
অর্থনৈতিক প্রতিবেদক
দেশের পুঁজিবাজার আচরণের কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটছে না। হঠাৎ কোনো একদিন সূচকের কিছুটা উন্নতি ঘটলেও পরবর্তীতে শিকার হচ্ছে টানা পতনের। গত সপ্তাহের প্রথম দিনটি কর্মদিবস টানা পতনের পর সপ্তাহের শেষ দুই দিন কিছুটা উন্নতি ঘটে সূচকের। কিন্তু গতকাল নতুন সপ্তাহ শুরু হতেই ফের পতনের ধারায় ফিরে গেল বাজারগুলো। দিনের শুরুটা কিছুটা ভালো হলেও মাঝামাঝি সময়ে এসে সৃষ্ট বিক্রয়চাপ দিনশেষে পতন ঘটায় সূচকের।
পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাজারে এই মুহূর্তে বড় বিক্রয়চাপের কোনো সুনির্দিষ্ট কারণ নেই। তারপরও প্রতিনিয়তই এটা ঘটছে। এ ক্ষেত্রে তারা বিনিয়োগকারীদের দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের পরিবর্তে দ্রুত মুনাফা তুলে নেয়ার প্রবণতাকেই দায়ি করছেন। তারা মনে করেন, দিনের শুরুতে যে বাজার ভালো থাকে তাতে বিক্রয়চাপ তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়। কিন্তু সামান্য বিক্রয়চাপ তৈরি হলেই যদি শেয়ার বিক্রির প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে যায় তাহলে তা কোনো স্বাভাবিক আচরণ থাকে না। এক সময় এ প্রবণতা দেখা যেত ব্যক্তি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে। কিন্তু এখন প্রতিষ্ঠানগুলোও একই ধরনের আচরণ করে চলেছে। ফলে ধারাবাহিক পতনের কবলে পড়ছে বাজার।
প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক ডিএসইএক্স গতকাল ২৪ দশমিক ৫৪ পয়েন্ট অবনতির শিকার হয়। ৫ হাজার ৪৭৫ দশমিক ৫৭ পয়েন্ট থেকে সকালে লেনদেন শুরু করা সূচকটি গতকাল দিনশেষে স্থির হয় ৫ হাজার ৪৫১ দশমিক ০৩ পয়েন্টে। একই সময় বাজারটির দুই বিশেষায়িত সূচক ডিএসই-৩০ ও ডিএসই শরিয়াহর অবনতি ঘটে যথাক্রমে ২ দশমিক ২৩ ও ৬ দশমিক ৬৬ পয়েন্ট। অনুরূপভাবে দেশের দ্বিতীয় পুঁজিবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) সার্বিক মূল্যসূচক সিএএসপিআই ৩০ দশমিক ৬৩ পয়েন্ট হ্রাস পায়। রোববার ১৪ হাজার ৬৬০ দশমিক ৯৬ পয়েন্ট থেকে লেনদেন শুরু করা সূচকটি ওই দিন বিকেলে লেনদেন শেষে নেমে আসে ১৪ হাজার ৬৩০ দশমিক ৩৩ পয়েন্টে। বাজারটির দুই বিশেষায়িত সূচক সিএসই-৩০ ও সিএসসিএক্স সূচকের অবনতি ঘটে যথাক্রমে ১৭ দশমিক ০১ ও ২১ দশমিক ৬৭ পয়েন্ট।
গতকাল সকালে দুই পুঁজিবাজার সূচকের উন্নতি দিয়ে লেনদেন শুরু করে। ঢাকায় প্রধান সূচকটি বেলা ১২টা পর্যন্ত ২০ পয়েন্টের মতো উন্নতি ধরে রাখতে সক্ষম হয়। এর পরই শুরু হয় বিক্রয়চাপ। দিনের বাকি সময় ক্রমান্বয়ে এ চাপ বাড়তে থাকে। আর এভাবেই লেনদেনের পরবর্তী দুই ঘণ্টায়ও বাজার আর ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি।
