মতামত
মতামত। নয়া দিগন্ত গ্রাফিক্স

এলপিজি সিলিন্ডারের দাম আবার বাড়ল। ১২ কেজির যে সিলিন্ডারের দাম ছিল এক হাজার ৫৮৫ টাকা। গ্রাহককে কিনতে হতো দুই হাজার থেকে সোয়া দুই হাজার বা তারও বেশি দামে সেটি হয়ে গেল এক হাজার ৮৩৭ টাকা। গত ৪ অক্টোবর বিইআরসি (BERC) একলাফে দাম বাড়িয়ে দিলো ২৫২ টাকা।
এখন নিশ্চিতই ভোক্তাদের কিনতে হবে আড়াই হাজার থেকে তিন হাজার টাকা পর্যন্ত যেকোনো দামে। কারণ সরকারের বেঁধে দেয়া দরে ব্যবসায়ীরা কখনোই পণ্য বিক্রি করেন না। এ বিষয়ে সরকারের যথাযথ তদারকি ও আইনি ব্যবস্থারও ঘাটতি আছে। ফলে ভোগান্তিই এ দেশের মানুষের অক্ষয় ললাটলিখন। 
সরকার ইচ্ছা করে দাম বাড়িয়েছে এমন নয়। বাধ্য হয়েছে। বাজারে সরবরাহ ছিল না। ঘরে চুলা জ্বলছিল না। মানুষের ভোগান্তি হচ্ছিল। এই ভোগান্তি সরকার তৈরি করেনি। সাম্প্রতিক সময়ে যে পরিমাণ এলপিজি আমদানি করেছে তা চাহিদার চেয়ে বেশি। সঙ্কট হওয়ার কথা নয়। একটি দৈনিকের খবর অনুযায়ী, এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (লোয়াব) জানিয়েছে, দেশে চাহিদার তুলনায় যথেষ্ট এলপিজি আমদানি হয়েছে। আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাসে প্রচুর গ্যাস আমদানি হলেও এখন মাঠপর্যায়ে কৃত্রিম সঙ্কট তৈরি করা হচ্ছে। 
কারা কিভাবে কৃত্রিম সঙ্কট তৈরি করছে, তা সবার জানা। সঙ্কট তৈরি করছে যথারীতি সিন্ডিকেট।
জ্বালানির ডিলার, পাইকারি ও খুচরা বিক্রেতা এবং স্থানীয় মধ্যস্বত্বভোগীরা। এরা পরস্পর যোগসাজশ করে সিলিন্ডার মজুদ করে রাখে। বিভিন্ন অজুহাতে বাজারে চাহিদার চেয়ে কম সরবরাহ করে। তৈরি হয় সঙ্কট। ভোগান্তিতে পড়ে সাধারণ মানুষ। তারা বাধ্য হয়ে যেকোনো দামে সিলিন্ডার পেতে মরিয়া হয়ে ওঠে। কারণ চুলা না জ্বললে জীবন অচল। মানুষের ভোগান্তি সৃষ্টি করে তাদের অসহায়ত্বের সুযোগে বাড়তি দাম আদায় করে সংশ্লিষ্টরা। এবার সিলিন্ডার সঙ্কটের পেছনে যে অজুহাত দাঁড় করানো হচ্ছে তা হলো— বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়া। এই অজুহাতে গরিবের পকেট কেটে নিজের পকেট ফাঁপিয়ে তুলছে এসব নরপশু। আর সেই খুশিতে সবার অগোচরে ঘরের ছাদ ফাটিয়ে বিকট অট্টহাসি হাসছে।
সিন্ডিকেট কিভাবে কাজ করে? আওয়ামী লীগের সময়ে বাজারে সিন্ডিকেটের অপ্রতিহত দৌরাত্ম্যে নাভিশ্বাস ওঠে মানুষের। ভারত যখনই পেঁয়াজ রফতানি বন্ধ বা শুল্ক বাড়ায়, তখনই এ দেশের আমদানিকারক ও আড়তদাররা আগের কম দামে কেনা পেঁয়াজও আড়তে লুকিয়ে ফেলে। মাত্র ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে পেঁয়াজের দাম দ্বিগুণ হয়ে যায়। চালের ক্ষেত্রেও একই অবস্থা। বাংলাদেশ চাল উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ। তার পরও চালের দাম বাড়ে। 
বড় বড় চালকলের (মিলার) মালিকরা কৃষকের কাছ থেকে কম দামে ধান কিনে মজুদ গড়ে তোলেন। সরকার যখন গরিব মানুষের জন্য ওএমএস (OMS) বা খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির জন্য চাল কিনতে যায়, মিলাররা সরকারের নির্ধারিত রেটে চাল দিতে অস্বীকার করে। বাধ্য হয়ে সরকারকে চালের সরকারি ক্রয়মূল্য বাড়াতে হয় অথবা শুল্ক ছাড় দিয়ে বিদেশ থেকে চাল আমদানির অনুমতি দিতে হয়। ডিমের সিন্ডিকেট নিয়েও ঘটেছে এমনই মহা ডামাডোল। আর সরকার সিন্ডিকেটের কাছে আত্মসমর্পণ করেছে। কখনো দলদাস ব্যবসায়ীদের স্বার্থ রক্ষায়, কখনো স্রেফ দলের স্বার্থে। আর এরই ফল হিসেবে সিন্ডিকেটের হোতারা দলবেঁধে হুক্কা দিয়েছে, ‘শেখ হাসিনার সরকার, এই মুহূর্তে দরকার।’  
