মতামত
মতামত। নয়া দিগন্ত গ্রাফিক্স

সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর একটি বক্তব্য অনেকেরই দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। তিনি অভিন্ন আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন প্রশিক্ষণ এবং সনদায়ন ব্যবস্থা চালুর কথা বলেছেন। বলেছেন, এতে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে বাংলাদেশী কর্মীদের গ্রহণযোগ্যতা ও স্বীকৃতি বাড়বে। একই সাথে তিনি বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের প্রশিক্ষণ কার্যক্রম সমন্বিত কাঠামোর আওতায় এনে অভিন্ন সিলেবাসে প্রশিক্ষণ দানের নির্দেশনা দিয়েছেন। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে দক্ষ জনশক্তির চাহিদার দিকে লক্ষ্য রেখে একক প্রশিক্ষণ নীতি অনুসরণের পরামর্শ দিয়েছেন।
বর্তমানে প্রায় এক কোটির ওপর বাংলাদেশী পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে কাজ করছেন। তাদের বেশির ভাগই অজনপ্রিয় অড জবে নিয়োজিত। বিদেশে অন্যান্য দেশের শ্রমিকের যে মূল্যায়ন বাংলাদেশী শ্রমিকদের ক্ষেত্রে তার উল্টো। এর প্রধান কারণ বেশির ভাগ বাংলাদেশী প্রবাসী অদক্ষ শ্রমিক হিসেবে বিদেশে যান। আবার বেশির ভাগই যান দালালদের মাধ্যমে। অনেকেই বিদেশবিভূঁইয়ে সর্বস্ব খুইয়েছেন, অনেকের ঠাঁই হয়েছে জেলখানায়। আবার অনেকে মানবপাচারকারীদের পাল্লায় পড়ে বিভিন্ন দেশে ভাড়াটে সৈন্য হিসেবে কাজ করছেন অথবা জিম্মি অবস্থায় মানবেতর জীবনযাপন করছেন। প্রায়ই সংবাদপত্রের খবরে দেখা যায়, বিশেষ কোনো চক্র তাদের বিদেশে আটক রেখে অমানবিক অত্যাচার করছে দেশে তাদের আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে মুক্তিপণ আদায়ের জন্য। এদের বেশির ভাগই অবৈধভাবে বিদেশে পাড়ি দিয়েছেন দালালের খপ্পরে পড়ে। এ অবস্থার উত্তরণ জরুরি। না হলে ভবিষ্যতে অনেকেই সর্বস্বান্ত হবে। অনেক পরিবার আর্থিক ও সামাজিক দুর্দশায় পড়বে। সরকারি অনুমোদনবিহীন কোনো প্রতিষ্ঠান যেন জনশক্তি রফতানি করতে না পারে  এ ব্যাপারে কঠোর আইন এবং তার বাস্তবায়ন ও তত্ত্বাবধান দরকার। দ্বিতীয়ত, যেসব দেশে বাংলাদেশীদের পাঠানো হচ্ছে সেসব দেশে এদের প্রয়োজনীয় আবাসন, খাদ্য, চিকিৎসা, বেতনসহ পূর্ণ নিরাপত্তার দালিলিক প্রমাণ থাকতে হবে। তৃতীয়ত, জনশক্তি রফতানি ব্যয়ের আর্থিক পরিমাণ নির্দিষ্ট থাকতে হবে এবং তা ব্যাংকের মাধ্যমে লেনদেন করতে হবে। কোনো অবস্থাতেই ব্যাংকের বাইরে কোনো লেনদেন না করার পূর্ণ নিশ্চয়তার ব্যবস্থা থাকতে হবে। চতুর্থত, কেউ যদি দালালের মারফতে বিদেশে গিয়ে বিপদে পড়েন তার জন্য সরকার কোনোভাবেই দায়বদ্ধ হবে না— মর্মে বিদেশগামীদের জানানো প্রয়োজন। ইদানীং প্রায়ই দেখা যায়, দালালের খপ্পরে পড়ে বিদেশে গিয়ে বিপদে পড়লে বা মৃত্যুবরণ করলে সরকারের কাছে সাহায্যের আবেদন করা হচ্ছে। 
