মতামত
মতামত। নয়া দিগন্ত গ্রাফিক্স

কয়েকটি জাতীয় সঙ্কটে কিছু ছাত্রসংগঠন মোড় পরিবর্তনকারীর ভূমিকা রেখেছে। বিশেষ করে স্বৈরাচার ও ফ্যাসিস্ট উৎখাতে তাদের ভূমিকা ইতিহাসে লেখা থাকবে। তবে এগুলোকে ছাত্রদের প্রথাগত সংগঠিত ছাত্ররাজনীতি বললে পুরো সত্য বলা হবে না। যেমন জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে বড় ছাত্র সংগঠনের ব্যানারের পরিবর্তে অসংগঠিত আপামর ছাত্রের অবদান প্রধান। সাধারণ সময়ে দেশের ছাত্ররাজনীতি ইতিবাচক ভালো রাজনীতির বদলে দেশের জন্য আদর্শহীন ক্ষতিকর ভূমিকা উপহার দিয়েছে। মূলত সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, ফাও খাওয়া এবং মূল সংগঠনের লাঠিয়াল হিসেবে তারা কাজ করেছে। এমনকি নির্বাচিত ছাত্র সংসদগুলোও যে অনেক ভালো কিছু করেছে এর নজির সামান্য; বরং নির্বাচিত হলে ছাত্রনেতাদের একটি শক্ত ভিত্তি তৈরি হয়, সেটি নানা অনিয়ম-দুর্নীতি অসৎ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে নিজের ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থ করতে অপব্যবহার করেছেন অনেকে। জুলাই বিপ্লবের পর ক্যাম্পাসগুলোতে ছাত্রশিবিরের উত্থানের পর বাংলাদেশের ইতিহাসে ছাত্র রাজনীতিতে ভিন্ন ধারার সূচনা দেখা গেল।
ছাত্র কল্যাণকে প্রাধান্য দিয়ে শিবির যে রাজনীতি শুরু করেছে, সেটি পুরনো রাজনীতির শত ভাগ বিপরীত। ফাও খাওয়ার বদলে খাবারের মানোন্নয়ন, সিট দখলের পরিবর্তে ন্যায্যতার ভিত্তিতে সিট বণ্টন, চাঁদাবাজির বিপরীতে ছাত্রদের জন্য ভর্তুকির আয়োজনসহ বেশ কিছু ছাত্রসহায়ক কর্মসূচি নিয়ে হাজির হয়েছে তারা। এ দিকে দখল, সন্ত্রাস ও আধিপত্য বিস্তারের পরিবর্তে গেস্টরুম-গণরুমের মূলোৎপাটন করে আদুভাই-বড়ভাই সংস্কৃতি বিলুপ্ত করেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ-ডাকসু তার কার্যকাল শেষে তার কর্মকাণ্ডের ‘স্বচ্ছতা প্রতিবেদন’ প্রকাশ করেছে। তাতে দেখা যাচ্ছে— তারা কয়েক ডজন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করেছে। ছাত্র কল্যাণে তারা এমন কিছু উদ্যোগ নিয়েছে, যেগুলো বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ও সরকারের পক্ষ থেকে বাস্তবায়ন করার বিষয়। 
সবচেয়ে বড় বিষয়, কোটি কোটি টাকার কাজ করলেও তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ উঠেনি। রাজনীতি কলুষিত হয়ে যাওয়ার এই ঘোর দুর্দিনে সততার এক নতুন মাত্রা তারা প্রতিষ্ঠিত করেছে। স্বাধীনতার পর ইতিহাসের বেশির ভাগ সময় বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদলের আধিপত্য ছিল। দলটির কেউ কেউ ডাকসুতে বিভিন্ন সময় নির্বাচিতও হয়েছেন; কিন্তু এই সময়ে চাঁদাবাজি, ফাও খাওয়া ও সন্ত্রাসের অভিযোগ থেকে ছাত্রসংগঠনটি নিজেদের মুক্ত রাখতে পারেনি। তবে এবারের ডাকসুর ইতিবাচক কর্মসূচির তোড়ে তারাও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ছাত্র কল্যাণে নেমেছেন। সম্প্রতি তারা ক্যাম্পাসে ২০০টি ডাস্টবিন স্থাপন করেছেন। এর আগেও ক্যাম্পাস পরিচ্ছন্ন রাখতে কয়েকটি কর্মসূচি পালন করেছেন। ছাত্ররা যে ইতিবাচক গঠনমূলক কাজ করতে পারে এবং নিজেদের মধ্যে এর প্রতিযোগিতা হতে পারে, আগে কল্পনা করা যায়নি।
