
গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ধ্বংসে শেখ হাসিনা নতুন মাত্রা যোগ করেন। বিশেষ করে ভোটাধিকার নিয়ে তিনি যে প্রহসন করেছেন তা নজিরবিহীন। তার সরকারের সময়ে অনুষ্ঠিত তিনটি জাতীয় নির্বাচন কুখ্যাতি পেয়েছে। ২০১৪ সালের ভোটারবিহীন নির্বাচন, ২০১৮ সালে নৈশভোটের নির্বাচন আর ২০১৮ সালের আমি-ডামির নির্বাচন। নির্বাচন কমিশনকে তিনি সাজিয়েছিলেন আওয়ামী অনুগতদের দিয়ে। হাসিনার চাওয়া তারা অক্ষরে অক্ষরে পূরণ করেন। দেশে-বিদেশে যখন নির্বাচন নিয়ে তীব্র সমালোচনা হয়, প্রতিবেশী ভারত হাসিনার পক্ষে সমর্থন নিয়ে এগিয়ে আসে। দেশের ভেতরে নিজেদের এজেন্টদের দিয়ে তারা হাসিনার পক্ষে মতামত তৈরি করেছে, অন্য দিকে বৈশ্বিক ফোরামগুলোতে সমর্থন দিয়ে সরকার টিকিয়ে রেখেছে।
বাংলাদেশের ছাত্র-জনতা এক রক্তক্ষয়ী অভ্যুত্থান ঘটিয়ে হাসিনাকে হটিয়ে পুনরায় ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠা করলেও ভারতে সংক্রমিত হয়েছে হাসিনার সৃষ্ট এই ভাইরাস। দেশটির নির্বাচন কমিশনের অনিয়ম-দুর্নীতি নিয়ে বিরোধী দলগুলো বেশ কয়েক বছর ধরে সমালোচনা করে আসছে। মোদি তার পেশিশক্তি দিয়ে সেগুলোকে এতদিন চেপে রাখতে পারলেও এখন সেটি প্রকাশ্যে এসে গেছে। পোষা নির্বাচন কমিশনারদের দিয়ে নির্বাচন করে হাসিনার মতো সফলতা কি মোদি পেতেই থাকবেন? দেশটিতে জাতীয় পর্যায়ে গণ-আন্দোলনে সফলতার কার্যকর নজির নেই। বিরোধী দলগুলো মোদির গায়ে এ পর্যন্ত একটি আঁচড়ও কাটতে পারেনি। তবে সেখানেও তৃতীয় একটি শক্তির আবির্ভাব ঘটেছে বাংলাদেশের জুলাই প্রজন্মের মতো। তারা ইতোমধ্যে দেশটির শিক্ষামন্ত্রীকে পদত্যাগে বাধ্য করে মোদির গায়ে একটি আঁচড় কেটেছেন। স্বৈরাচারী ব্যবস্থার পতন ঘটাতে না পারলে হাসিনার চালান দেয়া নির্বাচনী ব্যবস্থা ধ্বংসের এই ভাইরাস ভারতের জনগণের জন্য এক অসহনীয় দুঃখ হিসেবে থেকে যাবে। এই ভাইরাস তারাই দেশে ডেকে এনেছে।
হাসিনার অধীনে শুধু তিনটি জাতীয় নির্বাচন নয়; বরং হাসিনা প্রথম ২০০৮ সালে যে নির্বাচনে ক্ষমতায় এসেছিলেন, সেই নির্বাচনে ঘোরতর কারচুপি হয়েছিল। ভোটার অংশগ্রহণের হার থেকে তা স্পষ্ট। বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন ছিল ১৯৯৬ সালের সপ্তম ও ২০০১ সালের অষ্টম সংসদ নির্বাচন। দু’টি নির্বাচনে দেশের প্রধান সব রাজনৈতিক দল অংশ নেয়। দুই নির্বাচনে ভোটার অংশগ্রহণের হার ছিল প্রায় ৭৪ শতাংশ। বড় ধরনের গোলোযোগ ও বিশৃঙ্খলার পর ২০০৮ সালের নবম সংসদ নির্বাচন হয়। এই সময় দেশের প্রধান দু’টি দলের একটিকে পুরোপুরি কোণঠাসা করে ফেলা হয়। সেনাশাসিত সরকার একতরফা বিএনপিকে দমন-পীড়নের মুখে রাখে।
নির্বাচনের সময় দলটি তৃণমূলে একেবারে অসংগঠিত ও বিচ্ছিন্ন অবস্থায় ছিল। বিএনপি নেতৃত্বকে চাপ দিয়ে নির্বাচনে আসতে বাধ্য করা হয়। দেখা গেল, বিএনপি মাত্র ৩০টি আসন পেয়েছে। বিগত কয়েক দশকে ভোটারদের সমর্থনের যে প্রবণতা, এ নির্বাচনে পুরোপুরি অনুপস্থিত দেখা গেল। বিএনপির একচেটিয়া সমর্থনের এলাকাগুলোতে তারা কোনো আসন পেল না। এ দিকে ভোটার উপস্থিতির হার দেখা গেল ৮৭ শতাংশের বেশি। ভোটের প্রবণতা নিশ্চিত করে, এটি ছিল সাজানো নির্বাচন। মাথামোটা সামরিক নেতৃত্ব ভারতের সাথে মিলে এই মহাচুরির আয়োজন করে। পরে ভারতের সাবেক প্রেসিডেন্ট প্রণব মুখার্জির বইয়ে সেই গোপন আঁতাতের আলামত পাওয়া যায়।
