
গত ৫ অক্টোবর ছিল বিশ্ব শিক্ষক দিবস। যথাযোগ্য মর্যাদায় দিবসটি উদযাপন হয়েছে। সরকারি এবং বেসরকারিভাবে অনেক গুণী শিক্ষককে সম্মাননা দেয়া হয়েছে। স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীও ১০০ জনের বেশি গুণী শিক্ষককে সম্মানিত করেছেন। এই প্রেক্ষাপটে আমাদের আত্মসমালোচনা প্রয়োজন— শিক্ষকদেরকে শুধুই কি শিক্ষক দিবসে আমরা সম্মান জানাচ্ছি?
শিক্ষক আসলে এক দিনের সম্মানের ব্যক্তিত্ব নন। বছরব্যাপী সার্বক্ষণিকভাবে শিক্ষকের মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্ব নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষকের গুরুত্ব, সম্মান ও মর্যাদা পৃথিবীর পুরনো আলোচনার একটি। পরিবার থেকে বিশ্ববিদ্যালয় এবং ধর্ম থেকে অধর্ম বা ধর্মনিরপেক্ষতা— সবাই শিক্ষকের মর্যাদার কথা বলে; কিন্তু আমরা কি সেই সর্বজনীন মূল্যবোধকে লালন করি? ব্যক্তি পর্যায়ে প্রায় সবাই মানলেও রাষ্ট্রীয়ভাবে কি শিক্ষকের সেই মর্যাদা নিশ্চিত করতে পেরেছি? ইসলামের ইতিহাস মোতাবেক শিক্ষা এবং জ্ঞান দিয়েই মানবজাতির শুরু হয়েছিল। মহান আল্লাহ তায়ালা স্বয়ং সৃষ্টির প্রথম মানুষ হজরত আদম আ:-কে জ্ঞান দিয়ে আলোকিত করে পৃথিবীতে পাঠিয়েছিলেন। (সূরা বাকারাহ-৩১) শেষ নবী হজরত মুহাম্মদ সা:-কেও মানবতার শিক্ষক হিসেবে প্রেরণ করা হয়েছিল। (সূরা জুময়া-২ এবং ইবনে মাজাহ, হাদিস-২২৫)
আধুনিক রাষ্ট্র পরিচালনায় ছয়টি উপাদান থাকে। সেগুলো হলো : ক. সরকার ও রাজনৈতিক বন্দোবস্ত; খ. আইন, বিচার ব্যবস্থা ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানগুলো; গ. সামাজিক নিরাপত্তাব্যবস্থা এবং বৈদেশিক সম্পর্কগুলো; ঘ. অবকাঠামো এবং জনসেবা ব্যবস্থাপনা; ঙ. অর্থনৈতিক ও ব্যবসাবাণিজ্যিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া এবং চ. শিক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়ন প্রক্রিয়া। এই ছয় উপাদানের মধ্যে ‘শিক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়ন’ বাকি পাঁচ উপাদানকে তৈরি করে এবং বাঁচিয়ে রাখে। অর্থাৎ রাষ্ট্র বা জাতিসত্তার অন্য সব উপাদানের পেছনেই শিক্ষা একক উপাদান হিসেবে কাজ করে থাকে।
বিশ্বব্যাপী শিক্ষায় সর্বজনীন একটি আদর্শ বা মানদণ্ড রয়েছে, যা দিয়ে একটি দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে বিচার বা তুলনা করা যায়। পৃথিবীর অনেক দেশ সেই আদর্শে অবস্থান না করলেও মোটামুটি কাছাকাছি অবস্থানে আছে। সেই তুলনায় আমরা কোথায় অবস্থান করছি তার একটি চিত্র আমাদের দেখা দরকার।