বাংলাদেশের সরকারি অনেক সেবায় ঘুষ, অনিয়ম, দুর্নীতি গ্রাস করে নিয়েছে। জনসাধারণ বিনা পয়সায় যে সেবা পেতে পারে, এই মানসিকতা তাদের চরিত্র থেকে উধাও হয়ে গেছে। এর খানিকটা তারা ক্যাম্পাস থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে নিয়ে যায়। বড় বড় দুর্নীতির সাথে অভিযুক্ত মন্ত্রী, আমলা ও সামরিক আমলাদের অনেকে ছাত্রজীবনে ক্যাম্পাসে রাজনীতি করে এর প্রাথমিক পাঠ নিয়েছেন। এবার বড় সব ক’টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রসংসদ নির্বাচনে শিবির ভূমিধস বিজয় পেয়েছে। একটি ছাত্র সংসদের বিরুদ্ধেও তহবিল তসরুপ কিংবা দুর্নীতির অভিযোগ উঠেনি। আশা করা যায়, জাতীয় সংস্কৃতিতে এটি ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।  
ডাকসুসহ দুটো ছাত্র সংসদ ইতোমধ্যে তাদের মেয়াদকাল শেষ করেছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ-জাকসু আনুষ্ঠানিক তাদের অডিট রিপোর্ট পেশ করেছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন থেকে ১৬ লাখ এবং অনুদান পেয়েছে সাত লাখ ৫৫ হাজার। খাতভিত্তিক এই অর্থ খরচের পুঙ্খানুপুঙ্খ তালিকা তারা প্রকাশ করেছে। প্রতিবেদনে কোথাও অনিয়ম-দুর্নীতি ও তসরুপের অভিযোগ পাওয়া যায়নি। রাজশাহী, চট্টগ্রাম ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদের মেয়াদকাল এখনো শেষ হয়নি। এই তিনটি ছাত্র সংসদও ছাত্র কল্যাণে ডাকসু ও জাকসুর মতো কাজ করে চমক সৃষ্টি করেছে। 
বড় ক্যাম্পাসগুলোতে শিবিরের অবস্থান মজবুত হওয়ায় ছাত্ররাজনীতির কদর্য চেহারা ফিরে আসেনি। বড় ছাত্রসংগঠনগুলোর মধ্যে সংঘর্ষের তেমন কোনো ঘটনা জুলাইয়ের পর ঘটেনি। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে শিবিরের ওপর হামলা ছিল ব্যতিক্রম। ওই আক্রমণে শিবিরের কয়েকজন আহত হয়, এ ছাড়া অন্য কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে রক্তপাত হয়নি। ছাত্ররাজনীতির ইতিহাস এক বিরল সময় পার করছে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস। কথায় কথায় এক পক্ষ অপর পক্ষের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ত। প্রায়ই একটি সংগঠন অপর সংগঠনের বিরুদ্ধে অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে মহড়া দিত। এমনকি নিজেদের সংগঠনের অন্তঃকোন্দলে নিয়মিত বিরতিতে লাশ পড়ার ঘটনা ঘটেছে। 
