মতামত
মতামত। নয়া দিগন্ত গ্রাফিক্স

দেশের ব্যাংকিং খাতের সঙ্কট নিয়ে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ প্রশ্নগুলোর একটি হলো, ইসলামী ব্যাংকগুলোই কেন বারবার রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, মালিকানা পরিবর্তন, ঋণ অনিয়ম, পরিচালনা পর্ষদ ভাঙাগড়া এবং শেষ পর্যন্ত একীভূতকরণের কেন্দ্রে চলে আসে? 
দেখা যায়, ২০১৭ সালে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রণ পরিবর্তনের পর সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকসহ কয়েকটি শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক এস আলম-সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে যায়। পরে এসব ব্যাংকের বড় অংশ গভীর সঙ্কটে পড়ে। পাঁচটি দুর্বল ইসলামী ব্যাংক একীভূত করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠনের উদ্যোগ সেই সঙ্কট স্পষ্ট করেছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলও বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে দুর্বল মালিকানা কাঠামো, অতিরিক্ত সংশ্লিষ্ট ঋণ, দুর্বল ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও নিয়ন্ত্রক তদারকির সীমাবদ্ধতার কথা উল্লেখ করেছে।
কিন্তু এখানেই প্রশ্নের শেষ নয়, বরং শুরু। এই সঙ্কট কি কেবল দুর্বল সুশাসন, মালিকানার কেন্দ্রীভবন ও ঋণ অনিয়মের অর্থনৈতিক কাহিনী, নাকি এর সাথে রাজনৈতিক ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, ইসলামপন্থী রাজনীতির প্রতি রাষ্ট্রীয় দৃষ্টিভঙ্গি এবং ইসলামী ব্যাংকিংয়ের সামাজিক ও অর্থনৈতিক গুরুত্বও জড়িয়ে আছে? ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশের সাথে জামায়াতে ইসলামীর ঐতিহাসিক সম্পর্ক নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক থাকতেই পারে; কিন্তু এ ধরনের রাজনৈতিক সম্পর্কের অভিযোগ নেই এমন অন্য ইসলামী ব্যাংকও কেন নিয়ন্ত্রণ পরিবর্তন ও আর্থিক সঙ্কটে পড়ল? এর উত্তর খুঁজতে প্রয়োজন ঘটনা, নথি, মালিকানা, ঋণপ্রবাহ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ধারাবাহিক অনুসন্ধান।
ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি ঘিরে রাজনৈতিক প্রশ্ন বাস্তব। ২০১৭ সালের ৫ জানুয়ারি ব্যাংকটির তৎকালীন চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালককে গোয়েন্দা সংস্থার কার্যালয়ে নিয়ে পদত্যাগে বাধ্য করার অভিযোগ এবং পরে নতুন নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার ঘটনা একাধিক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। সে সময় ব্যাংকটির সাথে জামায়াতে ইসলামীর ঐতিহাসিক সম্পর্কও রাজনৈতিক আলোচনার অংশ ছিল। ফলে নিয়ন্ত্রণ পরিবর্তনের পেছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ছিল কি না, এ প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
