নিয়ম ভঙ্গের পদায়নে অসন্তোষ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে পুরনো প্রতিষ্ঠান

  শাহেদ মতিউর রহামন

Advertisement

আর্থিক অনিয়ম আর চেয়ারম্যানের স্বেচ্ছাচারিতায় কারিগরি শিক্ষা বোর্ডে শৃঙ্খলা ভেঙে পড়েছে। গত কয়েক বছরের ব্যবধানে নতুন চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো: রুহুল আমিনের যোগদানের পর থেকেই কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে বিরোধ আর অসন্তোষ চরম আকার ধারণ করেছে। বিশেষ করে চেয়ারম্যানের পছন্দমতো কর্মকর্তাদের বাইরে থেকে প্রেষণে বোর্ডে নিয়োগ দেয়াকে কেন্দ্র করে বোর্ডের স্থায়ী কর্মকর্তাদের মধ্যে অসন্তোষ আরো প্রকট হচ্ছে। এরই মধ্যে বোর্ডের এই বিরোধ বা শৃঙ্খলা ভঙ্গের কারণে বোর্ড নিয়ন্ত্রিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রভাব পড়ছে। ইতোমধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে বা বন্ধ হওয়ার পথে রয়েছে প্রায় এক হাজার প্রতিষ্ঠান। অনেক প্রতিষ্ঠান ইচ্ছা করেই আর কোনো শিক্ষার্থী ভর্তি নিচ্ছেন না। বোর্ডের অভ্যন্তরের অব্যবস্থাপনা এখন বাইরের প্রতিষ্ঠানগুলোতে পড়তে শুরু করেছে। 
সূত্র জানায় ইতোমধ্যে শিক্ষার্থী ভর্তি কার্যক্রম পরিচালনা না করায় ডিপ্লোমা পর্যায়ের ৮৬টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয়া হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের পাঠদানের অনুমতি কেন বাতিল হবে না, আগামী ১৫ অক্টোবরের মধ্যে এ ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে। একইসাথে ভোকেশনাল প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ইতোমধ্যে ৬২১টি প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে। দীর্ঘদিন শিক্ষার্থী ভর্তি কার্যক্রম পরিচালনা না করায় এইচএসসি (বিএমটি) পর্যায়ের ২৬টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাঠদানের অনুমতি কেন বাতিল হবে না মর্মে ব্যাখ্যা চেয়েছে বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ড।
 সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলে জানা গেছে মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন থাকা সত্ত্বেও বোর্ডের বেশ কয়েকজন সিনিয়র কর্মকর্তাদের চতুর্থ গ্রেডে পদোন্নতি বা পদায়ন না দিয়ে চেয়ারম্যান নিজেই পছন্দের লোকজন এনে বোর্ডে বিভিন্ন শাখা বন্ধ থাকা সত্ত্বেও কর্মকর্তা বসিয়ে রেখে বেতন দিচ্ছেন। সূত্র জানায়- সিভিটি সেল বন্ধ থাকা সত্ত্বেও একজন ডিরেক্টর এনে তাকে বসিয়ে রেখেই মাসে মাসে মোটা অঙ্কের বেতন দিচ্ছেন। অনুরূপভাবে বোর্ডের মূল্যায়ন কর্মকর্তা মাজেদা বেগম অসুস্থ, হাঁটাচলা করতে পারে না তা সত্ত্বেও বিকল্প কাউকে দায়িত্ব না দিয়ে চেয়ারম্যানের নির্দেশে তাকে বাসায় রেখেই বেতনভাতা দিচ্ছেন। অপর দিকে পরিদর্শক বি এম আমিনুল ইসলাম আইন বহির্ভূত পরিদর্শন কাজ করছেন। কিন্তু তিনি পরিদর্শন কমিটির সদস্য না হওয়ায় নিয়মমতো তিনি এসব পরিদর্শন করতে পারেন না। সূত্র জানায়, গত মাসে বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো: রুহুল আমিন ও সচিব মো: আল মাসুদ করিমের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) লিখিত অভিযোগ দেয়া হয়েছে। গত ৩০ আগস্ট ২০২৬ তারিখের ওই অভিযোগপত্রে বোর্ডের প্রশাসন, পরিদর্শন, সভা-সেমিনার, নিয়োগ-বদলি, প্রকল্প ও ক্রয় কার্যক্রমে নানা অনিয়মের কথা তুলে ধরা হয়েছে এবং বিভিন্ন মিটিংকে সভা সেমিনার ওয়ার্কশপ বানিয়ে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে।
সূত্র আরো জানায়, বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডে সিস্টেম অ্যানালিস্ট পদ দু’টি থাকলেও নিয়ম বহির্ভূতভাবে ডেপুটেশনে নিয়োগবিধি না মেনে অতিরিক্ত আরো একজনকে সিস্টেম অ্যানালিস্ট পদে বসিয়ে রেখে অতিরিক্ত বেতনভাতা প্রদান করছেন। শুধু তা-ই নয়, একজন মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারকে সিস্টেম এনালিস্ট পদে বসানো হয়েছে। আবার সরকারি টিএসসি থেকে নিয়োগবিধি অনুসারে বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডে সরাসরি প্রেষণে আসার কোনো সুযোগ না থাকলেও তাকে নিয়মবহির্ভূতভাবে আনা হয়েছে। উপপরিচালক প্রকাশনা পদে টিএসসি থেকে আরো একজনকে নিয়োগবিধি অমান্য করে এনে বসিয়ে বসিয়ে বেতন দিচ্ছেন। অন্য দিকে অনেক যোগ্য অফিসার থাকা সত্ত্বেও তাদের প্রমোশন না দিয়ে বা তাদের যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও সেই পদে না বসিয়ে অর্থের বিনিময়ে মন্ত্রণালয়ের কিছু অসাধু অফিসারের মাধ্যমে ডেপুডেশনে অযোগ্য লোক এনে বোর্ডের অর্থ অপচয় করা হচ্ছে, যাতে চেয়ারম্যানের স্বেচ্ছাচারিতার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। বিষয়টি নিয়ে বোর্ডের অনেক কর্মকর্তার ভেতরে ক্ষোভ বিরাজ করেছে। কিন্তু তারা মুখ খুলতে ভয় পাচ্ছে।  
এ দিকে বিভিন্ন কারিগরি প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকদের অনেক পদ খালি থাকায় শিক্ষা কার্যক্রমও চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে। সম্প্রতি কারিগরি প্রতিষ্ঠানের শূন্য পদের চাহিদা সংগ্রহ শেষ করেছে কারিগরি শিক্ষা অধিদফতর। কয়েক দফায় তথ্য সংগ্রহের পর প্রায় দুই হাজার ১৪০টি প্রতিষ্ঠানে শূন্য পদ রয়েছে বলে জানা গেছে। অধিদফতরের এক কর্মকর্তা জানান, সফটওয়্যার সংক্রান্ত রিপোর্ট পাওয়ার পর বিষয়টি নিয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত মহাপরিচালকের সাথে আলোচনা করা হবে। এরপরই বদলি আবেদনের সময়সূচি নির্ধারণ করা হতে পারে।
কারিগরি শিক্ষা বোর্ডর অসন্তেÍাষ নিয়ে বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো: রুহুল আমিন নয়া দিগন্তকে জানান, নিয়মের বাইরে কাউকে নিয়োগ বা পদোন্নতি দেয়ার কোনো সুযোগ নেই। আর এই পদায়নে আমার ন্যূনতম কোনো হাত নেই। সব কিছু মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমেই হচ্ছে। প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান হিসেবে আমার এখানে ক্ষমতার অপব্যবহার করার কোনো সুযোগও নেই।