
বিশেষ সংবাদদাতা
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে টাকার পরিমাণ যত বাড়ছে, তার বিপরীতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ব্যালান্সশিটে কী ধরনের সম্পদ রয়েছেÑ এই প্রশ্নটি এখন আরো বেশি গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ ব্যাংকের ২৩ জুলাই ২০২৬-এ শেষ হওয়া সপ্তাহের হিসাব বলছে, দেশে প্রচলিত নোটের মূল্য দাঁড়িয়েছে প্রায় তিন লাখ ৬৫ হাজার ৭১৯ কোটি টাকা। এর বিপরীতে বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘ইস্যু ডিপার্টমেন্ট’-এ দেখানো সম্পদের বড় অংশই বৈদেশিক মুদ্রা; পাশাপাশি রয়েছে সরকারি সিকিউরিটিজ, স্বর্ণ-রৌপ্য, মুদ্রা এবং বাণিজ্যিক কাগজ।
অন্যদিকে ‘ব্যাংকিং ডিপার্টমেন্ট’-এর (ইধহশরহম উবঢ়ধৎঃসবহঃ) মোট সম্পদ ও দায় দাঁড়িয়েছে চার লাখ ২৬ হাজার ৬১৩ কোটি টাকা। এই অংশে সরকারের দেনা, বৈদেশিক সম্পদ, ব্যাংকগুলোর আমানত এবং বিনিয়োগÑ সব মিলিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আর্থিক কাঠামোর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ চিত্র পাওয়া যায়।
এ দু’টি হিসাব পাশাপাশি রাখলে আমাদের মুদ্রাব্যবস্থার মূল বৈশিষ্ট্যটি স্পষ্ট হয়Ñ টাকার বিপরীতে সরাসরি কোনো স্বর্ণভিত্তিক ব্যবস্থা নেই; বরং বৈদেশিক মুদ্রা ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অন্যান্য সম্পদই এর প্রধান ভিত্তি।
নোটের পেছনে বৈদেশিক মুদ্রাই প্রধান
বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, ২৩ জুলাই পর্যন্ত মোট ইস্যুকৃত নোটের (ঘড়ঃবং ওংংঁবফ) মূল্য ছিল তিন লাখ ৬৫ হাজার ৭১৯ কোটি ১৭ লাখ ৬২ হাজার টাকা। এর প্রায় পুরোটাই ছিল প্রচলিত নোট।
এর বিপরীতে সম্পদের সবচেয়ে বড় উপাদান হলো অনুমোদিত বৈদেশিক মুদ্রার পরিমাণ তিন লাখ ১৫ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ, শুধু অনুমোদিত বৈদেশিক মুদ্রার হিসাব ধরলে, ইস্যুকৃত নোটের প্রায় ৮৬.১ শতাংশের সমপরিমাণ সম্পদ এর বিপরীতে রয়েছে।
নোট ইস্যুর বিপরীতে সম্পদের চিত্র
সম্পদ টাকার পরিমাণ নোট ইস্যুর তুলনায়
আনুমানিক অংশ
অনুমোদিত বৈদেশিক মুদ্রা ৩.১৫ লাখ কোটি টাকা ৮৬.১৪%
সরকারি সিকিউরিটিজ ৪৩,২৭৬.০৯ কোটি টাকা ১১.৮৩%
স্বর্ণ ও বুলিয়ন ৪,২৯১.৯৯ কোটি টাকা ১.১৭%
বাণিজ্যিক কাগজ ২,৯৮৭.৯৪ কোটি টাকা ০.৮২%
রৌপ্য ১২১.৮৮ কোটি টাকা ০.০৩%
টাকা কয়েন ৪১.২৭ কোটি টাকা ০.০১%
(দ্রষ্টব্য : হিসাবের সামান্য পার্থক্য মূলত বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যের গোলাকারীকরণ ও উপাদানভিত্তিক শ্রেণীবিন্যাসের কারণে।)
এখানে সবচেয়ে লণীয় বিষয় হলোÑ স্বর্ণের পরিমাণ নয়, বৈদেশিক মুদ্রাই টাকার প্রধান সম্পদভিত্তি। এর অর্থ দাঁড়ায়, বাংলাদেশে টাকার স্থিতিশীলতা মূলত বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুদ্রানীতির সাথে সরাসরি যুক্ত।
স্বর্ণভিত্তিক নয়, এটি বৈদেশিক মুদ্রাভিত্তিক কাঠামো
ইস্যু ডিপার্টমেন্টের হিসাবে স্বর্ণ ও বুলিয়নের মূল্য প্রায় ৪,২৯১.৯৯ কোটি টাকা। রৌপ্যসহ এটি যোগ করলে মোট মূল্য দাঁড়ায় প্রায় ৪,৪১৩.৮৭ কোটি টাকা, যা তিন লাখ ৬৫ হাজার ৭১৯ কোটি টাকার নোটের বিপরীতে মাত্র ১.২১ শতাংশ।
