
রয়টার্স ও আলজাজিরা
ইয়েমেনে হাউছি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে এক লাখ সেনার সমন্বয়ে বড় ধরনের নতুন সামরিক অভিযানের পরিকল্পনা করছে সৌদি আরব। লোহিত সাগরের কৌশলগত বাণিজ্যিক পথ হাউছিদের হাত থেকে মুক্ত করতে রিয়াদ এই প্রস্তুতি নিচ্ছে। উপকূলীয় অঞ্চল পুনরুদ্ধার কিংবা ইয়েমেনের একাধিক সামরিক অঞ্চলে একযোগে জোরালো আক্রমণের মতো বিকল্প পথ বিবেচনায় রয়েছে। আঞ্চলিক ও পশ্চিমা সূত্রের দেয়া তথ্যানুযায়ী, আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই স্থলভাগে ইয়েমেনি বাহিনীর নেতৃত্ব এবং সৌদির বিমান হামলার মাধ্যমে এই যৌথ যুদ্ধ শুরু হতে পারে। ওয়াশিংটন এতে গোয়েন্দা তথ্য দিয়ে সহায়তা করছে এবং ইউরোপীয় ও আঞ্চলিক কয়েকটি মিত্রদেশ প্রতিরক্ষামূলক সহায়তা জোগাচ্ছে।
অভিযানের মূল লক্ষ্য সম্প্রতি লোহিত সাগরসংলগ্ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বাব আল-মানদেব প্রণালী ও তার আশপাশের দ্বীপাঞ্চলে হাউছিদের অর্জিত সাফল্য নস্যাৎ করা। হরমুজ প্রণালীতে অস্থিরতার কারণে লোহিত সাগরের এই প্রবেশপথটি এশিয়া ও ভূমধ্যসাগরীয় বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত সংবেদনশীল হয়ে উঠেছে। রিয়াদ মনে করে, বাব আল-মানদেব প্রণালী হাউছিদের দখলে থাকাবস্থায় তাদের সাথে আর কোনো কার্যকর রাজনৈতিক সংলাপ সম্ভব নয়। যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদির সামরিক কৌশলবিদরা মনে করছেন, এবারের সম্ভাব্য হামলা ২০১৫ সালের সঙ্ঘাতের মতো দীর্ঘমেয়াদি না হয়ে সুনির্দিষ্ট উপকূলীয় এলাকা দখলের দিকেই বেশি জোর দেবে।
২৪ ঘণ্টায় এক হাজার পাঁচ শতাধিক হাউছি হতাহতের দাবি
এ দিকে ইয়েমেনের রণক্ষেত্রে এরই মধ্যে সংঘর্ষ চরম আকার ধারণ করেছে। দেশটির আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারি বাহিনী দাবি করেছে, তারা গত ২৪ ঘণ্টায় প্রায় ৫০০টি সামরিক অপারেশন চালিয়ে এক হাজার ৫৪০ জন হাউছি সদস্যকে হত্যা বা আহত করেছে। সরকারি বাহিনীর মুখপাত্র কর্নেল মাজেদ আবদুল্লাহ আল-নাজিলি জানান, যুদ্ধবিমান, ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র ও ভারী কামানের সাহায্যে তারা এসব আক্রমণ পরিচালনা করেছেন। এই সংঘর্ষের মূল কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল তাইজ প্রদেশ, যেখানে হাউছিদের অগ্রযাত্রা প্রতিহত করার কথা জানানো হয়েছে। নিরাপত্তা শঙ্কার কারণ দেখিয়ে আজ ইয়েমেনি সেনাবাহিনী তাইজের গুরুত্বপূর্ণ ‘আল-হুবান’ ক্রসিংটি বন্ধ করে দিয়েছে। টানা ৯ বছর বন্ধ থাকার পর ২০২৪ সালে মানবিক কারণে সাধারণ নাগরিকদের যোগাযোগের জন্য রাস্তাটি খুলে দেয়া হয়েছিল। তবে সম্প্রতি হাউছিরা ওই পথ দিয়ে তাইজে অনুপ্রবেশের চেষ্টা ও সামরিক শক্তি বৃদ্ধি করায় সড়কটি আবার সিলগালা করা হলো। ২০২২ সালে হওয়া দু’পক্ষের নাজুক যুদ্ধবিরতি গত জুলাইয়ে ভেঙে পড়ার পর পুরো ইয়েমেনে এই যুদ্ধ ব্যাপক আকার ধারণ করে।
অনাহারের দ্বারপ্রান্তে প্রতি ৪টি পরিবারের ৩টি
রণক্ষেত্রের সঙ্ঘাত বাড়ার সরাসরি প্রভাব গিয়ে পড়েছে বেসামরিক নাগরিকদের ওপর। জাতিসঙ্ঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) ভয়াবহ সতর্কবার্তা জারি করে জানিয়েছে, সঙ্ঘাতের কারণে ইয়েমেনে তীব্র খাদ্যসঙ্কট দেখা দিয়েছে এবং সরকারনিয়ন্ত্রিত অঞ্চলের প্রতি চারটি পরিবারের মধ্যে তিনটি (৭৪ শতাংশ) তাদের মৌলিক খাদ্যের চাহিদা মেটাতে পারছে না। দেশটি ৯০ শতাংশ খাদ্য আমদানির ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় সরবরাহ শৃঙ্খল ভেঙে পড়ে এই ভয়াবহ অনাহার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। ডব্লিউএফপির সহকারী নির্বাহী পরিচালক ম্যাথিউ হোলিংওয়ার্থ গতকাল জেনেভায় সতর্ক করে বলেন, এই চলমান সঙ্ঘাত আন্তর্জাতিক পর্যায়ে খাদ্য ও জ্বালানির দাম বাড়িয়ে দেয়ার পাশাপাশি ইয়েমেনকে অভূতপূর্ব বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। বর্তমানে দেশটির এক কোটি ৮৩ লাখ মানুষ চরম খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় দিন কাটাচ্ছে, যার মধ্যে পাঁচ বছরের কম বয়সী ২২ লাখ শিশু মারাত্মক পুষ্টিহীনতায় আক্রান্ত। সংস্থাটি ১৫ লাখ মানুষের জরুরি ত্রাণের জন্য ১০ কোটি ৯০ লাখ ডলার তহবিল চেয়েছে। ইতোমধ্যে সঙ্ঘাতের মুখে এক লাখ ৪৯ হাজারেরও বেশি মানুষ গৃহহীন হয়ে পড়েছে এবং হাজার হাজার মানুষ দেশ ছেড়ে জিবুতিসহ প্রতিবেশী দেশগুলোতে আশ্রয় নিচ্ছে।
_GDN_970x90px_English.gif&w=2048&q=75)








