
খাগড়াছড়ি ও রাঙ্গামাটি প্রতিনিধি
রাঙ্গামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্র সাজেক এখন পর্যটকশূন্য। সড়ক অবরোধকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ ও গোলাগুলির ঘটনায় পর্যটকদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বৃহস্পতিবার সাজেকে আটকে পড়া দুই হাজার ৯৩৩ জন পর্যটককে নিরাপত্তা বাহিনীর পাহারায় খাগড়াছড়ি সদরে ফিরিয়ে নেয়া হলেও অবরোধ অব্যাহত থাকায় রিসোর্ট-কটেজ, পর্যটকবাহী জিপ ও স্থানীয় ব্যবসায়ীদের কার্যক্রমে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। পাশাপাশি পর্যটক যাতায়াতে প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞা থাকায় দুর্ভোগে পড়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
শুক্রবার বাঘাইহাট বাজার এলাকায় সড়কে যানবাহন চলাচল করতে দেখা যায়নি। বন্ধ ছিল অধিকাংশ দোকানপাট। খোলা কয়েকটি দোকানেও ক্রেতার উপস্থিতি ছিল কম। সড়কে মানুষের চলাচলও ছিল সীমিত। প্রয়োজনীয় কাজে বের হওয়া স্থানীয় বাসিন্দাদের হেঁটে গন্তব্যে যেতে দেখা গেছে।
বাঘাইহাট স্টেশনের লাইনম্যান জসিম জানান, অবরোধকারীরা সড়কের বিভিন্ন স্থানে পিকেটিং করায় যানবাহন চলাচল বন্ধ রয়েছে।
সাজেক গণ অধিকার রক্ষা কমিটি ও সাজেক কারবারি অ্যাসোসিয়েশন পাহাড়ের সশস্ত্র সদস্যদের সরিয়ে নেয়াসহ বিভিন্ন দাবিতে গত ১১ অক্টোবর থেকে অবরোধ কর্মসূচি পালন করে আসছে। দুর্গাপূজা উপলক্ষে ১৬ থেকে ২১ অক্টোবর পর্যন্ত কর্মসূচি স্থগিত রাখা হয়। দাবি পূরণ না হওয়ার অভিযোগে বৃহস্পতিবার থেকে আবারো অবরোধ শুরু করে সংগঠন দু’টি।
অবরোধের প্রথম দিন উজো বাজার এলাকায় পর্যটকবাহী গাড়ির বহর চলাচলে বাধা দেয়া হয়। পরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা অবরোধকারীদের সরিয়ে দিলে গাড়িবহর সামনে এগিয়ে যায়। এরপর সেখানে গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দাবি, ইউপিডিএফের সশস্ত্র সদস্যরা গুলি চালিয়েছেন। তবে এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে ইউপিডিএফ।
এ ঘটনার পর সাজেকে আটকে পড়া দুই হাজার ৯৩৩ জন পর্যটককে গত বৃহস্পতিবার নিরাপত্তা বাহিনীর পাহারায় খাগড়াছড়ি শহরে ফিরিয়ে নেয়া হয়। সংঘর্ষ ও গোলাগুলির ঘটনায় পর্যটকদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
রাঙ্গামাটির পুলিশ সুপার মুহম্মদ আব্দুর রকিব বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সাজেকের বিভিন্ন পয়েন্টে টহল দিচ্ছে। বর্তমানে সেখানকার পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে। জেলা প্রশাসক নাজমা আশরাফীও জানান, প্রশাসন সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে।
পর্যটন ব্যবসায় ক্ষতির আশঙ্কা
অবরোধের কারণে সাজেকের রিসোর্ট-কটেজগুলোতে পর্যটক নেই বললেই চলে। আগাম বুকিং বাতিল হওয়ায় লোকসানের আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীরা। সাজেক রিসোর্ট-কটেজ মালিক সমিতির সহসাধারণ সম্পাদক মতিজয় ত্রিপুরা বলেন, নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণে অনেক পর্যটক আগাম বুকিং বাতিল করেছেন। সড়কে যান চলাচল বন্ধ থাকায় নতুন পর্যটকরাও সাজেকে যেতে পারছেন না।
সাজেক পরিবহন কাউন্টারের ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ আরিফ জানান, প্রতিদিন ১০০ থেকে ১৫০টি পর্যটকবাহী জিপ সাজেকের উদ্দেশে রওনা দিত। বর্তমানে পর্যটকদের যাতায়াতে নিষেধাজ্ঞা থাকায় এসব যানবাহন চলাচল বন্ধ রয়েছে। ফলে জিপচালক ও পরিবহনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা আয় হারাচ্ছেন।
দুর্ভোগে স্থানীয় বাসিন্দারাও
সড়ক যোগাযোগ বন্ধ থাকায় স্থানীয় বাসিন্দাদের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কেনাকাটা এবং কৃষিপণ্য বাজারজাত করতে ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। অধিকাংশ দোকানপাট বন্ধ থাকায় বাজারের স্বাভাবিক কার্যক্রমও ব্যাহত হচ্ছে।
এদিকে সাজেকে অবরোধকারীদের ওপর হামলা, লাঠিচার্জ এবং ঘরবাড়ি ও দোকানপাট ভাঙচুরের অভিযোগের প্রতিবাদে রাঙ্গামাটি ও খাগড়াছড়িতে আধাবেলা অবরোধের ডাক দিয়েছে ছাত্র-জনতার সংগ্রাম পরিষদ। সংগঠনটির ঘোষণায় বলা হয়েছে, সাজেকে সশস্ত্র সদস্যদের সরিয়ে নেয়ার দাবিতে চলা অবরোধে হামলার প্রতিবাদ এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবির প্রতি সংহতি জানাতে এ কর্মসূচি নেয়া হয়েছে। আজ সকাল ৫টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত দুই জেলার সড়ক ও নৌপথে এ অবরোধ পালনের কথা রয়েছে। তবে অ্যাম্বুলেন্স, রোগীবাহী ও শববাহী যান, ফায়ার সার্ভিস, জরুরি ওষুধ সরবরাহকারী যানবাহন এবং সাংবাদিকদের গাড়ি কর্মসূচির আওতামুক্ত থাকবে।
