
জাতীয় সংসদ ভবনের ক্যাবিনেট কক্ষে ‘সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটি’র সাম্প্রতিক বৈঠকগুলো থেকে যেসব প্রস্তাবনা ও ‘আইডিয়া’ বেরিয়ে আসছে, তা নিয়ে রাজনৈতিক, আইনি ও বুদ্ধিবৃত্তিক অঙ্গনে আলোচনা চলছে। সংবিধানের বহু কাটাছেঁড়া দেখেছি, যা মূলত ক্ষমতাসীনদের ক্ষমতা কুক্ষিগত করা এবং নিজেদের শাসনকাল দীর্ঘায়িত করার আইনি বৈধতা হিসেবেই বেশি ব্যবহৃত হয়েছে। এবারের আলোচনাগুলোতে কাঠামোগত পরিবর্তনের যে রূপরেখা দেয়া হচ্ছে, তা যদি রাজনৈতিক সততার সাথে এবং অংশীজনদের প্রকৃত ঐকমত্যের ভিত্তিতে বাস্তবায়িত হয়, তবে তা বাংলাদেশের ভঙ্গুর রাষ্ট্রকাঠামোয় এক যুগান্তকারী ও স্থায়ী পরিবর্তন আনতে পারে।
কমিটির সভাপতি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই দীর্ঘ মতবিনিময় সভায় সংবিধান বিশেষজ্ঞ, সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের অধ্যাপকদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল, যার মধ্যে ৪৪ জন উপস্থিত থেকে মতামত তুলে ধরেছেন। এই আলোচনার নির্যাসগুলো বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট বোঝা যায় যে, রাষ্ট্র সংস্কারের একটি বড় ক্যানভাস তৈরি হচ্ছে, তবে এর বাস্তবায়নের পথ মোটেও সহজ নয়।
আমাদের রাজনৈতিক সঙ্কটের দীর্ঘস্থায়ী ব্যাধি হলো নির্বাচনকালীন সরকারব্যবস্থা নিয়ে আস্থার অভাব। পারস্পরিক অবিশ্বাসের কারণে দলীয় সরকারের অধীনে একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন এ দেশে এক অলীক কল্পনায় পরিণত হয়েছে। এই সঙ্কট নিরসনে বিশেষ কমিটির বৈঠকে একটি অত্যন্ত সৃজনশীল, প্রাতিষ্ঠানিক ও দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের প্রস্তাব উঠেছে, আর তা হলো সংবিধানে একটি ‘উচ্চকক্ষ’ সৃষ্টি এবং সেই উচ্চকক্ষের কাঠামোর ভেতর থেকেই নির্বাচনকালীন সরকার বা তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন। আলোচনায় সুনির্দিষ্টভাবে প্রস্তাব এসেছে যে, বাংলাদেশের জন্য একটি ১০৫ সদস্যবিশিষ্ট উচ্চকক্ষ গঠন করা যেতে পারে।
‘‘রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি সব সময় বাস্তবতায় রূপ নেয় না। তাই নাগরিক সমাজ, রাজনৈতিক শক্তি, গণমাধ্যম এবং অংশীজনদের নিরবচ্ছিন্ন ও তীক্ষ্ণ নজরদারি থাকতে হবে। আমরা এমন একটি আধুনিক সংবিধান চাই, যা জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের স্পিরিট বা মূল আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করবে। উচ্চকক্ষ সৃষ্টি, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রাতিষ্ঠানিক রূপ, ৭০ অনুচ্ছেদের সংস্কার, সংসদীয় জবাবদিহিতা এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতার যেসব প্রস্তাব এই বিশেষজ্ঞরা দিয়েছেন, তা যেন সংবিধানে অক্ষরে অক্ষরে প্রতিফলিত হয়, তবেই বলা যাবে, বাংলাদেশ সত্যি একটি আধুনিক, সহনশীল ও ভারসাম্যপূর্ণ রাষ্ট্রে পরিণত হবে। আমরা আর কোনো রাজনৈতিক প্রতারণার শিকার হতে চাই না, আমরা চাই একটি স্থায়ী, গণতান্ত্রিক, বৈষম্যহীন ও শোষণমুক্ত বাংলাদেশের এক টেকসই সাংবিধানিক ভিত্তি, যা প্রজন্মের পর প্রজন্মকে পথ দেখাবে’’