ক. কার্যকরী পাঠদানের জন্য শ্রেণিকক্ষে ছাত্র-শিক্ষক অনুপাত গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের দেশে প্রতি ৪২ শিক্ষার্থীর জন্য একজন শিক্ষক আছেন, যে সংখ্যা চীনে ১৬, ভারতে ২৯, ইন্দোনেশিয়ায় ২০, জাপানে ১৬ এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ১৩ জন। এটি হলো প্রাথমিকের চিত্র। আর মাধ্যমিকে বাংলাদেশে যেখানে একজন শিক্ষক থাকেন ২৯ জনের জন্য। সেখানে চীনে ১৪, ভারতে ২০, ইন্দোনেশিয়ায় ২১, জাপানে ১১ এবং আমেরিকায় ১৫ জনের জন্য।
খ. আধুনিক শিক্ষায় ‘আইসিটির’ গুরুত্ব অপরিসীম; কিন্তু আমাদের প্রাথমিকে ‘আইসিটি’ রিসোর্স আছে মাত্র ১১ শতাংশ এবং মাধ্যমিকে আছে মাত্র ২৫.৪ শতাংশ। এ ছাড়াও আইসিটি প্রশিক্ষিত শিক্ষক, অবকাঠামো, ইন্টারনেট সংযোগ এবং বিদ্যুৎ সরবরাহের অপ্রতুলতা তো আছেই।
গ. আমাদের দেশের শিক্ষাব্যবস্থার একটি বড় নেতিবাচক দিক হলো বহুমুখী কারিকুলাম। মাদরাসা, সাধারণ এবং কারিগরি। মাদরাসায় আবার কওমি এবং আলিয়া ধারা। সাধারণ শিক্ষায় তিন ভাগ : বাংলা, ইংলিশ ভার্সন এবং ইংলিশ মিডিয়াম। অর্থাৎ শিক্ষাক্রমে ঐকতানের অভাব নিয়েই শিক্ষার্থীরা তৈরি হতে থাকে, যা পরবর্তী সময়ে দেশ পরিচালনায় বড় মতানৈক্য সৃষ্টি করে।
ঘ. শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ অত্যন্ত ভয়াবহ প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে থাকে আমাদের দেশে। স্থানীয় ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বরাই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনা কমিটির নেতৃত্বে থাকেন। এ ক্ষেত্রে তাদের শিক্ষা বা যোগ্যতার প্রশ্ন থাকে না। ফলে প্রতিষ্ঠানসগুলোতে শিক্ষার উন্নয়নের চেয়ে রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তারের প্রক্রিয়াই বেশি হয়। এতে নিয়োগ, প্রমোশন, বদলি, পরীক্ষা প্রক্রিয়ায় দুর্নীতির দরজা খোলা থাকে।
ঙ. অন্য দিকে শিক্ষাকে অগ্রগণ্যতা বিবেচনায় আমরা অনেক পিছিয়ে আছি। বর্তমান সরকার আগের তুলনায় এই ক্ষেত্রে বরাদ্দ করা বাজেট বাড়ালেও সেটি জিডিপির মাত্র ২ শতাংশ। যেখানে বৈশ্বিক মানদণ্ড হলো ৪ থেকে ৬ শতাংশ। আর মধ্যম মানের দেশগুলোতে এটি ৪.২ শতাংশ। এই অর্থের পরিমাণ আমাদের দেশে পাবলিক সেক্টরে খরচের মাত্র ১২ শতাংশ। যেখানে ইউনেস্কোর মানদণ্ড হলো ১৫ থেকে ২০ শতাংশ। আর বৈশ্বিক সাধারণ মানের পরিমাণ ১২.৬ শতাংশ।
চ. তবে শিক্ষায় বাংলাদেশের সবচেয়ে দৈন্যদশায় আছে শিক্ষকদের সম্মানীর বিষয়টিতে। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একজন সহকারী শিক্ষকের বর্তমান মাসিক সম্মানী সাড়ে ১৭ হাজার টাকা, যা ২০২৮ সালে প্রদেয় স্কেল অনুযায়ী হতে পারে ৩২ হাজার টাকা এবং গ্রেড হবে দশম। মাধ্যমিকে বর্তমানে ২৪ হাজার টাকা, যা ২০২৮ সালে হতে পারে ৪৪ হাজার টাকা, তখন নবম গ্রেডে উন্নীত হবে। আর উচ্চ মাধ্যমিকে একজন লেকচারারের মাসিক বেতন ২০২৮ সালে হতে পারে ৪৪ হাজার টাকা এবং গ্রেড হতে পারে নবম।
