
নিজস্ব প্রতিবেদক
সোনাদিয়ায় প্রাকৃতিকভাবে ১৮ মিটার গভীরতার একটি আন্তর্জাতিক মানের গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের পরিকল্পনা বাদ দিয়ে ১৩ দশমিক ৪ মিটার ড্রাফটের ড্রেজিংনির্ভর মাতারবাড়ি বন্দরকে বিকল্প হিসেবে নেয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে বাংলাদেশের গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন পূরণ হলেও কাক্সিক্ষত সক্ষমতা ও কৌশলগত সম্ভাবনা অর্জিত হচ্ছে না বলে মন্তব্য করেছেন জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ। তিনি বলেন, ‘দুধের স্বাদ ঘোলে মেটানোর মতো বাংলাদেশকে এখন মাতারবাড়ি বন্দর নিয়ে সন্তুষ্ট থাকতে হচ্ছে। সোনাদিয়ায় প্রাকৃতিকভাবে ১৮ মিটার গভীরতার একটি বন্দর নির্মাণের সুযোগ ছিল। অথচ এখন ১৩ দশমিক ৪ মিটার ড্রাফটের একটি বন্দরের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে, যেখানে নিয়মিত ড্রেজিংয়ের প্রয়োজন হবে।’ তিনি বলেন, বন্দর নির্মাণে জাতিকে অন্ধকারে রাখলে আমরা সোচ্চার হবো।
গতকাল রোববার রাজধানীর জাতীয় প্রেস ক্লাবের কাজী নজরুল ইসলাম মিলনায়তনে নেক্সাস ডিফেন্স অ্যান্ড জাস্টিসের আয়োজনে ‘মাতারবাড়ি সমুদ্রবন্দর : ভূ-রাজনৈতিক ও কৌশলগত পর্যালোচনা’ শীর্ষক গোলটেবিল সংলাপে তিনি এ কথা বলেন। এতে উদ্বোধনী বক্তব্য দেন সাবেক কূটনীতিক সাকিব আলী। কিনোট পেপার উপস্থাপন করেন এনডিজের প্রেসিডেন্ট ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব:) মোহাম্মদ হাসান নাসির। আলোচনায় অংশ নেন সাবেক সচিব এ এফ এম সোলায়মান চৌধুরী, মোতাহার হোসেন, সাবেক সচিব ও রাষ্ট্রদূত মোতালেব হোসেন, মানারাত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ভিসি প্রফেসর ড. আব্দুর রব, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার এ এস এম শাহরিয়ার কবির, উন্নয়ন অর্থনীতিবিদ ড. শিব্বির আহমদ, সাবেক অতিরিক্ত সচিব মো: মহিউদ্দিন, মেজর জেনারেল (অব:) আমসা আমিন, সাবেক সংসদ সদস্য ও বীর মুক্তিযোদ্ধা মেজর (অব:) আখতারুজ্জামান, বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান ডা. মোস্তাফিজুর রহমান ইরান, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টির চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট আনোয়ারুল ইসলাম চান, ডিইউজের সভাপতি শহীদুল ইসলাম, নিরাপত্তা বিশ্লেষক লেফট্যানেন্ট জেনারেল (অব:) হাসান সোহরাওয়ার্দী, প্রফেসর ড. এস কে আকরাম আলী, রাজনৈতিক বিশ্লেষক রুবি আমাতুল্লাহ, সাবেক অতিরিক্ত সচিব আব্দুল হালিম, ডক্টর কামরুল হাসান প্রমুখ।
বক্তারা বলেন, কৌশলগত সিদ্ধান্ত হিসেবে গভীর সমুদ্রবন্দর শুধু অবকাঠামো প্রকল্প নয়, এটি একটি কৌশলগত সিদ্ধান্ত। চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দরের সীমাবদ্ধতার কারণে দেশের কনটেইনারের একটি বড় অংশ কলম্বো, সিঙ্গাপুর ও পোর্ট ক্লাং হয়ে চলাচল করে, যাতে খরচ, বিলম্ব ও ঝুঁকি বাড়ে।