ক্যাম্পাসে শান্তির এই অসাধারণ পরিবেশ স্থায়ী হওয়ার পেছনে নির্বাচিত ছাত্র সংসদের বড় ভূমিকা রয়েছে। শত উসকানি সত্ত্বেও তারা শক্তি প্রদর্শন করতে যায়নি। বিশেষ করে ডাকসু নেতৃত্ব এ জন্য কৃতিত্ব পেতে পারে। কিছু দিন আগে ডাকসু সংগ্রহশালায় হামলা চালানো হয়েছে। জিন্নাহর ছবিসহ গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি উপাদান ভাঙচুর করা হয়েছে। এর আগেও এ ধরনের দায়িত্বজ্ঞানহীন উগ্র কর্মকাণ্ড চালানো হয়েছে, ডাকসু নেতারা ধৈর্যের সাথে পরিস্থিতি মোকাবেলা করে ক্যাম্পাসে সম্প্রীতি ধরে রেখেছেন। এই চিত্র অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্বাচিত ছাত্রনেতারা দেখাচ্ছেন। ছাত্রসংসদ মেয়াদ শেষ হয়ে গেলে এই নেতৃত্ব থাকবে না, তখন পরিস্থিতি বদলে যেতে পারে। নতুন নির্বাচন দেয়ায় কোনো সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। নির্বাচনের সময় এলেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ নীরব। অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়েও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতি অনুসরণ করা হবে বলে মনে হচ্ছে। নিজেদের ছাত্রসংগঠন নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনা না থাকলে ছাত্রসংসদ নির্বাচনে সরকারের অনীহা দেখা যাচ্ছে।
এক দিকে ছাত্ররাজনীতিকে কল্যাণমুখী ধারায় বিকাশ, অন্য দিকে কদর্যরূপে ফিরে আসার এক সন্ধিক্ষণে উপস্থিত বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস। সম্প্রতি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবি) কয়েকজন সাংবাদিককে বেধড়ক পিটিয়েছে ছাত্রদল। এর আগেও বিভিন্ন ক্যাম্পাসে তারা পুরনো চেহারা নিয়ে ফিরে আসার আলামত প্রদর্শন করেছে, নির্বাচিত ছাত্রসংসদের পাশাপাশি সাধারণ ছাত্ররা সচেতন থাকায় তারা সুবিধা করতে পারেনি। ছাত্রদের মধ্যে বড় ভীতি কাজ করছে, কখন ছাত্ররাজনীতির পুরনো সংস্কৃতি ফিরে আসে। রাবির এই ঘটনাটি বিশ্লেষণ করলে শঙ্কার কারণটি আরো বাড়ে।
রাবিতে সাংবাদিকদের পেটানোর পেছনের ঘটনাটি সংবাদমাধ্যমে আসেনি। রাবি ছাত্রদল সহসভাপতি আহসান হাবিব একটি ফেসবুক গ্রুপে রাকসুর জিএস আম্মারকে খুনি, ধর্ষক, চাঁদাবাজ, মববাজসহ মুখে নেয়া যায় না এমন কুৎসিত ভাষায় গালাগাল করেন। এতে কমেন্ট করেন রাকসুর সহসম্পাদক রাকিবুল। আহসান হাবিব এর জবাবে রাকিবকে হুমকি দিয়ে লিখেন, ছাল তুলে ফেলব, সৎসাহস থাকলে তোর লোকেশন বল। তিনি এবারো অকথ্য ভাষায় রাকিবকে গালিগালাজ করেন। জবাবে রাকিব তার লোকেশন জানান এবং তিনি বলেন, তিনি একা অবস্থান করবেন ওই এলাকায়, আহসান হাবিবের সাহস থাকলে সেখানে যেন আসেন। দিনভর রাকিব সেখানে অবস্থান করলেও আহসান হাবিবের দেখা মেলেনি। তিনি স্পট থেকে চলে যাওয়ার পর সন্ধ্যায় হকি স্টিক ও লাঠি নিয়ে সেখানে আসেন। তা জানিয়ে আবার ফেসবুক পোস্ট দেন। এই ফেসবুক পোস্টের প্রতিক্রিয়া দেন জিয়াউর রহমান হল সংসদের জিএস। আহসান হাবিব এবার রড, পাইপ, চাপাতিসহ জিয়াউর রহমান হলের জিএসকে মারতে আসেন। অস্ত্রশস্ত্র দেখে সাংবাদিকরা ভিডিও ধারণ করতে গেলে তাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন আহসান হাবিব ও তার সাঙ্গোপাঙ্গরা।
