
ক্রীড়া প্রতিবেদক
মেসির বিকল্প কে? আর্জেন্টিনার নতুন প্রজন্মে কি কেউ সে শূন্যতা পূরণ করতে পারবেন? প্রশ্নটি শুনে স্কালোনির উত্তর ছিল সংক্ষিপ্ত, কিন্তু অর্থ ছিল বিশাল ‘কোথাও না।’ ‘আমি জীবনে আর কারো মধ্যে এমন আভা দেখিনি।’
মেসিকে নিয়ে স্কালোনির পথচলা শুরু হয়েছিল আর্জেন্টিনার কঠিন এক সময়ে। এরপর ধীরে ধীরে বদলে যায় দলটি। ২০২১ কোপা আমেরিকা, ২০২২ ফিনালিসিমা, ২০২২ বিশ্বকাপ ও ২০২৪ কোপা আমেরিকা- চারটি বড় শিরোপার সাক্ষী এ কোচ-অধিনায়ক জুটি। সে সাফল্যের সঙ্গীকে এবার আর ডাগআউটের সামনে দেখতে পাবেন না স্কালোনি।
একজন ছিলেন মাঠের জাদুকর, অন্যজন ডাগআউটের কারিগর! একজনের বাঁ পায়ে বদলে যেত ম্যাচের গল্প, অন্য জনের কৌশলে সে জাদু পেত দলগত রূপ। লিওনেল মেসি ও লিওনেল স্কালোনির সে জুটি আর্জেন্টিনাকে দিয়েছে চারটি বড় শিরোপা। কিন্তু বেনিনের বিপক্ষে ৩-০ গোলের জয়ের পর সে দীর্ঘ গল্পের একটি অধ্যায় শেষ হলো। মেসির বিদায়ের রাতে তাই স্কালোনির কণ্ঠে ছিল সাফল্যের স্মৃতির চেয়ে বিচ্ছেদের ভার!
সংবাদমাধ্যমের সামনে দাঁড়িয়ে আবেগ ধরে রাখতে পারেননি স্কালোনি, ‘এটা সত্যিই স্বপ্নপূরণের মতো ছিল। আমি কখনো ভাবিনি, ইতিহাসের সেরা ফুটবলারের কোচ হতে পারব। আমরা তার কাছে চিরকাল কৃতজ্ঞ থাকব। আমাদের তার সাথে থাকার সুযোগ দেয়ার জন্য।’
কথা বলতে বলতে স্কালোনির আবেগ আরো স্পষ্ট হয়ে ওঠে। মেসিকে ছাড়া আর্জেন্টিনার কথা ভাবাটাই তার কাছে কঠিন, ‘চোখে পানি আসছে, কারণ এ মুহূর্তে আমার মাথার ভেতর অনেক কিছু ঘুরছে। তাকে আর দেখতে না পাওয়াটা কষ্টের হবে।’
নতুন খেলোয়াড় আসবে, দল বদলাবে, নতুন কৌশল তৈরি হবে; কিন্তু মেসিকে পাশে পাওয়ার অনুভূতির সাথে কোনো কিছুর তুলনা করা সম্ভব নয় বলে মনে করেন স্কালোনি, ‘আমরা এখন তরুণ খেলোয়াড়দের নিয়ে কাজ করছি। এ প্রক্রিয়া চলবে; কিন্তু আপনার পাশে মেসি থাকার যে অনুভূতি, সেটার সাথে কোনো কিছুর তুলনা হয় না।’
শুধু গোল কিংবা অ্যাসিস্ট দিয়ে মেসির প্রভাব বোঝানো যায় না-স্কালোনির কথায় সেটিই যেন উঠে আসে। এমন ম্যাচ, যেখানে পরিকল্পনা আটকে গেছে, প্রতিপক্ষের রক্ষণ অটুট, সেখানেও মেসির একটি মুহূর্ত পুরো দৃশ্যপট বদলে দিতে পারত, ‘যে খেলোয়াড় তার অসাধারণ প্রতিভা দিয়ে অসম্ভব ম্যাচে জয় সম্ভব করে দিতে পারত, সে খেলোয়াড়টি এখন আর আপনার কাছে নেই।’