অর্থাৎ, প্রচলিত অর্থে ‘টাকার পেছনে স্বর্ণ আছে’Ñএমন ধারণা এই হিসাব সমর্থন করে না। আধুনিক ফিয়াট মুদ্রাব্যবস্থার মতোই টাকার মূল্য নির্ধারণে বরং অর্থনীতির উৎপাদনমতা, সরকারের আর্থিক সমতা, বৈদেশিক বাণিজ্য, বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ এবং জনগণের আস্থার ভূমিকা অনেক বেশি।
৫ বছরে নোট বেড়েছে প্রায় ৪৬ শতাংশ
কয়েক বছর আগের তথ্যের সাথে তুলনা করলে এই হিসাবের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ চিত্র পাওয়া যায়। বাংলাদেশ ব্যাংকের ২২ জুলাই ২০২১-এর হিসাব অনুযায়ী প্রচলনে থাকা নোট ছিল প্রায় দুই লাখ ৫০ হাজার ৯৫৬ কোটি টাকা। ২৩ জুলাই ২০২৬-এ তা বেড়ে হয়েছে তিন লাখ ৬৫ হাজার ৭১৯ কোটি টাকা। অর্থাৎ, পাঁচ বছরে প্রচলিত নোটের পরিমাণ বেড়েছে প্রায় এক লাখ ১৪ হাজার ৭৬৩ কোটি টাকা বা আনুমানিক ৪৫.৭ শতাংশ।
এই বৃদ্ধি নিজে থেকেই ‘অতিরিক্ত টাকা ছাপানো’ প্রমাণ করে না। অর্থনীতির আকার, নগদ অর্থের চাহিদা, ব্যাংকিং ব্যবস্থার তারল্য এবং মূল্যস্ফীতির পরিবর্তনের সাথে প্রচলিত নোটের চাহিদা বাড়াটাই স্বাভাবিক। তবে প্রশ্ন হলোÑ মুদ্রার পরিমাণের এই বৃদ্ধির সাথে উৎপাদন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং বৈদেশিক সম্পদের ভিত্তি কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ?
ব্যাংকিং ডিপার্টমেন্ট : সরকারের দেনা ও ব্যাংকের আমানত
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ব্যাংকিং ডিপার্টমেন্টের মোট সম্পদ ও দায় চার লাখ ২৬ হাজার ৬১৩ কোটি টাকা। এই অংশে রয়েছে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ খাতের হিসাব:
জ অন্যান্য সম্পদ: ১ লাখ ১০,৭০৪ কোটি টাকা
জ সরকারের দেনাদার ব্যালান্স: ১ লাখ ১৮,০৭৫ কোটি টাকা
জ ব্যাংকগুলোর আমানত: ৯৫,৫৪৮ কোটি টাকা
জ বিনিয়োগ: ৭৫,৬০৬ কোটি টাকা
জ নগদ ও স্বল্পমেয়াদি সিকিউরিটিজ: ৬৬,১১৭ কোটি টাকা
জ অন্যান্য ঋণ ও অগ্রিম: ২৫,৫৩৪ কোটি টাকা
জ আইএমএফের এসডিআর: ১৭,০৩২ কোটি টাকা
জ সরকারের কাছে ঋণ: ৮,২৬৫ কোটি টাকা
এখানে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন তৈরি করে সরকারের দেনাদার ব্যালান্স এক লাখ ১১ হাজার কোটি টাকার বেশি অংশটি, যা কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও সরকারের আর্থিক সম্পর্কের গভীরতা নির্দেশ করে। তবে এটিকে সরাসরি ‘সরকার বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে এত টাকা নিয়েছেÑ এভাবে ব্যাখ্যা করা ঠিক হবে না, কারণ ঋণ এবং দেনাদার ব্যালান্স দুটি আলাদা হিসাব।
অন্যদিকে, ব্যাংকিং ডিপার্টমেন্টের দায়ের মধ্যে ব্যাংকগুলোর আমানত প্রায় ৯৫,৫৪৮ কোটি টাকা। অর্থাৎ, কেন্দ্রীয় ব্যাংক কেবল নোট ইস্যুকারী প্রতিষ্ঠানই নয়; এটি ব্যাংকিং ব্যবস্থার তারল্য, রিজার্ভ ও আর্থিক স্থিতিশীলতার মূল ভিত্তি। বর্তমান ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ ও তারল্য-চাপের প্রোপটে এই হিসাবটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
১.১১ লাখ কোটি টাকার ‘অন্যান্য সম্পদ-আসলে কী?
