এডিবি, ঋণ, ডলার
ডলার। ইন্টারনেট

 

Advertisement

কঠিন শর্তে প্রায় ৩৩০ কোটি মার্কিন ডলার ঋণ নিচ্ছে সরকার। বিদ্যুৎ বিতরণব্যবস্থার উন্নয়ন এবং জ্বালানি আমদানির ব্যয় মেটাতে দু’টি আন্তর্জাতিক সংস্থা থেকে এই ঋণ নেয়া হবে। এর মধ্যে ২০ কোটি ডলার ঋণ নেয়া হবে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) থেকে। বাকি ৩১০ কোটি ডলার আসবে ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের (আইডিবি) বেসরকারি খাতের বাণিজ্যিক অর্থায়ন সংস্থা ইসলামিক ট্রেড ফাইন্যান্স করপোরেশন (আইটিএফসি) থেকে।
তবে দু’টি ঋণের ক্ষেত্রেই সুদের হার ভাসমান হওয়ায় ভবিষ্যতে ঋণ পরিশোধের ব্যয় বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। বিশেষ করে জ্বালানি আমদানির জন্য নেয়া স্বল্পমেয়াদি ঋণের ক্ষেত্রে এককালীন বড় অঙ্কের অর্থ পরিশোধের চাপও সৃষ্টি হতে পারে।
অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে গতকাল সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত বৈদেশিক ঋণসংক্রান্ত স্ট্যান্ডিং কমিটি অন নন-কনসেশনাল লোন (এসসিএনসিএল)-এর ৪৬তম সভায় ঋণের দু’টি প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়েছে।
এডিবির ২০ কোটি ডলারের ঋণ
অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) সূত্র জানায়, এডিবির ঋণে ঢাকার আশপাশের ১৩টি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির এলাকায় বিদ্যুৎ বিতরণব্যবস্থা শক্তিশালী করতে একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করবে বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড (বিআরইবি)।
প্রকল্পটির মোট প্রাক্কলিত ব্যয় ৪৪৯.৩৪ মিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে ২০০ মিলিয়ন ডলার অর্থাৎ ২০ কোটি ডলার আসবে এডিবির ঋণ থেকে। ঋণের মেয়াদ ২৫ বছর। এর মধ্যে পাঁচ বছর গ্রেস পিরিয়ড।
ঋণের সুদের হার হবে ছয় মাসের সোফারের সাথে ০.৫০ শতাংশ স্প্রেড। এর সাথে ০.১০ শতাংশ ম্যাচিউরিটি প্রিমিয়াম এবং বছরে ০.১৫ শতাংশ কমিটমেন্ট চার্জ রয়েছে। গত ১ অক্টোবরের ৩.৮৭ শতাংশ সোফার ধরে হিসাব করলে ঋণের গ্রান্ট এলিমেন্ট দাঁড়ায় প্রায় ৫.৭০ শতাংশ। এটি ২৫ শতাংশের নিচে হওয়ায় ঋণটি নন-কনসেশনাল বা অনমনীয় ঋণ হিসেবে গণ্য হচ্ছে।
প্রকল্পটি ২০২৬ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হয়ে ২০৩১ সালের জুলাই পর্যন্ত বাস্তবায়নের কথা রয়েছে।
প্রকল্পের আওতায় নতুন ও বিদ্যমান উপকেন্দ্র সম্প্রসারণ, ওভারহেড ও আন্ডারগ্রাউন্ড বিতরণলাইন নির্মাণ, ইনসুলেটেড কন্ডাক্টর স্থাপন এবং পরিবেশবান্ধব জিআইএস  প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে বিদ্যুৎ বিতরণব্যবস্থার নির্ভরযোগ্যতা, দক্ষতা ও জলবায়ু সহনশীলতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়া হবে।
