
জাপানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চার দিনের রাষ্ট্রীয় সফর নিয়ে চলছে নানা বিশ্লেষণ। এই সফরে বাংলাদেশের বহুমাত্রিক ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হয়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলেছেন, প্রধানমন্ত্রীর সফরের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ ও জাপানের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। অর্থনৈতিক সহযোগিতা, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, শিল্পায়ন ও সামুদ্রিক নিরাপত্তাসহ বহুমাত্রিক ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি এসেছে এ সফরে।
তবে তারা এও বলেছেন, জাপানের আধুনিক প্রযুক্তি ও কারিগরি জ্ঞান কাজে লাগাতে পারলেই বাংলাদেশের উৎপাদন খাতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হবে।
আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশের বেসরকারি খাতে এক লাখ কোটি জাপানি ইয়েন পর্যন্ত বিনিয়োগের সম্ভাবনা এবং এর মাধ্যমে প্রায় দুই লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রত্যাশা সফরের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক অর্জন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এ ছাড়া বাংলাদেশের দু’টি উন্নয়ন প্রকল্পে প্রায় ২৯৫ দশমিক ৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ঋণসহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে জাপান। দুই দেশের মধ্যে ছয়টি দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা দলিল স্বাক্ষরের পাশাপাশি বেসরকারি খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে আরো ১৭টি সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে। এ ছাড়া উপকূলীয় নিরাপত্তা জোরদারে বাংলাদেশকে টহল জাহাজ দেয়ার বিষয়েও অনুদান চুক্তি সই হয়েছে।
এ দিকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই সফরকে ঐতিহাসিক ও তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী। অন্য দিকে ব্যবসায়ী নেতা ও অর্থনীতি বিশ্লেষকরাও সফরের মধ্য দিয়ে দেশের অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন।
বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেমের মতে, জাপানের সাথে সম্পাদিত চুক্তিগুলো দেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতিতে বিশাল ভূমিকা রাখবে। বিশেষ করে আধুনিক প্রযুক্তি ও কারিগরি জ্ঞান দেশে আসার মাধ্যমে বাংলাদেশের শিল্প খাত নতুন সক্ষমতা অর্জন করতে পারে। প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফরে ঘোষিত বিনিয়োগ পরিকল্পনা, ঋণসহায়তা, প্রযুক্তিগত সহযোগিতা ও কৌশলগত অংশীদারত্ব বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রায় নতুন সম্ভাবনার বার্তা দিয়েছে। দীর্ঘদিনের উন্নয়ন সহযোগিতার সম্পর্ককে এবার বাণিজ্য, উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও আঞ্চলিক নিরাপত্তার বিস্তৃত পরিসরে নিয়ে যাওয়ার উদ্যোগ দৃশ্যমান হয়েছে।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের (বিআইআইএসএস) গবেষণা পরিচালক ও অর্থনীতি বিশ্লেষক ড. মাহফুজ কবির মনে করেন, জাপানের বিনিয়োগ ও ঋণসহায়তা কার্যকরভাবে কাজে লাগাতে পারলে বাংলাদেশে শিল্পায়ন এবং বিপুল কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে। তিনি বলেন, আমি মনে করি, এটা বাংলাদেশের জন্য বড় সুযোগ। বাংলাদেশ যদি এফডিআই এবং ঋণসহায়তাকে কাজে লাগাতে পারে এবং সেই সংশ্লিষ্ট প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন করতে পারে, বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের অবকাঠামো উন্নয়ন করতে পারে, তাহলে আমি আশা করি শিল্পায়নের জন্য বিদেশী বিনিয়োগ আসবে এবং একই সাথে বিপুল পরিমাণ কর্মসংস্থান তৈরি হবে।
