
ক্রীড়া প্রতিবেদক
বাংলাদেশ সময় গতকাল ভোর ৫টা। এদেশের সিংগভাগ মানুষই যখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন তখন আর্জেন্টিনার রাজধানী বুয়েনস আয়ার্সের মনুমেন্টাল স্টেডিয়ামে বিশাল আয়োজন। আর্জেন্টিনার গণ্ডী পেরিয়ে পুরো ল্যাতিন জোন, উত্তর আমেরিকা এবং প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোতে যেখানে দিন শুরু হয়ে গেছে বা দিন গড়িয়ে রাত সেখানে ফুটবল প্রেমীদের চোখ আটকে ছিল টিভি পর্দায়। আর মনুমেন্টাল স্টেডিয়ামের বাইরে যেমন ফুটবল প্রেমীদের শোরগোল তেমনি স্টেডিয়ামের ভেতরে থাকা ৮৫ হাজার দর্শকের মধ্যেই প্রবল উত্তেজনা। কারণ বেনিনের বিপক্ষে ম্যাচ দিয়েই যে আর্জেন্টিার হয়ে শেষ ম্যাচ খেলবেন লিওনেল মেসি। এরপর আর বিশ^ ফুটবলের জীবন্ত কিংবদন্তিকে আর দেখা যাবে না আর্জেন্টিনার ১০ নং জার্সিতে। শেষ পর্যন্ত সুষ্ঠুভাবেই হলো আর্জেন্টিনার অধিনায়কের বিদায়। আর এই বিদায়টাও ক্যারিয়ারের সোনালি সময়ের মতো উজ্জ্বল করে রাখলেন মেসি। আফ্রিকার দেশটির বিপক্ষে তিন বারের বিশ^ চ্যাম্পিয়নদের ৩-০ গোলের সবকটিতেই অবদান তার। নিজে গোল করেছেন, করিয়েছেন আরো দুই গোল। আর্জেন্টিনার মতো সারা বিশে^ ছড়িয়ে ছিটিয়ে শত কোটি দর্শকরা এমন বিদায়ইতো চেয়েছিলেন রেকর্ড গড়ার এই রাজপুত্রের।
আর্জেন্টিনার ১০নং জার্সি। এই জার্সি পড়ে দেশকে বিশ^কাপ এনে দিয়েছেন ১৯৭৮ সালে মারিও কেম্পেস, ১৯৮৬ সালে দিয়েগো ম্যারাডোনা। আগের দুই জনকে অনুসরণ করে ল্যাতিন দেশটিকে এই ১০ জার্সি গায়ে দিয়েই তৃতীয় বিশ^কাপ এনে দিয়েছেন লিওনেল মেসি। তা ২০২২ সালে কাতারের মাঠে। আর্জেন্টিনার আগামী ম্যাচেই এই ১০ নাম্বার জার্সি পরে অন্য কাউকে দেখা যাবে। তবে বিশ^ ফুটবলের জীবন্ত এই কিংবদন্তিকে আর এ নাম্বার টেন জার্সিতে দেখা যাবে না। গতকালই শেষবারের মতো আর্জেন্টিনার সাদা- আকাশী নীল জার্সিতে প্রথম একাদশে। ২০০৫ সালে ১৭ আগস্ট হাঙ্গেরির বুদাপেস্টের পুসকাস এরিনাতে হাঙ্গেরির বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে আর্জেন্টিনা সিনিয়র দলে যাত্রা শুরু মেসির। আর সমাপ্তির রেখা টানতে হলো প্রিয় জন্মভূমির বিশাল স্টেডিয়ামের মাঠে। ২০০৬ সালে জার্মানিতে অনুষ্ঠিত বিশ^কাপ দিয়েই গ্রেটেস্ট শো অন আর্থে খেলা শুরু তার। এরপর ২০১০, ২০১৪, ২০১৮ সালের বিশ^কাপে খেলা। কিন্তু বিশ^কাপ আর জেতা হচ্ছিল না। ২০১৪ সালে ব্রাজিল বিশ^কাপের ফাইনালে উঠেও অল্পের জন্য বিশ^চ্যাম্পিয়ন হওয়া হয়নি। অতিরিক্ত সময়ের গোলে জার্মানির কাছে হার। ২০১৮ সালে হতাশাজনক পারফরম্যান্স প্রদর্শন করে দ্বিতীয় রাউন্ডে ফ্রান্সের কাছে ৩-৪ গোলে হেরে ছিটকে পড়া। অবশেষে কাতারের মাঠে ২০২২ সালে সেই ফ্রান্সকেই ফাইনালে ট্রাইব্রেকারে হারিয়ে মেসির বিশ^কাপ জয়ের স্বপ্নপূরণ। সে ম্যাচে টাইব্রেকারে গোলসহ তিন গোল। সাথে দিয়েগো ম্যারাডোনার মতো আর্জেন্টিনাকে এনে দিলেন বিশ^কাপ। তবে বিশ^কাপ জয়ে ম্যারাডোনাকে টপকাতে পারেননি। যুক্তরাস্ট্রের নিউজার্সির ম্যাট লাইফ স্টেডিয়ামে স্পেনের কাছে সেই অতিরিক্ত সময়ের গোলে ০-১ এ হেরে টানা দ্বিতীয় বিশ^সেরা হওয়ার সুযোগ হারানো ইন্টার মিয়ামির এই তারকার।
