মনসুর আব্বাস, হামাস, হামাস সন্ত্রাসী সংগঠন, ইসরাইলের রাজনীতি, আইজ্যাক হারজোগ, গাদি আইজেনকোট, ইসরাইলের নির্বাচন, ফিলিস্তিনি আরব দল রাম
রাম দলের প্রধান মনসুর আব্বাস। সংগৃহীত

ঐতিহ্যবাহী ফিলিস্তিনি আরব দল ‘রাম’-এর প্রধান ও নেসেট সদস্য মনসুর আব্বাস গত বৃহস্পতিবার প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজোগের সাথে পরামর্শ সভাকালে গাজাভিত্তিক ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ আন্দোলন হামাসকে একটি সন্ত্রাসী গোষ্ঠী বলতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন।

Advertisement

ফিলিস্তিনিদের সাথে ‘সেতু’ হিসেবে কাজ চালিয়ে যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ এবং নিজের ও তার পরিবারের সম্ভাব্য ঝুঁকির কথা উল্লেখ করে তিনি এই অবস্থান নেন।

প্রেসিডেন্ট হারজোগ সরকার গঠনের দায়িত্ব কাকে দেবেন—তা নিয়ে সুপারিশ শুনতেই নির্বাচন-পরবর্তী দ্বিতীয় দিনে বিভিন্ন দলের নেতাদের সাথে বৈঠকে বসেন। এই বৈঠকেই তাদের মধ্যে এই কথোপকথনটি ঘটে। আব্বাস ‘ইয়াশার’ পার্টির প্রধান গাদি আইজেনকোটের নাম সুপারিশ করেন।

Advertisement

উল্লেখ্য, আইজেনকোট তার নেতৃত্বাধীন সরকারে যোগ দিতে চাওয়া দলগুলোর জন্য হামাসকে সন্ত্রাসী গোষ্ঠী হিসেবে স্বীকৃতি দেয়াকে অন্যতম শর্ত হিসেবে নির্ধারণ করেছেন।

আব্বাসের সাথে বৈঠকের সময় হারজোগ তাকে সরাসরি প্রশ্ন করেন যে তিনি হামাসকে কোনো সন্ত্রাসী সংগঠন মনে করেন কি না।

আব্বাস রাজনৈতিক সহিংসতার বিরুদ্ধে তার আন্দোলনের দীর্ঘদিনের বিরোধিতার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, ‘ক্রমাগত আমাদের আনুগত্যের এই পরীক্ষায় ফেলা অসম্ভব।’

তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের গাজা শান্তি পরিকল্পনার প্রতি তার সমর্থনও পুনর্ব্যক্ত করেন। আব্বাস বলেন, তার ‘দৃষ্টিভঙ্গি‘ হলো ইসরাইল-ফিলিস্তিন সংঘাতের একটি দ্বি-রাষ্ট্র সমাধান, যেখানে ‘হামাস এবং সকল সামরিক বা সশস্ত্র সংগঠনকে‘ পুরোপুরি নিরস্ত্রীকরণ করা হবে।

বৈঠক চলাকালে প্রেসিডেন্ট বাসভবনের মহাপরিচালক ইয়াল শভিকি আব্বাসকে প্রশ্ন করেন যে তিনি কেন কেবল হামাসকে সন্ত্রাসী সংগঠন আখ্যা দিয়ে ‘সংশয়বাদীদের উত্তর‘ দিচ্ছেন না?

জবাবে আব্বাস বলেন, ‘আমার কাছে একটি সুস্পষ্ট উত্তর আছে, কিন্তু অন্য পক্ষকে প্রভাবিত করার জন্য একটি সেতু হিসেবে কাজ করার সুযোগটুকু আমার জন্য রাখুন।’

তিনি আরো বলেন, ‘আমরা একটি সেতু। সেই সেতুটি ধ্বংস করবেন না। আমাদের সন্ত্রাসবাদের সমর্থক বা দেশদ্রোহী বানাবেন না।’

নিজের ও পরিবারের কথা উল্লেখ করে আব্বাস যোগ করেন, ‘আমাকে এবং আমার পরিবারকে রক্ষা করার মতো কিছুটা স্থান অন্তত আমাকে দিন।’ এই বিষয়টিকে তিনি ‘জীবন-মরণের প্রশ্ন‘ বলে অভিহিত করেন।

২৭ অক্টোবরের নেসেট নির্বাচনে আব্বাসের দল আটটি আসন জয়লাভ করে, আর তাদের সমমনা আরব-সংখ্যাগরিষ্ঠ দল ‘জয়েণ্ট লিস্ট’ পেয়েছে ১১টি আসন। দুইটি ফিলিস্তিনি আরব দলই নজিরবিহীন ভোটারের উপস্থিতির ওপর ভর করে এই সফলতা অর্জন করেছে, যা উভয় দলকে সরকার গঠনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ নিয়ন্ত্রকের ভূমিকা এনে দিয়েছে।

