ব্যাংকিংয়ে ডিজিটাল ঝুঁকি নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ

 বিশেষ সংবাদদাতা

Advertisement

বাংলাদেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থা দ্রুত ডিজিটাল হচ্ছে। ব্যাংকের শাখায় না গিয়ে এটিএম থেকে টাকা তোলা, ডেবিট ও ক্রেডিট কার্ডে কেনাকাটা, এক ব্যাংকের কার্ড অন্য ব্যাংকের বুথে ব্যবহার এবং বিভিন্ন ইলেকট্রনিক মাধ্যমে অর্থ পরিশোধ- সবই এখন দৈনন্দিন আর্থিক জীবনের অংশ। কিন্তু এই ব্যবস্থার নির্ভরযোগ্যতা কতটা, একটি প্রযুক্তিগত ত্রুটি কতগুলো ব্যাংকের গ্রাহককে একসাথে বিপাকে ফেলতে পারে এবং জরুরি পরিস্থিতিতে বিকল্প ব্যবস্থা কত দ্রুত চালু করা সম্ভব- এসব প্রশ্ন নতুন করে সামনে এসেছে।
গত ৬ অক্টোবর কিউ-ক্যাশ নেটওয়ার্কের সমস্যার কারণে অন্তত ৩০টি ব্যাংকের কার্ডভিত্তিক ও  এটিএম লেনদেন ব্যাহত হয়েছিল। ঘটনাটি গুরুত্বপূর্ণ শুধু এই কারণে নয় যে কিছু গ্রাহক টাকা তুলতে বা কার্ড ব্যবহার করতে সমস্যায় পড়েছিলেন; বরং এটি দেখিয়েছে, একাধিক ব্যাংকের সেবা যদি একটি অভিন্ন প্রযুক্তিগত অবকাঠামোর ওপর নির্ভরশীল হয়, তাহলে সেই অবকাঠামোর সমস্যার প্রভাব একসাথে বহু প্রতিষ্ঠানে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
এদিন ৩০টি ব্যাংকের লেনদেন ব্যাহত হওয়ার তথ্য থেকে সব ব্যাংকের সব সেবা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল, সব এটিএম অচল ছিল কিংবা গ্রাহকের অর্থ হারিয়ে গেছে- এমনটি ঘটেনি। সমস্যার প্রকৃত পরিধি নির্ধারণে জানতে হবে কোন কোন সেবা বন্ধ বা ধীর হয়েছিল, কতক্ষণ বিঘœ স্থায়ী হয়েছিল, কতটি লেনদেন ব্যর্থ হয়েছিল এবং পরে সেগুলোর নিষ্পত্তি কিভাবে হয়েছে।
সেবা ফিরেছে, কিন্তু জবাবদিহির প্রশ্ন রয়ে গেছে
১০ অক্টোবর ২০২৬ পর্যন্ত পাওয়া প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, কিউ-ক্যাশ নেটওয়ার্কের মাধ্যমে প্রভাবিত ব্যাংকগুলোর কার্ড ও সংশ্লিষ্ট ডিজিটাল লেনদেন ৬ অক্টোবর রাতেই আবার চালু করা হয়েছিল। অর্থাৎ ১০ অক্টোবর দুপুর পর্যন্ত সব সেবা বন্ধ থাকার যে সময়সীমা গ্রাহকদের জানানো হয়েছিল, তার আগেই জরুরি সেবা পুনরুদ্ধার করা হয়। তবে নির্ধারিত সিস্টেম মাইগ্রেশনের কাজ ১০ অক্টোবর দুপুর পর্যন্ত চলার কথা ছিল।
বাংলাদেশ ব্যাংক কিউ-ক্যাশ পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান আইটি কনসালট্যান্টস পিএলসির ব্যবস্থাপনাকে তলব করে এবং দ্রুত সেবা চালুর নির্দেশ দেয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংক লিখিত ব্যাখ্যাও চেয়েছে বলে সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে।
ঘটনার গুরুত্বপূর্ণ তথ্য অনুযায়ী, অন্তত ৩০টি এবং কোনো কোনো প্রতিবেদনে ৩১টি ব্যাংকের সেবায় বিঘেœর কথা জানা গেছে। ৪ অক্টোবর রাত থেকে বিঘœ শুরু; ৬ অক্টোবর রাতে সেবা পুনরুদ্ধারের খবর প্রকাশিত হয়।
