
নিষিদ্ধ সন্ত্রাসী সংগঠন কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্টের (কেএনএফ) ইউনিফর্ম তৈরিতে অর্থায়ন এবং এই সংক্রান্ত আর্থিক লেনদেনের অভিযোগে সংগঠনটির প্রধান নাথান বমসহ নয়জনের বিরুদ্ধে মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে মামলা দায়ের করেছে অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। সিআইডির অনুসন্ধানে কেএনএফের ৪০ হাজার সেট চার রঙের ক্যামোফ্লেজ ইউনিফর্ম তৈরির ফ্যাব্রিক ও সেলাইয়ের কাজ বাবদ মোট এক কোটি ৬২ লাখ ৫৯ হাজার ৫০০ টাকা লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে।
মামলায় অভিযুক্তরা হলো নাথানা লনচে ওরফে নাথান বম (৪৯), মংহলাসিন মারমা ওরফে মং (৩৮), নিয়াজ হায়দার (৩৯), মো: গোলাম আজম (৪৭), সাহেদুল ইসলাম (২৭), মোহাম্মদ কামরুজ্জামান (৫৮), জামালুল ইসলাম (৪৫), মো: তৌহিদুল ইসলাম (৩৮) ও মো: মতিউর রহমান (৪৩)।
আজ বৃহস্পতিবার সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার (মিডিয়া) মো: ছুফি উল্লাহ এসব তথ্য জানিয়েছেন।
তিনি জানান, ২০২৫ সালের ১৮ মে রাত আনুমানিক ২টা ৩০ মিনিটে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) একটি বিশেষ দল বায়েজিদ বোস্তামী থানাধীন মোজাফফরনগর আবাসিক এলাকায় অভিযান চালিয়ে কেএনএফের পোশাক প্রস্তুতের সাথে জড়িত একজনকে আটক করে। জিজ্ঞাসাবাদে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে পরবর্তী সময়ে হালিশহর থানাধীন ছোটপুল এলাকার দু’টি ফ্ল্যাটে অভিযান চালিয়ে আরো দু’জনকে আটক করা হয়। তাদের দেয়া তথ্য যাচাই করে বায়েজিদ বোস্তামী থানাধীন একটি গোডাউন ও একটি গার্মেন্টস কারখানা থেকে মোট ২০ হাজার ৩০০ সেট চার রঙের ক্যামোফ্লেজ কেএনএফের ইউনিফর্ম উদ্ধার করা হয়। এর মধ্যে একটি গোডাউন থেকে ১১ হাজার ২০০ সেট এবং একটি কারখানা থেকে নয় হাজার ১০০ সেট ইউনিফর্ম (প্রতি সেটে ১টি শার্ট ও ১টি প্যান্ট) জব্দ করা হয়। এ ঘটনায় বায়েজিদ বোস্তামী থানায় সন্ত্রাস বিরোধী আইনে মামলা দায়ের করা হয়।
পরে কেএনএফের ইউনিফর্ম তৈরির সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের আর্থিক কর্মকাণ্ডের বিষয়ে অনুসন্ধান শুরু করে সিআইডি। শুধু ইউনিফর্ম তৈরির সাথে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো শনাক্ত নয় বরং ব্যাংক হিসাব, চেক, নগদ অর্থ প্রদান, ক্রয়াদেশ, ব্যবসায়িক পরিচয় এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পারস্পরিক যোগাযোগ ও আর্থিক লেনদেন বিশ্লেষণের মাধ্যমে অর্থের উৎস, ব্যবহার এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যে অর্থ প্রবাহের চিত্র অনুসরণ করে সিআইডি।