কিন্তু অন্য ইসলামী ব্যাংকের ক্ষেত্রে একই ব্যাখ্যা কতটা প্রযোজ্য? সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের ক্ষেত্রেও ২০১৭ সালে পরিচালনা পর্ষদে পরিবর্তন এবং এস আলম-সংশ্লিষ্ট মালিকানা বৃদ্ধির ঘটনা ঘটেছে। অনুসন্ধানে পরিচালকদের ওপর চাপ প্রয়োগ এবং সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীর সাথে বড় ঋণ সম্পর্কের অভিযোগও সামনে এসেছে। ফলে সমস্যা নিছক জামায়াত-সম্পর্ক দিয়ে ব্যাখ্যা করা যথেষ্ট কি না, সেটি বড় প্রশ্ন। ইসলামী ব্যাংকিংয়ের নিজস্ব পরিচয়, আমানতভিত্তি ও অর্থনৈতিক গুরুত্বও এখানে বিবেচ্য। 
বাংলাদেশে ইসলামী অর্থব্যবস্থা ঘিরে রাজনৈতিক বিতর্ক নতুন নয়। অধ্যাপক আবুল বারকাত ২০১২ সালে ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক শক্তির অর্থনৈতিক প্রভাব এবং ব্যাংকসহ বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। ফলে ইসলামী ব্যাংকিংয়ের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক পরিচয় একাকার করে দেখার প্রবণতা দীর্ঘদিনের। তবে ইসলামী ব্যাংককে নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের প্রতিষ্ঠান হিসেবে চিহ্নিত করা যেমন যথার্থ নয়, তেমনই তার ধর্মীয় ও অর্থনৈতিক পরিচয় অপ্রাসঙ্গিক বলে এড়িয়ে যাওয়া যায় না।
ইসলামী ব্যাংকিং বাংলাদেশে একটি বড় ও প্রতিষ্ঠিত আর্থিক ব্যবস্থা। এর গুরুত্ব শুধু ধর্মীয় পরিচয়ে নয়; এর সাথে যুক্ত বিপুল আমানত, বিনিয়োগ, ব্যবসা, কর্মসংস্থান ও বিশাল গ্রাহকভিত্তি। তাই একটি বড় ইসলামী ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ শুধু মালিকানা পরিবর্তন নয়; এর সাথে যুক্ত হয় বৃহৎ আর্থিক সম্পদ ও অর্থনৈতিক প্রবাহের ওপর প্রভাব বিস্তারের সুযোগ। ইসলামী ব্যাংকিংয়ে আস্থা নষ্ট হলে তার প্রভাব একটি বা দু’টি প্রতিষ্ঠানে সীমাবদ্ধ থাকে না।
২০১৭ সালের পর ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ এবং এস আলম-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে বিপুল ঋণ সম্পর্ক নিয়ে গুরুতর অভিযোগ ও অনুসন্ধান প্রকাশিত হয়েছে। সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক নিয়েও একই রকম অভিযোগ সামনে এসেছে। এসব অভিযোগের স্বাধীন তদন্ত প্রয়োজন। 
সংশ্লিষ্ট ঋণ যদি মালিকানা বা প্রভাবের কারণে যথাযথ ঝুঁকি যাচাই ছাড়াই দেয়া হয়ে থাকে, তাহলে তার ক্ষতি শেষ পর্যন্ত বহন করেন আমানতকারী ও সাধারণ শেয়ারহোল্ডার।
পাঁচটি ইসলামী ব্যাংকের একীভূতকরণ অর্থনৈতিকভাবে প্রয়োজনীয় হতে পারে; কিন্তু যখন প্রচলিত ব্যাংকেরও অনেকগুলো দুর্বল, তখন কেন সঙ্কটাপন্ন পাঁচটি ব্যাংকই ইসলামী? এই প্রশ্নের উত্তর রাজনৈতিক অনুমান দিয়ে নয়, একই মানদণ্ডে সব দুর্বল ব্যাংকের সম্পদমান, মূলধন ঘাটতি, খেলাপি বিনিয়োগ, মালিকানা ও সুশাসনের তথ্য প্রকাশের মাধ্যমে দেয়া প্রয়োজন। একই ধরনের আর্থিক দুর্বলতার ক্ষেত্রে ভিন্ন নীতি প্রয়োগ হলে নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থার নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে।