বহুমাত্রিক প্রভাব পড়ে। এটিএম, কার্ড, পয়েন্ট-অব-সেল (চঙঝ), ইন্টারনেট ব্যাংকিংয়ের আন্তব্যাংক অর্থ স্থানান্তরসহ কিছু সংশ্লিষ্ট সেবা ব্যাহত হয়।
প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলোতে ঘটনার তাৎক্ষণিক কারণ হিসেবে কিউ-ক্যাশের সিস্টেম মাইগ্রেশন, সার্ভার সমস্যা এবং প্রযুক্তি সরবরাহকারীর সাথে বিরোধ- তিনটি বিষয় উঠে এসেছে। তবে এগুলোকে একই মাত্রায় প্রতিষ্ঠিত তথ্য হিসেবে দেখা যাবে না।
কিউ-ক্যাশ পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান আইটি কনসালট্যান্টসের বক্তব্য অনুযায়ী, সার্ভারে ত্রুটি দেখা দেয়ায় পূর্বনির্ধারিত সময়ের আগেই সিস্টেম মাইগ্রেশন শুরু করতে হয়েছিল। অন্যদিকে, গণমাধ্যমের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে রাশিয়াভিত্তিক প্রযুক্তি সরবরাহকারী কম্পাস প্লাসের সাথে সফটওয়্যার পরিবর্তন ও চুক্তিগত বিরোধের বিষয়টি উঠে এসেছে। আইটিসিএল অভিযোগ করেছে, প্রতিষ্ঠানটি তাদের সার্ভারে এমন একটি স্ক্রিপ্ট স্থাপন করেছিল, যা নির্দিষ্ট বিরতিতে সার্ভার আবার চালু করে নেটওয়ার্কের রাউটিং-সংক্রান্ত তথ্য মুছে দিচ্ছিল।
তবে কারণ যা-ই হোক, একটি মৌলিক প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই: গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক সেবার প্রযুক্তিগত পরিবর্তন কেন এমন পরিস্থিতি তৈরি করল, যাতে বহু ব্যাংকের গ্রাহক একই সময়ে সমস্যায় পড়লেন?
সফটওয়্যার মাইগ্রেশন ব্যাংকিং প্রযুক্তির স্বাভাবিক অংশ। পুরনো সফটওয়্যার বদলানো, নিরাপত্তা হালনাগাদ করা কিংবা নতুন প্ল্যাটফর্মে স্থানান্তর করার প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু এমন পরিবর্তনের আগে পরীক্ষামূলক পরিবেশে যাচাই, ব্যাকআপ, বিকল্প সার্ভার, ধাপে ধাপে স্থানান্তর এবং ব্যর্থ হলে আগের ব্যবস্থায় ফিরে যাওয়ার পরিকল্পনা থাকা জরুরি। এসব ব্যবস্থা কার্যকর থাকলে একটি প্রযুক্তিগত সমস্যা এত বিস্তৃত সেবা-বিঘেœ রূপ নেবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলার যথেষ্ট কারণ রয়েছে।
কিউ-ক্যাশ কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
কিউ-ক্যাশ একটি আন্তব্যাংক কার্ড ও পেমেন্ট নেটওয়ার্ক। এর মতো নেটওয়ার্ক বিভিন্ন ব্যাংকের কার্ড, এটিএম এবং ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের পেমেন্ট টার্মিনালের মধ্যে লেনদেনের বার্তা আদান-প্রদান ও অনুমোদনের প্রক্রিয়া পরিচালনা করে।
ধরা যাক, একজন গ্রাহক তার ব্যাংকের কার্ড দিয়ে অন্য ব্যাংকের এটিএম থেকে টাকা তুলতে গেলেন। সাধারণভাবে কার্ডের তথ্য যাচাই, লেনদেনের অনুরোধ সংশ্লিষ্ট ব্যাংকে পাঠানো এবং অনুমোদনের উত্তর ফেরত আসার জন্য একাধিক প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা কাজ করে। এই শৃঙ্খলের কোনো গুরুত্বপূর্ণ অংশ অকার্যকর হলে লেনদেন ব্যর্থ হতে পারে, যদিও গ্রাহকের হিসাবে পর্যাপ্ত অর্থ রয়েছে এবং কার্ডটিও বৈধ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক স্থিতিশীলতা প্রতিবেদন ২০২৫ অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে জাতীয় পেমেন্ট সুইচ বাংলাদেশের (এনপিএসবি) সাথে এটিএম লেনদেনের জন্য ৫৭টি, পিওএস লেনদেনের জন্য ৫৫টি এবং ইন্টারনেট ব্যাংকিং ফান্ড ট্রান্সফারের জন্য ৫৬টি তফসিলি ব্যাংক যুক্ত ছিল। ওই বছরে এনপিএসবি-তে ১৯ কোটি ৯২ লাখ ৪০ হাজার লেনদেন হয়েছে, যার আর্থিক মূল্য ছিল ৬০৩৪.৭১ বিলিয়ন টাকা- অর্থাৎ প্রায় ৬.০৩ লাখ কোটি টাকা।
এই পরিসংখ্যান দেখায়, ডিজিটাল পেমেন্ট এখন আর ব্যাংকের একটি সহায়ক সেবা নয়। এটি অর্থনীতির দৈনন্দিন লেনদেনের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো। সেই অবকাঠামোর কোনো একটি অংশে বিঘœ ঘটলে প্রভাব শুধু ব্যাংকের আইটি বিভাগে সীমাবদ্ধ থাকে না; গ্রাহক, ব্যবসায়ী, কর্মচারী এবং আর্থিক সেবার ওপর নির্ভরশীল প্রতিষ্ঠানগুলোও সমস্যায় পড়ে।
শুধু টাকা তুলতে না পারার সমস্যা নয়
ডিজিটাল লেনদেনে বিঘেœর ক্ষতি নিরূপণ করতে হলে শুধু ব্যর্থ লেনদেনের সংখ্যা গণনা করলেই হবে না। গ্রাহকের সময়, ব্যবসায়িক ক্ষতি, জরুরি ব্যয় মেটাতে না পারা এবং ব্যাংকের ওপর আস্থার অবনতিও বিবেচনায় নিতে হবে।
৬ অক্টোবরের ঘটনায় প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলোতে গ্রাহকদের এটিএম থেকে টাকা তোলা, দোকানে কার্ড ব্যবহার, অনলাইন কেনাকাটা এবং আন্তব্যাংক অর্থ স্থানান্তরে সমস্যার কথা এসেছে। কোনো কোনো ব্যাংকের গ্রাহককে বেতন তোলার ক্ষেত্রেও অসুবিধায় পড়তে হয়েছে।
ক্ষতির ধরনগুলো আলাদা করে দেখলে সমস্যার ব্যাপ্তি আরো পরিষ্কার হয়: ১. নগদ অর্থের তাৎক্ষণিক সঙ্কট: মাসের শুরুতে বেতন, বাড়িভাড়া, বাজারসদাই, ওষুধ বা হাসপাতালের বিল পরিশোধের জন্য নগদ অর্থ প্রয়োজন হতে পারে। কার্ড কাজ না করলে হিসাবের টাকা থাকা সত্ত্বেও গ্রাহক তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবহার করতে পারেন না।
২. ব্যবসা ও বাণিজ্যে বাধা : কার্ডনির্ভর দোকান, রেস্তোরাঁ, হোটেল ও অনলাইন ব্যবসায় বিক্রি সম্পন্ন না হওয়া, গ্রাহক হারানো কিংবা বিকল্প পদ্ধতিতে অর্থ গ্রহণের বাড়তি ব্যয় তৈরি হতে পারে।
৩. ব্যর্থ বা ঝুলে থাকা লেনদেন : টাকা কাটা গেলেও লেনদেন সম্পন্ন না হলে গ্রাহককে ফেরত পাওয়ার জন্য অভিযোগ করতে হতে পারে। তবে এই ঘটনায় কতটি লেনদেনে এমন হয়েছে, তার নির্ভরযোগ্য সামগ্রিক পরিসংখ্যান প্রকাশিত প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি।
৪. আস্থা ও সুনামের ক্ষতি: গ্রাহক সাধারণত প্রযুক্তি সরবরাহকারীকে চেনেন না। তিনি কার্ড ব্যবহার করেন নিজের ব্যাংকের নামে। ফলে তৃতীয় পক্ষের অবকাঠামোতে সমস্যা হলেও দায় ও জবাবদিহির প্রশ্নে ব্যাংককেই সামনে আসতে হয়।
সব ব্যাংকের সক্ষমতা এক নয়