যুক্তরাজ্যের সাময়িকী দ্য ইকোনমিস্ট ২০১১ সালে এ নির্বাচন নিয়ে হাটে হাঁড়ি ভেঙে দেয়। তারা এক প্রতিবেদনে জানায়, দিল্লির কৌশলগত পরামর্শের সহায়তায় আওয়ামী লীগ জয়লাভ করেছিল। ইকোনমিস্টের প্রতিবেদনের প্রতিক্রিয়ায় ভারত সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের কেউ প্রতিবাদ করেননি। এ জন্য হাসিনাও ভারতকে উজাড় করে দিয়েছেন। তিনি নিজেই স্বীকার করেন, ভারতকে যা দিয়েছি চিরদিন মনে রাখবে। পরের নির্বাচনগুলো তিনি জনমত উপেক্ষা করে আয়োজন করে একচেটিয়া নিজের বিজয়ের ব্যবস্থা শুধু করেছেন। এই যাত্রায় ভারতের সরকারি ও বিরোধী দল হাসিনাকে শর্তহীন সমর্থন দিয়ে গেছে। ২০১৪ সালের নির্বাচনের সময় ক্ষমতায় ছিল কংগ্রেস সরকার। ওই সরকারের পররাষ্ট্র সচিব সুজাতা সিং বাংলাদেশের নির্বাচনে প্রকাশ্যে হস্তক্ষেপ করেন। ঢাকা সফরে এসে তিনি জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান এরশাদকে ওই নির্বাচনে অংশগ্রহণে চাপ দেন। এরশাদ সেটি নিজেই স্বীকার করেন। সুজাতা তাকে জানান, হাসিনা ক্ষমতায় না থাকলে জামায়াত ক্ষমতায় চলে আসবে।
একইভাবে ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচনের অগে ও পরে ভারতীয় দূতাবাস অত্যন্ত সক্রিয় ছিল। দূতাবাসের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা নির্বাচন কমিশনে গিয়ে সেই সময় উপর্যুপরি দেখাসাক্ষাৎ করেন, বিরোধী দলগুলো যখন অবাধ-নিরপেক্ষ নির্বাচনের দাবি করে সরকারের চরম পীড়ন ও নির্যাতনের শিকার হয় তখন তাদের নেতাকর্মীদের একটি অংশ বিচারবহির্ভূত হত্যার শিকার হয়, আরেকটি অংশ গুম হয়েছে। লাখ লাখ কর্মী হুলিয়া নিয়ে বন-বাদাড়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। আন্দোলনের সময় ধানক্ষেতে রাতে ঘুমিয়েছে। এই নির্বাচন আয়োজনে সরাসরি সহযোগিতা করেছে দিল্লি। পরে দেশে-বিদেশে এর পক্ষে সমর্থন জুুগিয়ে হাসিনার ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করতে সহায়তা করেছে দিল্লি।
কংগ্রেস ও বিজেপি দুই দলই বাংলাদেশের নির্বাচনী ব্যবস্থা ধ্বংসে সমান সহযোগী। কংগ্রেসের নেয়া বেপরোয়া বাংলাদেশ নীতি বিজেপি আরো জোরশোরে চালিয়ে যায়। বাংলাদেশ প্রশ্নে উভয় দল এক এবং তাদের অবস্থান সম্পূর্ণ একপেশে ও অনৈতিক।
ভারতের নির্বাচনব্যবস্থা যখন হাসিনার ভাইরাস সংক্রমণ হলো তখন সরকারি দল বিজেপি সুবিধাভোগী এবং বিরোধী দল বিশেষত কংগ্রেস বাংলাদেশের তখনকার বিরোধী দলের মতোই অসহায়। কংগ্রেস এখন প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগ চেয়ে আন্দোলন করছে। বাংলাদেশের নির্বাচন প্রশ্নে তারা পীড়িত মানুষের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিল। তাই কংগ্রেসের অন্তত নির্বাচনে অনিয়ম নিয়ে প্রতিবাদ ও আন্দোলনের কোনো নৈতিক ভিত্তি নেই। দলটি বাংলাদেশের মানুষের ওপর হাসিনার ভয়াবহ পীড়নের সময় তাকে সমর্থন দিয়ে শক্তিশালী করেছে। হাজার হাজার মানুষ হত্যা, গুম ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ নিয়ে দিল্লিতে অবস্থান নেয়া দণ্ডিত হাসিনাকে এখনো তারা সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে।
