ক্ষতিপূরণের চেক ছাড়াতে ৬০ লাখ টাকা ঘুষের অভিযোগ

 মাহমুদ হাসান পটুয়াখালী
পায়রাবন্দরের জন্য অধিগ্রহণ করা জমির ক্ষতিপূরণ বাবদ এক কোটি ৩১ লাখ টাকার চেক পেতে ৬০ লাখ টাকা ঘুষ নেয়ার অভিযোগ উঠেছে পটুয়াখালী জেলা প্রশাসনের ভূমি অধিগ্রহণ শাখার প্রধান সহকারী খালিদ হোসাইন ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে। জমির মালিকের ব্যাংক হিসাবে ক্ষতিপূরণের টাকা জমা হওয়ার দুই দিন পর তিনটি চেকের মাধ্যমে ওই টাকা তুলে নেয়া হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, ঘুষের অর্থ পরিশোধের নিশ্চয়তা হিসেবে চেকগুলো জামানত রাখা হয়েছিল।
এ ঘটনায় জমির মালিক মোশারেফ সরদার আদালতে দু’টি মামলা করলেও টাকা ফেরত দেয়ার প্রতিশ্রুতিতে সেগুলো প্রত্যাহার করেন। তবে তার দাবি, এখনো টাকা ফেরত পাননি। এ দিকে, অভিযোগটি তদন্ত করেছে বরিশাল বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়।
মামলার নথি, ব্যাংক বিবরণী ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, ২০২০ সালের ২৪ জুন কলাপাড়া উপজেলার লালুয়া মৌজার তিন একর জমি পায়রা বন্দরের জন্য অধিগ্রহণ করা হয়। ওই বছরের ১৮ নভেম্বর জমির মালিক হিসেবে মোশারেফকে নোটিশ দেয়া হয়। জমিটির ক্ষতিপূরণ নির্ধারণ করা হয় এক কোটি ৩১ লাখ ৩৭ হাজার ১৩৭ টাকা। জমির মালিকানা নিয়ে আপত্তি ও মামলা থাকায় নির্ধারিত সময়ে তিনি ক্ষতিপূরণ পাননি।
এ সময় ভূমি অধিগ্রহণ শাখায় যাতায়াতের সূত্রে শরীফুল ইসলামের সাথে তার পরিচয় হয়। ক্ষতিপূরণের টাকা পেতে সমস্যার কথা জানালে শরীফুল তাকে খালিদ হোসাইনের কাছে নিয়ে যান। মামলার নথি অনুযায়ী, ক্ষতিপূরণের টাকা পাইয়ে দেয়ার আশ্বাস দিয়ে খালিদ তার কাছে ১৫ শতাংশ অর্থ দাবি করেন। নিশ্চয়তা হিসেবে ব্যাংকের চেক জামানত রাখার প্রস্তাবে রাজি হন মোশারেফ।
নথিতে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের ৭ জুন শরীফুল ও খালিদের পরামর্শে স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের পটুয়াখালীর একটি শাখায় হিসাব খোলেন মোশারেফ। চেক বই পাওয়ার পর স্বাক্ষর করা তিনটি চেক তাদের হাতে দেন তিনি। পরে ক্ষতিপূরণের চেক তৈরি হলে তাকে জানানো হয়। ভূমি অধিগ্রহণ শাখায় চেক গ্রহণের রেজিস্টারে স্বাক্ষর করলেও সেটি তার হাতে দেয়া হয়নি। ৮ জুন শাখার অফিস সহকারী জাফরের মাধ্যমে চেকটি তার ব্যাংক হিসাবে জমা করা হয়।
মামলার আর্জিতে মোশারেফ দাবি করেন, ওই দিনই ব্যাংকে লিখিত আবেদন দিয়ে কয়েকটি চেক জমা রেখে ৫০ লাখ টাকা স্থায়ী আমানত করার অনুরোধ জানান। একই সাথে তার অনুপস্থিতিতে অন্য কোনো চেকের বিপরীতে টাকা না দিতে বলেন। কিন্তু ১০ জুন ১৮ লাখ ৭৫ হাজার, ২৩ লাখ ২৫ হাজার ও ১৮ লাখ টাকার তিনটি চেকের মাধ্যমে মোট ৬০ লাখ টাকা তুলে নেয়া হয়।
