মতামত
মতামত। নয়া দিগন্ত গ্রাফিক্স

বাংলাদেশে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগে যখন খরা পরিস্থিতি বিরাজমান; তখন আকিজ শিল্প পরিবারের প্রতিষ্ঠাতা সেখ আকিজউদ্দীন (১৯২৯-২০০৬), স্কয়ার গ্রুপের স্যামসন এইচ চৌধুরী (১৯২৫-২০১২), প্রাণ আরএফএল গ্রুপের মেজর জেনারেল (অব:) আমজাদ হোসেন খান চৌধুরী (১৯৩৯-২০১৫), এপেক্স গ্রুপের সৈয়দ মঞ্জুর ইলাইহি (১৯৪২-২০২৫) প্রমুখের কথা মনে পড়ে। সরকারের নীতিসহায়তা, পৃষ্ঠপোষকতা, প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির পরাকাষ্ঠা তারা দেখাননি। তারা ছিলেন স্বনির্মিত, স্বউদ্যোগী ও পরিশ্রমী প্রত্যয়ী ব্যক্তিত্ব। 
বিশিষ্ট  শিল্পপতি, শিল্পোদ্যোক্তা ও সমাজসেবক সেখ আকিজউদ্দীন প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাগ্রহণের পরিবর্তে বাবার স্বাধীন ব্যবসায়ী চেতনা আয়ত্ত করেছিলেন। দরিদ্র বাবার সাহায্যার্থে তাকে ব্যবসার কাজ শুরু করতে হয়। ডাব বিক্রি, চানাচুর বাদাম ফেরি করার কাজ। ব্যবসায় ভুল হলে বাবার কাছে বকা খেতে হতো। একদিন বাবা-ছেলের মধ্যে বচসা বেধে যায়। আকিজ রাগ করে বাড়ি থেকে পালানোর সিদ্ধান্ত নেন। এ সময় তার বয়স ছিল ১২ বছর। সে সময় তার কাছে মাটির ব্যাংকে জমানো ১৭ টাকা নিয়ে এক কাপড়ে বাড়ি থেকে পালিয়ে যান। মানুষ হয়ে বাড়ি ফিরবেন— এ ছিল তার পণ। গভীর রাতে শিয়ালদা স্টেশনে এসে নেমে আকিজ দেখেন, অসংখ্য মানুষ প্ল্যাটফর্মের ওপর কাগজ বিছিয়ে শুয়ে আছেন। এখান থেকে আকিজ জীবনের প্রথম পাঠ নিয়েছিলেন। স্টেশনের প্ল্যাটফর্মই হয় তার সেই নতুন জীবনের আশ্রয়। সারাদিন শহর বেড়িয়ে রাত কাটে তার স্টেশনে। এক পয়সায় কেনা খবরের কাগজ বিছিয়ে মাথার নিচে ইট দিয়ে শুয়ে থাকা। দৃঢ়-কঠিন জীবন; কিন্তু আকিজ স্বপ্ন দেখেছিলেন এক অসামান্য জীবন প্রত্যয়ের। কলকাতার পথঘাট আকিজউদ্দীনের অজানা। কিন্তু এই অজানাকে চেনা, শহর ঘুরে ঘুরে কাজের সন্ধান করা। ইতোমধ্যে মন্দার প্রভাব শহরময় ছড়ানো। অচেনা এক কিশোর আকিজ। তাকে কাজ দেবেন কে? কিছু দিন ঘোরাফেরা করেন শহরের বিভিন্ন জায়গায়। এতে পুঁজিও কমে আসতে থাকে। আয় নেই কিন্তু ব্যয় আছে। তদুপরি ছাতু খেয়ে জীবন ধারণ। এ অবস্থায় হাতের টাকা কয়টি কিভাবে কাজে লাগানো যায় সেই চিন্তা। বাবার সাথে ব্যবসার কাজ করার অভিজ্ঞতা ছিল তার। সেই চিন্তা তার মাথায় খেলছিল। একদিন শহরের পথে হাঁটতে হাঁটতে আকিজ লক্ষ করেন বড় বাজারের রামলোচন স্ট্রিটের এক জায়গায় কমলালেবুর নিলাম হচ্ছে। বড় বাজারের বিভিন্ন জায়গায় নিয়মিত বিভিন্ন ফলের নিলাম হতো। এখান থেকে ফল কিনে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন জায়গায় বিক্রি করেন। আকিজ পূর্বঅভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে চাইলেন। সেই খুচরা বিক্রেতার কমলালেবুর নিলাম অনেক