এই ঘটনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোর একটি হলো, সব ব্যাংকের সেবা একইভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, যেসব ব্যাংকের কিউ-ক্যাশের পাশাপাশি নিজস্ব সুইচ বা বিকল্প পেমেন্ট নেটওয়ার্ক ছিল, তারা কিছু কার্ডভিত্তিক সেবা চালু রাখতে পেরেছে। ওয়ান ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকও বিকল্প নেটওয়ার্ক থাকার কারণে তাদের গ্রাহকেরা কার্ড লেনদেনে একই ধরনের বিঘেœর মুখে পড়েননি বলে জানিয়েছিলেন।
এটি দেখায়, প্রযুক্তিগত বিকল্প থাকা শুধু সুবিধার বিষয় নয়; সেবা সচল রাখার সক্ষমতারও অংশ।
ব্যাংকগুলোর প্রস্তুতি মূল্যায়নে অন্তত চারটি বিষয় যাচাই করা জরুরি : বিকল্প ব্যবস্থা যেন একই সার্ভার, একই সফটওয়্যার বা একই প্রযুক্তি সরবরাহকারীর ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল না হয়। বাস্তবসম্মত পরীক্ষায় নেটওয়ার্ক বন্ধ রেখে দেখা, বিকল্প ব্যবস্থা কত দ্রুত সচল করা যায়। প্রধান নেটওয়ার্কে সমস্যা হওয়ার আগে বা চলাকালে শুরু হওয়া লেনদেনের হিসাব যেন আবার চালু হওয়ার পর দ্বিগুণ, অসম্পূর্ণ বা ভুলভাবে নিষ্পত্তি না হয়। প্রধান নেটওয়ার্ক অচল হলে লেনদেন অন্য অনুমোদিত পথে পাঠানোর সক্ষমতা।
বিশেষজ্ঞ মত : কারিগরি ত্রুটিতেও পেমেন্ট সচল থাকা আবশ্যক
কিউ-ক্যাশ বিপর্যয় ও সার্বিক পেমেন্ট কাঠামোর টেকসই সক্ষমতা নিয়ে বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের ডিজিটাল পরিষেবা বিশেষজ্ঞ ও মিলেনিয়াম ইনফরমেশন সলিউশন লিমিটেডের (এমআইএসএল) সিইও ও সহ-প্রতিষ্ঠাতা মাহমুদ হোসেনের (বিএসইই, এমবিএ) মুখোমুখি হয় নয়া দিগন্ত। তার মতে, কোনো কারিগরি ত্রুটি, সরবরাহকারীর সাথে বিরোধ কিংবা প্রযুক্তিগত রূপান্তর ঘটার পরও একটি পেমেন্ট সিস্টেমকে নিরবচ্ছিন্ন থাকতে হবে। গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক সেবার ধারাবাহিকতা বজায় রাখা কেবল আইটি বিভাগের বিষয় নয়, এটি জন-আস্থা ও আর্থিক স্থিতিশীলতার মূল শর্ত।
প্রকাশিত প্রতিবেদনের তথ্যানুযায়ী, ৪ অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া এই বিঘেœ প্রায় ৩০টি ব্যাংকের এটিএম, কার্ড ও সংশ্লিষ্ট লেনদেন ব্যাহত হয় এবং ৬ অক্টোবর রাতে সেবা চালুর খবর আসে। অপারেটর আইটিসিএল ও তাদের কার্ড-সফটওয়্যার সরবরাহকারী সংস্থা কম্পাস প্লাসের মধ্যকার সিস্টেম মাইগ্রেশন এবং চুক্তিগত বিরোধের বিষয়টিকে এই ঘটনার উৎস হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। 
তবে মূল চিন্তার বিষয় হলো- একটিমাত্র অপারেটর ও তার সফটওয়্যার জোগানদারের সঙ্কট কিভাবে বহু ব্যাংকের সেবাকে থমকে দিতে পারল। এটি সেন্ট্রালাইজেশন বা একক নির্ভরতার ঝুঁকি, প্রযুক্তি সরবরাহকারীর ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা, পরিবর্তন ব্যবস্থাপনা এবং দুর্যোগকালীন সুরক্ষার সক্ষমতা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন তুলেছে। তদন্তের মাধ্যমে মূল কারণ অনুসন্ধানের পাশাপাশি কেন বিদ্যমান সুরক্ষাব্যবস্থা ব্যর্থ হলো, তা উদ্ঘাটন করা অত্যন্ত জরুরি।
