
সৈয়দ মূসা রেজা
সৌদি আরবে বসবাস ও কর্মসংস্থানসংক্রান্ত আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে বিদেশী কর্মীদের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। এর প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশী কর্মীদের ওপরও। বিভিন্ন সূত্রের হিসাবে, গড়ে প্রতি সপ্তাহে প্রায় ৫০০ বাংলাদেশীকে বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় সৌদি আরব থেকে দেশে ফেরত পাঠানো হচ্ছে। তবে সৌদি সরকারের প্রকাশিত সাপ্তাহিক পরিসংখ্যানে বহিষ্কৃতদের জাতীয়তাভিত্তিক পূর্ণাঙ্গ হিসাব না থাকায় এই সংখ্যা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।
সৌদি আরবের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক অভিযানসংক্রান্ত তথ্য পরিস্থিতির ব্যাপকতা তুলে ধরছে। সৌদি প্রেস এজেন্সি (এসপিএ) গত ৭ নভেম্বর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, ২৯ অক্টোবর থেকে ৪ নভেম্বর পর্যন্ত এক সপ্তাহে দেশজুড়ে আবাসন, শ্রম ও সীমান্ত নিরাপত্তাসংক্রান্ত ১১ হাজার ৫৮৭টি আইন লঙ্ঘনের ঘটনা শনাক্ত করা হয়েছে। একই সময়ে ৪১ হাজার ১০৬ জন বিদেশী নাগরিকের বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগের প্রক্রিয়া চলছিল। তাদের মধ্যে ৯ হাজার ৫৮৯ জনকে নিজ নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে। এই ফেরত পাঠানো ব্যক্তিদের সবাই বাংলাদেশী নন; তারা বিভিন্ন দেশের নাগরিক।
অন্যদিকে, বাংলাদেশী কর্মীদের ফেরত আসার যে সাপ্তাহিক গড়ের কথা বলা হচ্ছে তা সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্র থেকে পাওয়া। তা দূতাবাস, প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করছে না। কারণ সৌদি আরবে কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ, আটক, দেশে ফেরার নির্দেশ এবং চূড়ান্ত বহিষ্কার- এগুলো পৃথক পর্যায়। সব আটক ব্যক্তিকে বহিষ্কার করা হয় না; আবার আইনগত জটিলতা, ভ্রমণ নথি ও অন্যান্য প্রশাসনিক কারণে দেশে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়াও দীর্ঘায়িত হতে পারে।
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বিদেশী শ্রমবাজার সৌদি আরব। জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) হিসাবে, ২০২৫ সালে বাংলাদেশ থেকে সাত লাখ ৫২ হাজার ৭১৫ জন কর্মী সৌদি আরবে গেছেন। একই বছর বিদেশে কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ ছেড়েছেন প্রায় ১১ লাখ ১৭ হাজার কর্মী। অর্থাৎ ওই বছর বিদেশে যাওয়া বাংলাদেশী কর্মীদের প্রায় ৬৭ শতাংশের গন্তব্য ছিল সৌদি আরব। ফলে দেশটির অভিবাসন ও শ্রম আইন প্রয়োগের পরিবর্তন বাংলাদেশের কর্মসংস্থান, বৈদেশিক মুদ্রা আয় এবং লাখ লাখ পরিবারের জীবনযাত্রায় সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে।
এক সপ্তাহে ১১ হাজার ৫৮৭টি আইন লঙ্ঘন
সৌদি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২৯ অক্টোবর থেকে ৪ নভেম্বর পর্যন্ত শনাক্ত ১১ হাজার ৫৮৭টি আইন লঙ্ঘনের ঘটনার মধ্যে ছয় হাজার ৪৩টি আবাসন বা রেসিডেন্সি আইনসংক্রান্ত, তিন হাজার ১৯১টি সীমান্ত নিরাপত্তাসংক্রান্ত এবং দুই হাজার ৩৩৫টি শ্রম আইনসংক্রান্ত।