মোশারেফের ভাষ্য, টাকা উত্তোলনের সময় তিনি ঢাকায় ছিলেন। ১৭ আগস্ট ব্যাংকে গিয়ে ব্যবস্থাপক সানোয়ার হোসাইনের কাছে জানতে পারেন, শরীফুল ইসলাম, ইব্রাহীম ও ইকবাল হোসেন রনি ওই টাকা তুলেছেন। তবে তাদের টাকা তোলার অনুমতি দেননি বলে দাবি করেন তিনি।
ব্যবস্থাপক সানোয়ার হোসাইন দাবি করেন, ওই তিনজনকে টাকা দেয়ার জন্য মোশারেফ একটি প্রত্যয়ন দিয়েছিলেন। তবে তিনি এর কোনো কপি দেখাতে পারেননি। একই সাথে টাকা না দেয়ার লিখিত আবেদনটি ভুলবশত তার টেবিলে এসেছিল বলে স্বীকার করেন। তার ভাষ্য, ৮ জুন আবেদনটি গ্রহণ করে স্বাক্ষর করলেও পরে তাড়াহুড়োর মধ্যে সেটি টেবিল থেকে সরিয়ে ফেলা হয়।
টাকা উত্তোলনের বিষয়ে প্রতিকার চেয়ে মোশারেফ ৫ জুলাই পটুয়াখালীর সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলা করেন। এতে খালিদ, ব্যাংক ব্যবস্থাপক ও শরীফুলকে আসামি করা হয়। আইনজীবী কেএম রেজাউল করিম অভি বলেন, টাকা ফেরত দেয়ার আশ্বাসে প্রথম মামলাটি প্রত্যাহার করা হয়েছিল; কিন্তু টাকা না পাওয়ায় ১৫ জুলাই একই ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে দ্বিতীয় মামলা করেন মোশারেফ।
এর এক দিন আগে ১৪ জুলাই, জেলা প্রশাসনের ভূমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তা ও সিনিয়র সহকারী কমিশনার নাছিম রেজা ব্যাংককে চিঠি দিয়ে মোশারেফের হিসাবের সব ধরনের লেনদেন বন্ধ রাখার নির্দেশ দেন। তার স্বজনদের অভিযোগ, মামলা করায় ক্ষুব্ধ হয়ে এ ব্যবস্থা নেয়া হয়। তবে অভিযোগ অস্বীকার করে নাছিম রেজা জেলা প্রশাসকের সাথে কথা বলতে বলেন।
পরে ২২ জুলাই মোশারেফের ভাগনে কাওসার হোসেনের মধ্যস্থতায় দ্বিতীয় মামলাটিও প্রত্যাহার করা হয়। কাওসারের দাবি, সব টাকা ফেরত দেয়ার প্রতিশ্রুতিতে স্থানীয়ভাবে আপসের সিদ্ধান্ত হয়েছিল। তবে এখনো টাকা ফেরত দেয়া হয়নি। মামলার সাক্ষী ও মোশারেফের প্রতিবেশী জামাল গাজী অভিযোগ করেন, মামলা প্রত্যাহারে তাকে ভয়ভীতি দেখানো হয়েছে। অন্য দিকে, আইনজীবী রেজাউল করিমের অভিযোগ, দ্বিতীয় মামলা করার পর তাকেও হুমকি দেয়া হয়।
অভিযোগের বিষয়ে খালিদ হোসাইন বলেন, জমিতে দুইজনের মালিকানা অংশ থাকায় টাকা আটকে রাখা হয়েছে। দু’টি মামলাই প্রত্যাহার হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি। শরীফুল ইসলাম বলেন, ভুল বোঝাবুঝির কারণে মামলা হয়েছিল, পরে তা প্রত্যাহার করা হয়েছে। টাকা উত্তোলনের বিষয়ে বিস্তারিত বলতে তিনি সাক্ষাতে কথা বলার প্রস্তাব দেন।
বরিশাল বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ের সহকারী কমিশনার মারযুক রহমান রিফাত বলেন, ঘটনার তদন্ত শেষ হয়েছে। শিগগিরই বিভাগীয় কমিশনারের কাছে প্রতিবেদন জমা দেয়া হবে।
পটুয়াখালীর জেলা প্রশাসক চৌধুরী আশরাফুল করিম বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির অর্থ আত্মসাতের সুযোগ নেই। বিষয়টি তদন্তাধীন; অভিযোগ প্রমাণিত হলে ব্যবস্থা নেয়া হবে। বিভাগীয় কমিশনার খলিল আহমেদ ঢাকায় অবস্থান করায় তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

Advertisement