ইআরডির অতিরিক্ত সচিব ও এডিবি অনুবিভাগের প্রধান এস এম জাকারিয়া হকের নেতৃত্বে ১১ সদস্যের প্রতিনিধিদল এডিবির সাথে ঋণ নিয়ে আলোচনা সম্পন্ন করেছে।
জ্বালানি আমদানিতে ৩১০ কোটি ডলার
দ্বিতীয় প্রস্তাবটি জ্বালানি আমদানিসংক্রান্ত। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) পেট্রলিয়াম পণ্য আমদানির জন্য ২৫০ কোটি ডলার এবং পেট্রোবাংলা এলএনজি আমদানির জন্য ৬০ কোটি ডলার ঋণ নেবে।
আইটিএফসি থেকে মোট ৬০ কোটি ডলার নিজস্ব উৎসে সরবরাহ করা হবে। বাকি ২৫০ কোটি ডলার বাংলাদেশ ব্যাংকের কো-ফাইন্যান্সিংয়ের মাধ্যমে সংস্থান করা হবে।
প্রস্তাব অনুযায়ী, প্রতিটি ঋণের কিস্তির মেয়াদ ছয় মাস এবং পরিশোধ হবে এককালীন। ছয় মাসের টার্ম সোফার ৩.৬৭৭৬৫ শতাংশ ধরে এর সাথে ১.৭০ শতাংশ যোগ করলে সুদের হার দাঁড়ায় আনুমানিক ৫.৩৭৭৬৫ শতাংশ। এর সাথে রয়েছে ০.২০ শতাংশ প্রশাসনিক ফি।
জ্বালানি নিরাপত্তার জরুরি প্রয়োজন বিবেচনায় গত ১৭ আগস্ট প্রস্তাবটি বিশেষ বিবেচনায় অনুমোদন দেয়া হয়। পরে ২৬ আগস্ট এসসিএনসিএল কমিটির সভাপতির কাছ থেকেও নথিতে বিশেষ অনুমোদন নেয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
ভাসমান সুদে বাড়বে ব্যয়ের ঝুঁকি
বিশ্লেষকদের মতে, এই ঋণের অন্যতম বড় ঝুঁকি হলো সুদের হার অনিশ্চিত থাকা। দু’টি ঋণই ভাসমান সুদহারের সাথে যুক্ত। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে সুদের হার বাড়লে বাংলাদেশের ঋণ পরিশোধের ব্যয়ও বাড়বে।
ইআরডির একাধিক সূত্র বলছে, এ ধরনের ঋণের সুদের হার সোফারের সাথে সরাসরি যুক্ত থাকায় আন্তর্জাতিক সুদের হার পরিবর্তনের প্রভাব বাংলাদেশের ওপর পড়বে। সোফার বাড়লে ঋণের কার্যকর সুদের হারও বাড়বে। এর ফলে সরকারের বাজেট বা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের আয় থেকে অতিরিক্ত অর্থ দিয়ে ঋণের ব্যয় মেটাতে হবে।
বিশেষ করে জ্বালানি আমদানির ঋণটি মাত্র ছয় মাসের হওয়ায় ঝুঁকিটি বেশি। মেয়াদ শেষে ঋণ রোলওভার করতে না পারলে বাংলাদেশ ব্যাংকের কো-ফাইন্যান্সিংসহ বড় অঙ্কের অর্থ এককালীন পরিশোধের চাপ সৃষ্টি হতে পারে।
সূত্রের হিসাবে, মেয়াদ শেষে রোলওভার না হলে বাংলাদেশ ব্যাংকের সহ-অর্থায়নের অংশসহ প্রায় ১৯৫ কোটি ডলার পরিশোধের চাপ সৃষ্টি হতে পারে। সুদের হার ও অন্যান্য কারণে সর্বোচ্চ এক্সপোজার প্রায় ১২৫ কোটি ডলার পর্যন্ত হতে পারে বলেও সংশ্লিষ্ট মহলের আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে ডলার সঙ্কটের সময় নতুন করে ঋণ নবায়নের সুযোগ না থাকলে এককালীন বড় অঙ্কের বৈদেশিক মুদ্রা জোগাড় করা কঠিন হতে পারে।
বৈদেশিক ঋণের সীমা নিয়ে প্রশ্ন
নন-কনসেশনাল বৈদেশিক ঋণ গ্রহণের ক্ষেত্রেও সরকারের নির্দিষ্ট সীমা রয়েছে। ইআরডির নীতিমালা অনুযায়ী, কোনো অর্থবছরে অনমনীয় বৈদেশিক ঋণের সেবা ব্যয় সংশ্লিষ্ট অর্থবছরের রফতানি আয়ের ১০ শতাংশ অথবা রাজস্ব আয়ের ১৫ শতাংশের মধ্যে- যেটি কম- তার মধ্যে রাখতে হবে। একই সাথে মোট অনমনীয় বৈদেশিক ঋণের স্থিতি জিডিপির ১০ শতাংশের মধ্যে রাখার নীতিও রয়েছে।