এ বাস্তবতার মধ্যেই এখন নতুন আর্জেন্টিনা গড়তে হবে স্কালোনিকে। মেসি নিজেও বিদায়ী বক্তব্যে সামনে কঠিন সময় আসার কথা বলেছেন। স্কালোনিও একই বাস্তবতার কথা স্বীকার করেছেন, ‘পথটা কঠিন হবে, সে নিজেও তা বলে গেছে। গত কয়েক বছরে আমরা যা অভিজ্ঞতা অর্জন করেছি, তা সাধারণ কিছু নয়; সামনে কঠিন সময়ও আসতে পারে। তবে আমরা তরুণ ও নতুন খেলোয়াড়দের নিয়ে সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রস্তুত। পাশে তাকে পাওয়ার অনুভূতি ছিল তুলনাহীন, যা ভাষায় প্রকাশ করা বা কাউকে বোঝানো খুব কঠিন। এটি উপলব্ধি করতে হয়।’
মেসিকে হারানোর পর আর্জেন্টিনা যে থেমে থাকবে না, সেটিও স্পষ্ট করেছেন স্কালোনি। নতুন খেলোয়াড়দের নিয়ে দল গড়ার কাজ চলবে। তবে সে নতুন দল যতই শক্তিশালী হোক, মেসির রেখে যাওয়া শূন্যতা অন্যভাবে পূরণ করতে হবে, ‘আমরা যতই নতুন খেলোয়াড়দের নিয়ে একটি দুর্দান্ত দল গড়ে তুলি না কেন, মেসির সেই আভা আর কেউ কখনো দিতে পারবে না। সে যা তৈরি করত, তা আর থাকবে না। আমরা নতুন উপায় খুঁজব, কিন্তু সে বিশেষ অনুভূতি আর পাওয়া যাবে না। তাকে পাওয়াটা ছিল অবিশ্বাস্য, এখন তাকে ছাড়াই আমাদের সামনে এগিয়ে যেতে হবে।’
মেসির বিদায়ের সাথে তাই শুধু একজন ফুটবলারের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের সমাপ্তি ঘটেনি। স্কালোনির জন্যও শেষ হয়েছে এমন এক অধ্যায়, যেখানে কোচ ও অধিনায়ক মিলে আর্জেন্টিনার ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সফল সময় তৈরি করেছেন।
পুহাতোর সন্তান স্কালোনি, জাতীয় দলের সাথে যার চুক্তির মেয়াদ ডিসেম্বরে শেষ হতে চলেছে। তিনি বলেন, ‘সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে আমি কোচিং চালিয়ে যাবো এবং মেসি যে ঐতিহ্য রেখে গেছেন তা অসাধারণ। আমি এটিকেই সব সময় মনে রাখব। মাঠের ভেতরে এমন কিছু আর কখনো দেখা যাবে না এবং আমরা তার প্রতি চিরকৃতজ্ঞ।’
বর্তমানে আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন চুক্তিটি আরো একটি বিশ্বকাপ চক্রের জন্য নবায়ন করতে চাইলেও স্কালোনি তার থাকার বিষয়ে কেবল এটুকুই বলেছেন যে, ‘এখনো কোনো নতুন আপডেট নেই’।
এখন সামনে নতুন দল, নতুন খেলোয়াড় এবং নতুন বাস্তবতা। থাকবে না মেসির সেই বাঁ পা, থাকবে না এক মুহূর্তে ম্যাচ বদলে দেয়ার নিশ্চয়তা। থাকবে শুধু তার রেখে যাওয়া উত্তরাধিকার। আর সে উত্তরাধিকারকে সামনে রেখেই স্কালোনিকে শুরু করতে হবে মেসি-পরবর্তী আর্জেন্টিনার গল্প!
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








