
হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দেশের প্রধান আন্তর্জাতিক প্রবেশদ্বার; কিন্তু যাত্রীদের ধারাবাহিক ভোগান্তি, হয়রানি ও অব্যবস্থাপনা দীর্ঘদিনের। আগে থেকে ফ্লাইটের সময়সূচি জানা সত্ত্বেও প্রস্তুতির অভাব স্পষ্ট। কোন সময়ে কতগুলো ফ্লাইট ল্যান্ড করবে, কতজন যাত্রী একসাথে নামবেন, তা বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের কাছে আগে থেকে ডিজিটাল সিস্টেমে নিবন্ধিত থাকে। পিক-আওয়ারের এই ট্রাফিক আকস্মিক কোনো ঘটনা নয়। এটি জেনেও ট্রলি প্রস্তুত না রাখা বা গ্রাউন্ড স্টাফ কম রাখা স্পষ্টত প্রশাসনিক ও পরিকল্পনাগত ব্যর্থতা। রানওয়ে থেকে ব্যাগেজ বেল্ট পর্যন্ত লাগেজ পৌঁছানো, লাগেজ কাটা বা চুরি বন্ধ করা এবং ট্রলি ব্যবস্থাপনার মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব বিমান বাংলাদেশ বা অন্যান্য সার্ভিস প্রোভাইডারের ওপর ন্যস্ত থাকে। কিন্তু মূল নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে এই সার্ভিস প্রোভাইডারগুলো কঠোর তদারকি ও জবাবদিহির আওতায় আনার দায়িত্ব বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের।
কাস্টমস ও ইমিগ্রেশন কাউন্টারে অযথা সময়ক্ষেপণ, ব্যাগেজ বেল্টের অন্ধকার স্পটে লাগেজ কাটা বা চুরি যাওয়া— এগুলো বন্ধে পর্যাপ্ত সিসিটিভি কাভারেজ নিশ্চিত করা এবং ব্লাইন্ড স্পট দূর করা সম্পূর্ণ কর্তৃপক্ষের এখতিয়ারভুক্ত। দিনের পর দিন একই অভিযোগ আসা সত্ত্বেও স্থায়ী সমাধান না হওয়া তদারকির শৈথিল্যকে নির্দেশ করে। বিদেশফেরত প্রবাসী, বিদেশী পর্যটক বা সাধারণ নাগরিক— কাউকে বিমানবন্দরে নামার পর পরিবহনচক্র বা দালালদের হাতে অসহায় হতে দেয়া স্বাগতিক দেশের ভাবমর্যাদার জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। প্রবাসীদের কষ্টার্জিত রাজস্বে বিমানবন্দর চলে, অথচ তাদের ন্যূনতম সুশৃঙ্খল সেবা দিতে না পারা প্রশাসনিক সদিচ্ছার অভাবের প্রমাণ। বিমানবন্দর ঘিরে একাধিক শক্তিশালী দুষ্টচক্র গড়ে উঠেছে।
যেকোনো প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা থাকতে পারে; কিন্তু সুশাসন, পেশাদারিত্ব ও জবাবদিহি থাকলে বিদ্যমান ব্যবস্থার ভেতরে ভোগান্তি ও হয়রানি অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব। যাত্রীরা সরাসরি সার্ভিস দেয়া প্রতিটি এজেন্সিকে আলাদা করে চেনেন না। দিনশেষে সবকিছুর কেন্দ্রীয় দায় বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের ওপর বর্তায়।
