
ভারত-বাংলাদেশ গঙ্গা পানিবণ্টন চুক্তির মেয়াদ শেষ হতে আর মাত্র এক মাস বাকি থাকলেও তার নবায়নে এখনো প্রত্যাশিত কোনো অগ্রগতি নেই। ১৯৯৬ সালে ৩০ বছর মেয়াদি সই হওয়া এ চুক্তির মেয়াদ শেষ হচ্ছে আগামী ১২ ডিসেম্বর। সরকারের সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, এ চুক্তি নবায়নের জন্য আলোচনা শুরুর অনুরোধে ভারত এখনো কোনো সাড়া দেয়নি। তবে চুক্তি নবায়ন বিষয়ে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের প্রতিনিধিরা বিভিন্ন সময়ে আন্তঃমন্ত্রণালয় আলোচনায় অংশ নিয়েছে। ফলে সামনের যে এক মাস সময় রয়েছে তার মধ্যে আলোচিত এ পানি চুক্তি নবায়ন প্রায় অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ইতোমধ্যে চুক্তি নবায়নের বিষয়ে আলোচনার অনুরোধ জানানো হলেও ভারত এখনো সাড়া দেয়নি। তারপরও নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই চুক্তি নবায়ন হবে বলে সরকার আশাবাদী। কারণ সময় কমে আসার আসার সাথে সরকারের সংশ্লিষ্টরা তার সুরাহায় জোরালো চেষ্টা অব্যাহত রেখেছেন। প্রয়োজনে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে রাষ্ট্রের শীর্ষ পর্যায় থেকে ভারত সফরের পরিকল্পনাও হতে পারে।
এর আগে গত বছরের ৬ মার্চ চুক্তি নবায়ন নিয়ে কলকাতায় বাংলাদেশ ও ভারতের বিশেষজ্ঞ পর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ওই বৈঠকে উভয় পক্ষ নীতিগতভাবে চুক্তি নবায়নে একমত হলেও পরবর্তী সময়ে তা বাস্তবায়নের পথে আর এগোয়নি। আর কমিশনের সর্বশেষ কারিগরি বৈঠক হয়েছে গত মে মাসে।
বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য, ফারাক্কা চুক্তির নবায়ন ব্যর্থ হলে ভবিষ্যতে এটি বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ওপরও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে। এজন্য এর সমাধানে সবচাইতে বেশি প্রয়োজন দুই দেশের মধ্যে বন্ধুত্ব সম্পর্ক। কারণ চুক্তি নবায়ন হলেও ভারত বাংলাদেশকে কতটুকু পানি দেবে তাও দুই দেশের সম্পর্কের ওপর নির্ভর করবে।
তাদের ভাষ্য, জটিল এ সমস্যা নিরসন জেআরসির কর্মকর্তাদের মাধ্যমে সম্ভব নয়। কারণ সামনে যে সময় রয়েছে তাতে রাষ্ট্রের মন্ত্রী পর্যায় থেকে উদ্যোগী হতে হবে। নয়তো শেষ সময়সীমার মধ্যে এর সমাধান আটকে যেতেও পারে। আর তাতে করে মেয়াদ শেষে দেশে পানি সঙ্কটের বড়ো শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
এ বিষয়ে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে আন্তঃসীমান্ত নদীগুলো নিয়ে যোগাযোগ রক্ষায় গঠিত বাংলাদেশ যৌথ নদী কমিশনের (জেআরসি) এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে নয়া দিগন্তকে বলেন, চুক্তি নবায়নের বিষয়ে কাজ চলমান থাকলেও তার অগ্রগতি এখনো দৃশ্যমান নয়। কারণ বিষয়টি অত্যন্ত জটিল। তাই এ নিয়ে আলোচনা পর্যালোচনা হলেও ভারতের সাড়া মিলছে না। ফলে এখন মনে হচ্ছে রাষ্ট্রের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের মধ্যে আলোচনা ছাড়া এর সমাধান সম্ভব হবে না।