বৈশ্বিক তুলনায় এই অবস্থান শোচনীয়! ওইসিডি অর্থাৎ ‘অর্গানাইজেশন অব ইকোনমিক কো-অপারেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট’ভুক্ত দেশের একজন প্রাথমিকের শিক্ষক বছরে ৫৭ হাজার ৩৯৯ মার্কিন ডলার পান। আমাদের দেশের প্রাথমিক শিক্ষকরা ২০২৮ সালে পেতে পারেন বছরে মাত্র দুই হাজার ৩৩৮ ডলার। একইভাবে মাধ্যমিকে ৫৯ হাজার ৪৯৬ এর বিপরীতে আমাদের দেশের একজন মাধ্যমিক শিক্ষক ২০২৮ সালে পেতে পারেন বছরে তিন হাজার ১১৭ ডলার। উচ্চ মাধ্যমিকে ৬৩ হাজার ৫১৪ ডলারের বিপরীতে বাংলাদেশে একজন শিক্ষক বছরে পেতে পারেন চার হাজার ২৮৫ মার্কিন ডলার। এই তুলনা শুধু আমাদের সরকারি শিক্ষকদের সাথে করা হয়েছে। বেসরকারি বা প্রাইভেট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের চিত্র আরো করুণ!
আমরা কি শিক্ষকদেরকে যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতার উপযুক্ত মূল্যায়ন করতে পারছি? শিক্ষকরা কি চলমান জীবনযাত্রার সাথে ভারসাম্যপূর্ণ জীবনযাপন করতে পারছেন? সুযোগ্য ব্যক্তিরা কি শিক্ষকতায় আসতে আগ্রহী হবেন? এই অবস্থা কি শিক্ষকদের পেশাগত যোগ্যতা বৃদ্ধি এবং ক্যারিয়ার উন্নয়নের সহযোগী হতে পারে?
ছ. আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় দুর্নীতি এবং নৈতিক স্খলনের ছড়াছড়ি। ‘টিআইবি’ তাদের ২০২৫ সালের এক জরিপে দেখিয়েছে, মাধ্যমিক বিদ্যালয় পর্যায়ে অনিয়মিত আদান-প্রদানের (ঘুষ বা দুর্নীতি) হার ৩৫ শতাংশ। এর সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী হলেন শিক্ষকরা। বিশেষ করে পেনশনভোগীরা ভয়াবহ জুলুম ও দুর্নীতির শিকার হয়ে থাকেন।
কিছুদিন আগে আমরা পত্রিকায় দেখেছি ময়মনসিংহের এক শিক্ষিকা অবসরে গিয়ে পেনশনের টাকা তোলার প্রক্রিয়া করতে করতে মৃত্যুবরণ করেছেন। পরবর্তী সময়ে তার ছেলে সেই টাকা তুলতে গেলে তার কাছেও লাখ টাকা ঘুষ দাবি করা হয়েছে। এ ছাড়া কোনো প্রমাণ হাজির করতে না পারলেও বিভিন্ন সময়ে অভিযোগ শোনা যায়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং শিক্ষকদের বিভিন্ন ফাইল চালনা ও ছাড় করার জন্য ঘাটে ঘাটে ঘুষ দিতে হয়, যা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা নিজেদের পাওনা হিসাবেই দাবি করেন। এ ক্ষেত্রে সেবা গ্রহণকারীরা খুব অসহায় হয়ে পড়েন। এসব আবার ‘ওপেন সিক্রেট’ হিসেবে অনেকে বিবেচনা করে থাকেন। ফলে শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য সততা, শৃঙ্খলা, ন্যায়পরায়ণতা এবং দায়িত্ববোধ সৃষ্টির প্রক্রিয়াটি দুরূহ হয়ে পড়ে।