অবরোধের ঘোষণায় সাজেকের চলমান অবরোধের পাশাপাশি দুই জেলায় নতুন কর্মসূচি ঘিরেও যোগাযোগব্যবস্থা ও জনজীবনে ভোগান্তি বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
খাগড়াছড়িতে বিক্ষোভ : ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার দাবিতে আলটিমেটাম
সাজেক ভ্রমণে পর্যটকদের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, পর্যটনকেন্দ্র উন্মুক্তকরণ ও ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবিতে খাগড়াছড়িতে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেছে পর্যটন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী ও স্থানীয় জনগণ। আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার না হলে পরিবহন ধর্মঘটসহ কঠোর আন্দোলনের হুঁশিয়ারিও দেন তারা।
শুক্রবার বিকেলে খাগড়াছড়ি গেট থেকে একটি বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে শহরের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক প্রদক্ষিণ শেষে শাপলা চত্বর এসে সমাবেশে করে পর্যটন সংশ্লিষ্ট পরিবহন মালিক-শ্রমিক, হোটেল ব্যবসায়ী ও স্থানীয় জনগণ।
এ সময় মিছিলে অংশগ্রহণকারীরা স্লোগান দিতে থাকে ‘ভাত দে কাপড় দে নইলে সাজেক খুইলা দে।’
জিপ মালিক সমিতির অর্থ সম্পাদক মাসুম পারভেজের সঞ্চালনায় মিছিল-পরবর্তী বিক্ষোভ সমাবেশে বক্তব্য রাখেন পার্বত্য যানবাহন মালিক সমিতির সভাপতি আইয়ুশ চাকমা, সম অধিকার আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক মো: আসাদ উল্লাহ, সিএনজি মালিক সমিতির সভাপতি জসীম উদ্দিন, ই-ট্যুরিজম অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি উজ্জ্বল প্রমুখ।
চলমান সাজেকের ঘটনাগুলো আঞ্চলিক দু’টি সশস্ত্র সন্ত্রাসী সংগঠন ইউপিডিএফ ও জেএসএসের আধিপত্য বিস্তার সংক্রান্ত বিষয় উল্লেখ করে বক্তারা প্রশ্ন তুলেন প্রশাসন সশস্ত্র সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোর বিরুদ্ধে যথাযথ ও কার্যকর ব্যবস্থা না নিয়ে সাজেক ভ্রমণের ওপর কেন নিষেধাজ্ঞা দেয়। এ সময় তারা সাজেকের উজো বাজার এলাকায় সেনাক্যাম্প স্থাপনসহ পার্বত্য অঞ্চল থেকে প্রত্যাহার করা সব সেনাক্যাম্প আবার স্থাপনের দাবি জানান।
তারা অভিযোগ করেন, আঞ্চলিক সশস্ত্র সংগঠনগুলো প্রতিনিয়ত ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে জোরপূর্বক অবৈধ চাঁদা আদায় করছে। চাঁদা না দিলে চালক, শ্রমিক ও ব্যবসায়ীদের ওপর নির্যাতন করছে। এসব সশস্ত্র সংগঠনগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়ে সাধারণ জনগণের নিরাপত্তাসহ পর্যটকদের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানান বক্তারা।
বক্তারা আরো বলেন, ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার কারণে পর্যটক আসতে না পারলে সাজেকসহ খাগড়াছড়ির পর্যটন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী, শ্রমিক ও চালকরা বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হবে। ব্যাংক ঋণগ্রস্ত পরিবহন মালিক, চালক, হোটেল, কটেজ, রেস্তোরাঁসহ পর্যটননির্ভর অসংখ্য মানুষের জীবন-জীবিকা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। তারা দাবি জানান, ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়া না হলে তাদের ঋণের কিস্তি যেন আদায় করা না হয়।
এ সময় বক্তারা, পর্যটন উন্মুক্তকরণ, সাজেক ভ্রমণে আরোপিত প্রশাসনিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, সাজেকে পর্যটকদের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করণসহ শান্তি, স্থিতিশীলতা ও নিরাপদ পর্যটন পরিবেশ নিশ্চিত করার দাবি জানান। এ ছাড়াও আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা না হলে পরিবহন ধর্মঘটসহ কঠোর কর্মসূচির হুঁশিয়ারি দেন তারা।
গত ২১ অক্টোবর বুধবার এক জরুরি গণবিজ্ঞপ্তিতে অনিবার্য কারণবশত পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলাধীন বাঘাইছড়ি উপজেলার অন্তর্গত সাজেক ভ্যালি পর্যটনকেন্দ্র সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করে জেলা প্রশাসন।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








