
- ঘাটতিতে উৎপাদন, রফতানি ও বিনিয়োগে চাপ
- দৈনিক ঘাটতি চাহিদার প্রায় ৩৬ শতাংশ
শিল্পকারখানায় গ্যাস সঙ্কটের সমাধান দীর্ঘদিনেও মিলছে না। স্বল্পচাপ ও সরবরাহ ঘাটতিতে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। বিকল্প জ্বালানির ওপর নির্ভরতা বাড়ায় বাড়তি ব্যয়ের চাপে পড়েছেন উদ্যোক্তারা। এতে শিল্পের উৎপাদন সক্ষমতা, প্রতিযোগিতামূলক বাজারে টিকে থাকা এবং বিনিয়োগের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়ছে।
ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, দেশে দৈনিক গ্যাসের গড় চাহিদা প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট। সরবরাহ প্রায় ২৪২ কোটি ঘনফুট। অর্থাৎ প্রতিদিন প্রায় ১৩৮ কোটি ঘনফুট গ্যাস কম মিলছে, যা চাহিদার প্রায় ৩৬ শতাংশ। একই সময়ে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সঙ্কটে শিল্প খাতে দৈনিক সম্ভাব্য উৎপাদন ক্ষতি প্রায় ২৫০০ কোটি টাকা।
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রয়োজন অনুযায়ী গ্যাস না পাওয়ায় উৎপাদন ধরে রাখতে হিমশিম খাচ্ছেন উদ্যোক্তারা। কোথাও যন্ত্রপাতি সীমিত গতিতে চলছে, কোথাও চাপ কম থাকায় উৎপাদনপ্রক্রিয়া ব্যাহত হচ্ছে। বিকল্প জ্বালানি ও নিজস্ব বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যবস্থা করতে গিয়ে পরিচালন ব্যয় বাড়ছে। এতে মুনাফা কমছে, নির্ধারিত সময়ে রফতানি পণ্য সরবরাহও কঠিন হয়ে পড়ছে। বস্ত্র, সুতা, সিরামিক ও সার উৎপাদনসহ জ্বালানিনির্ভর বিভিন্ন শিল্পে এর প্রভাব পড়ছে।
তারা আরো বলেন, উৎপাদন কমলেও শ্রমিকের মজুরি, ঋণের সুদ ও রক্ষণাবেক্ষণের মতো স্থায়ী ব্যয় বহন করতে হয়। ফলে প্রতিটি পণ্যের ব্যয় বেড়ে যায়। ডিজেলচালিত জেনারেটর ব্যবহার করলে বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচ বাড়ে। যোগ হয় জেনারেটরের রক্ষণাবেক্ষণ ও যন্ত্রাংশের ক্ষয়। যেসব শিল্পে সরাসরি গ্যাসের তাপ লাগে, সেখানে বিকল্প জ্বালানিতে কাক্সিক্ষত গতি ও মান বজায় রাখা কঠিন।
গ্যাসের ঘাটতি শিল্পাঞ্চলভেদে ভিন্নভাবে প্রভাব ফেলছে। যেসব কারখানায় বয়লার, চুল্লি ও তাপ উৎপাদনকারী যন্ত্রের ব্যবহার বেশি, সেখানে চাপ কমলে উৎপাদন স্বাভাবিক রাখা যায় না। অনেক ক্ষেত্রে উৎপাদন কমাতে হয়, কখনো নির্দিষ্ট সময়ের জন্য যন্ত্রপাতি বন্ধ রাখতে হয়।
সাভার-আশুলিয়া শিল্পাঞ্চল নিয়ে ডিসিসিআইয়ের এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, গ্যাস ও বিদ্যুতের অনিয়মিত সরবরাহে কয়েকটি তৈরি পোশাক, ওয়াশিং ও সুতা কারখানার উৎপাদন ১৫ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে। বিকল্প বিদ্যুৎ উৎপাদনে ডিজেলের ব্যয়ও বেড়েছে। এতে উৎপাদন ব্যয়ের পাশাপাশি সময়মতো রপ্তানি পণ্য পাঠানো নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
বস্ত্র ও তৈরি পোশাকশিল্পে উৎপাদনের ধাপগুলো পরস্পর যুক্ত। সুতা উৎপাদন, বয়ন, রঙকরণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণের কোনো একটি ধাপে সমস্যা হলে পরের ধাপের কারখানা উপকরণ পেতে দেরি করে। বিদেশী ক্রেতাকে সময়মতো পণ্য দিতে না পারলে অতিরিক্ত পরিবহন ব্যয়, মূল্যছাড় কিংবা ভবিষ্যৎ ক্রয়াদেশ কমে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। তবে গ্যাস সঙ্কটে কতটি রফতানি আদেশ বাতিল হয়েছে বা কত ডলারের পণ্য সরবরাহ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তার সমন্বিত হালনাগাদ পরিসংখ্যান পাওয়া যায়নি।
সিরামিক শিল্পে স্বল্পচাপের প্রভাব সরাসরি পণ্যের মান ও উৎপাদন ব্যয়ের সাথে জড়িত। টাইলস ও স্যানিটারি পণ্য তৈরিতে চুল্লিতে নির্দিষ্ট তাপমাত্রা দীর্ঘ সময় ধরে রাখতে হয়। চাপ কমলে এ প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়, উৎপাদনের সময় বাড়ে, পণ্যের মান নষ্ট হওয়ার ঝুঁঁকি তৈরি হয় এবং কাঁচামালের অপচয়ও হতে পারে। ডিসিসিআইয়ের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, স্বল্পচাপের কারণে কিছু সিরামিক কারখানা স্থাপিত সক্ষমতার মাত্র ২০ থেকে ৩০ শতাংশ ব্যবহার করতে পারছে। উৎপাদনে গ্যাসের চাপ অন্তত ২৫ পিএসআই প্রয়োজন হলেও কখনো তা আট থেকে ১০ পিএসআইয়ে নেমে আসছে। বিকল্প হিসেবে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) ব্যবহারে ব্যয় বাড়ছে।
