
নয়া দিগন্ত ডেস্ক
ইরানের সাথে যুদ্ধের অবসানে একটি চুক্তিতে পৌঁছাতে নতুন শর্ত সামনে এনেছে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স বলেছেন, চুক্তির অংশ হিসেবে ইরানকে তার ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ সক্ষমতা ‘অর্থবহভাবে’ কমাতে হবে। খবর আলজাজিরার।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভ্যান্সের এই বক্তব্য থেকে ধারণা করা হচ্ছে, ওয়াশিংটন হয়তো আগের অবস্থান থেকে কিছুটা সরে এসে ইরানের সীমিত মাত্রায় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের সুযোগ রাখার বিষয়টি বিবেচনা করছে। তবে একই সময়ে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওসহ প্রশাসনের অন্য শীর্ষ কর্মকর্তারা ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে কঠোর অবস্থান বজায় রেখেছেন। রুবিও স্পষ্ট করে বলেছেন, ইরান কোনোভাবেই পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে পারবে না। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও বলেছেন, যুদ্ধের অবসান হবে ‘ভালোভাবে, অথবা ভালো নয় এমনভাবে’।
এ দিকে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি আলোচনার বিষয়ে ভিন্ন সুরে কথা বললেও ওয়াশিংটনের উদ্দেশ্য নিয়ে তেহরানের সন্দেহ এখনো কাটেনি। ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলার মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া যুদ্ধ ইতোমধ্যে অষ্টম মাসে প্রবেশ করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের নতুন দাবি কী?
রয়টার্সকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে জেডি ভ্যান্স বলেছেন, ইরানকে প্রমাণ করতে হবে যে, তারা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে চায় না। এজন্য দেশটির ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচিতে দৃশ্যমান পরিবর্তন আনতে হবে। জেডি ভ্যান্সের যুক্তি, ইরানের যদি পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির কোনো ইচ্ছাই না থাকে, তাহলে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার প্রয়োজন কেন হবে। তিনি বলেন, পারমাণবিক অস্ত্র না তৈরির বিষয়ে ইরান যদি সত্যিই প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়, তাহলে উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম উৎপাদন করা উচিত নয়। ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের মাধ্যমে পারমাণবিক চুল্লির জ্বালানি তৈরি করা যায়। তবে অনেক বেশি মাত্রায় সমৃদ্ধ করলে সেটি পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির উপযোগী হয়ে উঠতে পারে। আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) তথ্যানুযায়ী, ইরান ৬০ শতাংশ পর্যন্ত ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করেছে। পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির জন্য সাধারণত প্রায় ৯০ শতাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামকে অস্ত্র-গ্রেড হিসেবে বিবেচনা করা হয়। জেডি ভ্যান্সের সাম্প্র্রতিক বক্তব্যে অবশ্য যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি ইরানের পুরো সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি বন্ধ করার দাবি পুনর্ব্যক্ত করেনি। বরং ‘অর্থবহ হ্রাস’-এর কথা বলা হয়েছে। ফলে সীমিত মাত্রায় সমৃদ্ধকরণের কোনো ব্যবস্থা ভবিষ্যৎ চুক্তিতে রাখা হবে কি না, সেই প্রশ্ন সামনে এসেছে।
রুবিওর অবস্থান আরো কঠোর
জেডি ভ্যান্সের বক্তব্যে কিছুটা নমনীয়তার ইঙ্গিত থাকলেও পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর বক্তব্যে কঠোর অবস্থানই স্পষ্ট হয়েছে। এথেন্সে সাংবাদিকদের সাথে কথা বলার সময় রুবিও বলেন, ইরান কোনোভাবেই পারমাণবিক অস্ত্র রাখতে পারবে না। তার ভাষায়, বিষয়টি একেবারে সরল- ইরানের হাতে পারমাণবিক অস্ত্র থাকতে পারবে না। রুবিও আরো দাবি করেন, চুক্তিতে পৌঁছানোর একাধিক সুযোগ ইরান নষ্ট করেছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, তেহরানের ওপর অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক চাপ অব্যাহত রাখাই ওয়াশিংটনের কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। জেডি ভ্যান্সও বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচির সাথে যোগাযোগ করছে। তবে ইরানের সিদ্ধান্ত গ্রহণের কাঠামো নিয়ে ওয়াশিংটনের কাছে এখনো কিছুটা অনিশ্চয়তা রয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। সাম্প্রতিক সময়ে ইরানের নেতৃত্ব নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে এমন বক্তব্যও এসেছে।
ইরানের অবস্থান কী?