শিক্ষাব্যবস্থার এই অবস্থা থেকে উত্তরণে শিক্ষকদেরই মুখ্য ভূমিকা রাখতে হবে। দু’ভাবে এই ভূমিকা রাখা সম্ভব— ১. লেখালেখি ও সামাজিক আন্দোলনের মাধ্যমে সমাজ ও জাতির মনোযোগ আকর্ষণ করতে হবে। ২. প্রতিটি শিক্ষককে জাতির ভবিষ্যত নাগরিক এবং নেতৃত্ব তৈরির দক্ষ কারিগর হতে হবে। এর জন্য যা দরকার তা হলো— ক. নিজস্ব শিক্ষণ বিষয়ে জ্ঞানের গভীরতা বাড়ানো; খ. শিখন দক্ষতা আরো শাণিত করা; গ. নিজেকে ‘রোল মডেল’ হিসেবে শিক্ষার্থীদের সামনে উপস্থাপন করা। সততা, শৃঙ্খলা, উপস্থাপনা, দায়িত্ববোধ, আত্ম-নিয়ন্ত্রণ এবং অভিভাবকত্বের নজির পেশ করতে হবে; ঘ. শিক্ষার্থীকে বুঝতে হবে; তাদের কথা শোনা, লাজুক এবং দুর্বল শিক্ষার্থীর সমস্যা বোঝা এবং তাদের আবেগ স্পর্শ করা। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের সামাজিক বৈচিত্র্য ধারণ করতে হবে; ঙ. নিজেকে সারা জীবনের শিক্ষার্থী হিসেবে উপস্থাপন করতে হবে। এ জন্য নিজের কৃত ভুলগুলো অন্যের পরামর্শ থেকে শিক্ষা নেয়ার মানসিকতা তৈরি করতে হবে; চ. প্রচলিত টেকনোলজি ব্যবহার করে নিজে শেখা এবং শিক্ষার্থীদের শিক্ষণের প্রচেষ্টা চালাতে হবে; ছ. শিক্ষার্থীদের মূল্যবোধের চর্চার জন্য উদ্বুদ্ধ করতে হবে এবং নিজেও প্রায়োগিক মূল্যবোধ উপস্থাপন করতে হবে। এ জন্য শিক্ষার্থীদের সৃষ্টিকর্তার সাথে গভীর সম্পর্ক গড়ে তোলা এবং রাসূলুল্লাহ সা:-কে অনুসরণে চরিত্র গঠনে উৎসাহিত করা যেতে পারে; জ. শিক্ষকের নিজে পেশাদার আচরণ করার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের পেশাদারিত্বের তালিম দিতে হবে। এ জন্য সময়ানুবর্তিতা, সব শিক্ষার্থীকে সমানভাবে দেখা এবং আন্তরিকতার সাথে শিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে; ঝ. নিজেকে দক্ষ করে তোলার জন্য অনুধ্যায়ী বা রিফ্লেকটিং শিক্ষক হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। অন্য ভালো শিক্ষকদেরকে অনুসরণ, নিজস্ব স্টাইলের ভুল-ভ্রান্তি চিহ্নিত করা, অন্যকে এমনকি শিক্ষার্থীর কাছ থেকে নিজের শিক্ষণ পদ্ধতির পর্যবেক্ষণ নেয়ার মাধ্যমে নিজেকে আদর্শ শিক্ষক হিসেবে গড়ার প্রচেষ্টা চালাতে হবে; ঞ. একজন আদর্শ শিক্ষক পরিবারেরও একজন আদর্শ স্বামী/স্ত্রী এবং আদর্শ বাবা/মা হয়ে থাকেন। এ জন্য তিনি নিয়মিত নিজের শখের কাজটি করেন, পরিবারকে অর্থবহ সময় দেন। একসাথে অনেক কাজের চাপ থাকলে অগ্রগণ্যতার ভিত্তিতে সাজিয়ে সেগুলো শেষ করেন। নিজের সৃষ্টিকর্তার সাথে গভীর সম্পর্ক রাখেন। এভাবেই একজন শিক্ষক হয়ে উঠতে পারেন আদর্শ মানুষ। তারাই জাতিকে গঠনের মুখ্য ভূমিকা রাখেন।
লেখক : নিরাপত্তা বিশ্লেষক
maksud2648@yahoo.com
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