১৯৮৭ সালের ২৪ জুন আর্জেন্টিনার সান্তা ফে প্রদেশের রোজারিও শহরে জন্ম নেয়া মেসি স্থানীয় এভানডোরাডো গ্রানডোলি ক্লাবে ফুটবলে যাত্রা শুরু। হরমোন সমস্যার পর্ব ডিঙ্গিয়ে এরপর ম্যারাডোনারই সাবেক ক্লাব নিউওয়েলস ওল্ড বয়েজে পাঁচ মৌসুম কাটিয়ে ২০০০ সালে চলে আসেন বার্সোলোনার লা মাসিয়া অ্যাকাডেমিতে। এরপর বার্সেলোনা ‘সি’, বার্সেলোনা ‘বি’ দলের হয়ে খেলার পর ২০০৪ সালে যোগ দেন বার্সেলোনা মূল দলে। সেই থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত স্পেনের বিখ্যাত এই ক্লাবে। ২০০৫ সালে আর্জেন্টিনা সিনিয়র দলে অভিষেকের আগে ২০০৪ সালে অনূর্ধ্ব-২০ দলের জার্সি গায়ে তোলা।
রেকর্ড আট বারের ব্যালন ডি’অর জয়ী মেসি আটবার ফিফার বিশ^সেরা ফুটবলারের পুরস্কার জিতেছেন। ছয়বার দখলে নিয়েছেন ইউরোপিয়ান গোল্ডেন শু পুরস্কার। আর্জেন্টিনার হয়ে ২০৮ ম্যাচে ১২৬ গোল করা মেসি দেশকে দিয়েছেন সব ট্রফিই। ২০০৫ সালে নেদাল্যান্ডসে ১০ জুন থেকে ২ জুলাই অনুষ্ঠিত অনূর্ধ্ব-২০ বিশ^কাপে আর্জেন্টিনাকে চ্যাম্পিয়ন করিয়েছেন বলতে গেলে একক নৈপূণ্যেই। আসরে ছয় গোল দিয়ে হয়েছেন সর্বোচ্চ গোলদাতা। যদিও মেসির সেই আসর শুরু হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ০-১ গোলে হেরে। এরপর নক আউট পর্বের সব ম্যাচে গোল করে দলকে শিরোপা পাইয়ে দিয়েছেন। এর মধ্যে ফাইনালে নাইজেরিয়ার বিপক্ষে পেনাল্টিতে দুই গোল। যুব বিশ^কাপের পর ২০০৮ সালের বেইজিং অলিম্পিক গেমসে ফুটবলে স্বর্ণ জয়, ২০২১ ও ২০২৪ সালের কোপা আমেরিকা এবং ২০২২ সালের কোপা ফিনালেসিমা ট্রফি দিয়েছেন দেশকে।
এবারের বিশ^কাপে দুই অস্ট্রিয়া ও মিসরের বিপক্ষে পেনাল্টি মিস করেছিলেন মেসি। তবে আর্জেন্টিনার হয়ে ক্যারিয়ারের শেষ গোলটিও করেন এই স্পট কিকে। বেনিনের গোলরক্ষককে ডান দিকে ফেলে বাম পায়ের শটটি বাম দিক দিয়েই জালে জড়ান।
অবশ্য প্রথমার্ধ নিজেদের রক্ষণভাগ পোক্ত রাখে বেনিন। যে কারণে আর্জেন্টিনা গোলও পায়নি। তবে বিরতির পর মেসির ঝলক। ৪৮ মিনিটে নিকোলাস ওতামেন্দি, ৬১ মিনিটে নিকো পাজকে দিয়ে গোল করান আর্জেন্টিনার সদ্য বিদায়ী অধিনায়ক। এরপর ৭১ মিনিটে পেনাল্টি থেকে আর্জেন্টিনার হয়ে করলেন ১২৬ তম গোল।
আর্জেন্টিনার ফুটবলে সফল এই অধিনায়কের বিদায়কে স্মরণীয় করতে আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনেরও আয়োজনের কমতি ছিল না। সঙ্গীতানুষ্ঠান, লেজার শো (যেখানে স্প্যানিশ ভাষায় লেখা গ্রাসিয়াস, বিদায় ) সবই ছিল। ২০২২ বিশ^কাপ জয়ী সদস্যরা পরিবার নিয়ে স্টেডিয়ামে উপস্থিত ছিলেন।
পুরো পরিবার নিয়েই মাঠে আসেন মেসি। এরপর ছেলেক নিয়ে প্রবেশ করেন মাঠে। নির্ধারিত সময়ের আধাঘন্টা পরে শুরু হয় মেসির এই বিদায়ী ম্যাচ। ম্যাচের আগে মনুমেন্তাল স্টেডিয়ামের মাঠ কর্মীরা আর্জেন্টিনার বিশাল একটি জার্সী মাঠে বিছিয়ে দেন। যাতে লেখা ছিল গ্রাসিয়াস। এরপর গ্যালারিতে মেসি মেসি বলে সেøাগান। এদের এই উৎসবের আবহটা আরো স্মরণীয় হয়েছে মেসির গোল ও আর্জেন্টিনার জয়ে।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








