
চীনের পান্ডা কূটনীতি হলো একটি সফল নরম শক্তি কৌশল, যেখানে জায়ান্ট পান্ডাকে কূটনৈতিক উপহার বা ঋণ হিসাবে অন্য দেশে পাঠিয়ে সম্পর্ক উন্নয়ন করা হয়। পঞ্চাশের দশক থেকে শুরু হয়ে এটি বিশেষ করে সত্তরের দশকে যুক্তরাষ্ট্রে দু’টি পান্ডা উপহার দেয়ার মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী পরিচিতি পায়। পান্ডা চীনের জাতীয় প্রতীক হওয়ায় এগুলো প্রেরণ দেশগুলোর সাথে বন্ধুত্ব ও সহযোগিতার বার্তা দেয়। সাধারণত পান্ডাগুলো ঋণ হিসাবে পাঠানো হয়। বাচ্চা জন্মালে চীনের মালিকানা থাকে। এ কূটনীতি চীনকে ইতিবাচক ভাবমর্যাদা গড়তে, পরিবেশ সংরক্ষণে নেতৃত্ব দিতে এবং অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক সম্পর্ক মজবুত করতে সাহায্য করে। এটি চীনের বৈশ্বিক প্রভাব বাড়ানোর একটি মৃদু কিন্তু কার্যকর উপায়।
চীন বিশ্বজুড়ে মিত্রতা ও কূটনৈতিক সম্পর্ক জোরদার করতে বন্যপ্রাণী জায়ান্ট পান্ডাকে একটি অনন্য ভূরাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে, যা আন্তর্জাতিকভাবে ‘পান্ডা কূটনীতি’ নামে পরিচিত। যেহেতু বুনো পান্ডা কেবল চীনে পাওয়া যায়, বেইজিং বিরল প্রাণীটিকে অন্যান্য দেশে পাঠিয়ে সম্পর্কের ঘনিষ্ঠতা বা দূরত্বের বার্তা দেয়। বন্ধুত্বের দূত ও সফট ইমেজ তৈরিতে পান্ডাকে গণ্য করে চীন। নিরীহ ও মিষ্টি চেহারার প্রাণীটি বিদেশীদের মধ্যে তুমুল সাড়া ফেলে, যা সংশ্লিষ্ট দেশের সাধারণ মানুষের মনে চীনের প্রতি একটি ইতিবাচক ভাবমর্যাদা বা ‘সফট ইমেজ’ তৈরি করতে সাহায্য করে।
উপহার থেকে লিজ বা ভাড়া প্রথা : ১৯৪৯ সালে গণপ্রজাতন্ত্রী চীন প্রতিষ্ঠার পর থেকে ১৯৮৪ সাল পর্যন্ত মাও সেতুং ও অন্য নেতারা বিভিন্ন বন্ধুভাবাপন্ন দেশকে (যেমন— সোভিয়েত ইউনিয়ন, উত্তর কোরিয়া, যুক্তরাষ্ট্র) পান্ডা সরাসরি উপহার দিতেন। তবে ১৯৮৪ সালে পান্ডা বিলুপ্তপ্রায় প্রাণী ঘোষিত হওয়ার পর চীন উপহার দেয়া বন্ধ করে ১০-১৫ বছরের জন্য শর্তসাপেক্ষে ‘লিজ বা ভাড়া ব্যবস্থা’ চালু করে। বাণিজ্যিক ও কৌশলগত চুক্তি : চীন সাধারণত শুধু সেই সব দেশকে পান্ডা লিজ দেয় যাদের সাথে বাণিজ্য বা জ্বালানি চুক্তি চূড়ান্ত পর্যায়ে থাকে। যেমন— অস্ট্রেলিয়াকে পান্ডা দেয়ার পর ইউরেনিয়াম চুক্তি এবং কানাডা ও ফ্রান্সের কাছ থেকে বাণিজ্য এবং জ্বালানি সুবিধা পাওয়ার সময়ে চীন পান্ডা লিজ দিয়েছিল।