একই সময়ে দেশটিতে ৪১ হাজার ১০৬ জন বিদেশী নাগরিকের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া চলছিল। তাদের মধ্যে ৩৮ হাজার ৮১৩ জন পুরুষ এবং দুই হাজার ২৯৩ জন নারী। আটক ব্যক্তিদের মধ্যে ২৩ হাজার ১৯৩ জনকে নিজ নিজ দেশের দূতাবাস বা কনস্যুলেটের সাথে যোগাযোগ করে বৈধ ভ্রমণ নথি সংগ্রহের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। ৯ হাজার ১৩৯ জনকে দেশে ফেরার ব্যবস্থা সম্পন্ন করতে বলা হয়েছে। আর ৯ হাজার ৫৮৯ জনকে ইতোমধ্যে নিজ নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে।
এ ছাড়া অবৈধভাবে সৌদি আরবে প্রবেশের চেষ্টা করার সময় এক হাজার ৬৭৮ জনকে আটক করা হয়েছে। দেশটি থেকে অবৈধভাবে বের হওয়ার চেষ্টার অভিযোগে আটক হয়েছেন ১৮ জন। এই পরিসংখ্যান সৌদি আরবে অভিবাসন ও শ্রম আইন প্রয়োগের কঠোরতা এবং নিয়মিত অভিযানের ব্যাপ্তি নির্দেশ করে।
তবে ১১ হাজার ৫৮৭টি আইন লঙ্ঘনের ঘটনা এবং ৯ হাজার ৫৮৯ জনের প্রত্যাবাসনকে একই ধরনের পরিসংখ্যান হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই। প্রথমটি শনাক্ত হওয়া আইন লঙ্ঘনের ঘটনা, দ্বিতীয়টি বিভিন্ন দেশের নাগরিকদের দেশে ফেরত পাঠানোর সংখ্যা। বাংলাদেশীদের বহিষ্কারের প্রকৃত চিত্র জানতে পৃথক জাতীয়তাভিত্তিক তথ্য প্রয়োজন।
আকামা সঙ্কটের পেছনে কারা?
সৌদি আরবে বিদেশী কর্মীদের বৈধভাবে বসবাস ও কাজ করার জন্য আকামা এবং সংশ্লিষ্ট কর্মানুমতি প্রয়োজন। আকামা কেবল পরিচয়পত্র নয়; এটি কর্মীর বৈধ অবস্থান, নিয়োগকর্তা এবং কর্মসংস্থানের সাথে সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ নথি। চাকরি পরিবর্তন, নিয়োগকর্তা পরিবর্তন কিংবা প্রতিষ্ঠানের অধীনে কর্মীর অবস্থান পরিবর্তনের ক্ষেত্রে সৌদি আরবের নির্ধারিত বিধি অনুসরণ করতে হয়।
কিন্তু বাস্তবে অনেক বাংলাদেশী কর্মী সৌদি আরবে যাওয়ার পর প্রতিশ্রুত কর্মস্থলে কাজ পান না। কেউ নির্ধারিত নিয়োগকর্তার পরিবর্তে অন্যত্র কাজ করতে বাধ্য হন। আবার কোনো কোনো নিয়োগকর্তা কর্মীর আকামা নবায়ন করেন না, বেতন আটকে রাখেন কিংবা কর্মীকে দায়িত্বহীনভাবে ছেড়ে দেন। ফলে কর্মী একপর্যায়ে অনিয়মিত অবস্থায় পড়ে যান।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আকামার মেয়াদ শেষ হওয়া, কর্মানুমতি নবায়ন না হওয়া এবং নিয়োগকর্তার কাছে অনুপস্থিত বা পলাতক হিসেবে রিপোর্ট করা- সব এক বিষয় নয়। প্রতিটির আইনগত অবস্থান ও প্রতিকারও আলাদা।
সৌদি আরবে এ ধরনের পরিস্থিতির সাথে ‘হুরুব’ বা পলাতক কর্মী হিসেবে চিহ্নিত হওয়ার বিষয়টিও জড়িত। নিয়োগকর্তার কাছে অনুপস্থিতির অভিযোগ, কর্মসংস্থানসংক্রান্ত বিরোধ কিংবা প্রশাসনিক নথিতে কর্মীর অবস্থান নিয়ে জটিলতা তৈরি হলে তার জন্য নতুন চাকরি বা বৈধ অবস্থানে ফিরে যাওয়ার পথ কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