তারেক রহমানের জাপান সফরের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক সাফল্য হিসেবে দেখা হচ্ছে দেশটির বেসরকারি খাতে বাংলাদেশের জন্য এক লাখ কোটি ইয়েনের সম্ভাব্য বিনিয়োগ পরিকল্পনা। জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি দুই দেশের শীর্ষ বৈঠকের পর জানান, আগামী পাঁচ বছরে জাপানি কোম্পানিগুলোর বাংলাদেশে সম্ভাব্য বিনিয়োগের পরিমাণ এক লাখ কোটি ইয়েন পর্যন্ত হতে পারে। এর মাধ্যমে প্রায় দুই লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রত্যাশা করা হচ্ছে। বাংলাদেশী মুদ্রায় এই বিনিয়োগের পরিমাণ প্রায় ৭৭ হাজার ৪৭০ কোটি টাকা। গাড়ি উৎপাদন, অন্যান্য উৎপাদনশিল্প এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানি অবকাঠামো খাতে জাপানি বিনিয়োগের সম্ভাবনা রয়েছে। বাংলাদেশের বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতেও জাপানি কোম্পানিগুলোর আগ্রহ রয়েছে। এই বিনিয়োগ পরিকল্পনা বাংলাদেশের অর্থনীতিতে জাপানের আস্থার প্রতিফলন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বিশেষ করে উৎপাদনশিল্পে জাপানের অভিজ্ঞতা, আধুনিক প্রযুক্তি ও ব্যবস্থাপনাগত দক্ষতা কাজে লাগানোর সুযোগ তৈরি হলে বাংলাদেশের শিল্পায়ন নতুন গতি পেতে পারে। বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা বলছেন, জাপানের আধুনিক প্রযুক্তি ও কারিগরি জ্ঞান কাজে লাগাতে পারলে তৈরি পোশাকশিল্পসহ উৎপাদন খাতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হবে। প্রচলিত পণ্যের বাইরে উচ্চমূল্যের পণ্য উৎপাদন ও রফতানির সক্ষমতা বাড়বে। একই সাথে দেশীয় কর্মীদের দক্ষতা উন্নয়নেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জাপান সফরকে ঐতিহাসিক ও তাৎপর্যপূর্ণ আখ্যা দিয়েছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী। তিনি বলেন, বাংলাদেশের সাথে জাপানের সুসম্পর্ক বরাবরই ছিল। তবে বর্তমান সরকারের প্রধানমন্ত্রীর এই সফর অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। চার দিনের সফরে বাংলাদেশের বড় ধরনের অর্জন হয়েছে।
রিজভী বলেন, সফরে দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর উদ্যোগে ‘বিআইজি-বি ফর শেয়ার্ড প্রসপারিটি’ নামে একটি সহযোগিতার নীতি ঘোষণা করা হয়েছে। এর আওতায় উদীয়মান অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদার, সরবরাহব্যবস্থার ঝুঁকি মোকাবেলা, প্রযুক্তিগত পরিবর্তন ও ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তা মোকাবিলায় একসাথে কাজ করার বিষয়ে দুই দেশ একমত হয়েছে। তিনি বলেন, সফরে প্রায় ২৯৫ দশমিক ৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের ঋণসহায়তার প্রতিশ্রুতি এবং বিভিন্ন চুক্তি, সমঝোতা স্মারক ও লেটার অব ইনটেন্ট স্বাক্ষরিত হয়েছে। অর্থনৈতিক সম্পর্ক ও বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নয়ন, কৃষি, বন, মৎস্য এবং জলবায়ু পরিবর্তনসহ বিভিন্ন বিষয়ে দুই দেশের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মধ্যে আলোচনা ও সহযোগিতার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর সফরের বিভিন্ন দিক তুলে ধরে রিজভী বলেন, তারেক রহমান উন্নয়ন সহযোগী, অর্থনৈতিক ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি এবং রাজনীতিবিদদের সাথে বৈঠক করেছেন। এসব আলোচনার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার নতুন ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে।
জানতে চাইলে জাপানে বসবাসরত বাংলাদেশী ব্যবসায়ী আর এম ইন্টারন্যাশনালের কর্ণধার মো: ফাইয়াজ আহমেদ চৌধুরী বলেন, তারেক রহমানের জাপান সফরে ঘোষিত বিনিয়োগ পরিকল্পনা, ঋণসহায়তা, প্রযুক্তিগত সহযোগিতা ও কৌশলগত অংশীদারত্ব বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রায় নতুন সম্ভাবনার বার্তা দিয়েছে। দীর্ঘদিনের উন্নয়ন সহযোগিতার সম্পর্ককে এবার বাণিজ্য, উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও আঞ্চলিক নিরাপত্তার বিস্তৃত পরিসরে নিয়ে যাওয়ার উদ্যোগ দৃশ্যমান হয়েছে। তবে এসব বাস্তবায়নের জন্য জাপানের আধুনিক প্রযুক্তি ও কারিগরি জ্ঞান কাজে লাগাতে হবে। তাহলেই বাংলাদেশের উৎপাদন খাতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হবে এবং রফতানি বহুমুখীকরণের পথ আরো প্রসারিত হবে।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