এর সাথে আরো বড় প্রশ্ন হলো, এস আলম কিভাবে একাধিক ইসলামী ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণে এতটা প্রভাবশালী হয়ে উঠল এবং তৎকালীন সরকার ও নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর ভূমিকা কী ছিল? কেন কোনো সুদভিত্তিক ব্যাংক একইভাবে দখলের শিকার হলো না? প্রকাশিত অনুসন্ধানে মালিকানা বিস্তার ও নিয়ন্ত্রক অনুমতির নানা তথ্য উঠে এসেছে। তাই প্রশ্ন উঠতেই পারে, এটি কি কেবল একটি গোষ্ঠীর আর্থিক স্বার্থের বিষয় ছিল, নাকি এর ফলে ইসলামী ব্যাংকিংকে দুর্বল ও বিতর্কিত করার বৃহত্তর পরিণতি তৈরি হয়েছে? এর উত্তর অনুমানে নয়, স্বাধীন তদন্ত ও নথিভিত্তিক জবাবদিহির মাধ্যমে দিতে হবে।
পাঁচটি ব্যাংকের আমানতকারীদের অর্থ উত্তোলন নিয়ে দীর্ঘ অনিশ্চয়তা এবং ২০২৬ সালের মার্চে বাংলাদেশ ব্যাংকের সামনে তাদের বিক্ষোভ পুরো ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থার জন্যই সতর্কসঙ্কেত। আমানতকারীদের যদি নিজের অর্থ ফেরত পেতে রাস্তায় নামতে হয় তাহলে ক্ষতি শুধু সংশ্লিষ্ট পাঁচটি ব্যাংকে সীমাবদ্ধ থাকে না; পুরো ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করে। 
এর প্রভাব ভবিষ্যৎ উদ্যোক্তাদের ওপরও পড়তে পারে। তারা যদি মনে করেন, নীতিগত বা নিয়ন্ত্রক পরিবর্তনের সময় ইসলামী ব্যাংক অনিশ্চিত নিয়ন্ত্রণ পরিবর্তন, পুনর্গঠন কিংবা একীভূতকরণের ঝুঁকিতে পড়তে পারে, তাহলে নতুন ইসলামী ব্যাংক প্রতিষ্ঠার আগ্রহ কমে যেতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে এতে ইসলামী ব্যাংকিংয়ের বিস্তার, প্রতিযোগিতা ও প্রাতিষ্ঠানিক বৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে।
অন্য দিকে প্রচলিত ব্যাংকের ইসলামী শাখা ও উইন্ডোর বিস্তারও নতুন প্রশ্ন তৈরি করছে। ইসলামী ব্যাংকিং শুধু একটি নাম নয়; এর সাথে শরিয়াহভিত্তিক বিনিয়োগ কাঠামো, চুক্তির ধরন, ঝুঁকি বণ্টন ও তদারকির প্রশ্ন জড়িত। তাই এসব শাখা ও উইন্ডোতে শরিয়াহ মানদণ্ড কতটা অনুসৃত হচ্ছে, তদারকি কতটা স্বাধীন এবং গ্রাহককে কিভাবে তা জানানো হচ্ছে, এসব বিষয়ে স্বচ্ছতা প্রয়োজন। 
কোনো ব্যাংক দুর্বল হয়ে পড়লে তার সংস্কার, পুনর্গঠন বা একীভূতকরণ অর্থনৈতিকভাবে প্রয়োজন হতে পারে। বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংক-সমাধান কাঠামোতেও দুর্বল ব্যাংকের পুনর্গঠন, অধিগ্রহণ, একীভূতকরণ কিংবা প্রয়োজন হলে অবসানের মতো ব্যবস্থার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু একটি ব্যাংকের সঙ্কটের অর্থনৈতিক ব্যাখ্যা থাকলেই তার সাথে সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক ও আদর্শিক প্রশ্নগুলো অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যায় না। ব্যাংক রক্ষার নামে যদি শুধু  প্রভাবশালী মালিকানার রদবদল ঘটে, তাহলে কাঙ্ক্ষিত সংস্কারের উদ্দেশ্য ও নিরপেক্ষতা দু’টিই প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে।
