বেস-লোড বিদ্যুতের দায়িত্ব বিপিডিবিকেই নিতে হবে
বেস-লোড বিদ্যুতের দায়িত্ব বিপিডিবিকেই নিতে হবে।

 আশরাফুল ইসলাম

Advertisement

দেশের অন্যতম শিল্প উদ্যোক্তা ও বিদ্যুৎ খাতের বিশেষজ্ঞ জাভেদ হোসেন বলেছেন, দেশের বিদ্যুৎ নিরাপত্তা এমন একটি ব্যবস্থার ওপর দাঁড়াতে পারে না, যেখানে আমরা প্রয়োজনের চেয়ে বেশি বিদ্যুৎকেন্দ্র ‘ভাড়া’ করি, অথচ প্রয়োজনের সময় জ্বালানি বা বৈদেশিক মুদ্রার অভাবে সেই বিদ্যুৎ পাই না।
তিনি উল্লেখ করেন, বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতের প্রধান সমস্যা এক দিকে অতিরিক্ত স্থাপিত ক্ষমতা, অন্য দিকে আমদানিনির্ভর জ্বালানি ও ডলারভিত্তিক চুক্তি। বিদ্যুৎ না নিয়েও ক্যাপাসিটি পেমেন্ট দিতে হচ্ছে, অথচ গ্যাস ও এলএনজি সঙ্কটে অনেক কেন্দ্র পূর্ণ ক্ষমতায় চলছে না। ফলে বিপুল বিনিয়োগের পরও লোডশেডিং হচ্ছে।
তার প্রস্তাব, বেস-লোড বিদ্যুতের দায়িত্ব স্পষ্টভাবে বিপিডিবি- কে দিতে হবে এবং প্রায় ১৩ হাজার মেগাওয়াট নির্ভরযোগ্য বেস-লোড সক্ষমতাকে পরিকল্পনার বেঞ্চমার্ক হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে।
দৈনিক নয়া দিগন্তের সাথে এক সাক্ষাৎকারে তিনি এ কথা বলেন। নিচে তার সাক্ষাৎকারের বিস্তারিত তুলে ধরা হলো-
প্রশ্ন : বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতের বর্তমান সঙ্কটকে আপনি কিভাবে দেখছেন?
জাভেদ হোসেন : বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতের মূল সমস্যা এখন একই সাথে দু’টি-এক দিকে অতিরিক্ত স্থাপিত ক্ষমতা, অন্য দিকে আমদানিনির্ভর জ্বালানি। গত এক দশকে আমরা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি সক্ষমতা তৈরি করেছি, কিন্তু সে সক্ষমতার বড় অংশের জন্য বিদ্যুৎ উৎপাদন না করেও ক্যাপাসিটি পেমেন্ট দিতে হচ্ছে। আবার অনেক চুক্তির ব্যয় ডলারের সাথে যুক্ত। ফলে বিদ্যুৎ না নিয়েও অর্থ দিতে হচ্ছে এবং ডলারের দাম বাড়লে সে দায় টাকায় আরো বেড়ে যায়।
একটি উদাহরণ দিলে বিষয়টি পরিষ্কার হবে। জরুরি প্রয়োজনে একটি পরিবার একটি বাড়ি ভাড়া নিতে পারে। কিন্তু একই পরিবারের জন্য পাঁচটি বাড়ি ভাড়া নিলে সেটি আর যৌক্তিক থাকে না; বরং আর্থিক বিপর্যয় ডেকে আনে। গত এক দশকে বাংলাদেশ অনেকটাই সেই পরিস্থিতিতে গেছে।
প্রশ্ন : বর্তমানে দেশে বিদ্যুৎ সক্ষমতা কতটা অতিরিক্ত?
জাভেদ হোসেন : ২০২৬ সালের মে মাসে আমদানিসহ বাংলাদেশের গ্রিড-সংযুক্ত বিদ্যুৎ সক্ষমতা ছিল প্রায় ২৮ হাজার ৯১৯ মেগাওয়াট। পাওয়ার ডভিশনের সেপ্টেম্বরের হিসেবে সর্বোচ্চ উৎপাদন ছিল ১৭ হাজার ২০১ মেগাওয়াট-এটি সর্বোচ্চ উৎপাদনের হিসাব, সর্বোচ্চ চাহিদার নয়। আবার পাওয়ার গ্রিডের ঘণ্টাওয়ারি তথ্য বলছে, ১০ সেপ্টেম্বর বেলা ৩টায় তিন হাজার ৫৫৭ মেগাওয়াট লোডশেডিং ছিল।
অর্থাৎ কাগজে-কলমে সক্ষমতা থাকলেই গ্রাহকের ঘরে বিদ্যুৎ নিশ্চিত হয় না। সক্ষমতা, জ্বালানি, অর্থায়ন, গ্রিড এবং সঠিক সময়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা-সবগুলো একসাথে থাকতে হবে।
প্রশ্ন : তাহলে বিদ্যুৎ খাতের মূল দুর্বলতা কোথায়?