ব্যাংক ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার করণীয়
অপারেশনাল রেজিলিয়েন্স বা পরিচালনগত স্থায়িত্ব নিশ্চিতে প্রকৌশলী মাহমুদ হোসেন ব্যাংক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের জন্য পাঁচটি সুপারিশ তুলে ধরেন:
১. নিয়ন্ত্রক তদারকি জোরদার : বাংলাদেশ ব্যাংককে একটি স্বাধীন কারিগরি ও শাসনকেন্দ্রিক পর্যালোচনার মাধ্যমে পুরো খাতের জন্য স্পষ্ট সংশোধনমূলক ব্যবস্থা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
২. একক নির্ভরতার ঝুঁকি চিহ্নিতকরণ: যৌথ অপারেটর, প্ল্যাটফর্ম ও সফটওয়্যার লাইসেন্সের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে বিকল্প ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
৩. পুনরুদ্ধার সক্ষমতার বাস্তব পরীক্ষা : শুধু কাগজে-কলমে ‘ডিজাস্টার রিকভারি প্ল্যান’ থাকা যথেষ্ট নয়। সরবরাহকারীর ব্যর্থতা বা সফটওয়্যার বিচ্ছিন্নতার মতো চরম পরিস্থিতিতে নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে ডাটা পুনরুদ্ধার হচ্ছে কি না, তার নিয়মিত মহড়া চালাতে হবে।
৪. চুক্তিতে সেবার ধারাবাহিকতার শর্ত: চুক্তিতে প্রযুক্তি সরবরাহকারীর সাথে বিরোধ তৈরি হলেও সেবা চালু রাখা, ডাটা বহনযোগ্যতা এবং নিয়মতান্ত্রিক এক্সিট রূপরেখার আইনি বাধ্যবাধকতা থাকতে হবে।
৫. জাতীয় প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও ইন্টার-অপারেবিলিটি: দেশীয় প্রকৌশলগত দক্ষতা ও ইন্টার-অপারেবল ফিনটেক কাঠামোয় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে, যাতে সরবরাহকারী দেশী বা বিদেশী যা-ই হোক না কেন, যেকোনো সঙ্কটে নিজস্ব আইনি নিয়ন্ত্রণে সিস্টেম চালানো ও সচল রাখা যায়।
বিদেশী সফটওয়্যারের ওপর নির্ভরতা বন্ধ করা কি সমাধান?
প্রকৌশলী মাহমুদ হোসেনের স্পষ্ট বক্তব্য- এর সমাধান বিদেশী প্রযুক্তি বর্জন করা নয়, বরং বুদ্ধিমত্তার সাথে প্রযুক্তি নির্ভরতা পরিচালনা করা। আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যাংকিং আধুনিকায়নে বড় ভূমিকা রেখেছে এবং দেশীয় সেবাদাতারাও তৃতীয় পক্ষের প্রযুক্তি ও অবকাঠামোর ওপর নির্ভরশীল।
তিনি নয়া দিগন্তকে বলেন, বিষয়টি সরবরাহকারীর জাতীয়তার নয়; ব্যাংক বা অপারেটরের কাছে সিস্টেমের পর্যাপ্ত নিয়ন্ত্রণ, প্রযুক্তিগত স্থায়িত্ব এবং সহজে তা প্রতিস্থাপনের বাস্তব সক্ষমতা আছে কি না। দেশীয় সক্ষমতাকে উৎসাহিত করার পাশাপাশি বৈশ্বিক উদ্ভাবনের পথ খোলা রাখতে হবে। ‘প্রযুক্তিগত সার্বভৌমত্ব’ মানে হলো সঙ্কটকালে আইনগত ও বাস্তব শক্তিতে যেকোনো সঙ্কটময় প্রযুক্তি পরীক্ষা, পুনরুদ্ধার বা প্রতিস্থাপন করার সক্ষমতা অর্জন করা।
সাইবার নিরাপত্তা, নাকি প্রযুক্তি ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতা?