এই উচ্চকক্ষের গঠনপদ্ধতি হবে অত্যন্ত ভারসাম্যপূর্ণ, যেখানে সংসদের নিম্নকক্ষের আসনের অনুপাতে ৫০ জন সদস্য এবং জাতীয় নির্বাচনে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের আনুপাতিক হারে আরো ৫০ জন সদস্য নির্বাচিত হবেন। বাকি যে পাঁচটি আসন থাকবে, সেখানে দলমত নির্বিশেষে শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতি, বিজ্ঞান বা জাতীয় জীবনে অসামান্য অবদান রাখা প্রজ্ঞাবান ব্যক্তিদের রাষ্ট্রপতি সরাসরি মনোনয়ন দেবেন। এই দ্বিকক্ষবিশিষ্ট ব্যবস্থার মাধ্যমে সমাজে যেমন যোগ্য মানুষের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত হবে, তেমনি রাষ্ট্রপতির একক ক্ষমতার সাথে প্রধানমন্ত্রীর নিরঙ্কুশ ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সুযোগ থাকবে।
এই উচ্চকক্ষ গঠন কেবল আইন পাসের সুবিধার্থেই নয়, বরং নির্বাচনকালীন ক্ষমতার শূন্যতা পূরণেও ভূমিকা পালন করতে পারে। সংবিধানে উচ্চকক্ষের স্পিকারের পদটিকে পদাধিকার বলে উপরাষ্ট্রপতি বা ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে মর্যাদা দেয়ার প্রস্তাব এসেছে। যখন নিম্নকক্ষ ভেঙে দেয়া হবে বা সরকারের মেয়াদ শেষ হবে, তখন এই উচ্চকক্ষের স্পিকারই নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করবেন। বিকল্প প্রস্তাব হিসেবে এমন ধারণাও দেয়া হয়েছে যে, সরকারি ও বিরোধী দলের সম্মতিতে স্পিকার নির্বাচিত হওয়ার পর তাকে প্রধান করে এবং উভয় দলের সম্মতিতে উচ্চকক্ষ থেকেই অন্যান্য উপদেষ্টাদের নিয়োগ দিয়ে নির্বাচনকালীন সরকার গঠন করা যেতে পারে।
দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদের ক্ষেত্রে উচ্চকক্ষের মেয়াদ যদি ছয় বছর হয় এবং নিম্নকক্ষের মেয়াদ চার বছর হয়, তবে সরকারের মেয়াদ শেষ হয়ে নিম্নকক্ষ ভেঙে গেলেও রাষ্ট্রের একটি নির্বাচিত কক্ষ সবসময় বহাল থাকবে। এর ফলে রাষ্ট্র কখনোই সম্পূর্ণ জনপ্রতিনিধিত্বহীন বা শূন্যতায় পড়বে না। একটি বড় ভয় হলো— এই উচ্চকক্ষ যেন কেবল মূল নির্বাচনে পরাজিত, বয়োবৃদ্ধ বা বিতর্কিত রাজনীতিকদের পুনর্বাসন কেন্দ্রে পরিণত না হয়। ৬৪ জেলা ও বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার যে প্রস্তাবটি এসেছে, তা অত্যন্ত সাধুবাদযোগ্য। উচ্চকক্ষকে হতে হবে সত্যিকার অর্থেই একটি প্রজ্ঞাবানদের সম্মিলন, যা নিম্নকক্ষের যেকোনো হঠকারী, আবেগতাড়িত বা জনস্বার্থবিরোধী আইন দ্রুত পাসের ক্ষেত্রে এক ধরনের ‘চেক অ্যান্ড ব্যালান্স’ বা রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করবে।