সার উৎপাদনেও গ্যাস গুরুত্বপূর্ণ। প্রাকৃতিক গ্যাস সার তৈরির প্রধান কাঁচামালগুলোর একটি এবং প্রক্রিয়ার জ্বালানিও। প্রয়োজনীয় গ্যাস না পেলে কারখানার উৎপাদন কমাতে বা সাময়িক বন্ধ রাখতে হয়। এতে অভ্যন্তরীণ বাজারে সার সরবরাহ পরিকল্পনা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে। ঘাটতি মেটাতে আমদানি বাড়লে সরকারের ব্যয়ও বাড়ে।
ডিসিসিআই সভাপতি তাসকীন আহমেদ নয়া দিগন্তকে বলেন, জ্বালানি সঙ্কটের প্রভাব নতুন বিনিয়োগেও পড়ছে। উদ্যোক্তারা জমি, ভবন, যন্ত্রপাতি ও অবকাঠামোয় বড় অঙ্কের অর্থ বিনিয়োগ করেন; কিন্তু গ্যাস সংযোগ না পেলে উৎপাদন শুরু করা যায় না। কারখানা চালুর আগেই ঋণের সুদ, কিস্তি, কর্মী ও রক্ষণাবেক্ষণের ব্যয় বহন করতে হয়। দীর্ঘদিন এমন চললে প্রত্যাশিত মুনাফা কমে যায় এবং উদ্যোক্তারা নতুন প্রকল্প থেকে পিছিয়ে যেতে পারেন। তিনি বলেন, উৎপাদন ব্যয় বাড়লে তার প্রভাব শুধু উদ্যোক্তাদের মুনাফায় সীমাবদ্ধ থাকে না। খরচের একটি অংশ পণ্যের দামে যুক্ত হলে দেশীয় ক্রেতারাও চাপে পড়তে পারেন। রফতানিমুখী শিল্পে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছে প্রতিযোগিতামূলক দাম ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। কারণ আন্তর্জাতিক বাজারে বাড়তি উৎপাদন ব্যয় সব সময় দামে সমন্বয় করা যায় না। ফলে অনিয়মিত গ্যাস সরবরাহ দীর্ঘায়িত হলে উৎপাদন, রফতানি ও বিনিয়োগ- তিন ক্ষেত্রেই চাপ বাড়তে পারে।
ডিসিসিআইয়ের তথ্যে দেখা যায়, নতুন শিল্পকারখানার গ্যাস সংযোগ ও অতিরিক্ত গ্যাসের চাহিদাসংক্রান্ত প্রায় এক হাজার ৮৫৭টি আবেদনের বিপরীতে ৩৫ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ আটকে ছিল।
এ দিকে বিশ্বব্যাংকও বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে জ্বালানি খাতের সমস্যাকে গুরুত্বপূর্ণ বাধা হিসেবে চিহ্নিত করেছে। সংস্থাটির বাংলাদেশ উন্নয়ন হালনাগাদ প্রতিবেদনে জ্বালানি খাতের দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা, আর্থিক খাতের দুর্বলতা ও রাজস্ব আহরণের সীমাবদ্ধতাকে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে চাপ সৃষ্টিকারী কারণ বলা হয়েছে। বিশ্বব্যাংক বলেছে, সঙ্কট মোকাবেলায় শুধু গ্যাস আমদানি বাড়ালেই হবে না। সরবরাহ ব্যবস্থার দক্ষতা বাড়ানো, পাইপলাইনের সক্ষমতা উন্নয়ন, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান এবং শিল্পাঞ্চলভিত্তিক সরবরাহের তথ্য স্বচ্ছভাবে প্রকাশ করা জরুরি। পাশাপাশি জ্বালানিসাশ্রয়ী প্রযুক্তি ও ছাদে সৌরবিদ্যুতের মতো ব্যয়সাশ্রয়ী বিকল্পের ব্যবহার বাড়ানো যেতে পারে। তবে শিল্পের উৎপাদনপ্রক্রিয়ার উপযোগী নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, সঙ্কটের প্রকৃত অর্থনৈতিক প্রভাব নিরূপণে দৈনিক চাহিদা ও সরবরাহের হিসাবের পাশাপাশি শিল্পাঞ্চলভিত্তিক গ্যাসচাপ, সক্ষমতা ব্যবহারের হার, বিকল্প জ্বালানিতে বাড়তি ব্যয়, শ্রমঘণ্টার ক্ষতি এবং রফতানি আদেশ বাতিল বা বিলম্বের তথ্য সমন্বিতভাবে প্রকাশ করা দরকার। এতে কোন খাত সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এবং কোথায় জরুরি ভিত্তিতে সরবরাহ বাড়ানো প্রয়োজন, তা নির্ধারণ করা সহজ হবে। দীর্ঘস্থায়ী সঙ্কটের সমাধান না হলে বিকল্প জ্বালানির বাড়তি ব্যয় ও উৎপাদন সক্ষমতার অব্যবহার শিল্প খাতের প্রতিযোগিতার সক্ষমতাকে আরো চাপে ফেলতে পারে বলে তারা মনে করছেন।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








