এনসিটি ডিপি ওয়ার্ল্ডে
চট্টগ্রাম বন্দরের নিউ মুরিং কনটেইনার টার্মিনাল পরিচালনার জন্য ইউএইর ডিপি ওয়ার্ল্ডের সাথে চুক্তি সই অনুষ্ঠানে নৌপরিবহনমন্ত্রীসহ অতিথিরা : নয়া দিগন্ত।

 নিজস্ব প্রতিবেদক

Advertisement

চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) আধুনিকায়ন ও পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই সরকারের মালিকানাধীন বৈশ্বিক বন্দর ও লজিস্টিকস অপারেটর ডিপি ওয়ার্ল্ড। সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের (পিপিপি) আওতায় ১৫ বছরের জন্য প্রতিষ্ঠানটিকে এ পরিচালন স্বত্ব দেয়া হয়েছে। তবে টার্মিনালের জমি, অবকাঠামো ও মূল সম্পদের মালিকানা এবং নিয়ন্ত্রণ আগের মতোই চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের (চবক) হাতে থাকবে।
গতকাল বৃহস্পতিবার ঢাকায় ইনভেস্ট বাংলাদেশের অডিটরিয়ামে এ সংক্রান্ত অপারেশনাল কনসেশন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল মো: মনিরুজ্জামান এবং ডিপি ওয়ার্ল্ডের নির্বাহী চেয়ারম্যান এসা কাজিম নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানের পক্ষে চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন।
চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম, নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী মো. রাজিব আহসান, বাংলাদেশে নিযুক্ত সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাষ্ট্রদূত আবদুল্লাহ আলী আল হুমুদি এবং ইনভেস্ট বাংলাদেশের চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরীসহ সরকারের প্রতিনিধি, বেসরকারি খাতের নেতারা ও গণমাধ্যমকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।
১৫ বছরে ১,০০০ কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগ
চুক্তির আওতায় এনসিটির আধুনিকায়ন, নতুন যন্ত্রপাতি সংযোজন ও প্রযুক্তি ব্যবস্থার উন্নয়নে প্রথম ১০ বছরে এক হাজর কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগ করবে ডিপি ওয়ার্ল্ড। এ ছাড়া চুক্তির শুরুতেই প্রায় ৬০০ কোটি টাকা অগ্রিম ফি দেয়ার প্রতিশ্রুতি রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির।
এর পাশাপাশি চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ রাজস্বের অংশ এবং নির্ধারিত বার্ষিক ফি পাবে। অর্থাৎ টার্মিনাল পরিচালনার মাধ্যমে এক দিকে আধুনিকায়ন ও সক্ষমতা বাড়ানোর বিনিয়োগ আসবে, অন্য দিকে বন্দর কর্তৃপক্ষের রাজস্ব আয়ও অব্যাহত থাকবে।
চুক্তিতে পরিচালনার মান নিশ্চিত করতে একাধিক মূল কর্মসম্পাদন সূচক (কেপিআই) নির্ধারণ করা হয়েছে। অপারেটরকে নিয়মিত কার্যক্রমের প্রতিবেদন দিতে হবে। নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ব্যর্থ হলে আর্থিক জরিমানার ব্যবস্থাও রাখা  হয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ মনিটরিং, নিরীক্ষা ও নির্ধারিত প্রতিবেদন পর্যালোচনার মাধ্যমে অপারেটরের কার্যক্রম তদারকি করবে।
নিরাপত্তা ও সার্বভৌম নিয়ন্ত্রণ থাকবে সরকারের হাতে চুক্তির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে- ডিপি ওয়ার্ল্ড কেবল টার্মিনাল পরিচালনার অধিকার পাবে, মালিকানা নয়। এনসিটির জমি, অবকাঠামো ও মূল সম্পদ চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ তথা বাংলাদেশ সরকারের মালিকানাতেই থাকবে।
নৌবাহিনী, কোস্টগার্ড, কাস্টমস, ইমিগ্রেশনসহ রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর বিদ্যমান দায়িত্ব ও নিরাপত্তা প্রটোকলও বহাল থাকবে। ফলে বাণিজ্যিক পরিচালনায় আন্তর্জাতিক অপারেটর যুক্ত হলেও বন্দরের সার্বভৌম নিয়ন্ত্রণ সরকারের কাছেই থাকবে বলে জানিয়েছে সরকার।