বিমানবন্দরে প্রবাসী শ্রমিক ও যাত্রীরা বছরের পর বছর ধরে নানা ধরনের প্রশাসনিক ও প্রশাসনিক-বহির্ভূত হয়রানির শিকার হয়ে আসছেন। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যগামী ও ফেরত প্রবাসী কর্মীদের ক্ষেত্রে এ অভিজ্ঞতার হার তুলনামূলক বেশি। বৈধ ভিজিট বা ওয়ার্ক ভিসা, প্রয়োজনীয় বিএমইটি ক্লিয়ারেন্স এবং রিটার্ন টিকিট থাকা সত্ত্বেও অনেকসময় ইমিগ্রেশন কাউন্টারে প্রবাসীদের দীর্ঘক্ষণ দাঁড় করিয়ে অনাবশ্যক নানা প্রশ্ন করা হয়। ডাটাবেজে তথ্য আপডেট না থাকা বা সার্ভার ডাউন থাকার অজুহাতে অনেককে বোর্ডিং বা ইমিগ্রেশনে আটকে দেয়া বা ফ্ল¬াইট মিস করানোর মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়। সরকারি ব্যাগেজ রুলসের অধীনে ব্যক্তিগত জিনিসপত্র, স্বর্ণালঙ্কার, ব্যবহৃত ইলেকট্রনিক্স বা আত্মীয়দের জন্য আনা উপহার সামগ্রী নিয়ে কাস্টমস কাউন্টারে অনাবশ্যক তর্কে জড়ানো এবং অনেক ক্ষেত্রে বকশিশ বা টাকা দাবির অভিযোগ ওঠে। রানওয়ে থেকে ব্যাগেজ বেল্ট পর্যন্ত লাগেজ আনার প্রক্রিয়ায় কাটাকাটি, তালা ভাঙা বা লাগেজ থেকে মূল্যবান জিনিস খোয়া যাওয়ার ঘটনা ঘটে। ঢাকা বিমানবন্দরে লাগেজ থেকে মালামাল খোয়া যাওয়ায় অনেক প্রবাসীকে ফ্লোরে গড়াগড়ি করে চিৎকার করে কাঁদতে দেখা যায়।
বিমানবন্দরে নেমে নির্দিষ্ট সময়ে ট্রলি না পেয়ে দীর্ঘক্ষণ ভারী ব্যাগ হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। অনেকসময় ট্রলি পাইয়ে দেয়ার নামে অবৈধ অর্থ দাবি করার অভিযোগও থাকে। বিশ্রামাগার, মানসম্মত ও সাশ্রয়ী খাবারের অভাব, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন শৌচাগারের ঘাটতি এবং সঠিক তথ্যের জন্য হেল্পডেস্কের সহায়তার অভাব হয়রানির অন্যতম কারণ। বিমানবন্দর থেকে বের হওয়ার সাথে সাথে ট্যাক্সি বা সিএনজিচালক এবং সিআইপি স্পটের দালালরা অতিরিক্ত ভাড়া দাবি করে। একই সাথে প্রবাসী যাত্রীদের নানাভাবে বিভ্রান্ত বা অসহায় করার চেষ্টা করে। আগমনী টার্মিনালের বাইরে স্বজনদের বসার বা অপেক্ষায় পর্যাপ্ত স্থান ও সুবিধার অভাব থাকায় প্রবাসীদের সাথে আসা পরিবারও ভোগান্তিতে পড়ে।
অতি সম্প্রতি ঢাকা বিমানবন্দরে বীর মুক্তিযোদ্ধা মেজর (অব:) আখতারুজ্জামানের সাথে ট্রলির সঙ্কট ও ঠিক সময়ে জমজমের পানি না পাওয়া নিয়ে বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালকের সাথে উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় হয়। অন্যায্য বা ভোগান্তিকর পরিস্থিতি সত্ত্বেও বিমানবন্দরে নিরাপত্তার দায়িত্বপ্রাপ্তদের সাথে উত্তপ্ত বা কড়া ভাষায় কথা বলা প্রশাসনিক নীতিমালার দৃষ্টিতে অনুচিত। মেজাজের ওপর নিয়ন্ত্রণ রেখে যৌক্তিক বা আইনি প্রক্রিয়ায় প্রতিবাদ জানালে তার বক্তব্য নৈতিকভাবে আরো বেশি শক্ত অবস্থান পেত। একজন সাবেক জ্যেষ্ঠ সেনা কর্মকর্তা, মুক্তিযোদ্ধা এবং সাবেক সংসদ সদস্য হিসেবে সর্বসাধারণের কাছে তার প্রতি আলাদা শ্রদ্ধা ও প্রত্যাশা থাকে। তবে একজন প্রবীণ নাগরিক ও বীর মুক্তিযোদ্ধার ক্ষেত্রে