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা ও বিতর্কের জায়গাটি ছিল এই সরকারের প্রধান হিসেবে সর্বশেষ অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতিকে টেনে আনা। এই একটি বিধানের কারণে গোটা সুপ্রিম কোর্ট ও বিচার বিভাগ রাজনীতিকীকরণের শিকার হয়েছিল। বিচারপতিদের অবসরের বয়সসীমা বাড়ানো নিয়ে যে নগ্ন দলীয়করণ আমরা দেখেছি, তা দেশের বিচারব্যবস্থার প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থাকে তলানিতে নিয়ে গিয়েছিল। বিশেষ কমিটির এই বৈঠকে বিচার বিভাগকে এই নির্বাচনকালীন সরকারের সম্পূর্ণ প্রক্রিয়ার বাইরে রাখার বিষয়ে তাত্ত্বিক আলোচনা হয়েছে। বিচারালয় হলো সাধারণ মানুষের শেষ আশ্রয়স্থল, একে কোনোভাবেই রাজনৈতিক ক্ষমতার ভাগবাটোয়ারায় যুক্ত করা উচিত নয়। নির্বাচনকালীন সরকারের প্রধান খোঁজার জন্য রাষ্ট্রপতির সর্বশেষ বিকল্পটিও বাদ দিয়ে পুরোপুরি রাজনৈতিক ঐকমত্যের ভিত্তিতে উচ্চকক্ষ বা স্পিকারকে প্রধান করার যে প্রস্তাবনা এসেছে, তা যদি নির্মোহভাবে বাস্তবায়িত হয়, তবে বিচার বিভাগের হারানো নিরপেক্ষতা ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে।
সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদের অধীনে অধস্তন আদালতের বিচারকদের নিয়ন্ত্রণ, বদলি ও পদোন্নতির ক্ষমতা কার্যত আইন মন্ত্রণালয়ের হাতে বন্দী রয়েছে, যা বিচার বিভাগের স্বাধীনতার পথে অন্তরায়। এই ক্ষমতা পুরোপুরি সুপ্রিম কোর্টের হাতে ন্যস্ত করতে হবে। বিচার বিভাগের জন্য একটি পৃথক সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় প্রতিষ্ঠার যে প্রস্তাব নিয়ে কমিটিতে দীর্ঘ আলোচনা হয়েছে এবং এ বিষয়ে বর্তমান সরকারের যে রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি রয়েছে, তা দ্রুত ও নির্ভুলভাবে আইনে পরিণত করা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। কমিটির সভাপতি জানিয়েছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারি করা এ সংক্রান্ত অধ্যাদেশে কিছু ভুলত্রুটি থাকায় সেটিকে আইনে পরিণত করা হয়নি, তবে সচিবালয় প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি থেকে সরকার সরে আসেনি। সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগে কোনো সুনির্দিষ্ট আইন না থাকায় দলীয় বিবেচনায় নিয়োগের যে মহোৎসব আমরা দশকের পর দশক ধরে দেখেছি, তা বন্ধ করতে বিচারক নিয়োগে একটি স্বচ্ছ আইন প্রণয়ন করাও অপরিহার্য হিসেবে আলোচনায় উঠে এসেছে।
আমাদের সংসদীয় কাঠামোর আরেকটি বড় গলদ হলো সংসদ সদস্যদের স্বাধীন সত্তার অভাব। জনপ্রতিনিধিরা সংসদে গিয়ে মূলত দলীয় প্রধানের ‘রাবার স্ট্যাম্প’ হিসেবে কাজ করতে বাধ্য হন, সংবিধানের বিতর্কিত ৭০ অনুচ্ছেদের কারণে। কোনো সংসদ সদস্য দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে নিজের বিবেক বা এলাকার জনগণের স্বার্থ অনুযায়ী ভোট দিতে পারেন না। এই ধারাটি গণতান্ত্রিক চর্চাকে গলা টিপে হত্যা করে এক ধরনের ‘প্রাইম মিনিস্টেরিয়াল ডিক্টেটরশিপ’ বা প্রধানমন্ত্রীর একনায়কতন্ত্র কায়েম করেছে। কমিটিতে জোরালো প্রস্তাব এসেছে যে, ৭০ অনুচ্ছেদটি সম্পূর্ণ বাতিল না করে একে কেবল চারটি সুনির্দিষ্ট ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ রাখা হোক। এই ক্ষেত্রগুলো হলো— সংবিধান সংশোধন, অর্থবিল, সরকারের ওপর আস্থা বা অনাস্থা ভোট এবং যুদ্ধ বা জাতীয় নিরাপত্তাজনিত জরুরি