৯ দিনের বেশি কনটেইনার অবস্থানকাল
চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তা থেকেই এনসিটি পরিচালনায় আন্তর্জাতিক অপারেটর যুক্ত করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। দেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের প্রায় ৯২ শতাংশ চট্টগ্রাম বন্দরের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু আন্তর্জাতিক বন্দর দক্ষতার সূচকে বাংলাদেশের প্রধান সমুদ্রবন্দরের অবস্থান এখনো অনেক নিচে। বৈশ্বিক বন্দর দক্ষতা সূচক-২০২৫ অনুযায়ী বিশ্বের ৪০০টি কনটেইনার বন্দরের মধ্যে চট্টগ্রাম বন্দরের অবস্থান ৩৬৪তম। দীর্ঘ কনটেইনার অবস্থানকাল, জাহাজের দীর্ঘ বন্দর-অবস্থানকাল, যন্ত্রপাতির কার্যকারিতা এবং সামগ্রিক উৎপাদনশীলতার ঘাটতিকে এর অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
চট্টগ্রাম বন্দর ও এনসিটিতে একটি কনটেইনারের অবস্থানকাল ৯ দিনেরও বেশি। অথচ তুলনীয় দক্ষ বন্দরগুলোতে এ সময় দুই দিনের কম। একইভাবে একটি জাহাজকে চট্টগ্রাম বন্দরে আড়াই দিনের বেশি সময় অবস্থান করতে হয়। আন্তর্জাতিক মানদে  দক্ষ বন্দরে এই সময় সাধারণত ১৫ থেকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে।
ফলে বন্দর ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা বাড়াতে পারলে আমদানি-রফতানি পণ্য দ্রুত খালাস, পরিবহন ব্যয় কমানো এবং ব্যবসার প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।
বিশ্বব্যাংকের তথ্য উদ্ধৃত করে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, কনটেইনারের অবস্থানকাল মাত্র এক দিন কমানো গেলে বাংলাদেশের রফতানি প্রায় ৭ দশমিক ৪ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। বর্তমান অদক্ষতার কারণে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রতিদিন প্রায় ১০ কোটি টাকা, অর্থাৎ বছরে তিন হাজার কোটি টাকার বেশি ক্ষতি হচ্ছে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।
বন্দরের ৪৪ শতাংশ কনটেইনার হ্যান্ডলিং এনসিটিতে
২০০৭ সালে কার্যক্রম শুরু করা নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরের মোট কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের প্রায় ৪৪ শতাংশ পরিচালনা করে। ফলে এনসিটির পরিচালন দক্ষতা বৃদ্ধি পুরো বন্দরের সক্ষমতার ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরে চারটি কনটেইনার হ্যান্ডলিং স্থাপনা চালু রয়েছে। এনসিটির পাশাপাশি ভবিষ্যৎ সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য নতুন টার্মিনাল উন্নয়নের কাজও চলছে।
২০২৫ সালের জুলাই থেকে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর নিয়ন্ত্রণাধীন চিটাগং ড্রাই ডক লিমিটেড (সিডিডিএল) এনসিটির ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পালন করছে। এ ছাড়া পঞ্চম কনটেইনার টার্মিনাল হিসেবে লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনাল উন্নয়ন করছে ডেনমার্কভিত্তিক বৈশ্বিক অপারেটর এপিএম টার্মিনালস। টার্মিনালটি ২০৩০ সাল নাগাদ প্রস্তুত হওয়ার কথা রয়েছে।
বৈশ্বিক নেটওয়ার্কে যুক্ত হবে এনসিটি
ডিপি ওয়ার্ল্ড বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ বন্দর ও লজিস্টিকস অপারেটর। ৪০টির বেশি দেশে প্রতিষ্ঠানটির ৮০টির বেশি সামুদ্রিক ও অভ্যন্তরীণ টার্মিনাল রয়েছে। বৈশ্বিক কনটেইনার পরিবহনের প্রায় ১০ শতাংশ তাদের নেটওয়ার্কের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। ভারত, পাকিস্তান, সৌদি আরব, মিসর, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশে বন্দর পরিচালনার অভিজ্ঞতা রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির।