জাভেদ হোসেন : অতিরিক্ত সক্ষমতা এবং জ্বালানি আমদানিনির্ভরতা-দুটোই বড় দুর্বলতা। আইইইএফএ-এর হিসাবে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশের রিজার্ভ মার্জিন ৬১ দশমিক ৩ শতাংশ; ডিরেটেড সক্ষমতা ধরে ৫৮ দশমিক ৬ শতাংশ। তবে এগুলো ঐতিহাসিক হিসাব, আজকের দিনে জ্বালানিসম্পন্ন বাস্তব রিজার্ভের পরিমাপ নয়।
অন্য দিকে প্রাথমিক জ্বালানির আমদানিনির্ভরতা ২০২০-২১ অর্থবছরের ৪৭ দশমিক ৭ শতাংশ থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৬২ দশমিক ৫ শতাংশে উঠেছে। একই সময়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের গড় ব্যয় ৮৩ শতাংশ বেড়েছে।
জিরো কার্বন অ্যানালিটিক্সের একটি শর্তসাপেক্ষ হিসাবে বলা হয়েছে, বর্তমান বছরের গড় আন্তর্জাতিক মূল্য বজায় থাকলে ২০২৬ সালে বাংলাদেশের জীবাশ্ম জ্বালানি আমদানি ব্যয় ২০২৫ সালের তুলনায় ৩০ শতাংশ বা প্রায় ২ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার বাড়তে পারে। এই ধরনের পূর্বাভাস অবশ্য আন্তর্জাতিক বাজারের ওপর নির্ভরশীল।
প্রশ্ন : ক্যাপাসিটি পেমেন্টকে আপনি কতটা বড় বোঝা মনে করেন?
জাভেদ হোসেন : এটি বড় বোঝা। ২০২৬ সালের জুনের একটি প্রতিবেদনে বিইআরসির মূল্যায়ন উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে সামগ্রিক ক্যাপাসিটি পেমেন্ট ও রেন্টাল চার্জ প্রায় ৫২ হাজার ৬০৮ কোটি টাকায় উঠতে পারে, যেখানে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের হিসাব ছিল প্রায় ৪৮ হাজার ২৬০ কোটি টাকা।
তবে এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি; এটি বেসরকারি ও রেন্টাল কেন্দ্রকে দেওয়া অর্থের হিসাবমাত্র নয়; এটি অপেক্ষাকৃত বিস্তৃত মোট হিসাব। আবার এগুলো অর্থবছর শেষে অডিট করা প্রকৃত ব্যয় নয়-প্রাক্কলন।
২০২৪-২৫ অর্থবছরে সংশোধিত বিদ্যুৎ ভর্তুকি বাজেট ছিল ৬২ হাজার কোটি টাকা। একই বছরে বিপিডিপির ৫৫ হাজার ৬৬০ কোটি টাকার রাজস্ব ঘাটতি ছিল ভর্তুকির আগের আলাদা হিসাব। এ দুই অঙ্ককে যোগ করে অতিরিক্ত ক্ষতি হিসেবে দেখানো ঠিক হবে না।
প্রশ্ন : ডলারের বিনিময় হার এ সঙ্কটকে কতটা বাড়িয়ে দিচ্ছে?
জাভেদ হোসেন : অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণভাবে বাড়াচ্ছে। এপ্রিল ২০২৬-এ বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর পাওনা পরিশোধে প্রায় ৩০০ দিনের বিলম্বে খবর এসেছে। ৬ অক্টোবর বাংলাদেশ ব্যাংকের রেফারেন্স রেট ছিল প্রতি ডলারে ১২৩ দশমিক ০২২৭ টাকা। যদি উদাহরণ হিসেবে ৮০ টাকা ডলার ধরে কোনো দায়ের হিসাব করা হয়, তবে একই ডলারের দায় টাকায় প্রায় ৫৩৮ শতাংশ বেশি হয়ে যায়।
তাই ঋণনির্ভর দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি এবং বৈদেশিক মুদ্রনির্ভর দায়কে জাতীয় বেস-লোড নিরাপত্তার মূল ভিত্তি করা যায় না।
প্রশ্ন : কিছু এইচএফওভিত্তিক আইপিপির  সাথে বিপিডিপির চুক্তি নিয়ে যে বিরোধের কথা বলা হচ্ছে, সেটি কিভাবে দেখছেন?
