শেষ হলো মহাকাব্যিক অধ্যায়ের
বেনিনের বিপক্ষে বিদায়ী ম্যাচে দর্শকদের উদ্দেশে লিওনেল মেসি : ইন্টারনেট।

 

Advertisement

আর্জেন্টিনা হয়ে মেসির গোল

 দল ম্যাচ গোল
 জাতীয় দল ২০৮ ১২৬
যুব দল  ২০ ১৪


বিশ্ব ফুটবলে আগমন ঘটেছে বহু তারকার। যারা কোটি কোটি ভক্ত-সমর্থকদের মুগ্ধ করেছেন তাদের পায়ের জাদুতে। এর মাঝেই সব তারকাকে ছাড়িয়ে নিজেকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন একজন, যেকোনো ফুটবলারের জন্য এই জায়গায় পৌঁছানো স্বপ্নের মতো, তিনি আর কেউ নন- ফুটবল ইতিহাসের এক জীবন্ত কিংবদন্তি লিওনেল আন্দ্রেস মেসি। আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে গত ৩১ আগস্ট অবসরের ঘোষণা দিয়েছেন বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ক। তাকে বিদায় জানাতে আর্জেন্টিনা ফুটবল কনফেডানেশন আয়োজন করে এক প্রীতি ম্যাচের। প্রতিপক্ষ আফ্রিকার দেশ বেনিন। বুয়েন্স আয়ার্সের মনুমেন্তাল স্টেডিয়ামে ৮৫ হাজারের বেশি দর্শকের সামনে হয়ে গেল ইতিহাসের অন্যতম সেরা ফুটবলারের আন্তর্জাতিক অধ্যায়ের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি। মেসির বিদায়ী ম্যাচে বেনিনকে ৩-০ গোলে হারিয়ে আবেগঘন এক রাত উপহার দিয়েছে আর্জেন্টিনা জাতীয় ফুটবল দল। ম্যাচে তিন গোলেই অবদান ছিল আলবিসেলেস্তেদের সেরা তারকার। নিজে গোল করার পাশাপাশি দু’টি গোলে সহায়তা করেন মেসি।
আর্জেন্টিনার জার্সিতে শেষবার মাঠে নামতে যাচ্ছিলেন মেসি, তাই ম্যাচের ফলাফলের চেয়ে গতকাল ভোরটার গুরুত্ব ছিল অন্যরকম। মাঠে নামার সময় তিন সন্তানকে সাথে নিয়ে আসেন রেকর্ড আটবারের ব্যালন ডি’অর জয়ী তারকা। গ্যালারিতে ছিলেন স্ত্রী আন্তোনেলা রোকুজ্জো ও মা সেলিয়া কুচ্চিত্তিনি। বিশাল একটি ‘গ্রাসিয়াস’ লেখা আর্জেন্টিনার ১০ নম্বর জার্সিও মাঠে প্রদর্শন করা হয়। স্প্যানিশ ভাষা গ্রাসিয়াস-এর অর্থ হলো ধন্যবাদ বা আপনাকে ধন্যবাদ। শুরু হলো বিদায়ী ম্যাচ। ঘড়ির কাটায় ম্যাচের বয়স ১০ মিনিট। হঠাৎকরেই থেমে যায় খেলা। অন্য কোনো কারণে নয়, মেসির বিখ্যাত ১০ নম্বর জার্সির প্রতি সম্মান। দাঁড়িয়ে করতালিতে মুখরিত হয় পুরো স্টেডিয়াম। আবেগের সাগরে পরিণত হয়ে যায় পুরো গ্যালারি। আবেগ ধরে রাখতে পারেননি মেসি নিজেও। 
তবে প্রথমার্ধে কোনো গোল করতে পারেনি আর্জেন্টিনা। নিজেদের রক্ষণভাগ শক্ত রেখে মেসি-আলভারেজদের আক্রমণ সামলাতে সক্ষম হয় বেনিন। ম্যাচের চেহারা বদলে যায় দ্বিতীয়ার্ধেই। ৪৮ মিনিটে আর্জেন্টিনাকে এগিয়ে দেন অভিজ্ঞ ডিফেন্ডার নিকোলাস ওতামেন্দি। গোলটির পেছনে ছিল মেসির অবদান। ৬১ মিনিটে ব্যবধান দ্বিগুণ করেন নিকো পাজ। এবারো গোলের কারিগর মেসি। ফলে বিদায়ী ম্যাচেও মেসি বুঝিয়ে দেন, শুধু গোল করাই নয়, সতীর্থদের গোল করানোর ক্ষেত্রেও তিনি কতটা কার্যকর। এরপর আসে সেই মুহূর্ত। 