তবে নিয়োগকর্তা পরিবর্তনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই পুরোনো স্পন্সরের অনুমতি অপরিহার্য- এমন ধারণাও পুরোপুরি সঠিক নয়। সৌদি মানবসম্পদ ও সামাজিক উন্নয়ন মন্ত্রণালয়ের ২০২৬ সালের ৮ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত সেবা নির্দেশনায় নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ সাপেক্ষে বর্তমান নিয়োগকর্তার অনুমোদন ছাড়াও নতুন নিয়োগকর্তার অধীনে স্থানান্তরের সুযোগের কথা বলা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে কিউয়া (ছরধি) প্ল্যাটফর্মে নতুন নিয়োগকর্তা চাকরির প্রস্তাব দেন এবং কর্মী তা গ্রহণ বা প্রত্যাখ্যান করতে পারেন।
নিয়োগকর্তার অনিয়ম, ভুক্তভোগী কর্মী
সৌদি শ্রমবাজারে বাংলাদেশী কর্মীদের অনিয়মিত হয়ে পড়ার পেছনে শুধু কর্মীদের আইন অমান্য করাই দায়ী নয়। অনেক ক্ষেত্রে নিয়োগকর্তার চুক্তিভঙ্গ, বেতন আটকে রাখা, আকামা নবায়ন না করা এবং প্রতিশ্রুত কর্মসংস্থান না দেয়ার অভিযোগ রয়েছে।
সৌদি শ্রম আইন অনুযায়ী, বিদেশী কর্মীকে বৈধ কর্মানুমতির অধীনে কাজ করতে হয় এবং নিয়োগকর্তার সাথে তার চুক্তিভিত্তিক সম্পর্ক থাকতে হয়। কর্মীর আবাসিক অনুমতিপত্র ও কর্মসংস্থানসংক্রান্ত প্রয়োজনীয় ব্যয় বহনের দায়িত্বও নিয়োগকর্তার ওপর বর্তায়। ফলে আকামা নবায়ন না করার দায় সব ক্ষেত্রে কর্মীর ওপর চাপিয়ে দেয়ার সুযোগ নেই।
অথচ বাংলাদেশ থেকে যাওয়ার পর কোনো কোনো কর্মী দেখতে পান, যে প্রতিষ্ঠানে চাকরির কথা বলা হয়েছিল সেখানে কাজ নেই। কেউ বেতন পান না, কেউ আবাসন সুবিধা থেকে বঞ্চিত হন। আবার কেউ প্রতিশ্রুত পেশার পরিবর্তে সম্পূর্ণ ভিন্ন কাজে নিয়োজিত হতে বাধ্য হন। এসব পরিস্থিতিতে নিয়োগকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ জানানোর পদ্ধতি না জানায় অনেক কর্মী অসহায় হয়ে পড়েন।
এ ধরনের অনিয়মের সাথে ভিসা ব্যবসায়ী, মধ্যস্বত্বভোগী এবং কিছু অসাধু রিক্রুটিং এজেন্সির সংশ্লিষ্টতার অভিযোগও রয়েছে। কথিত ফ্রি ভিসার নামে কর্মী পাঠানোর প্রবণতা সমস্যাকে আরো জটিল করছে। সৌদি আরবে বৈধভাবে কাজ করতে হলে প্রকৃত নিয়োগকর্তা, কর্মানুমতি এবং কর্মসংস্থানের বৈধ ভিত্তি থাকা জরুরি। এসব নিশ্চিত না করে বিদেশে পাঠানো কর্মীকে সহজেই অনিশ্চিত অবস্থায় ঠেলে দেয়া হয়।
দেশে ফেরার প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতা
সৌদি আরব থেকে বৈধভাবে দেশে ফেরার ক্ষেত্রে ফাইনাল এক্সিট বা চূড়ান্ত প্রস্থান ভিসা গুরুত্বপূর্ণ। তবে ফাইনাল এক্সিট এবং সাধারণ এক্সিট-রিএন্ট্রি ভিসা এক বিষয় নয়। সৌদি সরকারের আবশের সেবা নির্দেশনা অনুযায়ী, ফাইনাল এক্সিটের ক্ষেত্রে বৈধ পাসপোর্ট, আবাসিক অনুমতিপত্র, প্রযোজ্য ফি এবং নির্ধারিত অন্যান্য শর্ত পূরণ করতে হয়। ট্রাফিক জরিমানা নিষ্পত্তি ও সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক শর্তও প্রযোজ্য হতে পারে।
যেসব কর্মীর আকামা নেই কিংবা যাদের বিরুদ্ধে আইনগত জটিলতা রয়েছে, তাদের দেশে ফেরার প্রক্রিয়া আরো কঠিন হতে পারে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ দূতাবাসের মাধ্যমে পরিচয় ও নাগরিকত্ব যাচাই, ভ্রমণ নথি সংগ্রহ এবং সৌদি কর্তৃপক্ষের সাথে সমন্বয় করতে হয়।