জাভেদ হোসেন : বিপিডিপির অভ্যন্তরীণ সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, কয়েকটি এইচএফওভিত্তিক আইপিপি তাদের পাওয়ার পারচেজ এগ্রিমেন্টে থাকা সাসপেনশন ক্লজ প্রয়োগ করেছে। বিপিডিপির সাথে তাদের এ নিয়ে বিরোধ তৈরি হয়েছে।
কিছু সূত্রের দাবি, সংশ্লিষ্ট আইপিপি যদি চুক্তিতে নির্ধারিত পদ্ধতি অনুসরণ না করে সাসপেনশন ক্লজ প্রয়োগ করে থাকে, তাহলে আলোচনার মাধ্যমে চুক্তি বাতিলের সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে এটি একটি বিতর্কিত অবস্থান; চুক্তির আইনি ব্যাখ্যা এবং উভয় পক্ষের অবস্থান বিবেচনা করেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
আমার দৃষ্টিতে অতিরিক্ত ক্যাপাসিটি পেমেন্ট কমানোর একটি উপায় হতে পারে-যে আইপিপি সত্যিই সিস্টেমের জন্য প্রয়োজনীয়, সীমিত সংখ্যক এমন কেন্দ্র রাখা এবং চাহিদা, জ্বালানি ও রক্ষণাবেক্ষণ পরিস্থিতি অনুমতি দিলে তাদের সক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার করা। আর উদ্বৃত্ত কেন্দ্রগুলোর চুক্তি পারস্পরিক সমঝোতার মাধ্যমে শেষ করা।
প্রশ্ন : অর্থাৎ আপনি আইপিপি পুরোপুরি বাতিলের কথা বলছেন না?
জাভেদ হোসেন : না। লক্ষ্য হওয়া উচিত প্রয়োজনীয় কেন্দ্রগুলোকে কাজে লাগানো এবং অপ্রয়োজনীয় সক্ষমতার পুনরাবৃত্ত ব্যয় কমানো। বিদ্যুৎ খাতে রাষ্ট্রের অর্থ এমন সক্ষমতার জন্য দেয়া উচিত নয়, যার ব্যবহারের প্রয়োজনই নেই।
প্রশ্ন : জ্বালানি সঙ্কট বিদ্যুৎ উৎপাদনকে কতটা বাধাগ্রস্ত করছে?
জাভেদ হোসেন : এটি দ্বিতীয় বড় দুর্বলতা। আইইইএফএ’র হিসাবে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বেসরকারি ফার্মস অয়েলভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় গড়ে প্রতি ইউনিট প্রায় ২৭ টাকা ৫০ পয়সা। এর মধ্যে ক্যাপাসিটি পেমেন্টের আনুমানিক অংশ ছিল ৯ টাকা ৫০ পয়সা। ওই ৯ টাকা ৫০ পয়সাকে আবার ২৭ টাকা ৫০ পয়সার সাথে আলাদা করে যোগ করা যাবে না; এটি মোট ব্যয়ের একটি অংশ।
গ্যাসের ক্ষেত্রেও একই সমস্যা। এপ্রিল ২০২৬-এর গ্রীষ্মকালীন পরিকল্পনা অনুযায়ী, বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে গ্যাস সরবরাহ ছিল দৈনিক প্রায় ৯০০ মিলিয়ন ঘনফুট, যেখানে ১২ হাজার ২০৪ মেগাওয়াট গ্যাসভিত্তিক সক্ষমতা চালাতে প্রয়োজন ছিল প্রায় দুই হাজার ৫২৪ মিলিয়ন ঘনফুট। ফলে সম্ভাব্য উৎপাদন প্রায় পাঁচ হাজার ২০০ মেগাওয়াটে সীমাবদ্ধ হওয়ার কথা ছিল। এগুলো পরিকল্পনাভিত্তিক তথ্য, বর্তমান দিনের অপারেটিং স্ন্যাপশট নয়।
প্রশ্ন : এলএনজি আমদানির ওপর নির্ভরতা কি ভবিষ্যতে আরো বড় ঝুঁঁকি তৈরি করবে?