সরাসরি মামলা করে গ্রেফতারি পরোয়ানা বা তাৎক্ষণিক শাস্তিমূলক পদক্ষেপ নেয়া কতটুকু যৌক্তিক, তা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন থেকে যায়। এটি কি প্রয়োজনীয় ও সামঞ্জস্যপূর্ণ পদক্ষেপ ছিল, নাকি আগে অভিযোগের সত্যতা যাচাই, সিসিটিভি ফুটেজ ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য পরীক্ষা করে আইনি ব্যবস্থা নেয়া বেশি যুক্তিসঙ্গত ছিল? সেখানে কোনো সহিংসতা, শারীরিক আক্রমণ বা জাতীয় নিরাপত্তায় হুমকি তৈরি হওয়ার মতো অপরাধ ঘটেনি। এটি ছিল দীর্ঘদিনের নাগরিক ক্ষোভ ও ভোগান্তির এক আকস্মিক মৌখিক বহিঃপ্রকাশ। এই ধরনের ঘটনায় লিখিত সতর্কবার্তা, ডিউটি ম্যাজিস্ট্রেটের মধ্যস্থতা বা আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা স্বাভাবিক প্রশাসনিক রীতি। তা ছাড়া যদি জমজমের পানি সরবরাহে সত্যি পরিচালনগত গাফিলতি হয়ে থাকে এবং এ কারণে দুই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেয়া হয়ে থাকে, তাহলে যাত্রীদের ক্ষোভের মূল কারণটি আগে থেকে স্বীকার করে সমাধান করা হলো না কেন?
স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ করা একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং একজন প্রবীণ সাবেক জনপ্রতিনিধির প্রতি রাষ্ট্র ও প্রশাসনের একধরনের সম্মানবোধ বজায় রাখা উচিত ছিল। কড়া বা অশোভন ভাষা কখনো সমর্থনযোগ্য নয়। সেই সাথে তা নিয়ে সমালোচনা অবশ্যই হতে পারে। তবে একজন প্রবীণ বীর মুক্তিযোদ্ধাকে গ্রেফতার করে জেলে পাঠানোর এই কঠোর পদক্ষেপ সমস্যার সমাধান তো করেইনি; বরং বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের সেবার ঘাটতি ও প্রশাসনিক উদাসীনতা জাতির সামনে উৎকটভাবে উন্মোচিত করেছে। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের উচিত আইনের প্রয়োগে যেমন কঠোর হওয়া, তেমনি নাগরিকের ক্ষোভের কারণ অনুধাবন করে সহানুভূতিশীল ও সংবেদনশীল হওয়া। প্রশাসনিক সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা নির্বাহী পরিচালকের দায়িত্ব; সুতরাং বর্তমান ব্যর্থতার দায় এড়াতে পারেন না তিনি।
মেজর (অব:) আখতারুজ্জামান দীর্ঘকাল বিএনপির রাজনীতির সাথে যুক্ত ছিলেন। এ ছাড়া সাবেক সংসদ সদস্য ছিলেন। পরবর্তী সময়ে তার বিএনপি ত্যাগ এবং জামায়াতে যোগদানের সিদ্ধান্ত বিএনপির রাজনৈতিক ভাবমর্যাদা ও অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে একধরনের অস্বস্তি তৈরি করেছে। বিএনপি বা সরকারের নীতিনির্ধারকদের একাংশের মনে যে ক্ষোভ জমছিল, জামায়াত দাবি করছে, সেই রাজনৈতিক অসন্তোষ বিমানবন্দর ঘটনার মাধ্যমে ‘সুযোগ’ হিসেবে উগড়ে দেয়া হয়েছে। সাধারণ মানুষের মধ্যে ধারণা জন্মেছে যে, এটি কর্তৃপক্ষের নিজস্ব ব্যর্থতা ও দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা আড়াল করার একটি কৌশল। এটি শুধু কড়া ভাষার প্রতিবাদের সাজা নয়; বরং এর পেছনে দলীয় ও রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশের প্রভাব স্পষ্ট। মামলা ও গ্রেফতারের পথটি সরকারের ভাবমর্যাদা এবং বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের পেশাদারত্ব— উভয় সঙ্কুচিত করেছে।
জরুরি সংযোগ পথ বন্ধ কেন
প্রধান টার্মিনাল থেকে ডমেস্টিক টার্মিনাল কিছুটা আলাদা। আন্তর্জাতিক আগমনী এলাকা থেকে সরাসরি ডমেস্টিক প্রস্থান এলাকায় যেতে যেভাবে একটি ডেডিকেটেড ‘ইন-ট্রানজিট কাস্টমস অ্যান্ড সিকিউরিটি চ্যানেল’ থাকা দরকার, শাহজালালের বর্তমান অবকাঠামোতে তা সুবিন্যস্ত নয়। একজন যাত্রী দীর্ঘ আন্তর্জাতিক ফ্লাইট শেষে ক্লান্ত অবস্থায় লাগেজ বেল্ট থেকে ব্যাগ তুলে আবার আন্তর্জাতিক টার্মিনাল থেকে বাইরে বের হন। তারপর লাগেজ টেনে ডমেস্টিক টার্মিনালে গিয়ে লাইনে দাঁড়িয়ে স্ক্যানিং ও বোর্ডিং পাস সংগ্রহ করেন। এ পুরো প্রক্রিয়ায় অনেকসময় এক থেকে দুই ঘণ্টাও লেগে যায়, যার ফলে অনেকে কানেক্টিং ফ্লাইট মিস করেন। শিকল দিয়ে বন্ধ রাখা বিকল্প পথটিতে একটি ছোট কাস্টমস ব্যাগেজ স্ক্যানার এবং সিকিউরিটি ডেক্স বসালে যাত্রীদের বাইরের সাধারণ ভিড় ও ট্রলি টেনে যেতে হতো না। বিমানবন্দরের ভেতরে নিরাপদ ও দ্রুত উপায়ে স্ক্যানিং সম্পন্ন করে তারা ডমেস্টিক লাউঞ্জে প্রবেশ করতে পারতেন। সদিচ্ছা ও সামান্য সমন্বয় থাকলে শিকল দিয়ে বন্ধ রাখা বিকল্প পথটি চালু করে যাত্রীদের এই অহেতুক ভোগান্তি সহজেই দূর করা সম্ভব।
বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক প্রবেশদ্বার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সুনাম রক্ষা করতে হলে কোনো তালি দেয়া সাময়িক পদক্ষেপ নয়; বরং প্রয়োজন আমূল প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ও আধুনিক ব্যবস্থাপনা। আন্তর্জাতিক ফ্লাইট আসার সঠিক সময়ের সাথে ট্রলি মেলানো, লাগেজ কাটা ও চুরির জন্য দায়ী অসাধু সিন্ডিকেট নির্মূল করা, অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক ট্রানজিট যাত্রীদের জন্য যুক্তিসঙ্গত বিকল্প পথ উন্মুক্ত রাখা এবং সর্বোচ্চ পেশাদারিত্ব নিশ্চিত করা হতে পারে এ অচলাবস্থা দূরের একমাত্র পথ। দেশের প্রবাসী আয় এবং বিদেশী পর্যটকদের কাছে প্রথম ইম্প্রেশন হিসেবে এই বিমানবন্দরকে একটি আধুনিক, প্রযুক্তিনির্ভর এবং যাত্রীবান্ধব সেন্টারের উপযোগী করতে প্রশাসনিক জবাবদিহি ও সদিচ্ছার কোনো বিকল্প নেই।
লেখক : সাবেক উপদেষ্টা, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
drkhalid09@gmail.com
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








