীমাবদ্ধতা। কিন্তু উজানের দেশ হিসেবে সময়মতো আলোচনা, তথ্যের স্বচ্ছতা ও ভাটির ন্যূনতম প্রবাহ নিশ্চিত করার দায়িত্ব ভারতের। একসময় ‘মমতা কার্ড’, এখন ‘বিহার কার্ড’-বারবার আন্তর্জাতিক দায় এড়ানোর হাতিয়ার হলে, সেটি ফেডারেল জটিলতা নয়, কৌশলগত স্থগিতকরণ। ভারতীয় সংসদীয় স্থায়ী কমিটিও সতর্ক করেছে, মেয়াদ শেষের আগে নতুন ব্যবস্থা না হলে পারস্পরিক আস্থা ক্ষুণ্ন হবে। পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এ বলেছেন, ঢাকা নবায়ন নয়, নিশ্চয়তাধারাসহ নতুন চুক্তি চায়; শুষ্ক মৌসুমের হিস্যা ও বর্ষায় অতিরিক্ত পানি ছাড়ার ক্ষতি দুটোই আলোচনায় আনতে চায়। পররাষ্ট্রমন্ত্রী আগস্টে সংসদে জানিয়েছেন, চুক্তির নতুন খসড়া প্রণয়ন করতে দল গঠন করে ভারতকে জানানো হয়েছে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল ২৯ সেপ্টেম্বর বলেছেন, গঙ্গাসহ অভিন্ন নদীর বিষয় যৌথ নদী কমিশন ও কারিগরি বৈঠকের আলোচ্য। আনুষ্ঠানিক উচ্চপর্যায়ের আলোচনা শুরুর প্রকাশ্য ঘোষণা তখনো ছিল না।
চুক্তিভঙ্গের একক রায় নেই। বাংলাদেশের দীর্ঘ দিনের অভিযোগ— শুষ্কতম সময়ে ফারাক্কায় পানির পরিমাপ ও পানি ছাড়ার তথ্যে অসামঞ্জস্য, ১০ দিনের গড়ে হিস্যা কম পাওয়া এবং ৫০ হাজার কিউসেকের নিচে নামলেও জরুরি পরামর্শ কার্যকর না হওয়া। নিশ্চয়তাধারা না থাকায় প্রবাহ কমলে দায়িত্ব ‘পরামর্শে’ গিয়ে ঠেকে। পদ্মা অববাহিকায় শুষ্ক মৌসুমে সেচ, বোরো, মৎস্য, নৌচলাচল ও সুন্দরবনের লবণাক্ততা বাড়ে; ভূগর্ভের পানির ওপর চাপ বাড়ে। বর্ষায় অপরিকল্পিতভাবে পানি ছাড়ার ফলে বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিম ও দক্ষিণ-পশ্চিমে আকস্মিক বন্যা ও ফসলহানির ঝুঁকি তৈরি করে। ১২ ডিসেম্বরের পর চুক্তি না থাকলে পানি বণ্টনের বিষয়টি রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে নেমে আসবে। বাংলাদেশের দরকষাকষির জায়গা আরো সঙ্কুচিত হবে। এটি নিঃসন্দেহে কোনো সুপ্রতিবেশীসুলভ নয়।
সীমান্ত : প্রতিশ্রুতি বনাম গভর্ন্যান্স ব্যর্থতা
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, গত এক দশকে সীমান্তে অন্তত ২৯৬ বাংলাদেশী নিহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে ২১৩ জন বিএসএফের গুলিতে। ২০২৪ সালে ৩০ জন এবং ২০২৫ সালে ৩৪ জন নিহত হন; ২০২৫-এর মধ্যে ২৪ জন গুলিতে ও ১০ জন নির্যাতনে। একই সংস্থার হিসাবে ২০২৬-এর প্রথম ছয় মাসে ২১টি ঘটনায় ১০ জন নিহত, ১০ জন আহত; নিহতদের সাতজন গুলিতে ও তিনজন নির্যাতনে। দুই বাহিনীর মহাপরিচালক পর্যায়ে বারবার ‘প্রাণহানি শূন্য’ বলার পরও এ ধারা চলছে। প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবতার এ ব্যবধানই শাসন-ব্যর্থতার স্পষ্ট উদাহরণ।