জাভেদ হোসেন : অবশ্যই। বছরে প্রায় ৭৩০ বিলিয়ন ফুটকুবিক এলএনজি আমদানির প্রয়োজন হলে প্রতি এমএমবিটিইউ ১২ ডলার দরে ব্যয় প্রায় ৮ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার হতে পারে। দাম ২০ ডলারে উঠলে তা ১৪ বিলিয়ন ডলারের বেশি হতে পারে।
জুলাইয়ে পেট্রোবাংলার পক্ষ থেকে এসঅ্যান্ডপি গ্লোবালকে বলা হয়েছিল, ২০২৬ সালে কাতার এনার্জির  পরিকল্পিত সরবরাহ প্রায় ৪০ কার্গো থেকে ২০ কার্গোতে নেমে আসতে পারে। আবার ২৩ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ নভেম্বরের জন্য কাতার এনার্জি ট্রেডিংয়ের আরো দু’টি কার্গো অনুমোদন করেছে। তবে অনুমোদন পাওয়া মানেই বাস্তবে কার্গো সরবরাহ নিশ্চিত হওয়া এক বিষয় নয়।
সুতরাং, শুধু ক্যাপাসিটি কন্ট্রাক্ট করলেই জ্বালানি, শিপিং সুবিধা কিংবা বৈদেশিক মুদ্রা নিশ্চিত হয় না।
প্রশ্ন : ভারতের বিদ্যুৎ আমদানি কি এ ঘাটতি পূরণ করতে পারে না?
জাভেদ হোসেন : ভারত বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার এবং আন্তঃসংযোগও গুরুত্বপূর্ণ। তবে একক কোনো সরবরাহকারীর ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা ঝুঁঁকিপূর্ণ।
বিপিডিপির হিসাবে আদানির গোড্ডা থেকে এক হাজার ৪৯৬ মেগাওয়াট এবং ভেড়ামারা ও ত্রিপুরা দিয়ে এক হাজার ১৬০ মেগাওয়াট, এর সাথে নেপাল থেকে ৪০ মেগাওয়াট-মোট আমদানি সক্ষমতা প্রায় দুই হাজার ৬৯৬ মেগাওয়াট। মে মাসের গ্রিড সক্ষমতার তুলনায় ভারতের ২ হাজার ৬৫৬ মেগাওয়াট প্রায় ৯ শতাংশ।
জুলাইয়ের একটি প্রতিবেদনে বিপিডিপি চেয়ারম্যানের বক্তব্য উদ্ধৃত করে বলা হয়েছিল, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে আদানি থেকে বিদ্যুৎ কেনার ব্যয় ছিল প্রতি ইউনিট ১৩ টাকা ৮৩ পয়সা। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৫ হাজার ৫৮৭ কোটি টাকার ভর্তুকি চাওয়া হয়েছে বলেও রিপোর্ট করা হয়। তবে চাওয়া অর্থকে অনুমোদিত অর্থ হিসেবে দেখা যাবে না।
২০২৪ সালের শেষ দিকে বকেয়া নিয়ে বিরোধের মধ্যে আদানি সরবরাহ অর্ধেকে নামিয়ে দিয়েছিল বলে খবর প্রকাশিত হয়েছিল। তাই ভারতের সাথে আন্তঃসংযোগ থাকা জরুরি হলেও হাসপাতালসহ জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার বিদ্যুৎ সরবরাহকে কোনো একজন সরবরাহকারীর সাথে বিরোধের ওপর নির্ভরশীল রাখা উচিত নয়।
প্রশ্ন : নবায়নযোগ্য জ্বালানি কি এ পরিস্থিতি বদলাতে পারে?
জাভেদ হোসেন : অবশ্যই এবং এখানে ইতিবাচক কিছু উদ্যোগ আছে। সরকারের সেপ্টেম্বরের ঘোষণায় ২০৩০ সালের জন্য পাঁচ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট রুফটপ সোলার, চার হাজার ৫০০ মেগাওয়াট গ্রাউন্ড-মাউন্টেড সোলার এবং অন্যান্য নবায়নযোগ্য উৎস থেকে ৪৫০-৫৫০ মেগাওয়াটের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। মোট লক্ষ্য প্রায় ১০ হাজার ৪৫০ থেকে ১০ হাজার ৫৫০ মেগাওয়াট।
সেপ্টেম্বরের ঘোষণায় যোগ্য সোলার ইকুইপমেন্ট ও কম্পোনেন্টের জন্য ১৮০ দিনের জন্য শর্তসাপেক্ষে মোট ১ শতাংশ আমদানি কর সুবিধার কথাও বলা হয়েছে।
তবে সৌরবিদ্যুৎ বেস-লোডের বিকল্প হিসেবে একা যথেষ্ট নয়। স্টোরেজ, গ্রিড ব্যবস্থাপনা এবং অন্যান্য নির্ভরযোগ্য উৎসের সঙ্গে এর সমন্বয় প্রয়োজন।
প্রশ্ন : রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রকে আপনি কোথায় রাখছেন?