কঠোর সমালোচনার মুখে কেন্দ্রীয় ছাত্রদল আহসান হাবিবসহ তিনজনকে সংগঠন থেকে বহিষ্কার করে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সন্ত্রাসী ঘটনার বিরুদ্ধে মামলা করেছে। এমনকি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ও ছাত্রদল আলাদা দু’টি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। এসব পদক্ষেপ নেয়ার পরও এ ঘটনা থেকে আরো বেশি আশঙ্কা হচ্ছে— ক্যাম্পাসে ছাত্রদল পুরনো রাজনীতি নিয়ে হাজির হতে যাচ্ছে। দল থেকে বহিষ্কারের ঘটনা একেবারে লোকদেখানো একটি উদ্যোগ। ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগও চাপে পড়লে এমনটি করত; কিন্তু ইস্যুটি যখন আড়ালে চলে যেত, বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করে নেয়া হতো। এভাবে অপরাধী আরো শক্তিশালী হয়ে ফিরে আসত। আহসান হাবিবকে আরো দু’বার সংগঠন থেকে বহিষ্কার করা হয়। তার বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি ও ক্যাম্পাসে ছিনতাইয়ের অভিযোগ আসার পর ওই পদক্ষেপ নেয়া হয়। যুগ্ম সম্পাদক হাসিবুরকেও নানা অভিযোগের কারণে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিল। এই বহিষ্কার উদ্যোগ যে অপরাধীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা, তা প্রমাণ হয় না। কারণ এই পদক্ষেপ তাদের অপরাধ থেকে বিরত করেনি।
রাবি প্রশাসনের অবস্থা এর চেয়ে ভালো কিছু নয়। হামলাকারীদের ভিডিওতে স্পষ্ট দেখা গেলেও প্রশাসন অজ্ঞাতদের বিরুদ্ধে মামলা করে। তারা সন্ত্রাসীদের নাম নিতে ভয় পাচ্ছে। শিক্ষকরা কতটা চাপের মুখে আছেন, তা ঘটনাস্থলে উপস্থিত প্রক্টর অধ্যাপক মাহবুবুর রহমানের বক্তব্য শুনলে বোঝা যায়। ঘটনার পরপর তিনি বলেন, ‘আমরা ব্যর্থ, আমাদের দ্বারা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়নি। আমরা পুলিশকে ফোন দিয়েছি; কিন্তু পুলিশ ভয়ে পালিয়ে গেছে।’
বহিষ্কারের পর আহসান হাবিব ফেসবুকে আরো ভয়াবহ মন্তব্য করেছেন। তাতে তিনি নিজেই স্বীকার করেছেন, বহিষ্কারের হ্যাটট্রিক হয়েছে তার। তিনি বলেছেন, ছাত্রদল রাবিতে ‘হিজড়া ইউনিটে’ পরিণত হলো। তিনি যা ইঙ্গিত করলেন, তাতে সন্ত্রাসের রাজনীতির পথ তিনি ছাড়বেন না। এবার তিনি প্রকাশ্যে ওসব করবেন, যাতে কেউ লজ্জায় মুখ দেখাতে পারবে না। ফেসবুকে প্রকাশ্যে তিনি এসব লিখে বেড়াচ্ছেন।
অপরাধীদের দলীয় পরিচয় এখনো মুখ্য হয়ে আছে। অন্তত রাবিতে সাংবাদিক পেটানোর এই ঘটনায় তার প্রমাণ মিলছে। কারণ তাদের কাউকে আইনের আওতায় আনা হয়নি। প্রকাশ্যে তারা অন্যদের এখনো হুমকি দিয়ে বেড়াচ্ছেন। ফ্যাসিস্ট সরকারের অন্যতম প্রধান চরিত্র ছিল এটি, যার কারণে তাদের শেষ পর্যন্ত পালাতে হয়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পুরনো স্টাইলে আধিপত্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা ছাত্রসমাজসহ কেউ ভালো চোখে দেখবে না। রাবিতে যারা প্রকাশ্যে সাংবাদিক পিটিয়েছে, ছাত্রলীগের নিষ্ঠুর চরিত্র অর্জন করার আগে তাদের বিচারের আওতায় আনুন। দল থেকে বহিষ্কারের চেয়েও অপরাধের শাস্তি তাদের পাওয়া দরকার। তা না হলে ভুল বার্তা যাবে। 
লেখক : সহকারী সম্পাদক, নয়া দিগন্ত
jjshim146@yahoo.com

Advertisement