কিন্তু জনগণের লুটেরা সিন্ডিকেট যে জনরোষ থেকে সরকারকে বাঁচাতে পারে না, তারও প্রমাণ আমরা একই সাথে পেয়ে গেছি।  
মজুদদারি, সরবরাহ বন্ধ, জনভোগান্তি সৃষ্টি, জনগণকে জিম্মি করে বাড়তি দামে বিক্রি ও অতিরিক্ত মুনাফা অর্জন— এই গোটা প্রক্রিয়াটি বেআইনি, অবৈধ, অনৈতিক ও শাস্তিযোগ্য। কিন্তু এই সিন্ডিকেট এখন রাষ্ট্রের চেয়ে বেশি শক্তিশালী। রাষ্ট্র সিন্ডিকেটের চুলের ডগাও ছুঁতে পারে না; বরং সিন্ডিকেটই রাষ্ট্রকে নিয়ন্ত্রণ করে। সাবেক সংসদ সদস্য ও বিএনপি নেতা সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর ভাষায়— কুত্তা লেজ নাড়ে না, লেজই কুত্তাকে নাড়ায়। 
এই মহাশক্তিধর লেজের পরাক্রম শুধু গ্যাস সিলিন্ডারে সীমিত নয়। একেক সময় একেকটি অত্যাবশ্যক পণ্য নিয়ে তারা হায়েনার মতো সম্মিলিতভাবে সাধারণ মানুষের ওপর চড়াও হয়। তীক্ষè দাঁতে ছিন্নভিন্ন করে দেয় হাড়মাংস, নাড়িভুঁড়ি সব। কিন্তু হায়েনা বা বাঘ সিংহকে দোষ দেয়া বাতুলতা। ক্ষুধা পেলে তারা নিরীহ পশুদের শিকার করবে এটিই প্রকৃতির নিয়ম। সিন্ডিকেট করে যারা সাধারণের হাড়মাংস ছিঁড়ে খায় তারা ক্ষুধার্ত নয়। তারা করে অবৈধ মুনাফার জন্য। সম্পদের পাহাড় গড়ে তোলার জন্য। এরা কেবল নরাধম নয়, পশুরও অধম।
বর্তমান মূল্যস্ফীতির বাজারে সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য ও এলপিজি সিলিন্ডারসহ জ্বালানির দাম বৃদ্ধি জনজীবনে চরম সঙ্কট সৃষ্টি করেছে। মানুষ ধুঁকছে বাড়তি জ্বালানির দামে। গ্যাস-বিদ্যুতের অভাবে। বাড়তি বিদ্যুৎ বিলের অত্যাচারে এবং সিন্ডিকেটের কারসাজিতে। এই সিন্ডিকেট এক দীর্ঘস্থায়ী ও বহুল আলোচিত নিরেট বাস্তবতা। শুধু বাংলাদেশে নয়, বিশ্বের উন্নয়নশীল সব দেশেই।
বাজার সিন্ডিকেট পুরোপুরি ভাঙতে এবং বাজারে কৃত্রিম সঙ্কট রোধ করতে দেশের শীর্ষস্থানীয় অর্থনীতিবিদ, গবেষক ও বাজার বিশ্লেষকরা সুনির্দিষ্ট কিছু স্থায়ী ও কাঠামোগত সমাধানের কথা বলে আসছেন। তাদের মতে, কেবল মোবাইল কোর্ট বা সাময়িক জরিমানা করে সিন্ডিকেট দমন সম্ভব নয়; এর জন্য দরকার দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত পরিবর্তন।
দরকার বড় বড় ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর একচেটিয়া আধিপত্য খর্ব করা। মুষ্টিমেয় করপোরেট গ্রুপের হাতে ভোজ্যতেল, চিনি বা ছোলার মতো জরুরি পণ্যের এলসি (LC) ও আমদানি সুবিধা সীমিত না রেখে, মাঝারি ও নতুন ব্যবসায়ীদের জন্য ঋণ ও লাইসেন্স প্রাপ্তি সহজ করা। দরকার প্রতিযোগিতা কমিশনকে (Competition Commission) শক্তিশালী করা : দেশে একটি প্রতিযোগিতা কমিশন আইন আছে। কিন্তু কার্যকারিতা নেই। এই কমিশনকে স্বাধীন ও স্বায়ত্তশাসিত সংস্থায় পরিণত করা হলে তা একচেটিয়া ব্যবসা বা বাজারে জোটবদ্ধ হয়ে দাম নির্ধারণের বিরুদ্ধে সরাসরি ফৌজদারি ব্যবস্থা নিতে পারবে। টিসিবির সংস্কার, বিকল্প বাজার শক্তি (Countervailing Force) গড়ে তোলা, যাতে সরকারি গুদামে পর্যাপ্ত মজুদ রাখা হবে। সিন্ডিকেট কৃত্রিম সঙ্কট তৈরির চেষ্টা করলে, সরকার বাজারে কম দামে পণ্য ছেড়ে তাদের কারসাজি ব্যর্থ করে দিতে পারবে। একই সাথে বিশেষ ব্যবস্থা যেমন— সরকারি কোল্ড স্টোরেজ বা হিমাগার স্থাপন, আমদানিকৃত পণ্য বন্দর থেকে খালাস হওয়ার পর কোন আড়তে যাচ্ছে, তা ডিজিটাল ট্র্যাকিংয়ের আওতায় আনা, কৃষকরা যাতে সরাসরি পণ্য বাজারজাত করতে পারে সে জন্য কৃষি বাজারের মতো বাজার প্রতিষ্ঠা করে মধ্যস্বত্বভোগীর দৌরাত্ম্য দূর করার মতো পদক্ষেপ অবিলম্বে বাস্তবায়ন করা। 
কিন্তু এসব কাজ কোনো সরকারই দায়িত্ব নিয়ে করে না। বর্তমান সরকারের কাছে প্রত্যাশা থাকলেও তা এরই মধ্যে লোপ পেতে শুরু করেছে। কারণ সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছার প্রমাণ মিলছে না; বরং দেখা গেছে, সিন্ডিকেটের সাথে জড়িত বৃহৎ ব্যবসায়ী গ্রুপের রক্ষায় বিএনপির জনবলই সবার আগে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। সরকার দায়িত্ব নেয়ার পরপরই খোদ কেন্দ্রীয় ব্যাংক পতিত সরকারের সময় ব্যাংক দখলের হোতা মাফিয়াচক্রকে পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেয়। সম্প্রতি জ্বালানি আমদানির ব্যবস্থা বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেয়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এখানেও বৃহৎ বাণিজ্যিক গ্রুপগুলো অগ্রাধিকার পাবে বলে ধারণা করা যায়। দেশের শীর্ষস্থানীয় শিল্প গ্রুপ সরাসরি পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি এবং নিজস্ব ফিলিং স্টেশনের মাধ্যমে খুচরা বাজারে তা বিক্রির সুযোগ চেয়েছে সরকারের কাছে। এ ছাড়া সাম্প্রতিক সময়ে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) কার্গো আমদানির ক্ষেত্রে বেশ কিছু অনভিজ্ঞ ও অখ্যাত কোম্পানিকে অনুমোদন দেয়ার দৃষ্টান্ত সামনে এসেছে। 
এমন ধারায় চললে কৃত্রিম সঙ্কট বা সিন্ডিকেটের মাধ্যমে মূল্যবৃদ্ধির ঝুঁকি কমবে না; বরং আরো বাড়তে পারে বলে শঙ্কা প্রকাশ করছেন বিশেষজ্ঞরাই। 
এর বাইরেও শঙ্কার কারণ আছে। সরকারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রীর আত্মীয়স্বজন শুধু নয়, সরাসরি নিজের ছেলের অনভিজ্ঞ প্রতিষ্ঠানকে বড় অঙ্কের সরকারি মেগা প্রকল্পের কাজ দেয়া হচ্ছে। এটি যেকোনো মূল্যায়নে ক্ষমতার অপব্যবহার, স্বজনপ্রীতি ও দুর্নীতির প্রত্যক্ষ উদাহরণ হয়ে থাকবে। যেমনটি হয়েছিল পতিত সরকারের সময়। 
সরকারের অযথা সমালোচনা করা আমাদের উদ্দেশ্য নয়। আমরা শুধু চোখের সামনে ঘটমান বর্তমানের চিত্রটি মানুষের সামনে তুলে ধরতে চাই যেন সরকার ও দেশবাসী উভয়েই সচেতন ও সতর্ক হতে পারেন। গত ১৭ বছর ধরে যা দেখেছি এখনো সেই ধারাবাহিকতার রেশ দেখলেও আমরা শঙ্কিত বোধ করি। কারণ আমাদের ঘর পুড়েছে আগেই। স্বৈরাচারের সামান্য রেশও সিঁদুরে মেঘের মতো মনে হয়। 
লেখক : সিনিয়র অ্যাসিস্ট্যান্ট এডিটর, নয়া দিগন্ত
mujta42@gmail.com

Advertisement