কূটনৈতিক সম্পর্কের ব্যারোমিটার : কোনো দেশের সাথে চীনের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের পারদ কেমন, তা পান্ডা কূটনীতির মাধ্যমে বোঝা যায়। দুই দেশের সম্পর্কে টানাপড়েন বা বড় ধরনের রাজনৈতিক উত্তেজনার সৃষ্টি হলে বেইজিং লিজের মেয়াদ শেষে পান্ডা ফেরত নিয়ে নেয় বা চুক্তি নবায়ন করে না। আবার সম্পর্ক জোড়া লাগাতে নতুন করে পান্ডা পাঠায়। যেমন— মার্কিন-চীন সম্পর্কের অবনতির জেরে ২০২৩ সালে ওয়াশিংটনের চিড়িয়াখানা থেকে পান্ডা ফিরিয়ে নেয়া হলেও সম্পর্কের বরফ গলাতে ২০২৪-২৬ সালের মধ্যে সান দিয়েগো ও আটলান্টা চিড়িয়াখানায় আবারো নতুন জোড়া পান্ডা পাঠানো হয়েছে।
কঠোর শর্ত ও মালিকানা : লিজব্যবস্থার অধীনে প্রতি জোড়া পান্ডার জন্য বিদেশী চিড়িয়াখানাগুলোর বছরে প্রায় ১০ লাখ ডলার পর্যন্ত অর্থ দিতে হয়। এ ছাড়াও বিদেশে অবস্থানকালে লিজ নেয়া কোনো পান্ডা যদি বাচ্চার জন্ম দেয়, তবে চুক্তি অনুযায়ী ওই বাচ্চাও স্বয়ংক্রিয়ভাবে চীনের সম্পত্তি হিসেবে বিবেচিত হয়। নির্দিষ্ট বয়স শেষে তাকে চীনে ফেরত পাঠাতে হয়।
চীন সরকারের আধুনিক পান্ডা কূটনীতির প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি স্থাপন করেন গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের প্রতিষ্ঠাতা মাও সেতুং। তবে ঐতিহাসিকভাবে যদি দেখা যায়, এই কৌশলের প্রথম ব্যবহার হয়েছিল আরো অনেক আগে, সপ্তম শতাব্দীতে ট্যাং রাজবংশের শাসনামলে। ঐতিহাসিক নথিপত্র অনুযায়ী, ৬৫৮ খ্রিষ্টাব্দে চীনের তৎকালীন একমাত্র নারী সম্রাট উ জেতিয়ান জাপানের সম্রাটকে শুভেচ্ছা ও বন্ধুত্ব বাড়াতে এক জোড়া ভাল্লুক উপহার পাঠিয়েছিলেন। তবে আধুনিক বিশ্বরাজনীতিতে ভূরাজনৈতিক স্বার্থে এ পদ্ধতি সুনির্দিষ্ট নীতি হিসেবে প্রথম সফলভাবে ব্যবহার করেন মাও সেতুং। ১৯৫৯ সালে সমাজতান্ত্রিক ব্লকের মিত্র দেশ হিসেবে প্রথম সোভিয়েত ইউনিয়নকে পান্ডা উপহার দেয়ার মাধ্যমে তিনি পান্ডা কূটনীতির সূচনা করেন। পরবর্তীতে ১৯৭২ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনের ঐতিহাসিক চীন সফরের পর, মাও সেতুং যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দিতে ‘লিং-লিং’ এবং ‘শিং-শিং’ নামে দু’টি পান্ডা উপহার দেন। মাও সেতুংয়ের হাত ধরে শুরু হওয়া এই কূটনৈতিক কৌশলই পরবর্তী সময়ে চীনের অন্যান্য নেতা আরো পরিমার্জিত করেন। ১৯৮৪ সালে দেং জিয়াওপিংয়ের আমলে এটি সরাসরি উপহার থেকে বর্তমানের বাণিজ্যিক লিজ বা ভাড়া প্রথায় রূপান্তর করা হয়।
চীনের বর্তমান প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের শাসনামলে ‘পান্ডা কূটনীতি’ এক নতুন উচ্চতা এবং কৌশলগত পরিপক্বতা লাভ করেছে, যা আংশিকভাবে অত্যন্ত সফল হয়েছে। সেই সাথে আংশিকভাবে গভীর ভূরাজনৈতিক সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি। পূর্বসূরিদের তুলনায় শি জিনপিং পান্ডাকে শুধু বন্ধুত্বের প্রতীক হিসেবে না রেখে, একে চীনের জাতীয় সার্বভৌমত্ব প্রকাশ এবং পশ্চিমা দেশগুলোর সাথে কূটনৈতিক দরকষাকষির একটি অন্যতম শক্তিশালী ‘সফট পাওয়ার’ হিসেবে সুনির্দিষ্টভাবে ব্যবহার করেছেন।
