
রাজশাহী ব্যুরো
রাজশাহী রেলওয়ে স্টেশনে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) এক শিক্ষার্থীকে মারধরের ঘটনাকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। ঘটনার প্রতিবাদে রেললাইনে আগুন জ্বালিয়ে বিক্ষোভের পাশাপাশি স্টেশনে ভাঙচুর চালান বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর (আরএনবি) চার সদস্যকে সাময়িক বরখাস্ত করেছে রেল কর্তৃপক্ষ। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে মধ্য রাতে ঘটনাস্থলে যান বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, পুলিশ ও রাজশাহী সিটি করপোরেশনের প্রশাসক।
রোববার রাত সাড়ে ৯টার দিকে রাজশাহী রেলস্টেশনে রাবির ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী আইয়ুব আলীকে মারধরের অভিযোগ ওঠে। পরে আহতাবস্থায় তাকে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, চাচাকে রিসিভ করতে আইয়ুব আলী রেলস্টেশনে গিয়েছিলেন। এ সময় স্টেশনে ইংরেজি বিভাগের দুই শিক্ষার্থীর সাথে দায়িত্বে থাকা আরএনবি সদস্যদের কথাকাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে আইয়ুব আলী ওই শিক্ষার্থীদের পক্ষে কথা বলতে গেলে তার সাথেও আরএনবি সদস্যদের তর্ক-বিতর্ক হয়। পরে তাকে মারধর করা হয় বলে অভিযোগ ওঠে।
আহত আইয়ুব আলীকে দেখতে রাতে রামেক হাসপাতালে যান রাবি ভিসি অধ্যাপক ফরিদুল ইসলাম ও প্রক্টর অধ্যাপক মাহবুবুর রহমান। ভিসি বলেন, সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকরা আইয়ুবকে ২৪ ঘণ্টা পর্যবেক্ষণে রাখার কথা জানিয়েছেন। তার অবস্থা আশঙ্কাজনক বলেও জানান তিনি। বিষয়টি রাজশাহী মহানগর পুলিশের কমিশনার ও পশ্চিমাঞ্চল রেলের মহাব্যবস্থাপককে জানানো হয়। ভিসি আরো বলেন, এর আগে দুই-তিনবার রাবি শিক্ষার্থীদের রেলওয়ের কর্মচারীরা মারধর করেছেন। এসব ঘটনায় দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান তিনি।
এ দিকে শিক্ষার্থীর ওপর হামলার প্রতিবাদে এক ঘণ্টার আলটিমেটাম দিয়ে ফেসবুকে পোস্ট দেন রাকসুর জিএস সালাহউদ্দিন আম্মার। তিনি এক ঘণ্টার মধ্যে জড়িতদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানান। দাবি না মানলে আন্দোলন আরো কঠোর করার হুঁশিয়ারি দেন তিনি।
এরপর রাত সাড়ে ১০টার দিকে রাজশাহী রেলস্টেশনে জড়ো হতে থাকেন রাবি শিক্ষার্থীরা। একপর্যায়ে তারা রেললাইনে আগুন জ্বালিয়ে বিক্ষোভ করেন।
শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভের মধ্যেই উদ্ভূত পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে আরএনবির চার সদস্যকে সাময়িক বরখাস্ত করে রেল কর্তৃপক্ষ। রেলওয়ের রাজশাহী শাখার চিফ কমান্ড্যান্ট আশাবুল ইসলাম স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, রাজশাহী রেলওয়ে স্টেশনে সংঘটিত অনাকাক্সিক্ষত পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে আরএনবির চার সদস্যকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। বরখাস্ত হওয়া সদস্যরা হলেন- মো: আরিফ হোসেন, মো: রোকন উদ্দীন, মো: শফিকুল ইসলাম ও মো: শাহাদত হোসেন।
তবে চার আরএনবি সদস্যকে বরখাস্তের পরও সন্তুষ্ট না হয়ে শিক্ষার্থীরা রাজশাহী রেলওয়ে স্টেশনের দিকে রওনা হন। পরে সেখানে শতাধিক শিক্ষার্থী জড়ো হন। একপর্যায়ে তারা স্টেশনের বিভিন্ন স্থাপনায় ভাঙচুর চালান। এ সময় স্টেশনের সিসিটিভি, হেল্পডেস্ক ও জানালার কাচ ভাঙচুর করা হয়।
রাকসুর এজিএস সালমান সাব্বির বলেন, রেললাইন ও স্টেশনকে কেন্দ্র করে রেল কর্মচারী, কর্মকর্তা ও টিটিইদের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা বারবার হয়রানি ও নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। এসব ঘটনার প্রতিবাদ এবং পুনরাবৃত্তি ঠেকাতেই তারা অবস্থান কর্মসূচি পালন করছেন। রাতের মধ্যে সমস্যার সমাধান না হলে এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সহযোগিতা না করলে আন্দোলন আরো কঠোর করার কথা জানান তিনি।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরিয়াল টিম ঘটনাস্থলে যায়। পরে প্রক্টর অধ্যাপক মাহবুবুর রহমানসহ প্রায় ২০ থেকে ৩০ জন শিক্ষক স্টেশনে গিয়ে শিক্ষার্থীদের শান্ত করার চেষ্টা করেন। এ সময় রাজশাহী মহানগর পুলিশের সদস্যরাও ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেন। পুলিশের উদ্দেশে শিক্ষার্থীদের ‘ভুয়া ভুয়া’ স্লোগান দিতেও শোনা যায়।