নতুন করে এ ধরনের ঋণ যুক্ত হতে থাকলে নির্ধারিত সীমার কাছাকাছি পৌঁছে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ফলে ঋণ গ্রহণের আগে প্রকৃত পরিশোধ সক্ষমতা, বৈদেশিক মুদ্রার আয় এবং ভবিষ্যৎ ঋণসেবার চাপ বিবেচনা করা জরুরি বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।
ঋণগ্রহীতা প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতাও গুরুত্বপূর্ণ
বিশ্লেষকদের মতে, সরকার বা বাংলাদেশ ব্যাংকের গ্যারান্টিযুক্ত ঋণের ক্ষেত্রে ঋণগ্রহীতা প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব আয় থেকে ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা নিশ্চিত করা জরুরি। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান নিজস্ব আয় থেকে ঋণের কিস্তি ও সুদ পরিশোধ করতে না পারলে শেষ পর্যন্ত দায় সরকারের ওপরই বর্তাবে। বিশেষ করে জ্বালানি আমদানির ক্ষেত্রে ঋণ নিয়ে আমদানি করা পণ্যের মূল্য, বিক্রয়মূল্য, ভর্তুকি এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নগদ প্রবাহের মধ্যে সামঞ্জস্য না থাকলে ঋণ পরিশোধের দায় ক্রমেই সরকারি অর্থের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
প্রকল্প বাস্তবায়নেও ঝুঁকি
এডিবির ঋণের ক্ষেত্রে প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্বের ঝুঁকিও রয়েছে। ঋণের অর্থ পুরোপুরি ব্যবহার না হলেও কমিটমেন্ট চার্জ দিতে হয়। ফলে প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা হলে অর্থ ব্যবহার না করেও সরকারকে বাড়তি ব্যয় বহন করতে হবে। পাঁচ বছর মেয়াদি প্রকল্পে ক্রয়প্রক্রিয়া, জমি, ঠিকাদারি, সরঞ্জাম আমদানি ও সমন্বয়জনিত জটিলতা দেখা দিলে প্রকল্পের সময় ও ব্যয় দুটোই বাড়তে পারে। একই সাথে ঋণের সুদ পরিশোধের সময়ও দীর্ঘায়িত হবে।
সরকারের ব্যাখ্যা
তবে ইআরডির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, অনমনীয় ঋণ গ্রহণের ক্ষেত্রে সরকারের কঠোর নীতিমালা রয়েছে। যেসব প্রকল্প বা পণ্য সংগ্রহে নমনীয় অর্থায়ন পাওয়া সম্ভব নয় কেবল সেসব ক্ষেত্রেই অনমনীয় ঋণ অনুমোদন দেয়া হয়।
এ ছাড়া কোনো অর্থবছরে অনমনীয় বৈদেশিক ঋণের ঋণসেবা ব্যয় সংশ্লিষ্ট অর্থবছরের রফতানি আয়ের ১০ শতাংশ অথবা রাজস্ব আয়ের ১৫ শতাংশের মধ্যে- যেটি কম- সীমিত রাখা এবং মোট অনমনীয় বৈদেশিক ঋণের স্থিতি জিডিপির ১০ শতাংশের মধ্যে রাখার বাধ্যবাধকতা কঠোরভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে ইআরডি।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, সীমার মধ্যে থাকলেই ঋণ নিরাপদ- এমন নিশ্চয়তা নেই। ঋণের সুদের হার, মেয়াদ, রোলওভার ঝুঁকি, ডলারের বিনিময় হার এবং ঋণগ্রহীতা প্রতিষ্ঠানের নগদ প্রবাহ- সবকিছু বিবেচনায় নিয়েই নতুন ঋণের প্রকৃত ঝুঁকি মূল্যায়ন করতে হবে।