সাংস্কৃতিক আধিপত্য : অ্যান্তোনিও গ্রামসির ‘সাংস্কৃতিক আধিপত্য’ বলে, আধিপত্য শুধু বল প্রয়োগে তৈরি হয় না; বুদ্ধিবৃত্তিক ও নৈতিক নেতৃত্ব এমন সম্মতি তৈরি করে, যেখানে প্রভাবশালী পক্ষের ভাষা ও পছন্দ সাধারণ জ্ঞান হয়ে ওঠে (গ্রামসি, ১৯৭১)। ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কে ভাষা, গণমাধ্যম, চলচ্চিত্র, শিক্ষা ও রাজনৈতিক বয়ানে সরকাসরি না হয়ে পরক্ষো প্রভাব আছে, এ কথা বলা যায়। কিন্তু একে সরাসরি ‘নব্য উপনিবেশবাদ’ বললে বিশ্লেষণ দুর্বল হয়।
বাংলাদেশ ভারতবিরোধী রাষ্ট্র হতে চায় না। ইতিহাস, ভূগোল, বাণিজ্য ও নিরাপত্তা ঘনিষ্ঠ সহযোগিতার দাবি রাখে। কিন্তু সহযোগিতা অধীনতার নাম হতে পারে না। বন্ধুত্ব টেকসই হয় পারস্পরিক সম্মান, সার্বভৌম সমতা ও জনগণের স্বার্থে। রাষ্ট্র-রাষ্ট্র সম্পর্কের বৈধতা শুধু সরকারের সাথে সরকারের যোগাযোগে তৈরি হয় না; তা তৈরি হয় জনগণের উপলব্ধি, ন্যায়বিচার প্রদান ও নীতিগত ফলে।
ত্রিবেদীর মন্তব্য তাই একটি ব্যাখ্যা এবং একই সাথে একটি পরীক্ষার আমন্ত্রণ। পতিত ও মানবতাবিরোধী অপরাধে দণ্ডিত একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিকে আশ্রয় দেয়া যদি দায়িত্ব হয়, তবে সীমান্তে নিহত মানুষের জীবনের প্রতি দায় কী? ব্যাংক লুটের অর্থ ফেরত ও পি কে হালদারের মতো অভিযুক্তের প্রত্যর্পণে অগ্রগতি কোথায়? ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪-এর বিতর্কিত নির্বাচনে ধারাবাহিক কৌশলগত স্বাভাবিকীকরণের দায় কী? গঙ্গা, তিস্তা, টিপাইমুখ ও ৫৪ অভিন্ন নদীর ন্যায্য হিস্যার প্রতি দায় কী? এসব প্রশ্ন সাংবাদিক, সুশীল সমাজ ও সচেতন নাগরিককে করতে হবে।
শেষ প্রশ্ন একটিই, ভারতের দায়-দরদ কার প্রতি— বাংলাদেশের জনগণের প্রতি, নাকি একশ্রেণীর অভিযুক্ত ও ক্ষমতাচ্যুত রাজনৈতিক গোষ্ঠীর প্রতি? কোনো দল বা ব্যক্তির সাথে সম্পর্ক দীর্ঘস্থায়ী কৌশল হতে পারে না, যদি তা জনগণের আস্থা হারায়। স্বাধীন বাংলাদেশের জনগণ কৃতজ্ঞতা বোঝে, অধীনতা মেনে নেয় না; বন্ধুত্ব চায়, অসম মর্যাদা নয়; সহযোগিতা চায়, পছন্দমতো নীরবতা নয়।
লেখক : সাবেক সচিব, বাংলাদেশ সরকার; প্রেসিডেন্ট, সেন্টার ফর পলিসি অ্যানালাইসিস অ্যান্ড অ্যাডভোকেসি
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