ঘটনার কারণ নিয়ে সবচেয়ে সংবেদনশীল প্রশ্নটি এখানেই। আইটি কনসালট্যান্টসের অভিযোগ অনুযায়ী, প্রযুক্তি সরবরাহকারী কম্পাস প্লাসের সাথে সফটওয়্যার পরিবর্তন নিয়ে বিরোধের মধ্যে সার্ভারে সমস্যাজনক স্ক্রিপ্ট যুক্ত হয়েছিল। অন্যদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের বক্তব্য উদ্ধৃত করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক কিউ-ক্যাশ পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানকে তলব করেছে এবং সেবা পুনরুদ্ধারের নির্দেশ দিয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য ঘটনার তাৎক্ষণিক নিষ্পত্তির বাইরে কয়েকটি পদক্ষেপ প্রয়োজন: কী কারণে সেবা ব্যাহত হয়েছিল, কারা কখন বিষয়টি জানতে পেরেছিল, বিকল্প ব্যবস্থা কেন যথেষ্ট ছিল বা ছিল না এবং গ্রাহকের তথ্য ঝুঁকিতে পড়েছিল কি না- এসব বিষয়ে যাচাইযোগ্য প্রতিবেদন প্রকাশ করা দরকার।
এছাড়া প্রতিটি ব্যাংক ও গুরুত্বপূর্ণ পেমেন্ট অপারেটরের কাছে বিকল্প অবকাঠামো, তথ্য পুনরুদ্ধার, জরুরি যোগাযোগ এবং সেবা আবার চালুর পরীক্ষিত পরিকল্পনা থাকতে হবে। নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ এবং জরুরি মেরামত এক বিষয় নয়। কোন পরিস্থিতিতে তাৎক্ষণিক পরিবর্তন করা যাবে, কার অনুমোদন লাগবে এবং গ্রাহককে কিভাবে জানানো হবে- এসব স্পষ্ট করতে হবে।
একই সাথে সফটওয়্যার লাইসেন্স, প্রযুক্তিগত সহায়তা, চুক্তি বাতিল, বিকল্প সরবরাহকারী এবং জরুরি অবস্থায় সিস্টেমের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে- এসব বিষয় আগেই নির্ধারিত থাকা উচিত। টাকা কেটে গিয়ে সেবা না পাওয়া, ভুলভাবে অর্থ কর্তন, অতিরিক্ত ফি বা ব্যর্থ লেনদেনের কারণে ক্ষতির অভিযোগ দ্রুত নিষ্পত্তির সময়সীমা নির্ধারণ করা দরকার।
সেবা পুনরুদ্ধার স্বস্তির বিষয় তবে-
কিউ-ক্যাশের ঘটনায় তাৎক্ষণিক সেবা পুনরুদ্ধার স্বস্তির বিষয়। কিন্তু একটি নেটওয়ার্কের সমস্যায় বহু ব্যাংকের গ্রাহক একযোগে ভোগান্তিতে পড়ার অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের সম্প্রসারণের সাথে সাথে তার বিকল্প ব্যবস্থা, প্রযুক্তিগত স্বাধীনতা এবং জরুরি পরিস্থিতি মোকাবেলার সক্ষমতাও বাড়ানো প্রয়োজন।
ফাইন্যান্সিয়াল টেকনোলজির প্রকৃত পরীক্ষা কেবল স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে লেনদেন সম্পন্ন করা নয়, বরং একটি গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহকারী ব্যর্থ হলেও অপরিহার্য পেমেন্ট সেবা চালু রাখতে পারা। ব্যাংকিংয়ের ডিজিটাল রূপান্তরের সাফল্য শুধু কতটি এটিএম, কার্ড বা মোবাইল অ্যাপ চালু আছে, তা দিয়ে মাপা যায় না। সাফল্যের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠি হলো- কোনো একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা অচল হলেও গ্রাহক কতটা নির্বিঘেœ তার অর্থ ব্যবহার করতে পারেন।