যার অপেক্ষায় ছিল পুরো মনুমেন্তাল, শুধু মনুমেন্তাল বললে ভুল হতে পারে, গোটা বিশ্বে ছড়িয়ে থাকা কোটি কোটি মেসিভক্তরা। ৭১ মিনিটে পেনাল্টি থেকে গোল করেন মেসি। আর্জেন্টিনার জার্সিতে এটি তার ১২৬তম আন্তর্জাতিক গোল। শেষ ম্যাচেও গোল করে নিজের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শেষ অধ্যায়কে যেন নিজের মতো করেই সাজালেন তিনি।
বেনিনের বিপক্ষে এই ম্যাচের মধ্য দিয়ে আর্জেন্টিনার হয়ে ২১ বছরের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের সমাপ্তি ঘটালেন মেসি। ২০০৫ সালে জাতীয় দলে অভিষেকের পর তিনি হয়ে উঠেছেন দলের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা ও সবচেয়ে বেশি ম্যাচ খেলা ফুটবলার। বিদায়ের ম্যাচ শেষে তার নামের পাশে ২০৮ ম্যাচ ও ১২৬ গোল।
আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে মেসির সবচেয়ে বড় অর্জন ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপ জয়। এর আগে ২০২১ ও ২০২৪ সালে কোপা আমেরিকা এবং ২০২২ সালে ফিনালিসিমাও জিতেছেন তিনি। বিশ্বকাপ ও মহাদেশীয় সাফল্যের পাশাপাশি ব্যক্তিগত রেকর্ডেও মেসি আর্জেন্টিনার ফুটবল ইতিহাসে নিজেকে আলাদা উচ্চতায় নিয়ে গেছেন।
বেনিনের বিপক্ষে ম্যাচ শেষে বিদায়ী বক্তব্যে মেসি আবেগাপ্লুত হয়ে জানান, আর্জেন্টিনার জার্সির জন্য তিনি নিজের সর্বস্ব দিয়েছেন। তার বিদায়ের সাথে শেষ হলো এমন এক অধ্যায়, যেখানে হতাশা, সমালোচনা, ব্যর্থতা পেরিয়ে শেষ পর্যন্ত বিশ্বকাপ হাতে তুলে নিয়েছিলেন তিনি। আর বেনিনের বিপক্ষে শেষ ম্যাচে গোল ও দুই অ্যাসিস্ট করে তিনি রেখে গেলেন তার ক্যারিয়ারের জন্য একেবারে উপযুক্ত শেষ স্বাক্ষর।
অথচ ফুটবল যাত্রা মোটেও সহজ ছিল না রোজারিওর এক সাধারণ পরিবার থেকে উঠে আসা এই খুদে জাদুকরের। ছোটবেলায় গ্রোথ হরমোনের সমস্যায় ভুগেছেন। তবে পিছু হটেননি তিনি। ফুটবল ঈশ্বর যেন নিজের হাতে লিখেছিলেন তার ভাগ্য। বার্সেলোনার লা মাসিয়া একাডেমি থেকে শুরু করে স্প্যানিশ ক্লাবটির মূল দলে মেসির উত্থান ছিল রূপকথার মতো। ক্যাম্প ন্যু-এর সবুজ ঘাসে তিনি যা দেখিয়েছেন, তা ফুটবল ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। বার্সেলোনার হয়ে অসংখ্য ট্রফি এবং ব্যক্তিগত অর্জনের পর পিএসজি হয়ে বর্তমানে পায়ের জাদু দেখাচ্ছেন যুক্তরাষ্ট্রের ইন্টার মিয়ামিতেও।
রেকর্ড বইয়ের দিকে তাকালে দেখা যায়, একাই যেন একটি ইতিহাস মেসি। সর্বোচ্চ সংখ্যক ব্যালন ডি’অর জয়, আকাশি-নিল জার্সি গায়ে চাপিয়ে রেকর্ড পরিমাণ গোল এবং অ্যাসিস্ট- সবই জ্বলজ্বল করছে তার নামের পাশে। মেসি শুধু তার অবিশ্বাস্য ড্রিবলিং, নিখুঁত ফ্রি-কিক কিংবা চোখ ধাঁধানো গোলের জন্যই সেরা নন; মাঠ ও মাঠের বাইরে তার নম্রতা, সততা এবং লিডারশিপের কারণে অনন্য করে তুলেছে তাকে। কোটি কোটি তরুণ ফুটবলারের কাছে তিনি এক বিশাল অনুপ্রেরণার উৎস। শুধু মাঠে পায়ের জাদুতেই শেষ করেননি, কোটি মানুষের আবেগ আর ভালোবাসার শেষ আশ্রয় হয়ে বিদায় নিলেন মেসি।