সমস্যা হলো— তরুণরা কর্মসংস্থান নিয়ে দিশেহারা। ঢাকার একজন তরুণ যতটুকু বহির্বিশ্বের সাথে যোগাযোগের সুবিধে পাচ্ছে, তেঁতুলিয়া বা টেকনাফের একজন তরুণের কাছে তা স্বপ্নবিলাস মাত্র। আবার পদ্মা বা মুহুরীর চরে যে তরুণ বড় হয়েছে তার কাছেও কর্মসংস্থানের প্রয়োজনীয়তাও একই ধরনের। যেসব তরুণ কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছেন বা শিক্ষাজীবন শেষ করে বেরিয়েছেন তাদের কর্মসংস্থানের সমস্যা আরো প্রকট এবং দায়বোধের ভারে ন্যুব্জ। বিডিজবস-এর ২০ সেপ্টেম্বর পোর্টালে জানোনো হয়েছে, ৩৫ শতাংশ বিশ্ববিদ্যালয়-শিক্ষিত তরুণ বেকারত্বের অসহনীয় বোঝা টানছেন। দেশের বেকার তরুণদের প্রতি তিন জনের একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডি পেরোনো। প্রতি বছর বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে পাস করে বেরোচ্ছে সাত লাখ তরুণ, তিন লাখ চাকরি লভ্যতার বিপরীতে। বর্তমানে প্রায় ২০ লাখ তরুণ-তরুণী চাকরির সন্ধানে আছেন। আরেকটি সমীক্ষায় দেখা যায়, পড়াশোনা শেষে চাকরিহীন অবস্থায় রয়েছেন দেশের ৩৫ শতাংশ তরুণ। এর প্রধান কারণ যেসব পদের বিপরীতে চাকরির সুযোগ রয়েছে, সেগুলোর চাহিদার বিপরীতে যোগ্যতার প্রচণ্ড ঘাটতি।
আগুনে ঘি ঢেলেছে ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে ওঠা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়। এগুলো বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই বেকার তৈরির কারখানা বৈ নয়। এমনই এক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে পড়াশোনা করা এক তরুণের চাকরির মৌখিক পরীক্ষায় এলসি অর্থ জিজ্ঞাসা করার জবাব এসেছিল— তার জানা নেই। এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশির ভাগের পাঠ্যক্রমের সাথে বাস্তবতার, সৃজনশীলতার কোনো বালাই নেই। গৎবাঁধা নিয়মে চলছে পাঠদান। বিশ্ববিদ্যালয়ে জরুরি ভিত্তিতে জীবনধর্মী শিক্ষা চালু করা দরকার। যে সব প্রতিষ্ঠান ব্যর্থ হবে সেগুলোর অনুমতিপত্র বাতিল করা উচিত। শিক্ষার নামে বেকার সৃষ্টির এই কারখানাগুলোকে জাতির সাথে প্রতারণা করতে দেয়া যায় না। এসব প্রতিষ্ঠান থেকে শিক্ষাজীবন শেষ করে তরুণরা কর্মসংস্থান প্রতিযোগিতায় হেরে গিয়ে নিরাশায় ভুগছেন। বিদেশ গিয়ে রাস্তা ঝাড়ু দিচ্ছেন, গাড়ি মোছার কাজ করে নিজেকে তিলে তিলে ক্ষয়ে দিচ্ছেন। দেশ গড়ার শক্তি তারুণ্যকে এভাবে ব্যবহারের নজির খুব কম দেশেই আছে। 
লেখক : চক্ষুরোগ বিশেষজ্ঞ  
shah.b.islam@gmail.com

Advertisement