‘জয়েন্ট লিস্ট’ও আইজেনকোটকে সুপারিশ করার কথা জানিয়েছে, তবে এটি রাম-এর তুলনায় কিছুটা বেশি ধর্মনিরপেক্ষ ও জাতীয়তাবাদী দল। সরকারে যোগ দেয়ার ইচ্ছা না থাকলেও, প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে ক্ষমতাচ্যুত করতে পারে এমন যেকোনো সরকারের জন্য শর্তসাপেক্ষ ‘নিরাপত্তা বেষ্টনী‘ দেয়ার অঙ্গীকার করেছে জয়েন্ট লিস্ট।

অন্যদিকে, ‘রাম’ আইজেনকোটের নেতৃত্বাধীন জোটে যোগ দিতে আগ্রহী এবং তারা সাবেক জায়োনিস্ট আইনপ্রণেতা ও সিনিয়র পুলিশ কর্মকর্তা ইয়োভ সেগালোভিচকে ২ নম্বর প্রার্থী করে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিল। ঐতিহাসিকভাবে ইসলামপন্থী এই দলটি ২০২১-২০২২ সালে নেতানিয়াহুকে সাময়িকভাবে ক্ষমতাচ্যুত করা তথাকথিত ‘পরিবর্তনকামী সরকার‘-এরও অংশ ছিল।

নেতানিয়াহু, তার সমর্থক এবং তার কিছু ইহুদি বিরোধীপক্ষ উভয় আরব দলকেই সন্ত্রাসবাদের সমর্থক এবং সরকারে অংশগ্রহণের অযোগ্য দল হিসেবে চিত্রায়িত করেছেন (যদিও রাম ইতোপূর্বে সরকারের অংশ ছিল এবং প্রধানমন্ত্রী নিজে অতীতে রাম-এর সাথে সরকার গঠনের চেষ্টা করেছিলেন)। নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টি উভয় আরব দলের বিরুদ্ধে ঘুষের মাধ্যমে নির্বাচন ‘ছিনতাই‘ করার অভিযোগ তুলেছে; তবে তদন্ত চলা সত্ত্বেও এই দাবির পক্ষে এখন পর্যন্ত কোনো বস্তুনিষ্ঠ প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারানো নেতানিয়াহু, হারজোগ-আব্বাস বৈঠকের কয়েক ঘণ্টা আগে এক ভিডিও বার্তায় বলেন, ‘সন্ত্রাসবাদ সমর্থক ইসলামপন্থী দলগুলো‘ ভেতর থেকে ইসরাইলকে হুমকি দিচ্ছে এবং তাদের ওপর নির্ভরশীল যেকোনো সরকার ইসরাইলকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলবে।

নেতানিয়াহু বলেন, ‘উগ্র ইসলাম আজ এমন এক চ্যালেঞ্জ যা ইউরোপের দেশগুলোকে বিভক্ত করে ফেলছে। এটি আমাদের জন্যও এক বিশাল চ্যালেঞ্জ। ইরানের প্রক্সিগুলোর মাধ্যমে বিদেশ থেকে এবং সন্ত্রাসবাদ সমর্থক ইসলামপন্থী দলগুলোর মাধ্যমে ভেতর থেকেও এটি আমাদের হুমকি দিচ্ছে।’

তিনি আরো বলেন, ‘তারা ইসরাইলের ইহুদি পরিচয় মুছে ফেলতে চায়। তারা খোলামেলাই তা বলে। তারা চায় আমাদের শত্রুদের বিরুদ্ধে নিজেদের রক্ষা করার ক্ষমতা থেকে আমাদের বঞ্চিত করতে।’

নেতানিয়াহুর মতে, উগ্র ইসলামের ওপর নির্ভরশীল সরকার ‘কেবল শত্রুদের বিরুদ্ধে লড়াই করতেই ব্যর্থ হবে না, বরং ভেতর থেকে আমাদের ধ্বংস করে দেবে।’

তিনি তার নেতৃত্বে একটি ‘বিস্তৃত জাতীয় সরকার‘ গঠনের আহবান আবারো পুনর্ব্যক্ত করেন।

তবে জায়োনিস্ট বিরোধী দলের নেতারা নেতানিয়াহু এবং তার চরমপন্থী মিত্রদের সাথে যেকোনো ঐক্যবদ্ধ সরকারের সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়েছেন—যে মিত্রদের নেতানিয়াহু তার যেকোনো ভবিষ্যৎ সরকারে সাথে রাখার অঙ্গীকার করেছেন। সূত্র : টাইমস অব ইসরাইল