রাত দেড়টার দিকে রাজশাহী সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মাহফুজুর রহমান রিটন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও পুলিশ কর্মকর্তাদের সাথে নিয়ে রেলওয়ে স্টেশনে যান। তিনি বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীদের শান্ত হওয়ার আহ্বান জানান। মাহফুজুর রহমান রিটন বলেন, ঘটনাটি অত্যন্ত অনাকাক্সিক্ষত। রেলওয়ে সবার সম্পদ উল্লেখ করে তিনি সবাইকে শান্ত থাকার অনুরোধ জানান। শিক্ষার্থীদের দাবিগুলো যৌক্তিক উল্লেখ করে নিয়মানুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার আশ্বাস দেন তিনি।
পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক মাহবুবুর রহমানও শিক্ষার্থীদের শান্ত থাকার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, প্রক্টরিয়াল টিম ঘটনাস্থলে যাওয়ার পর শিক্ষার্থীরা তাদের কথা শুনেছেন। পরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়েছে।
পরে রাত ২টার দিকে শিক্ষার্থীরা স্টেশন এলাকা ছেড়ে যান।
শিক্ষার্থীরা রেলওয়ের প্রতিপক্ষ নয়- পশ্চিমাঞ্চলের জিএম
এ দিকে গতকাল সোমবার বেলা সাড়ে ৩টার দিকে রাজশাহী রেলস্টেশনে ভাঙচুরের ক্ষয়ক্ষতি পরিদর্শন করেন রেলওয়ে পশ্চিমাঞ্চলের (রাজশাহী) মহাব্যবস্থাপক (জিএম) আহম্মদ হোসেন মাসুম। এ সময় রেলওয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের একটি দল তার সাথে ছিল।
পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের জিএম বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা কখনো রেলওয়ের প্রতিপক্ষ হতে পারে না; বরং তাদের সাথে সুসম্পর্ক থাকা দরকার। কোনো ভুল বোঝাবুঝি বা দূরত্ব তৈরি হলে তা আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করতে হবে।’ রোববার রাতের ঘটনা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, প্রথম দিকে বিষয়টি সমাধান হয়ে গিয়েছিল। পরে একজন শিক্ষার্থী আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার ঘটনায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে উত্তেজনা দেখা দেয়। এরপর রাজশাহী রেলস্টেশনে রাষ্ট্রীয় সম্পদে যে ভাঙচুর হয়েছে, তা অত্যন্ত দুঃখজনক।
ভাঙচুরের ক্ষয়ক্ষতি প্রসঙ্গে জিএম বলেন, সরেজমিন ক্ষয়ক্ষতি দেখা হয়েছে। এখন ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ করা হবে। ভাঙচুরের কারণে রোববার রাতে একটি ট্রেন চলাচল করতে পারেনি। এতে যাত্রীরা দুর্ভোগে পড়েন। ট্রেনটিতে ছোট শিশুও ছিল বলে জানান তিনি।
তদন্তের বিষয়ে আহম্মদ হোসেন মাসুম বলেন, রেলওয়ের পক্ষ থেকে ইতোমধ্যে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। এ ছাড়া বিভাগীয় কমিশনারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আরো একটি পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে। সাময়িক বরখাস্ত হওয়া চার কর্মচারীর বিষয়ে তদন্ত প্রতিবেদন ও সংশ্লিষ্ট রেকর্ডের আলোকে পরবর্তী ব্যবস্থা নেয়া হবে। ভাঙচুরের ঘটনায় আইনি পদক্ষেপও নেয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি।
শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে জিএম বলেন, রেলওয়ের সাথে কোনো সমস্যা হলে বসে আলোচনা করে সমাধান করা হবে। তবে সাধারণ যাত্রীরা যেন ভোগান্তির শিকার না হন এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদের ক্ষতি না হয়, সে বিষয়ে সবাইকে দায়িত্বশীল থাকার আহ্বান জানান তিনি। রোববার রাতের ঘটনার পর পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলেও শিক্ষার্থী ও রেলওয়ের মধ্যে যাতে কোনো ধরনের দূরত্ব তৈরি না হয়, সে জন্য বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সাথে নিয়মিত আলোচনা করার কথাও জানান জিএম।