সময় নিয়ে দেখছিলেন। তিনিও নিলামের ডাকে অংশ নেন। আড়াই টাকা দিয়ে চার ঝুড়ি কমলা কিনেন। চার ঝুড়ি কমলা যখন কেনা হয়ে গেল, তখন আকিজ পড়েন আরেক বিপদে। ঝোঁকের মাথায় কমলা কেনা হয়েছে; কিন্তু এই অজানা শহরের কোথায় বিক্রি হবে তা তো জানা নেই। হঠাৎ হাওড়া ব্রিজের কথা তার মনে এলো। ওই ব্রিজ কিছু দিন আগে তৈরি হয়েছে। সেতু নির্মাণের অনেক কাজ তখনো বাকি। ফলে অনেক শ্রমিকের আনাগোনা ছিল সেখানে। এ জায়গাটি আকিজউদ্দীন তার কমলা বিক্রির উপযুক্ত ক্ষেত্র মনে করেন। তার এই ছিল কলকাতা জীবনের প্রথম ব্যবসা।

Advertisement

 
প্রথম দিনের ১০ পয়সা লাভ খুব কম ছিল না আকিজউদ্দীনের পক্ষে। এমন লাভ দেখে তিনি নিষ্ঠার সাথে ব্যবসাটি করতে লাগলেন। এভাবে কিছু দিন ব্যবসার পর লক্ষ করেন, তার হাতে প্রায় ৩০০ টাকা জমে গেছে। একসময় স্টেশনে তার ভাসমান জীবনের অবসান হলো। এ সময় তার বড় অঙ্কের মূলধন হওয়ায় ব্যবসা পরিবর্তনের চিন্তা করলেন। আরো ভালো ও বড় ব্যবসা কিভাবে করা যায়। তার খোঁজ করতে থাকলেন। তখনকার কলকাতার রাস্তায় রাস্তায় একটি দৃশ্য দেখা যেত। চার চাকার ঠেলাগাড়িতে বিভিন্ন মনোহারি পণ্য সাজিয়ে ‘নিলামওয়ালা ছ-আনা’ ‘যা নিবেন ছ-আনা’ ব্যবসা খুব জনপ্রিয় ছিল। ঠেলাগাড়িতে ৩০-৩৫ ধরনের পণ্য রাখা হতো। এই দোকানিরা সুন্দর সুন্দর ছড়া কাটতেন। সেসব ছড়ায় ক্রেতারা আকৃষ্ট হতেন। দোকানিদের উদ্দেশ্যও সফল হতো। তাদের পণ্যেও বিক্রি ভালো হতো। ছোট ও উঠতি বয়সী ছেলেমেয়েরা নিলামওয়ালা ফেরিওয়ালার কাছ থেকে তাদের মনের মতো খেলনা বা মনোহারি দ্রব্য কিনতে পছন্দ করত। আকিজউদ্দীন চমকদার ব্যবসাটির প্রতি আকৃষ্ট হলেন। তিনি একটি নতুন নিলামওয়ালা ঠেলাগাড়ির দোকান কিনলেন। আকর্ষণীয় ৩৫-৪০টি পণ্যে দোকানটি সাজালেন। সমস্যা হলো একটি। কারণ তিনি তখন পর্যন্ত হিন্দি ভাষা জানতেন না। যে হিন্দি ছড়াগুলো মুগ্ধকর এবং ছেলেমেয়েদের আকৃষ্ট করে; সেগুলো শিখতে চাইলেন তিনি। সেজন্য একজন হিন্দিভাষী সহকারী রাখলেন। এতে তার হিন্দি ছড়াগুলো আয়ত্ত করা সহজ হলো। কিছু দিনের মধ্যে ছড়াগুলো রপ্ত করলেন। তখন কিশোর আকিজউদ্দীনের মুখে হিন্দি ছড়াগুলো শুনে প্রচুর লোক তার দোকানে আসতে লাগলেন। এভাবে তার এই ব্যবসাও পুরনো দোকানিদের ছাড়িয়ে যেতে লাগল। প্রায় পুরো এক বছর আকিজউদ্দীনের ‘নিলামওয়ালা ছ-আনা’ ব্যবসা বেশ রমরমাভাবে চলল। কিন্তু ইতোমধ্যে তিনি পুলিশের খপ্পরে পড়লেন। শোনা যায় পুরনো দোকানিরা তার বিরুদ্ধে পুলিশকে লেলিয়ে দেন। অনুমতি ছাড়া রাস্তায় দোকান করার অভিযোগে পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে। 