এখান থেকেই একটি বৃহত্তর জনমতের ধারণা সামনে আসে। জনপরিসরে এমন ধারণা রয়েছে যে, বাংলাদেশে ভারতের প্রভাব বিস্তারের সহযোগী এ দেশীয় শক্তির কাছে জামায়াত ও জামায়াত-মনস্ক বৃহত্তর ইসলামী চিন্তার অনুসারীরা রাজনৈতিক অন্তরায় হিসেবে বিবেচিত। সেই প্রেক্ষাপটে জামায়াত-সংশ্লিষ্ট বলে বিবেচিত প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক ভিত্তি দুর্বল করা এবং ইসলামী ব্যাংকিংকে শক্তিশালী বিকল্প অর্থনৈতিক ব্যবস্থা হিসেবে বিকশিত হতে না দেয়ার কোনো রাজনৈতিক আগ্রহ ছিল কি না, সে প্রশ্নও ওঠে। 
তবে এসব দাবির সত্যতা নির্ধারণে নথিভিত্তিক অনুসন্ধান প্রয়োজন। মূল অনুসন্ধানের প্রশ্ন হওয়া উচিত, ইসলামী ব্যাংকের ধর্মীয় পরিচয়, ঐতিহাসিক রাজনৈতিক সম্পর্ক ও বিপুল আমানতভিত্তি কি কোনো রাজনৈতিক বা ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর কাছে এসব প্রতিষ্ঠানকে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে আকর্ষণীয় করে তুলেছিল? এর উত্তর খুঁজতে হলে মালিকানা পরিবর্তন, শেয়ার অধিগ্রহণের অর্থের উৎস, ঋণপ্রবাহ, সুবিধাভোগী এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার ভূমিকা পর্যালোচনা করতে হবে।
এখানে একটি মৌলিক প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ, ব্যাংক কার
ব্যাংকের আমানত কোনো রাজনৈতিক দলের বা ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর ব্যক্তিগত সম্পদ নয়। ইসলামী ব্যাংকগুলোর সংস্কারে তাই একটি নীতি স্পষ্ট হওয়া জরুরি। দেশের অন্যান্য বেসরকারি ব্যাংকের মতোই যোগ্যতা, উপযুক্ততা যাচাই, স্বার্থের সঙ্ঘাত, মালিকানা স্বচ্ছতা এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন প্রক্রিয়া প্রযোজ্য হবে। পার্থক্য থাকবে ব্যাংকের পণ্য, বিনিয়োগ পদ্ধতি ও শরিয়াহ তদারকিতে; রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণে নয়। পর্ষদে রাজনৈতিক আনুগত্যের পরিবর্তে দক্ষতা, সততা ও অভিজ্ঞতার গুরুত্ব দিতে হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের দায়িত্ব হবে সব ব্যাংকের ক্ষেত্রে একই আইনি মানদণ্ড প্রয়োগ করা। কোনো ব্যাংক পর্ষদ অনিয়মে জড়িত থাকলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নিতে হবে; কিন্তু সেখানে আরেকটি রাজনৈতিক বা ব্যবসায়ী গোষ্ঠীকে বসানো সংস্কার নয়। ব্যাংক পুনর্গঠনের প্রতিটি পর্যায়ে আমানতকারী, শেয়ারহোল্ডার ও সাধারণ জনগণকে স্বচ্ছ তথ্য জানাতে হবে। 
বাংলাদেশের প্রয়োজন একটি পূর্ণাঙ্গ, নিরপেক্ষ ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যাংকিং তদন্ত। জানাতে হবে কে কিভাবে ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ নিলো, কারা শেয়ার কিনল, অর্থের উৎস কী ছিল, কার অনুমোদনে ঋণ দেয়া হলো, কোথায় অর্থ গেল এবং কারা সুবিধা পেল। তদন্তে ইসলামী ও প্রচলিত উভয় ধরনের ব্যাংককেই অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। কারণ কোনো ব্যাংক রাজনৈতিক দলের সম্পদ নয়, কোনো ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর ব্যক্তিগত ভাণ্ডারও নয়। 
লেখক : অর্থনীতিবিদ গবেষক ও কলামিস্ট
mizan12bd@yahoo.com

Advertisement