বিষয়। এই চারটি স্পর্শকাতর বিষয় বাদে অন্য যেকোনো সাধারণ আইন প্রণয়ন বা জনগুরুত্বপূর্ণ বিতর্কের ক্ষেত্রে সংসদ সদস্যরা স্বাধীনভাবে তাদের মতামত প্রকাশ ও ভোট দিতে পারবেন। এর ফলে সরকারের স্থায়িত্ব যেমন হুমকির মুখে পড়বে না, তেমনি সাধারণ আইন প্রণয়নে সংসদ সদস্যরা নিজেদের স্বাধীন সত্তার বিকাশ ঘটাতে পারবেন। তবে কোনো সদস্য যদি দলের বিরুদ্ধে ভোট দেন, তবে তার সদস্যপদ সরাসরি বাতিল না করে, তাকে দল থেকে বহিষ্কারের ক্ষমতা দলের হাতেই ছেড়ে দেয়া উচিত। সংসদ সদস্যপদ বাতিলের ক্ষমতা জনগণের হাতে বা নির্বাচন কমিশনের হাতে থাকাটাই বেশি যুক্তিসঙ্গত।
বর্তমান কাঠামোতে একজন ব্যক্তির হাতেই দলের প্রধান, সরকারের প্রধান এবং সংসদের নেতার পদ পুঞ্জীভূত থাকে। বিশেষ কমিটির বৈঠকে এক ব্যক্তির হাতে দল, সরকার ও সংসদের প্রধান— এই তিনটি পদ না রাখার বিষয়ে যে আলোচনা হয়েছে, তা স্বৈরতন্ত্র প্রতিরোধের একটি অত্যন্ত কার্যকর পদক্ষেপ হতে পারে। এছাড়া দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও মানবাধিকার কমিশনকে নিছক সংবিধিবদ্ধ সংস্থার বদলে সরাসরি সাংবিধানিক মর্যাদা দেয়ার প্রস্তাব উঠেছে। সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে নিয়োগের ক্ষেত্রে নিরপেক্ষ বাছাই কমিটি গঠনের যে রূপরেখা আলোচিত হয়েছে, তা যদি কার্যকর করা যায়, তবে নির্বাচন কমিশন থেকে শুরু করে দুদক— সব প্রতিষ্ঠানই মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়াতে পারবে এবং সরকারের প্রভাবমুক্ত হয়ে কাজ করতে পারবে। পাশাপাশি, সংসদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে সরকারি হিসাব কমিটি ও সরকারি প্রতিষ্ঠান কমিটির মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থায়ী কমিটিগুলোর পাশাপাশি স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মতো অত্যন্ত সংবেদনশীল সংসদীয় কমিটির সভাপতির পদ বিরোধী দলকে দেয়ার যে প্রস্তাব এসেছে, তা সংসদীয় সংস্কৃতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আনবে। জুলাই জাতীয় সনদেও এর উল্লেখ রয়েছে। এর ফলে সরকারের আর্থিক ব্যয়ের স্বচ্ছতা ও প্রশাসনিক জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। সংবিধানে ৭৬ অনুচ্ছেদের অধীনে সংসদীয় কমিটিগুলোকে যে কাউকে তলব করার ক্ষমতা দেয়া হলেও, সেখানে উপস্থিত হওয়া বাধ্যতামূলক করতে কোনো আইন আজ পর্যন্ত কোনো সরকার করেনি। এই বিষয়ে আইন প্রণয়নের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন কমিটির সভাপতি।
সাংবিধানিক সংস্কার কোনো সাধারণ আইনি প্রক্রিয়া বা একদলীয় ইশতেহার নয়। এটি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ রাজনৈতিক চুক্তিপত্র। বৃহৎ বিরোধী দলের সক্রিয় অংশগ্রহণ ও সম্মতি ছাড়া যে সংবিধান প্রণীত হবে, তা ভবিষ্যতে রাজনৈতিক বৈধতার সঙ্কটে পড়তে বাধ্য। জুলাই জাতীয় সনদের কিছু বিষয়ে ভিন্নমত থাকার কারণে বিরোধী দল এই বিশেষ কমিটিতে অংশ নেয়া থেকে নিজেদের বিরত রেখেছে। তাই এই আলোচনা গুরুত্ব হারাচ্ছে। সরকারকে বিষয়টি বিবেচনা করতে হবে। সরকারের উচিত কেবল আনুষ্ঠানিক আহ্বানের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে, রাজনৈতিকভাবে উদ্যোগী হয়ে এবং আলোচনার পরিবেশ সৃষ্টি করে বিরোধী দলকে টেবিলে নিয়ে আসা। একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রক্রিয়া ছাড়া কোনো সাংবিধানিক সংস্কারই দীর্ঘস্থায়ী বা টেকসই হয় না।