তখনকার ব্রিটিশ ভারতের আদালতে বিচারব্যবস্থা ছিল খুব কঠোর। শ্বেতাঙ্গ বিচারকরা কারণে-অকারণে ভারতীয়দের কঠোর শাস্তি দিতেন। কিন্তু আকিজউদ্দীনের বেলায় একটু ব্যতিক্রম হলো। তার চেহারায় একটি সাধারণ লাবণ্য ছিল। ছিল নিষ্পাপ উজ্জ্বল মুখ। বিচারের সময় তার এ চেহারা দেখে বিচারকের মায়া হয়। বিচারক আকিজউদ্দীনকে মাত্র তিন দিনের জেল ও পাঁচ টাকা জরিমানা করেন। তবু নির্দোষ আকিজউদ্দীন এ জরিমানা ও জেল খাটার কথা মনে করে ভেঙে পড়েন। জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর এই ব্যবসায় আর ফিরতে চাইলেন না। তিনি চার চাকার ঠেলাগাড়ি এবং দোকানের সব পণ্য বিক্রি করে দিলেন। 
হঠাৎ একদিন পূর্বপরিচিত পেশোয়ারের এক ফল ব্যবসায়ীর সাথে সাক্ষাৎ হয়। কলকাতায় এসে প্রথম যে কমলালেবুর ব্যবসা শুরু করেছিলেন, রামলোচন স্ট্রিটের সেই কমলালেবু বিক্রেতা ছিলেন পেশোয়ারের ব্যবসায়ী। তিনি আকিজউদ্দীনের কাছ থেকে তার কলকাতা জীবনের সব ঘটনা শুনলেন। নির্ভীক আকিজউদ্দীন তার প্রস্তাবে সম্মত হয়ে পেশোয়ারে গেলেন। পেশোয়ারে স্বল্পকাল অবস্থান করলেও পরবর্তীকালে জীবনে এর প্রভাব ছিল সুদূরপ্রসারী। এমনকি তার এই পেশোয়ার বাসের অভিজ্ঞতা একবার নিজের জীবন বাঁচাতে সাহায্য করেছিল। ভবিষ্যতে বাংলাদেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে তার সাফল্য লাভের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল এটি। 
পেশোয়ার যাওয়ার সময় আকিজউদ্দীনের কাছে প্রায় দুই হাজার দুই শ’ টাকা ছিল। পেশোয়ারে ব্যবসা করার পর তার এই মূলধন প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যায়। সন্দেহ নেই তখনকার চার হাজার ৫০০ টাকার পুঁজি মানে বেশ বড় ব্যাপার। বড় ব্যবসায়ী না হলেও এ পুঁজি দিয়ে সচ্ছল ছোটখাটো ব্যবসায়ী হওয়া সম্ভব ছিল। তিনি এ পুঁজি সম্বল করে পেশোয়ার থেকে পূর্ব দিকে রওনা হলেন।  কলকাতায় এসে তার বাড়ি ফেরার ইচ্ছা জাগে। ব্যবসার পুরনো পরিবেশে তিনি আর একবার চেষ্টা করলেন। এবার ব্যবসার ধারা পরিবর্তন করে বাবার পুরনো ব্যবসা ধরলেন তিনি। তার বাবা তরকারির ব্যবসা করতেন। তিনি শিয়ালদা স্টেশনের পাশে নফরবাবু বাজারের রাধারাম বল্লভের আড়শ থেকে বিভিন্ন ধরনের তরকারি কিনে ওই বাজারে বসে খুচরা বিক্রি করতে শুরু করেন। ব্যবসায় তার প্রচুর লাভ হতে থাকে। এ ব্যবসায় তিনি এক বছর নিয়োজিত ছিলেন। 
১৯৪৪ সালে বাড়ি ফেরার সময় তার কাছে পুঁজি জমেছিল প্রায় আট হাজার টাকা। ১৯৪৮ সালে  বিয়ে করলেন সখিনা খাতুনকে। বিয়ের পর আকিজউদ্দীনের জীবনে বড় রকমের একটি পরিবর্তন আসে। নিজের চিন্তা ও সংকল্পের প্রতি অনড় থাকেন। শুধু সাংসারিক কাজ করে নিজের স্বপ্ন ও সম্ভাবনাকে নষ্ট করে চাইতেন না। স্বাধীনচেতা আকিজউদ্দীন নিজের স্বপ্ন সার্থক করতে চেয়েছিলেন। আর্থিক সামর্থ্য স্বল্প হলেও আত্মবিশ্বাসের প্রতি অটল ছিলেন। 