জাভেদ হোসেন : রূপপুর বাংলাদেশের জন্য সম্ভাব্য বড় কন্টিনিউয়াস পাওয়ার সোর্স। দু’টি ইউনিটের প্রতিটির সক্ষমতা এক হাজার ২০০ মেগাওয়াট। প্রথম ইউনিটের ফুয়েল লোডিং শুরু হয়েছে ২৮ এপ্রিল। ৩০ সেপ্টেম্বর প্রকল্প কর্মীরা সেফটি-ভ্যালভ প্রেশার টেস্ট সফল হওয়ার কথা জানিয়েছেন এবং ৩ অক্টোবর পারমাণবিক জ্বালানির একটি চালান সাইটে পৌঁছেছে।
তবে এগুলো কমার্শিয়াল গ্রিড অপারেশন শুরু হওয়ার প্রমাণ নয়। একইভাবে প্রকল্পের ১২ দশমিক ৬৫ বিলিয়ন ডলারের কনস্ট্রাকশন কন্ট্রাক্ট এবং ২০১৬ সালের ১১ দশমিক ৩৮ বিলিয়ন ডলারের রাশিয়ান ক্রেডিট এগ্রিমেন্ট-দু’টি আলাদা বিষয়।
রূপপুর চালু হলে তা বাংলাদেশের বেস-লোড ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আনতে পারে। কিন্তু তার জন্য গ্রিড প্রস্তুত করা, রক্ষণাবেক্ষণ সক্ষমতা, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং স্বাধীন নিউক্লিয়ার রেগুলেশন নিশ্চিত করতে হবে।
প্রশ্ন : তাহলে আপনার প্রস্তাবিত বিদ্যুৎ কাঠামো কী?
জাভেদ হোসেন : আমার মতে বিপিডিপিকে বেস-লোড বিদ্যুতের জন্য একটি স্পষ্ট স্ট্যাটুটরি রেসপনসিবিলিটি দিতে হবে। পরিকল্পনার প্রাথমিক বেঞ্চমার্ক হিসেবে আমি প্রায় ১৩ হাজার মেগাওয়াট ডিপেন্ডেবল বেস-লোড ক্যাপাসিটি বিবেচনা করার কথা বলছি। তবে এটি চূড়ান্ত সংখ্যা নয়; ঘণ্টাওয়ারি চাহিদা, ফোর্চড আউটটেজ, রক্ষণাবেক্ষণ এবং রিজার্ভ রিকোয়ারমেন্ট বিশ্লেষণ করে এটি নির্ধারণ করতে হবে।
এ ব্যাকবোন-এ থাকবে নিউক্লিয়ার, কয়লা এবং দেশীয় গ্যাস।
আমি কোর ফ্লিটের মালিকানায় বিপিডিপিকে অগ্রাধিকার দিই। তবে প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্বের পার্থক্য গুরুত্বপূর্ণ। রূপপুরের ডেসিগনেটেড অপারেটর হলো এনপিসিবিএল, আর পাওয়ার গ্রিডের এনএলডিসির দায়িত্ব সিস্টেম অপারেশন। ফলে যেকোনো প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারে স্পেশালিস্ট অপারেশন এবং ইন্ডিপেন্ডেন্ট নিউক্লিয়ার রেগুলেশন অক্ষুণœ রাখতে হবে।
প্রশ্ন : নতুন বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রের ক্ষেত্রে আপনার অবস্থান কী?
জাভেদ হোসেন : নতুন প্রাইভেট ক্যাপাসিটি মূলত পিকিং বা মার্চেন্ট সেলসের জন্য হওয়া উচিত। নতুন করে দীর্ঘমেয়াদি ক্যাপাসিটি পেমেন্ট-নির্ভর চুক্তি না করাই ভালো। সম্ভব হলে চুক্তির ঝুঁঁকি টাকার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে।
আমাদের মূলনীতি হওয়া উচিত-আগে ফুয়েল ফাইন্যান্সিং, পরে ক্যাপাসিটি পেমেন্ট। জ্বালানি নেই, ডলার নেই, অথচ ক্যাপাসিটি পেমেন্ট দিতে হচ্ছে-এটি টেকসই মডেল নয়।
প্রশ্ন : পাকিস্তানের উদাহরণ কি বাংলাদেশের জন্য প্রাসঙ্গিক?