কিছু প্রবাসী স্বেচ্ছায় পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণ করে আটককেন্দ্রে যান। এরপর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের যাচাই-বাছাই শেষে দেশে ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়। তবে প্রত্যেকের ক্ষেত্রে জরিমানা ছাড়া ফেরার সুযোগ রয়েছে- এমন নিশ্চয়তা নেই। অপরাধ, আর্থিক দায়, প্রশাসনিক নিষেধাজ্ঞা এবং অভিবাসনসংক্রান্ত অবস্থার ওপর প্রক্রিয়া নির্ভর করে।
সংশ্লিষ্ট কয়েকটি সূত্রের দাবি, বিশেষ পরিস্থিতিতে দেশে ফেরার সুযোগ নিতে প্রতিদিন কয়েক শ’ বাংলাদেশী দূতাবাসে যোগাযোগ করেন। এসব আবেদন নিষ্পত্তিতে ১৫ দিন থেকে দুই মাস পর্যন্ত সময় লাগতে পারে বলেও জানা গেছে। তবে বিশেষ এক্সিট পারমিট বা এসিপি নামে কোনো সাধারণ ও সর্বজনীন জরিমানামুক্ত কর্মসূচি বর্তমানে কার্যকর রয়েছে কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত সরকারি নির্দেশনা পাওয়া যায়নি। এ ধরনের ব্যবস্থায় কতজন বাংলাদেশী দেশে ফিরছেন, তারও হালনাগাদ পরিসংখ্যান প্রকাশ করা প্রয়োজন।
অনেক আবেদনকারীর পাসপোর্ট থাকে না। কারো কাছে দেশে ফেরার বিমানভাড়া কেনার অর্থও থাকে না। এসব ক্ষেত্রে পরিচয় যাচাই, ট্র্যাভেল পারমিট ও প্রয়োজনীয় সহায়তা দিতে হয়। ফলে দূতাবাসের কনস্যুলার সেবার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে।
কারাগারে বাংলাদেশী কতজন?
সৌদি আরবের কারাগারে বাংলাদেশী নাগরিকের সংখ্যা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। সংশ্লিষ্ট কয়েকটি সূত্রের বরাতে প্রায় সাত হাজার ১৩৭ জন বাংলাদেশী বন্দীর কথা বলা হচ্ছে। তাদের মধ্যে তিন হাজার ৬৪৩ জন মাদকসংক্রান্ত অপরাধে এবং এক হাজার ৫৩০ জন চুরির অভিযোগে কারাভোগ করছেন বলে দাবি করা হয়েছে। এ ছাড়া প্রায় ৩০০ বাংলাদেশী নারী যৌন পেশাসংক্রান্ত অপরাধে আটক রয়েছেন বলেও কিছু সূত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে এসব সংখ্যার পক্ষে সৌদি কারা কর্তৃপক্ষ, বাংলাদেশ দূতাবাস কিংবা প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের হালনাগাদ ও যাচাইকৃত কোনো সমন্বিত পরিসংখ্যান পাওয়া যায়নি। তাই এগুলোকে নিশ্চিত সরকারি তথ্য হিসেবে প্রকাশ করা সমীচীন নয়।
বিশেষ করে মাদক ব্যবহার, মাদক পাচার এবং মাদকসংক্রান্ত অন্যান্য অপরাধকে একই শ্রেণীতে ফেলা যাবে না। অভিযোগ, বিচারাধীন অবস্থা এবং দণ্ডপ্রাপ্ত হওয়ার মধ্যেও পার্থক্য রয়েছে। একইভাবে আটক নারীকর্মীদের ক্ষেত্রে অভিযোগের প্রকৃতি ও বিচারিক অবস্থান যাচাই করা জরুরি।
দীর্ঘদিন পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন থাকা, অনিয়মিত কর্মসংস্থান, বেকারত্ব, মানসিক চাপ এবং অপরাধী চক্রের প্রভাব কোনো কোনো কর্মীকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে পারে। তবে এসব কারণ অপরাধের দায়মুক্তি দেয় না। অপরাধে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি নিরপরাধ কর্মীদের প্রতারণা ও শোষণ থেকে রক্ষা করাও জরুরি।
দক্ষ কর্মী পাঠানোর সুযোগ কাজে লাগাতে হবে
বাংলাদেশ ও সৌদি আরবের মধ্যে ২০২৫ সালের ৬ অক্টোবর সাধারণ কর্মী নিয়োগসংক্রান্ত একটি দ্বিপক্ষীয় চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। এর লক্ষ্য দুই দেশের কর্মী নিয়োগ প্রক্রিয়াকে নিয়মতান্ত্রিক করা, নিয়োগকর্তা ও কর্মীর অধিকার সুরক্ষা এবং চুক্তিভিত্তিক সম্পর্ককে সুসংহত করা।