সিআইডির অনুসন্ধানে প্রাপ্ত রেকর্ডপত্র ও সাক্ষীদের বক্তব্য বিশ্লেষণে জানা যায়, কেএনএফের প্রতিনিধি হিসেবে মংহলাসিন মারমা ওরফে মং প্রথমে নিয়াজ হায়দারের সাথে এবং পরে নিয়াজ হায়দারের মাধ্যমে গোলাম আজমের সাথে যোগাযোগ করেন। এরপর তারা ওয়েল কম্পোজিট নিট লিমিটেডের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সাথে যোগাযোগ করে কেএনএফের ইউনিফর্মের ক্যামোফ্লেজ প্রিন্টের ফ্যাব্রিক তৈরির ব্যবস্থা করেন। মংহলাসিন মারমা নিজেকে এমআই এন্টারপ্রাইজের সহকারী কমার্শিয়াল ম্যানেজার হিসেবে পরিচয় দিয়ে ২০ নভেম্বর ২০২৪ ও ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ তারিখে দু’টি পারচেজ অর্ডার দাখিল করেন। এসব কাজের বিপরীতে ওয়েল কম্পোজিট নিট লিমিটেডকে মোট ৯০ লাখ ৫৯ হাজার ৫০০ টাকা প্রদান করা হয়।
অনুসন্ধানে আরো পাওয়া যায়, কেএনএফের ৪০ হাজার সেট ইউনিফর্মের প্যান্ট ও শার্ট সেলাইয়ের জন্য মংহলাসিন মারমার নির্দেশনায় নিয়াজ হায়দার ও গোলাম আজম তাদের প্রতিনিধিদের মাধ্যমে রিংভো অ্যাপারেলস, এনএন ফ্যাশন ও নূর ফ্যাশনের সাথে যোগাযোগ করেন। অভিযুক্তরা পারস্পরিক যোগসাজশে কুকি-চিনের ৪০ হাজার সেট চার রঙের ক্যামোফ্লেজ ইউনিফর্মের ফ্যাব্রিক্সের কাজ বাবদ গত ২০/১১/২০২৪ ও ১০/০২/২০২৫ তারিখে ওয়েল কম্পোজিট নিট লিমিটেডের অনুকূলে দু’টি পারচেজ অর্ডার দাখিল করে ৯০ লাখ ৫৯ হাজার ৫০০ টাকা এবং ইউনিফর্ম সেলাই বাবদ রিংভো অ্যাপারেলস, এনএন ফ্যাশন ও নূর ফ্যাশনকে ৭২ লাখ টাকা প্রদান করেন।
সিআইডির আর্থিক অনুসন্ধানে কেএনএফের ইউনিফর্ম তৈরির পুরো প্রক্রিয়ায় অর্থের একটি সুস্পষ্ট প্রবাহ শনাক্ত করা হয়েছে। কেএনএফের প্রতিনিধি মংহলাসিন মারমার মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ব্যাংক হিসাব, চেক ও নগদ অর্থ ব্যবহার করে মোট এক কোটি ৬২ লাখ ৫৯ হাজার ৫০০ টাকা লেনদেনের তথ্য পাওয়া যায়। এর মধ্যে ৯০ লাখ ৫৯ হাজার ৫০০ টাকা ফ্যাব্রিক তৈরির জন্য এবং ৭২ লাখ টাকা ইউনিফর্ম সেলাইয়ের জন্য প্রদান করা হয়।
সিআইডির অনুসন্ধানে প্রাপ্ত তথ্য ও নথিপত্র পর্যালোচনায় কেএনএফের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নাথান বমের নির্দেশনায় মংহলাসিন মারমাসহ অন্যান্য অভিযুক্তরা পারস্পরিক যোগসাজশে কেএনএফের জন্য বিপুল পরিমাণ ইউনিফর্ম তৈরির উদ্যোগ গ্রহণ ও অর্থায়ন করে মর্মে অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া যায়। অনুসন্ধানে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রতি হুমকি সৃষ্টিকারী একটি সন্ত্রাসী সংগঠনের কার্যক্রমে ব্যবহারের উদ্দেশ্যে এসব ইউনিফর্ম তৈরিতে অর্থের হস্তান্তর, স্থানান্তর ও রূপান্তরের মাধ্যমে অর্থের প্রকৃত উৎস গোপন করার চেষ্টা করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছে সিআইডি।
এ ঘটনায় সিআইডি বায়েজিদ বোস্তামী থানায় গতকাল বুধবার (৭ অক্টোবর) মামলা দায়ের করা হয়।
মামলাটির তদন্তে সিআইডি নিষিদ্ধ সন্ত্রাসী সংগঠন কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট (কেএনএফ) সন্ত্রাসী কার্যক্রমে ব্যবহারের জন্য অর্থের উৎস ও প্রবাহ, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাব ও অন্যান্য আর্থিক লেনদেন, অর্থ প্রদানের প্রকৃত উদ্দেশ্য এবং এ আর্থিক নেটওয়ার্কের সাথে যুক্ত অন্যান্য ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সম্পৃক্ততা শনাক্ত করার লক্ষ্যে তদন্ত কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