আমাদের অতীত ইতিহাস অত্যন্ত তিক্ত, যা আমাদের অতি আশাবাদী হওয়ার পথে বারবার বাধা হয়ে দাঁড়ায়। আমরা ভুলিনি ২০১১ সালের সেই প্রহসনের কথা। তৎকালীন সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটির কো-চেয়ারম্যান প্রয়াত সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের নেতৃত্বাধীন কমিটি সব পক্ষের সাথে আলোচনা করে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বহাল রাখার পক্ষে ঐকমত্যে পৌঁছেছিল। খোদ কমিটির সদস্যরাও এই ব্যবস্থার পক্ষে ছিলেন। কিন্তু তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর সাথে একটিমাত্র রুদ্ধদ্বার বৈঠকের পরই পুরো সিদ্ধান্ত রাতারাতি উল্টে যায় এবং তত্ত্বাবধায়কব্যবস্থা সম্পূর্ণ বাতিল করে দেশে একদলীয় স্বৈরতান্ত্রিক শাসন দীর্ঘায়িত করার বীজ বপন করা হয়। বেশ কয়েকজন সংবিধান বিশেষজ্ঞ ঠিক এই শঙ্কাটির কথাই বৈঠকে অত্যন্ত জোরালোভাবে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। অতীতে অনেক প্রত্যাশা নিয়ে গিয়েও মানুষ প্রতারিত হয়েছে, তাই এবার তারা আশা করছেন সংবিধান যেন আগের চেয়ে অনেক বেশি অগ্রসর ও জনমুখী হয়। সরকারের পক্ষ থেকে আশ্বস্ত করে বলা হয়েছে, বর্তমান সরকারের কোনো একদলীয় স্বৈরতান্ত্রিক প্রবণতা বা অবৈধভাবে ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করার নগ্ন চেষ্টা নেই।
আমাদের মনে রাখতে হবে, রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি সব সময় বাস্তবতায় রূপ নেয় না। তাই নাগরিক সমাজ, রাজনৈতিক শক্তি, গণমাধ্যম এবং অংশীজনদের নিরবচ্ছিন্ন ও তীক্ষè নজরদারি থাকতে হবে। আমরা এমন একটি আধুনিক সংবিধান চাই, যা জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের স্পিরিট বা মূল আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করবে। উচ্চকক্ষ সৃষ্টি, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রাতিষ্ঠানিক রূপ, ৭০ অনুচ্ছেদের সংস্কার, সংসদীয় জবাবদিহিতা এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতার যেসব প্রস্তাব এই বিশেষজ্ঞরা দিয়েছেন, তা যেন সংবিধানে অক্ষরে অক্ষরে প্রতিফলিত হয়, তবেই বলা যাবে, বাংলাদেশ সত্যি একটি আধুনিক, সহনশীল ও ভারসাম্যপূর্ণ রাষ্ট্রে পরিণত হবে। আমরা আর কোনো রাজনৈতিক প্রতারণার শিকার হতে চাই না, আমরা চাই একটি স্থায়ী, গণতান্ত্রিক, বৈষম্যহীন ও শোষণমুক্ত বাংলাদেশের এক টেকসই সাংবিধানিক ভিত্তি, যা প্রজন্মের পর প্রজন্মকে পথ দেখাবে।
লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট
rintuanowar.com
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