এ ছাড়া সৌদি আরবের স্কিল ভেরিফিকেশন প্রোগ্রামের আওতায় নির্দিষ্ট পেশার কর্মীদের দক্ষতা পরীক্ষা করা হচ্ছে। বাংলাদেশে পরীক্ষাকেন্দ্রের সংখ্যা বাড়ানোর উদ্যোগও নেয়া হয়েছে। এতে দক্ষ ও সনদপ্রাপ্ত কর্মীদের সৌদি শ্রমবাজারে প্রবেশের সুযোগ বাড়তে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কর্মী পাঠানোর নীতিতে সংখ্যার চেয়ে দক্ষতা ও কর্মসংস্থানের গুণগত মানকে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। নির্মাণ, বিদ্যুৎ, যন্ত্রপাতি পরিচালনা, গাড়ি মেরামত, প্লাম্বিং, ওয়েল্ডিং, স্বাস্থ্যসেবা, হোটেল-রেস্তোরাঁ এবং তথ্যপ্রযুক্তির মতো খাতে প্রশিক্ষিত কর্মী তৈরি করা গেলে তুলনামূলক বেশি বেতনের চাকরির সুযোগ বাড়বে।
শুধু অদক্ষ কর্মী পাঠিয়ে বিপুল রেমিট্যান্স অর্জনের প্রত্যাশা বাস্তবসম্মত নয়। দক্ষতা, ভাষাজ্ঞান, অভিজ্ঞতা এবং পেশাগত সনদ কর্মীর বেতন ও কর্মপরিবেশ উন্নত করতে পারে। একই সাথে নিয়োগকর্তার সাথে বিরোধ ও প্রতারণার ঝুঁকিও কমাতে পারে।
ভাষা ও সামাজিক আচরণেও ঝুঁকি
সৌদি আরবে গিয়ে অনেক বাংলাদেশী কর্মী আরবি ভাষা না জানার কারণে দৈনন্দিন জীবন ও কর্মক্ষেত্রে সমস্যায় পড়েন। নিয়োগকর্তার নির্দেশনা বোঝা, বেতনসংক্রান্ত বিরোধ জানানো, চিকিৎসা নেয়া কিংবা পুলিশের সাথে যোগাযোগের ক্ষেত্রে ভাষাগত অদক্ষতা বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
বিশেষ করে নারী গৃহকর্মীদের ক্ষেত্রে এ সমস্যা আরো জটিল। অনেক নারীকর্মী সৌদি আরবে যাওয়ার আগে কাজের ধরন, কর্মপরিবেশ, নিয়োগকর্তার দায়িত্ব, বিশ্রামের সময়, বেতন এবং নির্যাতনের শিকার হলে কোথায় অভিযোগ করতে হবে- এসব বিষয়ে পর্যাপ্ত ধারণা পান না। ফলে নির্যাতন বা শোষণের শিকার হলেও অনেক সময় যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে যেতে পারেন না।
সৌদি আরবে গৃহকর্মী নিয়োগ ও ব্যবস্থাপনার জন্য মুসানেদ নামে সরকারি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম রয়েছে। নির্ধারিত নিয়োগ ও সেবা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থাও আছে। পাশাপাশি স্থানীয় আইন, সামাজিক আচরণ, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক রীতিনীতি এবং ব্যক্তিগত পরিসর সম্পর্কে বাস্তবভিত্তিক ধারণা দিতে হবে। আইন সম্পর্কে অতিরঞ্জিত বা ভিত্তিহীন ভীতি সৃষ্টি না করে প্রয়োজনীয় সচেতনতা তৈরি করাই হবে কার্যকর পদ্ধতি।
দূতাবাসের দায়িত্ব ও বাংলাদেশের করণীয়
সৌদি আরবে বাংলাদেশ দূতাবাস এবং জেদ্দায় বাংলাদেশ কনস্যুলেটের ওপর বর্তমানে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব রয়েছে। অনিয়মিত অবস্থায় থাকা কর্মীদের নাগরিকত্ব যাচাই, ভ্রমণ নথি ইস্যু, আটক ব্যক্তিদের আইনি সহায়তা, নির্যাতিত কর্মীদের অভিযোগ গ্রহণ এবং সৌদি কর্তৃপক্ষের সাথে সমন্বয় করতে হচ্ছে।
তবে শুধু দেশে ফেরার কাগজপত্র সরবরাহ করাই দূতাবাসের দায়িত্ব হতে পারে না। কোন নিয়োগকর্তা নিয়মিত কর্মীদের আকামা নবায়ন করছেন না, কোন রিক্রুটিং এজেন্সি প্রতারণার সাথে জড়িত, কোথায় বেতন আটকে রাখা হচ্ছে এবং কোন প্রতিষ্ঠানে মানবপাচারের ঝুঁকি রয়েছে- এসব তথ্য সংগ্রহ করে বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো প্রয়োজন।