১৯৫২ সালে আকিজ প্রথম বিড়ির ব্যবসা শুরু করেন। সেই সময়ের বিখ্যাত ‘বিধু’ বিড়ির মালিক বিধু ভূষণ ছিলেন তার এক বন্ধুর বাবা। তার অনুপ্রেরণাতে আকিজ প্রচণ্ড পরিশ্রম করে বিড়ির ব্যবসাটি দাঁড় করানোর চেষ্টা শুরু করেন। ধীরে ধীরে বেজেরডাঙ্গা তার নিজ এলাকায় রেলস্টেশনের পাশে একটি মুদি দোকান প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৫৪-৫৫ সালের দিকে এ দোকানে তার মোট বিনিয়োগের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৬০ হাজার টাকা। এক রাতে আকিজের পুরো দোকানটি পুড়ে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। অসীম ধৈর্যশীল আকিজ এতটুকু ভেঙে পড়েননি। স্থানীয় লোকজনের সহায়তায় অচিরে তিনি গড়ে তোলেন নতুন দোকান। তার সততা, নিষ্ঠা, একাগ্রতা ও নিরলস পরিশ্রমে কিছু দিনের মধ্যে মোট মূলধনের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় এক লাখ টাকা। পাশাপাশি আকিজ শুরু করেন ধান, পাট, চাল, ডাল, গুড় প্রভৃতির খুচরা ব্যবসা। সবসময় আকিজের প্রধান মূলধন ছিল বিশ্বস্ততা। ব্যবসায়ী মহলের সবাই তাকে একবাক্যে বিশ্বাস করত। পরবর্তীকালে ষাটের দশকের দিকে ব্যবসায়িক কারণে চলে আসেন যশোরের সীমান্তবর্তী থানার নাভারণ পুরাতন বাজারে। এখান থেকে বিড়ির ব্যবসার ব্যাপক প্রসার ঘটান। গড়ে তোলেন দেশের সর্ববৃহৎ আকিজ বিড়ি ফ্যাক্টরি। 
এভাবে ধাপে ধাপে এগিয়ে চলেন আকিজ। নতুন নতুন উদ্ভাবনী মেধায় তিনি উন্মোচন করেন ব্যবসার বিভিন্ন দিগন্ত। একে একে গড়ে তোলেন আকিজ তামাক ফ্যাক্টরি, আকিজ নেভিগেশন, আকিজ জুটমিল, আকিজ ম্যাচ ফ্যাক্টরি, আকিজ সিমেন্ট ফ্যাক্টরি ইত্যাদি শিল্পপ্রতিষ্ঠান। এসবের পেছনে ছিল তার সকাল থেকে রাত অবধি অক্লান্ত পরিশ্রম ও মেধা এবং পরবর্তীকালে তার সন্তানদের নিজ নিজ ক্ষেত্র ও খাতে সফল শিল্প উদ্যোগ ও দক্ষতার কারণে। 
একজন সফল ব্যবসায়ী হওয়া সত্ত্বেও সেখ আকিজউদ্দীনের প্রাতিষ্ঠানিক কোনো শিক্ষা ছিল না। অক্লান্ত পরিশ্রম, কঠোর অধ্যবসায়, আপসহীন সততা, সর্বোপরি মহান আল্লাহর ওপর পরিপূর্ণ আস্থা তাকে সফলতার চূড়ান্ত শিখরে পৌঁছে দিয়েছে। বাস্তব অভিজ্ঞতা তার পুরো জীবনের নিয়ন্ত্রক। অভিজ্ঞতা থেকে পাওয়া জ্ঞান সহজে নিজের জীবনে ব্যবহার করতে পেরেছিলেন। বিশাল শিল্প পরিবার গড়ে তোলার ক্ষেত্রে তার নিজের জীবনে স্কুল-কলেজের শিক্ষার প্রয়োজন হয়নি; বরং প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার প্রতি এক ধরনের অনাগ্রহ সৃষ্টি হয়েছিল। তবে দূরদৃষ্টিসম্পন্ন হওয়ায় সন্তানদের নিজ নিজ ক্ষেত্রে উচ্চশিক্ষা লাভের প্রতি ছিলেন অয়োময় নির্দেশক ও যত্নবান, যার ডিভিডেন্ড আকিজ শিল্প পরিবার পাচ্ছে এখন। তাদের মেধা ও প্রতিভার সমন্বয়ে গড়ে তোলা তার প্রতিষ্ঠানে এখন হাজার হাজার শ্রমজীবী মেহনতি মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। প্রকারান্তরে রাষ্ট্রীয় কোষাগার পাচ্ছে বেসরকারি খাতে পুনঃবিনিয়োগযোগ্য পুঁজি। 
লেখক : সাবেক সচিব, এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান