বিমানবন্দর ব্যবস্থাপনায় উন্নতি চাইলে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে

 বিশেষ সংবাদদাতা 

Advertisement

দেশের প্রধান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে যাত্রীসেবা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই নানা অভিযোগ রয়েছে। দীর্ঘ অপেক্ষা, লাগেজ পেতে বিলম্ব, ট্রলি সঙ্কট, লাগেজ হারানো বা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার অভিযোগ, বিভিন্ন পর্যায়ে তথ্যের ঘাটতি এবং কোথাও কোথাও অসৌজন্যমূলক আচরণ- এসব নিয়ে প্রশ্ন উঠছে বিমানবন্দর ব্যবস্থাপনার দক্ষতা ও জবাবদিহি নিয়ে।
বিশেষ করে প্রবাসী শ্রমিকদের একটি বড় অংশ দীর্ঘ সময় বিদেশে কাজ করে দেশে ফেরেন। তাদের কাছে বিমানবন্দর শুধু একটি প্রবেশদ্বার নয়; এটি দীর্ঘ প্রবাসজীবন শেষে পরিবারের কাছে ফেরার প্রথম অভিজ্ঞতা। ফলে সেখানে অযথা হয়রানি বা অনিশ্চয়তা শুধু ব্যক্তিগত কষ্ট নয়, রাষ্ট্রীয় সেবার মান ও দেশের ভাবমর্যাদার সাথেও সম্পর্কিত। 
বিমানবন্দর ব্যবস্থাপনার এসব সঙ্কট, সম্ভাব্য সংস্কার এবং যাত্রী অধিকার নিয়ে নয়া দিগন্তের সাথে কথা বলেছেন সেন্টার ফর ইনক্লুসিভ পলিসি অ্যান্ড গভর্ন্যান্স- সিআইপিজির চেয়ারম্যান ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক। নিচে সাক্ষাৎকারের বিস্তারিত- 
প্রশ্ন : বিমানবন্দরে যাত্রী ভোগান্তির অভিযোগ তো নতুন নয়। আপনি কি এটিকে বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা মনে করেন, নাকি এর পেছনে ব্যবস্থাপনাগত সঙ্কট রয়েছে?  
ড. মোজাম্মেল হক : আমি এটিকে শুধু বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখতে চাই না। অবশ্যই প্রতিটি অভিযোগের আলাদা তদন্ত প্রয়োজন এবং অভিযোগ উঠলেই কাউকে অপরাধী বলা যাবে না। কিন্তু একই ধরনের সমস্যা যদি বারবার সামনে আসে, তাহলে তার পেছনে ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতা আছে কি না, সেটি খতিয়ে দেখা জরুরি। 
বিমানবন্দরে দীর্ঘ সারি, লাগেজ পেতে বিলম্ব, ট্রলি না পাওয়া, তথ্যের ঘাটতি কিংবা অভিযোগ নিয়ে এক ডেস্ক থেকে অন্য ডেস্কে ঘোরার অভিজ্ঞতা- এসবকে একটি সমন্বিত সেবা-ব্যবস্থার অংশ হিসেবে দেখতে হবে। 
একজন যাত্রী জানেন না কোন সমস্যার জন্য কোন সংস্থা দায়ী। তার কাছে বিমানবন্দর একটি প্রতিষ্ঠান। তাই দায়িত্ব যাদেরই হোক, যাত্রীকে সমন্বিত সেবা দেয়ার জন্য একটি কার্যকর ব্যবস্থাপনা কাঠামো থাকতে হবে। 
প্রশ্ন : তাহলে আপনার দৃষ্টিতে সবচেয়ে বড় সমস্যা কোথায়- অবকাঠামো, জনবল, প্রযুক্তি নাকি জবাবদিহির ঘাটতি? 
ড. মোজাম্মেল হক : একটিকে আলাদা করে দায়ী করা ঠিক হবে না। অবকাঠামো, জনবল, প্রযুক্তি, দায়িত্ব বণ্টন, আন্তঃসংস্থা সমন্বয় এবং জবাবদিহি- সবগুলো পরস্পরের সাথে সম্পর্কিত। 
বড় ভবন তৈরি করলেই বিমানবন্দর আধুনিক হয় না। সেখানে দক্ষ কর্মী থাকতে হবে, যন্ত্রপাতি সচল রাখতে হবে, ব্যাগেজ ব্যবস্থাপনা কার্যকর করতে হবে এবং যাত্রীকে দ্রুত তথ্য দিতে হবে। 
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো- কাজের দায়িত্ব যেমন নির্ধারিত থাকবে, তেমনি সেই কাজের ফলাফলের জন্য কে দায়ী, সেটিও স্পষ্ট থাকতে হবে। 
প্রশ্ন : যাত্রীর অভিযোগ, বিশেষ করে লাগেজ নিয়ে অভিযোগ, কিভাবে দ্রুত মোকাবেলা করা উচিত? 
ড. মোজাম্মেল হক : প্রথম কাজ হলো যাত্রীকে তথ্য দেয়া। লাগেজ দেরি হলে তাকে জানতে হবে- কেন দেরি হচ্ছে, তার লাগেজ কোথায় এবং সম্ভাব্য কত সময় লাগতে পারে। 
একজন যাত্রীকে শুধু বেল্টের সামনে দাঁড় করিয়ে রেখে দেয়া কোনো সেবা নয়। অভিযোগ গ্রহণের একটি সহজ ব্যবস্থা থাকতে হবে। প্রতিটি অভিযোগের জন্য একটি অনুসরণযোগ্য নম্বর দেয়া যেতে পারে। যাত্রী যেন অনলাইনে বা নির্দিষ্ট কাউন্টার থেকে জানতে পারেন তার অভিযোগের বর্তমান অবস্থা কী। লাগেজ হারানো বা ক্ষতিগ্রস্ত হলে অনুসন্ধান এবং প্রযোজ্য ক্ষতিপূরণের পথও স্পষ্ট করতে হবে। 
প্রশ্ন : ১ অক্টোবর মদিনা থেকে আসা বিজি ৩৩৮ ফ্লাইটের যাত্রীদের লাগেজ ভোগান্তি নিয়ে চারজন সংসদ সদস্য লিখিত অভিযোগ করেছেন। এ ধরনের অভিযোগের ক্ষেত্রে আপনার প্রত্যাশা কী?
ড. মোজাম্মেল হক : এ ধরনের অভিযোগ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা উচিত। তবে তদন্তের আগে কাউকে দোষী ঘোষণা করা ঠিক হবে না। একইভাবে অভিযোগকে হালকাভাবে দেখাও উচিত নয়। 
মূল প্রশ্ন হলো- ঘটনাটি কেন ঘটল? কোথায় ব্যবস্থাপনায় সমস্যা হয়েছিল? যাত্রীকে যথাসময়ে তথ্য দেয়া হয়েছিল কি না? লাগেজ ব্যবস্থাপনার কোন ধাপে বিলম্ব হয়েছে? এসব প্রশ্নের উত্তর বের করতে হবে। 
তদন্তের ফলাফল যাই হোক, ভবিষ্যতে একই ধরনের ঘটনা যাতে না ঘটে তার জন্য ব্যবস্থাগত সংশোধন করতে হবে। 
প্রশ্ন : প্রবাসী শ্রমিকদের বিমানবন্দর অভিজ্ঞতা নিয়ে বিশেষ অভিযোগ রয়েছে। তাদের মর্যাদার বিষয়টি আপনি কতটা গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন? 
ড. মোজাম্মেল হক : অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একজন প্রবাসী শ্রমিক বছরের পর বছর বিদেশে শ্রম দিয়ে দেশে অর্থ পাঠান। তার পেশা বা পোশাকের কারণে তাকে কোনোভাবেই কম মর্যাদার নাগরিক হিসেবে দেখা যাবে না। 
ইমিগ্রেশন, কাস্টমস ও নিরাপত্তা যাচাই রাষ্ট্রের প্রয়োজনীয় দায়িত্ব। কিন্তু এসব দায়িত্ব পালনের পদ্ধতি হতে হবে আইনসম্মত, সৌজন্যমূলক ও বৈষম্যহীন। 
আমাদের মনে রাখতে হবে, বিমানবন্দরে একজন প্রবাসী শ্রমিক শুধু একজন যাত্রী নন; তিনি দেশের অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। তার সাথে সম্মানজনক আচরণ রাষ্ট্রের দায়িত্ব। 
প্রশ্ন : বিমানবন্দরে বিভিন্ন সংস্থা কাজ করে। ফলে দায়িত্ব নিয়ে এক সংস্থা অন্য সংস্থার দিকে আঙুল তোলে- এই সমন্বয়হীনতা কিভাবে দূর করা সম্ভব? 
ড. মোজাম্মেল হক : একটি যৌথ অপারেশনাল সমন্বয় কেন্দ্র গঠন করা যেতে পারে। এতে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর নিজ নিজ আইনগত ক্ষমতা অক্ষুণœ থাকবে, কিন্তু যাত্রীপ্রবাহ, লাগেজ, নিরাপত্তা, ট্রলি এবং জরুরি পরিস্থিতির তথ্য একটি সমন্বিত ব্যবস্থায় আসবে। 
একজন যাত্রীর সমস্যা সমাধানের জন্য তাকে বিভিন্ন সংস্থার কাছে পাঠানো যাবে না। রাষ্ট্রের ভেতরের প্রশাসনিক দায়িত্বের বিভাজন যাত্রীর ওপর চাপিয়ে দেয়া উচিত নয়। 
প্রশ্ন : দীর্ঘ অপেক্ষার সমস্যা কমাতে তাৎক্ষণিক কী করা উচিত? 
ড. মোজাম্মেল হক : ব্যস্ত সময়ে যাত্রী ও ফ্লাইটের চাপ অনুযায়ী পর্যাপ্ত গেট, স্ক্যানার, চেক-ইন ও ইমিগ্রেশন কাউন্টার চালু রাখতে হবে। যন্ত্রপাতি নষ্ট হলে বিকল্প ব্যবস্থা কত দ্রুত চালু করা যায়, তার প্রস্তুতি থাকতে হবে। 
এ ছাড়া যাত্রীকে বাংলা ও ইংরেজিতে সহজ নির্দেশনা দিতে হবে। সহায়তা ডেস্ক দৃশ্যমান জায়গায় রাখতে হবে। আমাদের এমন একটি ব্যবস্থা দরকার যেখানে যাত্রী সমস্যায় পড়ার পর সাহায্য খুঁজবেন না; বরং বিমানবন্দর ব্যবস্থাই তাকে প্রয়োজনীয় সহায়তার দিকে নিয়ে যাবে। 
প্রশ্ন : ট্রলি সঙ্কটকে অনেকে ছোট সমস্যা হিসেবে দেখেন। এটি কি আসলে ব্যবস্থাপনার বড় দুর্বলতার ইঙ্গিত? 
ড. মোজাম্মেল হক : একটি ট্রলি না পাওয়া হয়তো ছোট সমস্যা মনে হতে পারে। কিন্তু হাজার হাজার যাত্রীর ক্ষেত্রে একই ঘটনা ঘটলে সেটি বড় ব্যবস্থাপনাগত সমস্যা। 
শুধু ট্রলি কেনা নয়; কোথায় কতটি ট্রলি প্রয়োজন, ব্যবহারের পর সেগুলো কোথায় থাকবে এবং কে সেগুলো আবার নির্দিষ্ট স্থানে নিয়ে আসবেন- এসবের দায়িত্ব নির্ধারণ করতে হবে। 
ব্যস্ত সময়ে ট্রলি সরবরাহ সংশ্লিষ্ট ইউনিটের পরিমাপযোগ্য দায়িত্ব হওয়া উচিত। প্রয়োজনে ডিজিটাল ট্র্যাকিং ব্যবহার করা যায়। 
প্রশ্ন : বিমানবন্দরে অনানুষ্ঠানিক অর্থ বা বকশিশের সুযোগ বন্ধ করার জন্য কী করা দরকার? 
ড. মোজাম্মেল হক : প্রথমত, মৌলিক সেবা কোনটি বিনামূল্যে এবং কোন সেবার জন্য নির্ধারিত ফি আছে- তা স্পষ্টভাবে জানাতে হবে। সাইনবোর্ড ও ডিজিটাল মাধ্যমে তথ্য দিতে হবে। 
দ্বিতীয়ত, অভিযোগের সহজ ব্যবস্থা থাকতে হবে। তৃতীয়ত, কর্মীদের আচরণ ও সেবার মান নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে হবে। 
কোনো যাত্রী যেন মনে না করেন যে স্বাভাবিক সেবা পেতে তাকে অতিরিক্ত অর্থ দিতে হবে- এটি নিশ্চিত করা জরুরি। 
প্রশ্ন : লাগেজ চুরি বা অনিয়ম ঠেকাতে সিসিটিভি ও ডিজিটাল প্রযুক্তি কতটা কার্যকর হতে পারে? 
ড. মোজাম্মেল হক : প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু প্রযুক্তির সাথে ব্যবস্থাপনা থাকতে হবে। উড়োজাহাজ থেকে বেল্ট পর্যন্ত লাগেজের প্রতিটি ধাপে ডিজিটাল রেকর্ড থাকলে কোনো সমস্যা কোথায় হয়েছে, তা শনাক্ত করা সহজ হবে। 
ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় সিসিটিভির আওতা নিশ্চিত করতে হবে। প্রয়োজন অনুযায়ী কর্মীদের প্রবেশাধিকার নিয়ন্ত্রণ ও বডি ক্যামেরাও বিবেচনা করা যেতে পারে। 
তবে প্রযুক্তি ব্যবহারের সাথে তথ্যের নিরাপত্তা, রেকর্ড সংরক্ষণ এবং অনুমোদিত ব্যবহারের নিয়মও স্পষ্ট করতে হবে। 
প্রশ্ন : অভিযোগ প্রমাণিত হলে শুধু কর্মী বদলি বা সাময়িক ব্যবস্থা কি যথেষ্ট? 
ড. মোজাম্মেল হক : সবসময় নয়। চুরি, ঘুষ বা গুরুতর অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে প্রযোজ্য আইনানুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। 
কিন্তু এর পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাগত দুর্বলতাও খুঁজে বের করতে হবে। কারণ একজন কর্মী অনিয়ম করার সুযোগ পেলেন কেন- এটিও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। শুধু ব্যক্তি শাস্তি পেলে প্রতিষ্ঠান নিরাপদ হয় না। ব্যক্তিগত জবাবদিহির পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। 
প্রশ্ন : বিমানবন্দর সেবার মান কি নির্দিষ্ট সময় ও সূচকের মাধ্যমে পরিমাপ করা সম্ভব? 
ড. মোজাম্মেল হক : অবশ্যই। এ জন্য বাধ্যতামূলক সার্ভিস লেভেল এগ্রিমেন্ট চালু করা যেতে পারে। প্রথম লাগেজ ও শেষ লাগেজ পাওয়ার সময়, কাউন্টারে অপেক্ষার সময়, ট্রলির প্রাপ্যতা এবং অভিযোগের জবাব দেয়ার সময়- সব কিছুর নির্দিষ্ট মানদণ্ড থাকা দরকার। 
উদাহরণ হিসেবে প্রথম লাগেজ ৩০ মিনিট এবং শেষ লাগেজ ৬০ মিনিটের মধ্যে সরবরাহের লক্ষ্য বিবেচনা করা যেতে পারে। তবে এগুলো চূড়ান্ত সংখ্যা নয়; বিমানবন্দরের বাস্তব সক্ষমতা ও ফ্লাইটের ধরন বিশ্লেষণ করে মান নির্ধারণ করতে হবে। 
প্রশ্ন : অভিযোগের ৭২ ঘণ্টার মধ্যে নিষ্পত্তি- এ ধরনের কোনো ব্যবস্থা কি করা সম্ভব? 
ড. মোজাম্মেল হক : ৭২ ঘণ্টার মধ্যে অন্তত অভিযোগের প্রাথমিক সিদ্ধান্ত বা অগ্রগতির তথ্য দেয়া যেতে পারে। কিন্তু সব হারানো লাগেজ ৭২ ঘণ্টায় উদ্ধার হবে বা ক্ষতিপূরণ দেয়া হবে- এমন প্রতিশ্রুতি বাস্তবসম্মত নয়। 
মূল বিষয় হলো, অভিযোগ করার পর যাত্রী যেন অন্ধকারে না থাকেন। তিনি জানতে পারবেন তার অভিযোগ কোথায় আছে, কী তদন্ত হচ্ছে এবং পরবর্তী পদক্ষেপ কী। 
প্রশ্ন : গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ে বেসরকারি বা দক্ষ সেবাদাতার অংশগ্রহণ বাড়ানো হলে কি সমস্যা সমাধান হবে? 
ড. মোজাম্মেল হক : দক্ষ সেবাদাতার অংশগ্রহণ সুফল দিতে পারে। তবে শুধু প্রতিষ্ঠান পরিবর্তন করলেই সমাধান হবে না। 
প্রতিষ্ঠান নির্বাচনের সময় কম দরকে একমাত্র মানদণ্ড করা যাবে না। নিরাপত্তা, অভিজ্ঞতা, প্রশিক্ষিত জনবল, আধুনিক যন্ত্রপাতি ও রক্ষণাবেক্ষণ সক্ষমতা বিবেচনা করতে হবে। চুক্তিতে সেবার মান নির্ধারণ করতে হবে এবং মান পূরণ না হলে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়ার সুযোগ থাকতে হবে। 
প্রশ্ন : টিকিটে খালি আসন থাকা নিয়ে অনেক সময় কৃত্রিম সঙ্কটের অভিযোগ ওঠে। বিষয়টি কিভাবে দেখা উচিত? 
ড. মোজাম্মেল হক : কোনো ফ্লাইটে খালি আসন থাকলেই কৃত্রিম সঙ্কটের প্রমাণ বলা যাবে না। বুকিং বাতিল, যাত্রীর অনুপস্থিতি বা অন্যান্য অপারেশনাল কারণেও আসন খালি থাকতে পারে। তবে অস্বাভাবিকভাবে আসন আটকে রাখা, গ্রুপ বুকিং বা পুনর্বিক্রয়ের অভিযোগ থাকলে তথ্যের ভিত্তিতে তদন্ত করা প্রয়োজন। টিকিটের মূল্য ও শর্তের স্বচ্ছতা বাড়াতে হবে। 
প্রশ্ন : তৃতীয় টার্মিনালসহ বড় অবকাঠামো তৈরি হচ্ছে। এতে কি বিমানবন্দরের বর্তমান সঙ্কট দূর হবে? 
ড. মোজাম্মেল হক : অবকাঠামো প্রয়োজনীয়, কিন্তু অবকাঠামোই সমাধান নয়। একটি অত্যাধুনিক টার্মিনালও যদি দক্ষ জনবল, কার্যকর ব্যাগেজ ব্যবস্থা, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, সমন্বিত তথ্যব্যবস্থা ও জবাবদিহিমূলক পরিচালনা না পায়, তাহলে যাত্রীর অভিজ্ঞতায় বড় পরিবর্তন আসবে না। আমাদের ভবনের পাশাপাশি সেবা সংস্কৃতি তৈরি করতে হবে। 
প্রশ্ন : বিমানবন্দর পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণের বর্তমান কাঠামো নিয়ে কি নতুন করে ভাবার প্রয়োজন আছে? 
ড. মোজাম্মেল হক : নিয়ন্ত্রক ও পরিচালনাকারীর ভূমিকা পৃথক করার সম্ভাবনা নিয়ে আইনগত ও প্রাতিষ্ঠানিক পর্যালোচনা করা যেতে পারে। লক্ষ্য হওয়া উচিত স্বাধীন নিরাপত্তা তদারকি এবং পেশাদার পরিচালনা। তবে কাঠামো পরিবর্তনের আগে দায়িত্ব, অর্থায়ন, জনবল ও জবাবদিহির বিষয়গুলো পরিষ্কার করতে হবে। শুধু কাঠামোর নাম পরিবর্তন করলে কোনো লাভ হবে না। 
প্রশ্ন : সরকার এখনই যদি বিমানবন্দর সেবা সংস্কারের উদ্যোগ নিতে চায়, আপনার রোডম্যাপ কী হবে? 
ড. মোজাম্মেল হক : প্রথম ৯০ দিনে দৃশ্যমান কিছু পরিবর্তন আনতে হবে- অপেক্ষার সময় কমানো, তথ্যকেন্দ্র শক্তিশালী করা, ট্রলি ব্যবস্থাপনা উন্নত করা এবং অভিযোগ গ্রহণের কার্যকর ব্যবস্থা চালু করা। পরবর্তী ছয় থেকে ১২ মাসে এসএলএ, আন্তঃসংস্থা সমন্বয়, ব্যাগেজ ট্র্যাকিং এবং কার্যসম্পাদন মূল্যায়ন শক্তিশালী করা যেতে পারে। 
এর পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের রোডম্যাপ প্রকাশ করতে হবে। 
প্রশ্ন : এই সংস্কারের অগ্রগতি জনগণ কিভাবে যাচাই করবে? 
ড. মোজাম্মেল হক : তথ্য প্রকাশ করতে হবে। প্রতি তিন মাসে অপেক্ষার সময়, লাগেজ সরবরাহ, অভিযোগের সংখ্যা এবং প্রতিকারের বিষয়ে সংক্ষিপ্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করা যেতে পারে। 
জনগণকে জানাতে হবে- কী লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল এবং বাস্তবে কতটা অর্জিত হয়েছে। এতে জবাবদিহি তৈরি হবে। 
প্রশ্ন : শেষ প্রশ্ন- আপনার কাছে একটি ভালো বিমানবন্দরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড কী? 
ড. মোজাম্মেল হক : একজন যাত্রী নিরাপদে, সময়মতো ও সম্মানের সাথে তার গন্তব্যে পৌঁছাতে চান। তিনি চান সঠিক তথ্য, দ্রুত সহায়তা এবং অভিযোগ করলে কার্যকর প্রতিকার। বিশেষ করে দেশের প্রবেশদ্বারে একজন সাধারণ যাত্রীর সময় ও মর্যাদা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। আমাদের মনে রাখতে হবে- বিমানবন্দর শুধু একটি টার্মিনাল ভবন নয়। এটি দেশের সাথে বিশ্বের মানুষের প্রথম ও শেষ সংযোগগুলোর একটি। এখানে একজন প্রবাসী শ্রমিকের সাথে কেমন আচরণ করা হলো, একজন বিদেশী পর্যটক কী অভিজ্ঞতা পেলেন, একজন ব্যবসায়ী কত দ্রুত সেবা পেলেন- এসবের মধ্য দিয়েই বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় সেবার মান সম্পর্কে ধারণা তৈরি হয়। 
তাই লক্ষ্য হওয়া উচিত শুধু আধুনিক বিমানবন্দর নির্মাণ নয়; এমন একটি বিমানবন্দর ব্যবস্থা তৈরি করা, যেখানে যাত্রীকে ঘুরতে হবে না, তথ্যের জন্য অপেক্ষা করতে হবে না এবং ন্যায্য সেবা পেতে কারো অনুগ্রহের ওপর নির্ভর করতে হবে না।