২০০৯ সালে জাপানের প্যাসিফিক কনসালট্যান্টস ইন্টারন্যাশনালের সমীক্ষায় ৯টি স্থান যাচাই করে সোনাদিয়া-মহেশখালী এলাকাকে সবচেয়ে উপযুক্ত চিহ্নিত করা হয়। সেখানে ছিল ১৪ থেকে ১৬ মিটার প্রাকৃতিক গভীরতা ও তুলনামূলক কম ড্রেজিংয়ের সুবিধা। ২০২০ সালে সরকার পরিবেশগত ঝুঁকির কারণ দেখিয়ে প্রকল্পটি বাতিল করে; তবে অনেক বিশ্লেষকের মতে এর পেছনে ভূরাজনৈতিক চাপই ছিল মুখ্য কারণ।
সোনাদিয়ার বিকল্প হিসেবে দাঁড় করানো পায়রা বন্দর প্রসঙ্গে বক্তারা বলেন, সেখানকার প্রাকৃতিক ড্রাফট মাত্র ৬ মিটার। ব্যাপক ও লাগাতার মেইনটেনেন্স ড্রেজিং ছাড়া বড় জাহাজ ভেড়ানো সম্ভব নয়। প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের পরও তৃতীয় ধাপের কাজ ও বড় জাহাজের ভিড়ার লক্ষ্য অনিশ্চিত।
২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে ১৪ দশমিক ৩ কিলোমিটার দীর্ঘ, ২৫০ মিটার প্রশস্ত ও ১৬ মিটার গভীর চ্যানেল চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হয়। দুই বছরের মধ্যেই কিছু অংশে পলি জমে গভীরতা প্রায় ১০ মিটারে নেমে আসে এবং ২০২৬ সালের জুনে মেইনটেন্যান্স ড্রেজিং শুরু করতে হয়।
বক্তাদের মতে, এর ব্যয় ও পরিবেশগত প্রভাব দীর্ঘমেয়াদি। ঘোলা পানি ও ড্রেজড মাটি ফেলার স্থান, কচ্ছপ ও পরিযায়ী পাখির আবাস, জেলেদের জীবিকা এবং কোহেলিয়া নদীর পলি জমার প্রশ্নও এর সাথে জড়িত।
প্রকল্পের অনুমোদিত ব্যয় ১৭ হাজার ৭৭৭ কোটি টাকা থেকে বেড়ে প্রায় ২৪ হাজার ৩৮১ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে, অর্থাৎ বেড়েছে প্রায় ৩৭ শতাংশ। বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরুর সম্ভাব্য সময় ২০২৯-৩০। তারা তিনটি ঝুঁকির কথা তুলে ধরেন : প্রত্যাশার চেয়ে কম কার্গো এলে ঋণের কিস্তি ও পরিচালন ব্যয়ের চাপ সরাসরি করদাতার ওপর পড়বে। নিয়মিত ড্রেজিং ব্যয় বিনিয়োগের প্রতিদান দীর্ঘায়িত করে প্রকল্পকে অলাভজনক করে তুলতে পারে। কয়লানির্ভর অবকাঠামো ভবিষ্যতে অব্যবহৃত সম্পদে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
তারা বলেন, সোনাদিয়ায় ভারত, জাপান ও যুক্তরাষ্ট্রের আপত্তি ছিল আর মাতারবাড়ী জাপানের ইন্দো-প্যাসিফিক কানেক্টিভিটি দৃষ্টিভঙ্গির সাথে সঙ্গতিপূর্ণ ও ভারতের কাছেও গ্রহণযোগ্য। প্রাকৃতিক গভীরতায় সোনাদিয়া এগিয়ে হলেও অর্থায়ন, কূটনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা ও স্বল্পমেয়াদি সুফলের বিচারে এগিয়ে মাতারবাড়ী।
মাতারবাড়ী ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের প্রবেশদ্বার হতে পারে, যা রাজস্ব, কর্মসংস্থান ও আঞ্চলিক সহযোগিতার সুযোগ তৈরি করবে। বক্তাদের ভাষ্য, যোগাযোগ নিজে কোনো হুমকি নয়; ঝুঁকি তৈরি হয় নিয়ন্ত্রণ ও সুরক্ষা ছাড়া প্রবেশাধিকার দিলে।