সবচেয়ে নজরকাড়া অঙ্কটি হলো অন্যান্য সম্পদ-১ লাখ ১০,৭০৪ কোটি টাকা। মোট সম্পদের প্রায় ২৬ শতাংশই রয়েছে এই খাতে। এখানে কিছু মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে: এই খাতের মধ্যে ঠিক কী ধরনের সম্পদ রয়েছে? কোনটি পুনর্মূল্যায়নযোগ্য এবং কোনটি দ্রুত নগদায়নযোগ্য? এর মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি বা সরকারের সাথে সম্পর্কিত সম্পদ কতটুকু? কোনটির বিপরীতে সম্ভাব্য ঝুঁকি বা মূল্যহ্রাসের সুযোগ রয়েছে?
টাকার আসল ‘নিরাপত্তা’ কোথায়?
২৩ জুলাইয়ের হিসাবের সবচেয়ে বড় শিা হলো-ইস্যু ডিপার্টমেন্টের ৩.১৫ লাখ কোটি টাকার অনুমোদিত বিদেশী মুদ্রা থাকার অর্থ এই নয় যে, বাজারে থাকা প্রতিটি ১০০ টাকার নোটে আলাদা করে ৮৬ টাকার নগদ ডলার আলাদা করে রাখা আছে।
মুদ্রাব্যবস্থার প্রকৃত স্থিতিশীলতা নির্ভর করে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সম্পদের মান, বৈদেশিক মুদ্রার তারল্য, ব্যাংকিং খাতের স্বাস্থ্য এবং মুদ্রানীতির বিশ্বাসযোগ্যতার ওপর। তাই শুধু ‘টাকার পেছনে কত ডলার আছে’ তা জানলেই পুরো চিত্র পাওয়া যায় না। মূল প্রশ্নটি হলো-টাকার পরিমাণ যে গতিতে বাড়ছে, সেই অনুপাতে দেশের উৎপাদন, রফতানি ও রেমিট্যান্স কতটা শক্তিশালী হচ্ছে?
এছাড়া, বাংলাদেশ ব্যাংকের ইস্যু ডিপার্টমেন্টের বৈদেশিক সম্পদ এবং বহুল আলোচিত ‘বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ’ হুবহু এক নয়। রিজার্ভ হিসাব করা হয় নির্দিষ্ট আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে, আর ইস্যু ডিপার্টমেন্টের বৈদেশিক সম্পদ হলো নোট ইস্যুর বিপরীতে ব্যালান্সশিটে স্বীকৃত একটি হিসাব। তাই দুটিকে সরাসরি এক করে বিভ্রান্তি তৈরির সুযোগ নেই।
আস্থা গড়ে ওঠে অর্থনীতির শক্তিতে
বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের টাকা স্বর্ণের ওপর নয়, বরং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বৈদেশিক সম্পদ ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক সমতার ওপর দাঁড়িয়ে আছে। ভবিষ্যতের আর্থিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে মূলত তিনটি সূচকের ভারসাম্য রা করা জরুরি:
১. বৈদেশিক সম্পদ ও রিজার্ভের মান ও তারল্য।
২. সরকারের আর্থিক দায় ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওপর এর প্রভাব।
৩. ব্যাংকিং খাতের সম্পদের মান (বিশেষ করে খেলাপি ঋণ ও তারল্য পরিস্থিতি)। এই তিনটির মধ্যে সুষম সমন্বয় থাকলেই কেবল মুদ্রাব্যবস্থার ওপর জনগণের আস্থা অটুট থাকে।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