ভারতের নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ উঠেছে তাতে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, তারা বাংলাদেশের হাসিনার আমলের নির্বাচন কমিশনারদের অনুসরণ করছে। তারা যে মোদির পাপেট সেই নথিপত্র ইতোমধ্যে সামনে এসে গেছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার ও অন্য দু’জন কমিশনারের মধ্যে বিরোধের জেরে অনিয়ম-দুর্নীতি প্রকাশ হয়ে পড়েছে। দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদন রীতিমতো হাটে হাঁড়ি ভেঙে দিয়েছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনারের বিরুদ্ধে অভিযোগ হচ্ছে, তিনি নতুন ভোটার নিবন্ধনে একতরফা পরিবর্তন এনেছেন। বিপুল ভোটার বাদ দিয়েছেন। এ কাজে গুরুতর অনিয়ম ও দুর্নীতির আশ্রয় নিয়েছেন। মোদি যা নির্দেশে দিয়েছেন, সেটিই তিনি তামিল করেছেন। যদিও তিনি জনগণের অধিকার সংরক্ষণের শপথ নিয়েছিলেন। জনগণ এখন তার দ্বারা প্রতারিত বোধ করছেন।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যেসব নির্বাচন হয়েছে তাতে বিজেপির বিজয়ের জন্য তিনি কাজ করেছেন। এ ধরনের গুরুতর অভিযোগের পর ককরোচ জনতা পার্টি তার পদত্যাগে আন্দোলনে নেমেছে। এর আগে থেকেও বিরোধীরা অভিযোগ উত্থাপন করে বিচ্ছিন্ন আন্দোলন করেছে; কিন্তু ককরোচরা এগিয়ে আসার পর এটি নতুন মাত্রা পেয়েছে। এখনো পরিষ্কার নয়, ককরোচরা আন্দোলনে সফলতা পাবে কি না। তবে হাসিনার নিযুক্ত পুতুল নির্বাচন কমিশনারদের পরিণতি তাদের বুকে কাঁপন ধরানোর কথা। বিচারের রায় হওয়ার আগে চরম অপমান ও লাঞ্ছনার শিকার হয়েছেন তারা। উপমহাদেশের নির্বাচন কমিশনারদের শিক্ষার জন্য এটি যথেষ্ট।
আমি-ডামি নির্বাচনের হোতা কাজী হাবিবুল আওয়ালকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। নিশি নির্বাচনের কারিগর নূরুল হুদাকে জনতা গলায় জুতার মালা পরিয়ে ঘুরিয়েছে। তার কপালেও রিমান্ড মিলেছে। জাতির প্রতি তারা যেমন আচরণ করেছেন, বিচারব্যবস্থা তাদের সেই জবাব দেবে। রাষ্ট্রদ্রোহ মামলায় তারা সর্বোচ্চ দণ্ড পেতে পারেন। এদের মধ্যে ২০১৪ সালের ভোটারবিহীন একতরফা নির্বাচন আয়োজনকারী কাজী রকিব উদ্দিনের অবস্থা আরো খারাপ। গুরুতর অসুস্থ শয্যাশায়ী অবস্থায় কষ্টকর জীবন কাটছে তার। আটক করে বিচারের আওতায় না আনা হলেও দেশত্যাগে তার ওপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। আদালতে তাকে পলাতক দেখানো হচ্ছে। হাসিনার ভুয়া নির্বাচন আয়োজনের তিন প্রধান নির্বাচন কমিশনারের কেউ বাঁচতে পারেননি। হাসিনার পাপেট হওয়ার পরিণাম এখন তারা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছেন।
জনগণের ভাগ্য নিয়ে যারা ছিনিমিনি খেলে তাদের চরম পরিণতি হয়। বাংলাদেশের মানুষের ভাগ্য নিয়ে হাসিনা একা ছিনিমিনি খেলেননি, ভারতও সাথী ছিল। হাসিনার বিরুদ্ধে এখন ফ্যাসিস্টের তকমা লেগেছে, তিনি এখন পলাতক, তার কোনো সম্মান-মর্যাদা অবশিষ্ট নেই। ভারতের যারা হাসিনার সহযোগী হয়ে বাংলাদেশের মানুষের অধিকার কেড়ে নিয়েছেন, তাদেরও একটি পরিণতি অপেক্ষা করছে। পুরো ভারত এখন অগ্নিগর্ভ হয়ে আছে। সেখানে যেকোনো সময় জনবিস্ফোরণ ঘটতে পারে। দেশটির পাপেট নির্বাচন কমিশন ও তাদের প্রভুদের পরিণতি হাসিনা ও তার পাণ্ডা নির্বাচন কমিশনারদের মতো কিছু একটা হওয়া অসম্ভব নয়।
লেখক : সহকারী সম্পাদক, নয়া দিগন্ত
jjshim146@yahoo.com
_GDN_970x90px_English.gif&w=2048&q=75)