এ দিকে ইতোমধ্যেই পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলো বিগত অর্থবছরের লভ্যাংশ ঘোষণা শুরু করেছে। বেশ কয়েকটি কোম্পানি ভালো লভ্যাংশ ঘোষণা করেও শেয়ারদরে তার ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারেনি। ওয়ালটন হাইটেক ইন্ডাস্ট্রিজ, এপেক্স ফুটওয়্যারের মতো কোম্পানিগুলো ক’দিন আগেই এ কাজটি শেষ করে। সম্প্রতি অলিম্পিক ইন্ডাস্ট্রিজ লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে। মূল্যমানের দিক থেকেও কোম্পানিগুলো দেশের পুঁজিবাজারে ব্লুচিপস শেয়ার হিসেবে সুপরিচিত। কিন্তু কোনো প্রভাব পড়েনি বাজারে। সামনের দিনগুলোতেও সরকারি বেসরকারি বড় ও ভালো কোম্পানিগুলো একে একে লভ্যাংশ ঘোষণার জন্য তাদের পর্ষদসভার তারিখ ঘোষণা করেছে।
বাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, এটাই পুঁজিবাজারের জন্য ভালো সময় হওয়ার কথা। কোম্পানিগুলোর পারফর্মেন্স তাদের লভ্যাংশ ঘোষণার মধ্য দিয়েই প্রকাশ পায়। অথচ এখন ঘটছে উল্টোটা। লভ্যাংশ ঘোষণার পরপরই বিক্রয়চাপ বেড়ে গিয়ে কোম্পানিগুলোর শেয়ারদর কমতে থাকে। ফলে উদ্যোক্তাদের মধ্যেও ভালো লভ্যাংশ ঘোষণার বিষয়টি নিয়ে দোদুল্যমান অবস্থায় থাকে। অনেকে ভালো লভ্যাংশ ঘোষণার বিষয়টি এড়িয়ে গিয়ে নামমাত্র লভ্যাংশ দিয়ে দায়িত্ব সারার চেষ্টা করে যা দীর্ঘমেয়াদে পুঁজিবাজারের জন্য ক্ষতিকর। আর এভাবেই ভালো কোম্পানিগুলোও একসময় মন্দ কোম্পানিতে রূপান্তরিত হয়। সূচকের অবনতি ঘটলেও গতকাল ঢাকা শেয়ারবাজারে লেনদেনের কিছুটা উন্নতি ঘটে। ডিএসই গতকাল ৫৬৮ কোটি টাকার লেনদেন নিষ্পত্তি করে যা আগের দিনের চাইরে ৩৫ কোটি টাকা বেশি। গত বৃহস্পতিবার ডিএসইর লেনদেন ছিল ৫৩৩ কোটি টাকা। তবে লেনদেন কমেছে চট্টগ্রাম শেয়ারবাজারে। গতকাল সিএসইতে লেনদেন নিষ্পত্তি হয় মাত্র ৯ কোটি টাকার। আগের দিন এখানে ১৩ কোটি টাকার লেনদেন নিষ্পত্তি হয়েছিল।
ঢাকা স্টকের বাজার পর্যালোচনায় দেখা যায়, এখানে ১২টি প্রধান প্রধান খাতের মধ্যে মাত্র তিনটিতেই মূল্যবৃদ্ধি ঘটেছে। ৫ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধি ঘটে খাতগুলোর মধ্যে এগিয়ে ছিল বিবিধ খাত। বাকি দু’টি খাতের মধ্যে জ¦ালানি ও বিদ্যুৎ খাতে ২ দশমিক ২ শতাংশ ও ব্যাংকিং খাতে মূল্যবৃদ্ধির হার ছিল মাত্র দশমিক ২ শতাংশ। অপর দিকে সবচেয়ে বড় দরপতন ঘটেছে মিউচুয়াল ফান্ড খাতে। এ খাতটি গতকাল ৬ দশমিক ৪ শতাংশ দরপতনের শিকার ছিল। এ ছাড়া বীমা খাতে ৪ দশমিক ৫ শতাংশ, টেক্সটাইল ও সিরামিকস খাত ২ দশমিক ৭ শতাংশ দর হারায়।
ঢাকা শেয়ারবাজারে গতকাল লেনদেনের শীর্ষে উঠে আসে বেক্সিমকো লি:। ২৮ কোটি ১২ লাখ টাকায় কোম্পানিটির এক কোটি ১৭ লাখ ৫১ হাজার শেয়ার হাতবদল হয় গতকাল। ২৪ কোটি ৬ লাখ টাকায় ৩ লাখ ৩৯ হাজার শেয়ার বেচাকেনা করে দিনের দ্বিতীয় কোম্পানি ছিল জিকিউ বলপেন। ডিএসইর লেনদেনে শীর্ষ দশ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে ইভিন্স টেক্সটাইলস, সায়হাম টেক্সটাইলস, সোনালি আঁশ, শার্প ইন্ডাস্ট্রিজ, ডমিনেজ স্টিল বিল্ডিং সিস্টেমস, প্যারামাউন্ট টেক্সটাইলস, আইপিডিসি ফিন্যান্স ও সিমটেক্স ইন্ডাস্ট্রিজ।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








