
বিশেষ সংবাদদাতা
দেশের অর্থনীতির গতি ফেরার যে আভাস মিলেছিল সেটা থমকে গেছে। গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরের তৃতীয় প্রান্তিকে এসে ছন্দপতন ঘটে। কৃষি, শিল্প ও সেবা- তিন প্রধান খাতেই প্রবৃদ্ধি কমেছে। সবচেয়ে উদ্বেগের জায়গা শিল্পে। পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট ভিত্তিতে চতুর্থ প্রান্তিকে প্রবৃদ্ধি ৪.৬০ শতাংশ হারে বেড়েছে। আর চার প্রান্তিক মিলে মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৩.৬৮ শতাংশ বলে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সদ্য প্রকাশিত হালনাগাদ তথ্য থেকে জানা গেছে। বিবিএস বলছে, অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে যেখানে শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধি ছিল ৬.৮২ শতাংশ, তৃতীয় প্রান্তিকে সেটিই নেমে গেছে ঋণাত্মক ০.২৮ শতাংশে। ফলে সামগ্রিক অর্থনীতির প্রবৃদ্ধিও দ্বিতীয় প্রান্তিকের ৩.০৩ শতাংশ থেকে কমে তৃতীয় প্রান্তিকে দাঁড়িয়েছে ২.২২ শতাংশে। এ দিকে বিশ^ব্যাংক মঙ্গলবার প্রকাশিত তথ্যে জানিয়েছে গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ৩.৪ শতাংশ ছিল। চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি হবে ৩.৪ শতাংশ। তবে জ্বালানি সরবরাহ পরিস্থিতির ধীরে ধীরে উন্নতি এবং সরকারের সংস্কার কার্যক্রম জোরদার হলে আগামী ২০২৭-২৮ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৩.৯ শতাংশে উন্নীত হতে পারে।
গতকাল বুধবার বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) প্রকাশিত ২০২৫-২৬ অর্থবছরের তৃতীয় প্রান্তিকের ত্রৈমাসিক জিডিপির প্রাথমিক হিসাবে এই চিত্র উঠে এসেছে। বিবিএসের তথ্যানুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকে জিডিপি প্রবৃদ্ধি হয়েছে ২.২২ শতাংশ। অথচ ২০২৪-২৫ অর্থবছরের একই প্রান্তিকে এই প্রবৃদ্ধি ছিল ৪.৫৩ শতাংশ। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে তৃতীয় প্রান্তিকের প্রবৃদ্ধি কমেছে ২.৩১ শতাংশীয় পয়েন্ট। শুধু ২০২৪-২৫ বছরের সাথে তুলনা করলেই নয়, গত অর্থবছরের এক প্রান্তিক থেকে পরের প্রান্তিকেও অর্থনীতির গতি কমেছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ছিল ৪.৯৬ শতাংশ। দ্বিতীয় প্রান্তিকে তা নেমে আসে ৩.০৩ শতাংশে। তৃতীয় প্রান্তিকে আরো কমে হয়েছে ২.২২ শতাংশ। অর্থাৎ তিন প্রান্তিক ধরে প্রবৃদ্ধির রেখাটি নিচের দিকেই নেমেছে। আর চতুর্থ প্রান্তিকে হয়েছে ৪.৬০ শতাংশ। ফলে চার প্রান্তিক মিলে গড়ে ৩.৬৮ শতাংশ।
জিডিপির আকার
বিবিএসের হিসাবে বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরের চতুর্থ প্রান্তিকে চলতি মূল্যে জিডিপির আকার দাঁড়িয়েছে ১৬ লাখ ১১ হাজার ৬৭৪ কোটি ৩০ লাখ টাকা। আর ২০২৪-২৫ অর্থবছরের চতুর্থ প্রান্তিকে এই অঙ্ক ছিল ১৪ লাখ ৩৮ হাজার ৫২৭ কোটি ২০ লাখ টাকা।
শিল্পে সবচেয়ে বড় ধাক্কা
বিবিএসের হিসাবে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের তৃতীয় প্রান্তিকে শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধি হয়েছে ঋণাত্মক ০.২৮ শতাংশ। গত অর্থবছরের একই প্রান্তিকে এই খাতে প্রবৃদ্ধি ছিল ৩.৩৩ শতাংশ। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে শিল্পের প্রবৃদ্ধি কমেছে ৩.৬১ শতাংশীয় পয়েন্ট। অর্থবছরের আগের প্রান্তিকের সাথেও শিল্পের পতন বেশ বড়। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে শিল্পের প্রবৃদ্ধি ছিল ৬.৮২ শতাংশ। দ্বিতীয় প্রান্তিকে তা নেমে আসে ১.২৭ শতাংশে। তৃতীয় প্রান্তিকে এসে তা ঋণাত্মক ০.২৮ শতাংশ। অর্থাৎ মাত্র দুই প্রান্তিকের ব্যবধানে শিল্পের প্রবৃদ্ধি বেশি কমেছে।
হিসাব বলছে, অর্থনীতির যে খাতটি উৎপাদন, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি, সেই শিল্পেই এখন সবচেয়ে বড় দুর্বলতা। আগের অর্থবছরের তৃতীয় প্রান্তিকেও শিল্পে ৩.৩৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছিল। সেখানে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের একই সময়ে সেই প্রবৃদ্ধি আর ধরে রাখা যায়নি।
কৃষিতেও গতি থমকে গেল
বিবিএস তথ্য বলছে, কৃষি খাতের চিত্রও স্বস্তিদায়ক নয়। বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরের তৃতীয় প্রান্তিকে কৃষির প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১.৭৪ শতাংশ। আগের অর্থবছরের একই প্রান্তিকে এই হার ছিল ৪.৬১ শতাংশ। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে কৃষির প্রবৃদ্ধি কমেছে ২.৮৭ শতাংশীয় পয়েন্ট। বিদায়ী অর্থবছরের প্রান্তিকভিত্তিক হিসাবেও কৃষির গতি কমেছে। প্রথম প্রান্তিকে কৃষির প্রবৃদ্ধি ছিল ২.১১ শতাংশ, দ্বিতীয় প্রান্তিকে বেড়ে দাঁড়িয়েছিল ৩.৬৮ শতাংশ। কিন্তু তৃতীয় প্রান্তিকে সেটি নেমে আসে ১.৭৪ শতাংশে। অর্থাৎ দ্বিতীয় প্রান্তিকের তুলনায় তৃতীয় প্রান্তিকে কৃষির প্রবৃদ্ধি কমেছে ১.৯৪ শতাংশীয় পয়েন্ট। এক বছর আগে যেখানে তৃতীয় প্রান্তিকে কৃষি ৪.৬১ শতাংশ হারে বাড়ছিল, সেখানে এবার সেই গতি অর্ধেকেরও নিচে নেমে এসেছে।
সেবা খাতেও মন্থরতা
দেশের অর্থনীতির সবচেয়ে বড় খাত সেবাতেও প্রবৃদ্ধির গতি কমেছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের তৃতীয় প্রান্তিকে সেবা খাতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৩.৫২ শতাংশ। আগের অর্থবছরের একই প্রান্তিকে এই হার ছিল ৭.৩২ শতাংশ। ফলে এক বছরের ব্যবধানে সেবা খাতের প্রবৃদ্ধি কমেছে ৩.৮০ শতাংশীয় পয়েন্ট। বিদায়ী অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে সেবা খাতের প্রবৃদ্ধি ছিল ৪.৫১ শতাংশ। দ্বিতীয় প্রান্তিকে সামান্য কমে দাঁড়ায় ৪.৪৫ শতাংশে। তৃতীয় প্রান্তিকে আরো কমে হয়েছে ৩.৫২ শতাংশ। অর্থাৎ শিল্পের মতো সেবাতেও টানা দুই প্রান্তিকে প্রবৃদ্ধির গতি কমেছে। তবে শিল্পের মতো ঋণাত্মক অঞ্চলে না গেলেও আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় সেবার প্রবৃদ্ধি প্রায় অর্ধেক হয়েছে।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








