ফ্রান্সে ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা, তোপের মুখে পুলিশি দমনপীড়ন

 রয়টার্স
ফ্রান্সের বিদ্যালয়গুলোতে উপযুক্ত পরিবেশ নিশ্চিতের দাবিতে ছাত্রসমাজ দুই সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে যে আন্দোলন চালিয়ে আসছে, তা দমনে পুলিশি বলপ্রয়োগের পর প্রবল সমালোচনার মুখে পড়েছে দেশটির সরকার। গত সপ্তাহে সাঁ-ওঁ-ল্যমোন এলাকায় প্রতিবাদ কর্মসূচির সময় কাছে থেকে ছোঁড়া টিয়ার গ্যাস ক্যানিস্টারের আঘাতে এদান নামের ১৪ বছর বয়সী এক কিশোরের চোয়াল ভেঙে যায় এবং একাধিক দাঁত চূর্ণ হয়ে যায় বলে তার পরিবার ও আইনজীবী নিশ্চিত করেছেন। পরিবারের আইনজীবী এলসা মার্সেল উল্লেখ করেন, আন্দোলনস্থল থেকে খানিকটা দূরে দেয়ালের ওপর বসে মুঠোফোন ব্যবহার করছিল কিশোর এদান। স্থানীয় প্রসিকিউটরের ভাষ্য অনুযায়ী, এক পুলিশ সদস্য এদানের দিকে এগিয়ে গিয়ে লাঠি দিয়ে মারলে সে পাল্টা লাথি চালায়। তখন আরেক কর্মকর্তা কুগার লঞ্চার ব্যবহার করে তার মুখ লক্ষ্য করে টিয়ার গ্যাস গ্রেনেড নিক্ষেপ করেন।
আইনজীবী অভিযোগ করেন, পুলিশ সদস্য ছেলেটিকে রক্তাক্ত মুখে মাটিতে ফেলে রেখে চলে যান এবং কোনো জরুরি চিকিৎসাসেবাও ডাকেননি। গোপনীয়তা বজায় রাখতে এদানের পারিবারিক পদবি গোপন রেখেই হত্যাচেষ্টার মামলা ঠুকেছে পরিবার। পুলিশ তদন্তাধীন বিষয়ে মন্তব্য করতে না চাইলেও প্রসিকিউটর দফতর জানায়, ছাত্রটি পুলিশের দিকে তেড়ে এলে কর্মকর্তারা তাকে প্রতিহত করতে চেয়েছিলেন। ঘটনার আট দিন পর গত মঙ্গলবার স্থায়ী শারীরিক বিকৃতি ঘটানোর অভিযোগে এক পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক তদন্ত শুরু হয়। বিদ্যালয়ের নানা অব্যবস্থাপনা নিয়ে ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলনে পুলিশি তাণ্ডবের অভিযোগে অভ্যন্তরীণ তদারকি সংস্থা আইজিপিএন যে ২৪টি মামলার তদন্ত করছে, এটি তার অন্যতম। ফরাসি প্রধানমন্ত্রী সেবাস্টিয়ান ল্যকর্নু এই ছাত্র বিক্ষোভকে কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে সহিংস বলে আখ্যা দিয়েছেন।
পুলিশের এই আগ্রাসী ভূমিকার পর রাবার বুলেট ও গ্রেনেড লঞ্চারের ব্যবহার বন্ধের দাবি নতুন করে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। ইউরোপের অন্যান্য দেশের পুলিশে এসব মারণাস্ত্রের ব্যবহার নেই। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ও জাতিসঙ্ঘের মানবাধিকার বিশেষজ্ঞরা পুলিশি সরঞ্জামের চরম ও বিপজ্জনক ব্যবহারের সমালোচনা করে আসছেন। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে চরম জনক্ষোভ তৈরি হয়েছে, যা ২০২৭ সালের নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ সরকারের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের অসন্তোষকে আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। আইনি নথি ও সাক্ষাৎকার বিশ্লেষণ করে রয়টার্স জানিয়েছে, পুলিশি বলপ্রয়োগে আহত ২৮টির মধ্যে ১৫টি কেস আইজিপিএনের অধীনে তদন্তাধীন রয়েছে। এগুলোতে রাবার বুলেট, স্টান গ্রেনেড, টিয়ার গ্যাস, লাঠিচার্জ এবং ঘোড়া নিয়ে আক্রমণের প্রমাণ মেলে। দু’টি পৃথক ঘটনায় রাবার বুলেটের আঘাতে ভুক্তভোগীদের চোখ নষ্ট বা গুরুতর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। লেন্স অঞ্চলে ১৫ বছর বয়সী আরেক কিশোরের হাত উড়ে গেছে, যা সম্ভবত স্টান গ্রেনেডের বিস্ফোরণে ঘটেছে বলে দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরেন্ট নুনিয়েজ জানিয়েছেন। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত স্টান গ্রেনেড ব্যবহার আপাতত স্থগিত রাখা হয়েছে। এক রেডিও সাক্ষাৎকারে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী স্বীকার করেছেন প্রায় ২০০ জন শিক্ষার্থী আহত হয়েছে, তবে পুলিশি অ্যাকশনে আহত হওয়ার হার খুবই কম বলে দাবি করেন তিনি। তিনি দাবি করেন, শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা দেয়াই তাদের মূল কাজ। অন্য পক্ষে সরকারি সূত্রে দাবি করা হয়েছে, বিক্ষোভকারীদের হামলায় ৭০০ জন পুলিশ সদস্য জখম হয়েছেন। বিভিন্ন স্কুলে অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুর চালানো ছাড়াও শিক্ষক ও পথচারীদের ওপর হামলা চালিয়েছে আন্দোলনকারীরা। সহিংসতায় জড়িয়ে পড়ার অভিযোগে পুলিশ এ পর্যন্ত ছয় হাজার ৮৭৭ জনকে গ্রেফতার করেছে, যাদের সিংহভাগই অপ্রাপ্তবয়স্ক।

Advertisement