প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়, বিএমইটি, ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড এবং দূতাবাসের মধ্যে কার্যকর তথ্য বিনিময়ের ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। দেশে ফিরে আসা কর্মীদের অভিজ্ঞতা ও অভিযোগের ভিত্তিতে প্রতারণার সাথে জড়িত এজেন্সি ও মধ্যস্বত্বভোগীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে।
একই সাথে কর্মী পাঠানোর আগে নিয়োগকর্তা, প্রতিষ্ঠানের বাস্তব অস্তিত্ব, কর্মস্থল, বেতন, কাজের ধরন ও চুক্তির সত্যতা যাচাই বাধ্যতামূলক করতে হবে। শুধু ভিসা পাওয়া কিংবা বিএমইটির ছাড়পত্র নেয়াই নিরাপদ অভিবাসনের নিশ্চয়তা নয়।
শ্রমবাজার রক্ষায় এখনই উদ্যোগ প্রয়োজন
বাংলাদেশের জন্য সৌদি আরব শুধু একটি শ্রমবাজার নয়; এটি বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন, কর্মসংস্থান এবং লাখ লাখ পরিবারের জীবনযাত্রার সাথে যুক্ত। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে প্রবাসী আয় এসেছে ৩০.৩২৮৮১ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে সৌদি আরব থেকে এসেছে প্রায় ৪.২৬ বিলিয়ন ডলার।
এ অবস্থায় সৌদি আরব থেকে নিয়মিত কর্মী বহিষ্কার, অনিয়মিত অভিবাসন এবং নিয়োগকর্তার সাথে বিরোধের বিষয়গুলোকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এগুলো বাংলাদেশের শ্রমবাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতাও সামনে নিয়ে আসছে।
প্রথমত, সৌদি আরবে যাওয়ার আগে প্রত্যেক কর্মীর চাকরির চুক্তি, নিয়োগকর্তা ও কর্মস্থল যাচাই বাধ্যতামূলক করতে হবে। দ্বিতীয়ত, আরবি ভাষা, সৌদি শ্রম আইন, সামাজিক রীতিনীতি এবং জরুরি অভিযোগ জানানোর পদ্ধতি সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দিতে হবে। তৃতীয়ত, সৌদি আরবে কর্মরত বাংলাদেশীদের আকামা ও কর্মানুমতির অবস্থা পর্যবেক্ষণে কার্যকর তথ্যভাণ্ডার গড়ে তুলতে হবে। চতুর্থত, অবৈধ ভিসা ব্যবসা ও মানবপাচারের সাথে জড়িতদের বিরুদ্ধে দেশে-বিদেশে সমন্বিত ব্যবস্থা নিতে হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, সৌদি আরবে কর্মরত বাংলাদেশীদের সমস্যার দায় এককভাবে কর্মীদের ওপর চাপিয়ে না দিয়ে নিয়োগব্যবস্থার প্রতিটি পর্যায়ে জবাবদিহি নিশ্চিত করা।
সৌদি আরব এখনো বাংলাদেশী কর্মীদের জন্য বড় কর্মসংস্থানের সুযোগ ধরে রেখেছে। কিন্তু এই সুযোগ কাজে লাগাতে শুধু বিপুলসংখ্যক কর্মী পাঠানো যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন দক্ষ, প্রশিক্ষিত, আইন সম্পর্কে সচেতন এবং বৈধ চুক্তির আওতায় নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মী। অন্যথায় বহিষ্কারের ঘটনা চলতে থাকবে, কর্মীদের কষ্টার্জিত অর্থ ও স্বপ্ন ঝুঁকিতে পড়বে এবং বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শ্রমবাজারও অনিশ্চয়তার মুখে পড়বে।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








