করপোরেট চাকরি, বঞ্চিত জীবন
করপোরেট চাকরি, বঞ্চিত জীবন। নয়া দিগন্ত গ্রাফিক্স

তরুণদের কাছে করপোরেট চাকরি আকর্ষণীয় ক্যারিয়ার। আধুনিক অফিস, সুন্দর পরিবেশ, ভালো পদবি, ল্যাপটপ, মিটিং, প্রেজেন্টেশন সবমিলিয়ে বাইরে থেকে করপোরেট জীবন বেশ ঝকঝকে; কিন্তু এই চাকচিক্যের আড়ালে অনেক বেসরকারি চাকরিজীবীর জীবন কাটছে দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, অতিরিক্ত চাপ, কম বেতন, চাকরির অনিশ্চয়তা এবং নানা ধরনের বঞ্চনার মধ্য দিয়ে।

Advertisement

দেশের অর্থনীতিতে বেসরকারি খাতের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। লাখ লাখ মানুষ এই খাতে কাজ করে পরিবার চালাচ্ছেন; কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, কর্মীদের শ্রম ও সময়ের যথাযথ মূল্যায়ন সব প্রতিষ্ঠান করে না। অনেক প্রতিষ্ঠান কর্মীদের কাছ থেকে দায়িত্বের চেয়ে বেশি কাজ আদায় করলেও সেই অনুপাতে বেতন, সুযোগ-সুবিধা কিংবা নিরাপত্তা নিশ্চিত করে না।

সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো চাকরির অনিশ্চয়তা। অনেক কর্মী জানেন না, আগামী মাসেও তার চাকরিটি থাকবে কি না। ফলে অন্যায় বা অতিরিক্ত চাপের প্রতিবাদ করার সাহস অনেকের থাকে না। চাকরি হারানোর ভয় তাকে নীরবে সবকিছু মেনে নিতে বাধ্য করে। অনেক করপোরেট প্রতিষ্ঠানে পদোন্নতির ক্ষেত্রেও স্বচ্ছতার অভাব রয়েছে। যোগ্যতা, দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার পরিবর্তে ব্যক্তিগত সম্পর্ক কিংবা তদবির কখনো কখনো বেশি গুরুত্ব পায়। এতে যোগ্য কর্মীরা হতাশ হন এবং কর্মক্ষেত্রে তাদের আগ্রহ কমে যায়।

বেসরকারি চাকরিজীবীদের আরেকটি বড় সমস্যা হলো জীবনযাত্রার ব্যয়ের সাথে বেতনের অসামাঞ্জস্য। বাসাভাড়া, খাবার, যাতায়াত, চিকিৎসা, পরিবারের খরচসহ জীবনযাত্রার ব্যয় ক্রমেই বাড়ছে। অথচ কর্মীদের বেতন সেই অনুপাতে বাড়ছে না। মাসের শেষে বেতন পেয়েও অনেকের হাতে তেমন কিছু থাকে না। অনেকে পরিবারকে সাহায্য করতে পারেন না, কেউ ঋণের বোঝা টানেন, আবার অনেকে ভবিষ্যতের জন্য সামান্য সঞ্চয়ও করতে পারেন না। শুধু অর্থনৈতিক বিষয় নয়, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা ও অতিরিক্ত মানসিক চাপও এসব কর্মীর জীবনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত কর্মস্থলে ব্যস্ত থাকার কারণে পরিবারকে সময় দেয়া কঠিন হয়ে পড়ে। সন্তান, স্ত্রী, বাবা-মা ও আপনজনের সাথে সময় কাটানোর সুযোগ কমে যায়। ধীরে ধীরে কর্মজীবন ও ব্যক্তিজীবনের মধ্যে ভারসাম্য নষ্ট হয়। একজন কর্মী যন্ত্র নন। তার বিশ্রাম দরকার, পরিবারকে সময় দেয়া দরকার, যা মানসিক প্রশান্তি আনে। কর্মীর শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা নিশ্চিত করা শুধু মানবিক দায়িত্ব নয়, প্রতিষ্ঠানের উৎপাদনশীলতার জন্যও জরুরি। সুস্থ ও সন্তুষ্ট কর্মীই দীর্ঘমেয়াদে প্রতিষ্ঠানের জন্য বেশি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেন।

সরকারেরও এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। শ্রম আইন ও কর্মীদের অধিকার যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। কর্মঘণ্টা, বেতনভাতা, ছুটি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং চাকরির ন্যায্যতার বিষয়ে নিয়মিত তদারকি প্রয়োজন। অভিযোগ থাকলে দ্রুত ও নিরপেক্ষভাবে তা সমাধানের ব্যবস্থা থাকতে হবে।

করপোরেট সেক্টরের প্রকৃত উন্নয়ন শুধু সুউচ্চ ভবন, আধুনিক অফিস কিংবা বড় টার্নওভার দিয়ে মাপা যায় না। একটি প্রতিষ্ঠান কতটা মানবিক, কর্মিবান্ধব এবং ন্যায়সঙ্গত সেটিও উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড।

আমরা এমন কর্মসংস্কৃতি চাই, যেখানে একজন কর্মীকে ভয় দেখিয়ে নয়, সম্মান দিয়ে কাজ করানো হবে। যেখানে অতিরিক্ত শ্রমের যথাযথ মূল্য থাকবে, যোগ্যতার ভিত্তিতে পদোন্নতি এবং কর্মীর ব্যক্তিজীবনের প্রতিও সম্মান দেখানো হবে।

কর্মীর ঘামেই প্রতিষ্ঠানের সাফল্যের ভিত্তি তৈরি হয়। তাই সেই ঘামের মূল্য দিতে হবে। করপোরেট জীবনের চাকচিক্য তখনই সত্যিকারের সুন্দর হবে, যখন তার আড়ালে কোনো কর্মীর বঞ্চিত ও অনিশ্চিত জীবন লুকিয়ে থাকবে না।

মারুফা আক্তার, শিক্ষার্থী, ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়