জাভেদ হোসেন : কিছুটা। পাকিস্তান যদি এইচএফও-ভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের নির্ভরতা প্রায় ৬০ শতাংশ থেকে ১ দশমিক ৯ শতাংশে নামিয়ে আনতে পারে, তবে বাংলাদেশও এইচএফও-নির্ভরতা অনেক কমাতে পারে। আমাদেরও সিস্টেমকে কম খরচের, নির্ভরযোগ্য এবং জ্বালানি-নিরাপদ উৎসের দিকে নিতে হবে।
প্রশ্ন : কিন্তু বিপিডিপি নিজেই তো আর্থিক সঙ্কটে আছে। তাহলে এত বড় দায়িত্ব বিপিডিপিকে দেয়া কতটা বাস্তবসম্মত?
জাভেদ হোসেন : এটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আপত্তি; কিন্তু বিপিডিপির আর্থিক সঙ্কটকে দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার কারণ হিসেবে দেখলে সমস্যার সমাধান হবে না; বরং সংস্কার ও অর্থায়নের প্রয়োজনীয়তা প্রমাণিত হয়।
বিপিডিপিকে দায়িত্ব দিলে সে দায়িত্বের সাথে অর্থও দিতে হবে। ট্যারিফকে ব্যয়ের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে হবে, ডিসপাচ ব্যবস্থাকে স্বচ্ছ করতে হবে এবং গ্রিডকে নতুন জেনারেশন গ্রহণের উপযোগী করতে হবে।
একই সাথে আইএমএফের সঙ্গে বাংলাদেশের চলমান আলোচনা এবং সম্ভাব্য অর্থায়নের বিষয়েও ফিসকাল ডিসিপ্লিন বজায় রাখা জরুরি।
প্রশ্ন : শেষ পর্যন্ত আপনার মূল বক্তব্য কী?
জাভেদ হোসেন : প্রশ্নটা খুব সহজ-গ্রীষ্মের রাতে ভোর ৩টায় যখন দেশের হাসপাতাল, শিল্প, পানি সরবরাহ এবং সাধারণ মানুষের বিদ্যুৎ দরকার হবে, তখন সেই বেস-লোডের জন্য দায়ী কে?
দায়িত্ব এখন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ছড়িয়ে আছে। তবে ডিপেন্ডেবল সরবরাহের জন্য জবাবদিহি আরো স্পষ্ট হওয়া দরকার।
আমার প্রস্তাব হলো-বিপিডিপিকে জাতীয় বেস-লোড নিরাপত্তার মূল দায়িত্ব দিতে হবে। প্রয়োজনীয় কোর ফ্লিট রাষ্ট্রীয় মালিকানায় রাখতে হবে। অপ্রয়োজনীয় ক্যাপাসিটি পেমেন্ট কমাতে হবে। ফুয়েল সিকিউরিটি আগে নিশ্চিত করতে হবে। নতুন প্রাইভেট ক্যাপাসিটি সীমিত রাখতে হবে। নিউক্লিয়ার, কয়লা এবং দেশীয় গ্যাস হবে ব্যাকবোন; নবায়নযোগ্য হবে ক্রমান্বয়ে কমপ্লিমেন্টারি সোর্স।
শেষ কথা হলো-বাংলাদেশের বিদ্যুৎ নিরাপত্তা এমন একটি ব্যবস্থার ওপর দাঁড়াতে পারে না, যেখানে আমরা প্রয়োজনের চেয়ে বেশি বিদ্যুৎকেন্দ্র ‘ভাড়া’ করি, অথচ প্রয়োজনের সময় জ্বালানি বা বৈদেশিক মুদ্রার অভাবে সেই বিদ্যুৎ পাই না।
দেশের বেস-লোড বিদ্যুতের দায়িত্ব বিপিডিপিকে নিতে হবে। বাংলাদেশকে অন্যের বাড়ি ভাড়া করে বিদ্যুৎ নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পরিবর্তে নিজের প্রয়োজনীয় ‘বাড়ি’ তৈরি ও পরিচালনা করতে হবে।