যদিও এর আগে গত ৫ অক্টোবর ভারতের সাথে গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে বাংলাদেশ তার জাতীয় স্বার্থ ও নিরাপত্তার সর্বোত্তম সুরক্ষা নিশ্চিত করেই সিদ্ধান্ত নেবে বলে জানিয়েছিলেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির। ‘বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন’-এর অনুষ্ঠানে গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি নবায়নের বিষয়ে সাংবাদিকরা জানতে চাইলে মন্ত্রী পরিষ্কার কোনো জবার দিতে পারেননি। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের স্বার্থের জন্য যা সবচেয়ে ভালো, সেটিই করা হবে।’ বাংলাদেশ তার জাতীয় স্বার্থ ও নিরাপত্তার ভিত্তিতেই সিদ্ধান্ত নেবে।
এরপর ৮ অক্টোবর রাজধানীতে আয়োজিত আরেক অনুষ্ঠানে ডিসেম্বরের আগেই গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তি সম্পন্ন হবে বলে আশা প্রকাশ করেন পানিসম্পদমন্ত্রী। তিনি বলেন, গঙ্গা চুক্তিতে মূল অগ্রাধিকার থাকবে ১৯৭৭ সালের চুক্তির মতো ‘গ্যারান্টি ক্লজ’ ফিরিয়ে আনা। দুই মন্ত্রীর এমন বক্তব্যের পর এখানে চুক্তির বিষয়ে কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি।
এ বিষয়ে ইমেরিটাস অধ্যাপক ও টেকসই উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের প্রতিষ্ঠাতা ড. আইনুন নিশাত দৈনিক নয়া দিগন্তকে বলেন, ‘ভারতের সাথে গঙ্গা চুক্তি নবায়নের প্রস্তুতি অনেক আগেই শেষ হওয়া উচিত ছিল। চুক্তি নবায়নের বিষয়টি জেআরসি দিয়ে কিছুতেই সুরাহা হবে না মন্তব্য করে তিনি বলেন, বিষয়টি সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করছে দুই দেশের রাজনৈতিক সম্পর্কের ওপর। এজন্য দুই দেশের মধ্যে সম্পর্কোন্নয়নের সাথে প্রধানমন্ত্রী, পানি সম্পদ ও পররাষ্ট্র মন্ত্রীকে সরাসরি সম্পৃক্ত হতে হবে। নয়তো এ নিয়ে জটিলতা আরো বাড়বে।
অন্য দিকে পানি ও জলবায়ু বিশেষজ্ঞ নর্থ সাউথ ইউনির্ভাসিটির অধ্যাপক মো: সিরাজুল ইসলাম নয়া দিগন্তকে বলেন, পানিচুক্তি সময়মতো না হলে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক খারাপ হতে পারে। তা ছাড়া চুক্তি নবায়ন কিংবা পানি না দেয়ার কোনো কারণ দেখি না। কোনো যুদ্ধ পরিস্তিতি ছাড়া আন্তর্জাতিক আইনও না দেয়ার বিষয়টি সমর্থন করে না। সময় শেষ হবার আগেই পানি চুক্তি নবায়ন হবে এমন আশাবাদ ব্যক্ত করে তিনি বলেন, তিস্তার পানি সমস্যা শুধুমাত্র শুষ্ক মৌসুমের জন্য হলেও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ফারাক্কা চুক্তির নবায়ন শুধু পানিবণ্টনের প্রশ্ন নয়; এটি উত্তরবঙ্গের কৃষি, পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য এবং নদীভাঙন সমস্যার সাথেও সরাসরি যুক্ত।
১৯৯৬ সালে ৩০ বছর মেয়াদি সই হওয়া বর্তমান গঙ্গা চুক্তির মেয়াদ শেষ হচ্ছে আগামী ১২ ডিসেম্বর। এই চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশ সীমান্তের ২০ কিলোমিটার উজানে ভারতের ফারাক্কা বাঁধ দিয়ে শুকনো মৌসুমে পানিবণ্টন করা হয়। ২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত পলাতক সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পর থেকে ঢাকা ও দিল্লির সম্পর্কে টানাপোড়েন তৈরি হয়। ঝুলে যায় পানিবণ্টন চুক্তি। বিগত ইউনূস সরকারের সময়ে এ নিয়ে উদ্যোগ গ্রহণের কথা বলা হলেও বাস্তাবে তার কোনো আলামত মেলেনি।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