তারা বলেন, একতরফাভাবে করিডোর দিলে সার্বভৌমত্বের সুরক্ষা ও চলাচল নিয়ন্ত্রণ ক্ষুণœ হবে। দর-কষাকষির সক্ষমতা হ্রাস পেলে ন্যায্য রাজস্ব দাবি করাও কঠিন হবে। বাণিজ্যিক অবকাঠামোর সামরিক ব্যবহার স্বয়ংক্রিয় হতে পারে না। এই বন্দর ভারত-চীন প্রতিদ্বন্দ্বিতার লজিস্টিক করিডোরে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তারা আরো বলেন, পোর্ট টার্মিনাল, ডিজিটাল সিস্টেম ও ডেটাবেসে বিদেশী প্রতিষ্ঠানের অতি-নির্ভরতা সাইবার ও নিয়ন্ত্রণগত ঝুঁকি তৈরি করে।
সেমিনারে বক্তারা চার দফা প্রস্তাব দেন। তার মধ্যে রয়েছে জাতীয় নীতিমালা; বন্দর চালুর আগেই ‘জাতীয় কৌশলগত নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক যোগাযোগ নীতিমালা’ প্রণয়ন, যেখানে জাতীয় মালিকানা, সমন্বিত সামুদ্রিক নিরাপত্তা, ডিজিটাল সার্বভৌমত্ব, কৌশলগত নিরপেক্ষতা ও নিয়মিত সংসদীয় তদারকি থাকবে।
বিদ্যমান ব্যবস্থার পুনর্মূল্যায়ন; ২০১৮ সালের বন্দর ব্যবহার চুক্তি, ২০১৯ সালের কার্যপদ্ধতি, নৌ-প্রটোকল ও উপকূলীয় নৌপরিবহন চুক্তিসহ সব ব্যবস্থার পুনর্মূল্যায়ন।
বাণিজ্যিক ট্রানজিট ও সামরিক প্রবেশাধিকারের পার্থক্য; স্পষ্ট আইনি পার্থক্য নির্ধারণ এবং সামরিক-সংশ্লিষ্ট যেকোনো পরিবহনে কঠোর নিষেধাজ্ঞা বাধ্যতামূলক করা।
স্বাধীন তুলনামূলক বিশ্লেষণ; সোনাদিয়া ও মাতারবাড়ীর ৩০ বছরের ড্রেজিং ব্যয়, অবকাঠামো ব্যয়, পরিবেশগত ব্যয়, ঋণের সুদ ও সুযোগ-ব্যয় হিসাব করে একটি স্বাধীন বিশ্লেষণ পরিচালনা।
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব:) মোহাম্মদ হাসান নাসির বলেন, আসল প্রশ্ন এটি নয় যে ভারত কোন বন্দর থেকে সুবিধা পাবে; প্রশ্ন হলো বাংলাদেশ সার্বভৌম নিয়ন্ত্রণ ও কৌশলগত স্বাধীনতা বজায় রেখে সমানুপাতিক সুবিধা নিশ্চিত করতে পারবে কি না। তিনি বলেন, ‘বন্দর শুধু কংক্রিট, ক্রেন আর চ্যানেল নয়’; কে আমাদের সাথে ব্যবসা করবে, কে অবকাঠামোয় বিনিয়োগ করবে, কাদের জাহাজ জেটিতে ভিড়বে এবং নিজেদের অর্থনৈতিক ভাগ্যের ওপর আমরা কতটা নিয়ন্ত্রণ রাখব, সবই বন্দরের মধ্য দিয়ে নির্ধারিত হয়।
তার বিশ্বাস, মাতারবাড়ী হবে বাংলাদেশের সার্বভৌম সামুদ্রিক সম্পদ, আঞ্চলিক বাণিজ্যের প্রবেশদ্বার ও ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতির হাতিয়ার; কোনো বহিঃশক্তির একচেটিয়া কৌশলগত করিডোর নয়। তিনি আশা প্রকাশ করেন, আলোচনা স্লোগানের গণ্ডি ছাড়িয়ে প্রমাণভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গির দিকে এগোবে, যাতে বাংলাদেশ আরেকটি হাম্বানটোটার পথে না গিয়ে বঙ্গোপসাগরে একটি বিশ্বাসযোগ্য, ভারসাম্যপূর্ণ ও টেকসই সামুদ্রিক রাষ্ট্র হিসেবে নিজের জায়গা করে নিতে পারে।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