চুক্তি সম্পর্কে ডিপি ওয়ার্ল্ডের নির্বাহী চেয়ারম্যান এসা কাজিম বলেন, বাংলাদেশের বাণিজ্য ও উৎপাদন খাতের গুরুত্ব ক্রমেই বাড়ছে। এ অংশীদারত্বের মাধ্যমে এনসিটিকে ডিপি ওয়ার্ল্ডের বৈশ্বিক বন্দর, লজিস্টিকস অবকাঠামো ও সরবরাহব্যবস্থার নেটওয়ার্কের সাথে যুক্ত করা হবে। এতে আন্তর্জাতিক বাজারের সাথে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক সংযোগ আরো সহজ ও নিরবচ্ছিন্ন হবে।
তিনি বলেন, ডিপি ওয়ার্ল্ডের অভিজ্ঞতা, প্রযুক্তি ও সরবরাহব্যবস্থার প্রতিটি ধাপে লজিস্টিকস সেবা দেয়ার সক্ষমতা কাজে লাগিয়ে বাণিজ্য সম্প্রসারণ, বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং বাংলাদেশের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করা হবে।
নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বলেন, বিদ্যমান গুরুত্বপূর্ণ সম্পদের সক্ষমতা দ্রুত বাড়ানোই সরকারের লক্ষ্য। আধুনিক যন্ত্রপাতি, ডিজিটাল ব্যবস্থা, আন্তর্জাতিক মানের ব্যবস্থাপনা এবং বৈশ্বিক লজিস্টিক সংযোগের মাধ্যমে এনসিটিকে আরো প্রতিযোগিতামূলক করা হবে। বিভিন্ন টার্মিনালে একাধিক আন্তর্জাতিক অপারেটর যুক্ত করে সেবার মান ও নির্ভরযোগ্যতা বাড়ানোর মাধ্যমে সরবরাহব্যবস্থায় স্থিতিশীলতা আনার লক্ষ্য রয়েছে সরকারের।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল মো: মনিরুজ্জামান বলেন, পিপিপির মাধ্যমে নৌ ও বাণিজ্য অবকাঠামো শক্তিশালী করার অঙ্গীকারের প্রতিফলন এই অংশীদারত্ব। চুক্তির ফলে এনসিটির পরিচালন দক্ষতা বাড়বে, লজিস্টিকসের প্রতিবন্ধকতা কমবে এবং আন্তর্জাতিক বাজারের সাথে বাংলাদেশের সংযোগ আরো শক্তিশালী হবে। ইনভেস্ট বাংলাদেশের চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী বলেন, দেশের বাণিজ্যকে বৈশ্বিক গতির সাথে তাল মিলিয়ে এগিয়ে নিতে এনসিটির পরিচালনায় ডিপি ওয়ার্ল্ডকে যুক্ত করা বড় পদক্ষেপ। বন্দরের গুরুত্বপূর্ণ এই পিপিপি উদ্যোগের মাধ্যমে দ্রুত কার্যক্রম, শক্তিশালী সংযোগ ও উন্নত সেবার মান নিশ্চিত করার প্রত্যাশা রয়েছে।
স্থানীয় কর্মসংস্থান ও দক্ষতা বৃদ্ধির প্রত্যাশা
সরকার বলছে, আন্তর্জাতিক অপারেটর যুক্ত হলেও স্থানীয় কর্মসংস্থান অব্যাহত থাকবে। একই সাথে আধুনিক প্রযুক্তি, আন্তর্জাতিক প্রশিক্ষণ এবং বৈশ্বিক ব্যবস্থাপনা পদ্ধতির মাধ্যমে বাংলাদেশের বন্দর ও লজিস্টিকস খাতের জনবলের দক্ষতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।
বিশেষ করে কনটেইনার ব্যবস্থাপনা, টার্মিনাল অপারেশন, ডিজিটাল ট্র্যাকিং, যন্ত্রপাতি পরিচালনা এবং সরবরাহব্যবস্থার সমন্বিত ব্যবস্থাপনায় আন্তর্জাতিক মানের প্রযুক্তি ও দক্ষতা স্থানান্তর হলে দীর্ঘমেয়াদে দেশের বন্দর খাত উপকৃত হতে পারে। এনসিটি চট্টগ্রাম বন্দরের মোট কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের প্রায় অর্ধেকের কাছাকাছি পরিচালনা করায় এর আধুনিকায়নকে শুধু একটি টার্মিনাল পরিচালনার পরিবর্তন হিসেবে না দেখে দেশের সামগ্রিক বাণিজ্য অবকাঠামোর সক্ষমতা বৃদ্ধির অংশ হিসেবে দেখছে সরকার। তবে চুক্তির সফলতা শেষ পর্যন্ত নির্ভর করবে নির্ধারিত বিনিয়োগ বাস্তবায়ন, কেপিআই অর্জন, কনটেইনার অবস্থানকাল কমানো এবং বন্দর কর্তৃপক্ষের কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার ওপর।