ইরান জানিয়েছে, যুদ্ধ পুরোপুরি শেষ না হওয়া পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের সাথে দেশটির পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে কোনো আলোচনা হবে না। তেহরান বর্তমানে হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে দেয়া এবং আরো বিস্তৃত শান্তিচুক্তির দিকে এগিয়ে যাওয়ার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের দেয়া জবাব পর্যালোচনা করছে। গতকাল বুধবার তেহরান থেকে আলজাজিরার সাংবাদিক রানিয়া কাসেমির খবরে এ তথ্য জানানো হয়েছে। ওই খবর অনুযায়ী ইরান স্পষ্ট করেছে, যুক্তরাষ্ট্রের সাথে পরমাণু ইস্যুতে আলোচনার কোনো উদ্যোগ এখন নেয়া হচ্ছে না। ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারকের শর্তগুলো বাস্তবায়ন হওয়ার পর, অথবা অন্তত ইরানের দেয়া শর্তগুলো যুক্তরাষ্ট্র মেনে নেয়ার পর এ বিষয়ে আলোচনা শুরু হতে পারে। তেহরানের দাবি, তাদের পরমাণু কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ এবং এটি আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) কঠোর নজরদারির অধীনে ছিল। ইরান আরো অভিযোগ করেছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল একাধিকবার দেশটির পরমাণু স্থাপনায় বেআইনিভাবে হামলা চালিয়েছে। ইরানের ভাষ্য, যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের পর তারা নিজেদের সদিচ্ছা এবং পরমাণু কর্মসূচির শান্তিপূর্ণ চরিত্র প্রমাণের জন্য প্রস্তুত ছিল। তবে তেহরানের অভিযোগ, আইএইএর রিপোর্ট রাজনৈতিক ও পক্ষপাতদুষ্ট এবং এসব রিপোর্টের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পরমাণু স্থাপনায় হামলার অজুহাত পেয়েছে। এ কারণে ইরানের নেতৃত্বের অবস্থান হলো, যুদ্ধ পুরোপুরি শেষ হওয়ার পরই পরমাণু ইস্যুটি নিয়ে আলোচনা করা হবে। ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান সোমবার যুক্তরাষ্ট্রের সাথে আলোচনা নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেন। তার মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে ওয়াশিংটনের সাথে আলোচনা কার্যত অর্থহীন হয়ে পড়েছে। ইরানের সরকারি বার্তা সংস্থা ইরনা’র বরাতে তিনি বলেন, প্রতিবার আলোচনার টেবিলে বসার পরই ইরানের ওপর যুদ্ধ চাপিয়ে দেয়া হয়েছে। তার অভিযোগ, যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য কেবল আলোচনা নয়, বরং ইরানের সরকারকে উৎখাত করা। তবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচির বক্তব্যে আলোচনার সম্ভাবনা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়নি। ৪ অক্টোবর তেহরানে বিদেশী রাষ্ট্রদূতদের সাথে কথা বলার সময় তিনি বলেন, ন্যায় ও ন্যায্যতার ভিত্তিতে হওয়া আলোচনা দিয়েই সঙ্ঘাতের অবসান সম্ভব। অর্থাৎ, ইরান এক দিকে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশ্য নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করছে, অন্য দিকে আলোচনার দরজাও পুরোপুরি বন্ধ করছে না।
ইরানের ৭ দিনের প্রস্তাবে কী ছিল?
জাতিসঙ্ঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের সময় সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে ইরান হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে দেয়া এবং যুক্তরাষ্ট্রের সাথে আলোচনা শুরুর একটি প্রস্তাব দেয়। প্রস্তাব অনুযায়ী, প্রথমে সব ফ্রন্টে যুদ্ধ বন্ধ হবে। এর মধ্যে লেবাননে ইসরায়েলের সামরিক অভিযানও অন্তর্ভুক্ত থাকবে। এরপর যুক্তরাষ্ট্র হরমুজে নৌ অবরোধ তুলে নেবে, ইরানের ওপর থাকা তেল নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করবে এবং বিদেশে আটকে থাকা ইরানি সম্পদ ছাড়ার প্রক্রিয়া শুরু করবে। এরপর সাত দিনের মধ্যে হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে দিয়ে ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা শুরু করার প্রস্তাব দেয় তেহরান। তবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন।
সাম্প্রতিক সময়েও ইরান জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র তাদের শর্ত মেনে না নেয়া পর্যন্ত হরমুজ প্রণালী পুরোপুরি খুলে দেয়ার প্রশ্ন নেই।
আগের চুক্তির প্রস্তাবের সাথে পার্থক্য কোথায়?
ইরানের সর্বশেষ প্রস্তাবটি জুনে দুই দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত একটি সমঝোতার ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়েছিল। জুনের ওই সমঝোতায় যুদ্ধ কিছু সময়ের জন্য কমে এলেও পরে তা ভেঙে পড়ে। নতুন প্রস্তাবে মূলত সমঝোতার ধাপগুলোর সময়সীমা কমিয়ে আনা এবং কোন পদক্ষেপ আগে হবে, সেটিতে পরিবর্তন আনা হয়েছিল। বিশেষজ্ঞদের মতে, সবচেয়ে বড় বিরোধের জায়গা হলো কোনটি আগে হবে- হরমুজ খুলবে, নাকি পরমাণু ইস্যুতে সমঝোতা হবে। ইরান চায় প্রথমে অবরোধ ও নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং হরমুজ পুনরায় চালু করার মতো পদক্ষেপ নেয়া হোক, এরপর পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা হোক। অন্য দিকে যুক্তরাষ্ট্র সবগুলো বিষয়কে একটি সামগ্রিক চুক্তির অংশ হিসেবে দেখতে চাইছে।
শুধু পরমাণু ইস্যু নয়, আরো বড় বাধা
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সমঝোতার পথে সবচেয়ে বড় বাধা কেবল ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ নয়। তেহরানের দৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর মধ্যে রয়েছে- যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, নৌ অবরোধ তুলে নেয়া, বিদেশে আটকে থাকা ইরানি সম্পদ ছাড়ার নিশ্চয়তা, লেবাননের সঙ্ঘাতের অবসান এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে স্থায়ী যুদ্ধবিরতি। অধ্যাপক মাবনের মতে, শুধু পরমাণু কর্মসূচিতে ইরানের কাছ থেকে ছাড় আদায় করতে গিয়ে ওয়াশিংটন তেহরানের মূল অগ্রাধিকারগুলোকে উপেক্ষা করার ঝুঁকিতে রয়েছে। অর্থাৎ, যুক্তরাষ্ট্র যেখানে পরমাণু কর্মসূচিকে চুক্তির কেন্দ্রীয় বিষয় হিসেবে দেখছে, ইরানের কাছে অবরোধ, নিষেধাজ্ঞা, আটকে থাকা অর্থ ও আঞ্চলিক সঙ্ঘাতের অবসানও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