শি জিনপিংয়ের সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক সফলতা দৃশ্যমান হয়েছে সম্প্রতি তার যুক্তরাষ্ট্র সফরে। ওয়াশিংটনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাথে তার উচ্চপর্যায়ের দ্বিপক্ষীয় সামিট চলাকালীন হোয়াইট হাউজে দাঁড়িয়ে শি জিনপিং সরাসরি ঘোষণা দেন, চীন থেকে ‘পিং-পিং’ ও ‘ফু-শুয়াং’ নামে এক জোড়া নতুন জায়ান্ট পান্ডা যুক্তরাষ্ট্রের আটলান্টা চিড়িয়াখানায় পাঠানো হচ্ছে। মার্কিন-চীন বাণিজ্যযুদ্ধ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও প্রযুক্তিগত স্নায়ুযুদ্ধের চরম উত্তেজনার মধ্যেও এই পান্ডা প্রেরণ দুই দেশের মধ্যকার বৈরিতা কমিয়ে সংলাপ ও বাণিজ্যিক যুদ্ধবিরতির এক ইতিবাচক পরিবেশ সৃষ্টি করতে সফল হয়েছে। শি জিনপিং পান্ডা কূটনীতিকে শুধু চিড়িয়াখানার খাঁচায় সীমাবদ্ধ রাখেননি। সাম্প্রতিক সময়ে পান্ডা চুক্তিগুলোর পাশাপাশি আগামী পাঁচ বছরে এক লাখ মার্কিন শিক্ষার্থীকে চীনে পড়াশোনা ও সাংস্কৃতিক বিনিময়ে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। এর মাধ্যমে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ মানুষের মনে চীনের কঠোর কমিউনিস্ট ভাবমর্যাদা সহনীয় করতে বড় ধরনের সাফল্য পেয়েছেন।
চীন সরকার জায়ান্ট পান্ডাকে নিজেদের ‘জাতীয় সম্পদ’ এবং সার্বভৌমত্বের প্রতীক মনে করায় লিজ দেয়া পান্ডার সুরক্ষায় বেইজিংয়ের নিজস্ব আইন ও আন্তর্জাতিক চুক্তিপত্র অত্যন্ত কঠোর এবং আপসহীন। কোনো বিদেশী চিড়িয়াখানা বা রাষ্ট্র যদি চীনের এই নিয়মাবলি সামান্যতম লঙ্ঘন করে, তবে তাদের বিরুদ্ধে বিশাল অঙ্কের জরিমানা থেকে শুরু করে ফৌজদারি মামলা ও পান্ডা বাজেয়াপ্ত করার মতো কঠোর পদক্ষেপ নেয়া হয়। লিজ চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, বিদেশী চিড়িয়াখানাগুলোতে পান্ডার খাঁচা ও ইনডোর ভিলার ২৪ ঘণ্টার লাইভ ভিডিও ফিড সরাসরি চীনের বন্যপ্রাণী কর্তৃপক্ষের কাছে উন্মুক্ত রাখতে হয়। পান্ডাকে যে বাঁশ খাওয়ানো হবে, তার রাসায়নিক ও কীটনাশক পরীক্ষা করে প্রতি বছর চীন থেকে সার্টিফিকেট নিতে হয়। যদি স্থানীয় বাঁশ পান্ডার পছন্দ না হয়, তবে চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষ নিজ দায়িত্বে বিমানযোগে চীন থেকে বাঁশ আমদানি করতে বাধ্য থাকে। পান্ডা সামান্য অসুস্থ হলেও স্থানীয় পশু চিকিৎসকরা একা কোনো অস্ত্রোপচার বা বড় ওষুধ দিতে পারেন না। বেইজিংয়ের বিশেষজ্ঞ দলের সাথে লাইভ ভিডিও কনফারেন্স করে বা চীন থেকে প্রতিনিধি দল আসার পর তাদের লিখিত অনুমতি সাপেক্ষে চিকিৎসা শুরু করতে হয়। যেকোনো অবহেলাজনিত মৃত্যুর জন্য পাঁচ লাখ ডলার জরিমানা দিতে হয়, যা আন্তর্জাতিক আদালতে দাবি করা যায়।
পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তে লিজ নেয়া পান্ডার গর্ভে যে বাচ্চাই জন্ম নিক না কেন, সে জন্মের মুহূর্ত থেকে আইনগতভাবে চীনের সম্পত্তি। বাচ্চাটির বয়স তিন থেকে চার বছর পূর্ণ হওয়ার সাথে সাথে তাকে প্রজনন ও বুনো পরিবেশে অবমুক্তকরণের প্রশিক্ষণে বাধ্যতামূলকভাবে চীনে পাঠিয়ে দিতে হয়। বিদেশী চিড়িয়াখানা কোনোভাবে তাকে নিজেদের দেশে আটকে রাখতে পারে না।
পান্ডার মতো অন্যান্য কয়েকটি দেশ পশুকে কূটনীতিতে ব্যবহার করে। যেমন— অস্ট্রেলিয়া-কোয়ালা, ভারত-চিতাবাঘ ও হাতি, মালয়শিয়া-ওরাংওটাং, থাইল্যান্ড-হাতি ও চীনের সোনালি বানর।
আন্তর্জাতিক মহলে চীনের কমিউনিস্ট শাসনব্যবস্থা, মানবাধিকার পরিস্থিতি বা কঠোর বাণিজ্যিক নীতি নিয়ে প্রায়ই সমালোচনা হয়। কিন্তু নিরীহ, আদুরে ও মিষ্টি চেহারার পান্ডা যখন কোনো দেশের চিড়িয়াখানায় যায়, তখন সেখানকার সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে শিশু ও তরুণ প্রজন্মের কাছে চীনের একটি ইতিবাচক ও অহিংস ছবি তৈরি হয়। এটি চীনের বিরুদ্ধে থাকা নেতিবাচক মনোভাবকে সাময়িকভাবে ধামাচাপা দিতে দারুণ ভূমিকা রাখে।
অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় দেখা গেছে, চীন শুধু সেসব দেশকে পান্ডা লিজ দেয়, যাদের সাথে তাদের বড় ধরনের বাণিজ্যিক বা কৌশলগত চুক্তি সম্পন্ন হতে যাচ্ছে।
আর্থিক দৃষ্টিকোণ থেকে এ নীতি চীনের জন্য অত্যন্ত লাভজনক। বিদেশী চিড়িয়াখানাগুলো থেকে লিজ বাবদ পাওয়া লাখ লাখ ডলার চীন নিজেদের দেশের বন্যপ্রাণী ও প্রাকৃতিক পরিবেশ সংরক্ষণের তহবিলে জমা করে। এর ফলে আজ বন্য পান্ডার সংখ্যা বেড়েছে এবং প্রাণীটি বিলুপ্তপ্রায় তালিকা থেকে বাদ পড়েছে।
পান্ডা কূটনীতি একটি স্বল্পমেয়াদি মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ বা পিআর ক্যাম্পেইন হিসেবে শতভাগ সফল। এটি চীনের কমিউনিস্ট ভাবমর্যাদাকে বিশ্বের সাধারণ মানুষের কাছে মানবিক ও আকর্ষণীয় করে তুলতে পেরেছে। একই সাথে বেইজিংয়ের জন্য বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্যিক চুক্তি নিশ্চিত করেছে।
লেখক : অবসরপ্রাপ্ত যুগ্মসচিব ও গ্রন্থকার
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








