
হামিম উল কবির
রোগী কিংবা হাসপাতালকর্মীদের কোলাহলহীন পরিবেশে চিকিৎসা হয় গুয়াংজুর ফার্স্ট পিপলস হাসপাতালে। আছে জীবাণু প্রতিরোধে সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা। হাসপাতালকর্মী ও চিকিৎসক-নার্সদের পদধ্বনি ছাড়া আর কোনো শব্দ শোনা যায় না সেখানে।
১৮৯৯ সালে প্রতিষ্ঠিত এ প্রতিষ্ঠানটি চীনের একটি শীর্ষস্থানীয় সরকারি টার্শিয়ারি হাসপাতাল। চিকিৎসকরা বলেন, হাসপাতালের দু’টি ইউনিটে মোট দুই হাজার ৪৯০টি শয্যা রয়েছে। একটি ইউনিটে ৭০০ শয্যা, অন্যটিতে ১,৭৯০টি রয়েছে। প্রায় আড়াই হাজার শয্যায় হাসপাতালে বছরে প্রায় ৩০ লাখ রোগী চিকিৎসাসেবা নেন। গুয়াংডং প্রদেশের আন্তর্জাতিক চিকিৎসাসেবার পরীক্ষামূলক প্রকল্পের আওতায় প্রথম সারির হাসপাতালগুলোর একটি হিসাবে এই প্রতিষ্ঠানটি শেনঝেন হসপিটাল অ্যাক্রিডিটেশন রিসার্চ সেন্টার (এসএইচএআরসি) সনদপ্রাপ্ত। এই এসএইচএআরসি আবার বিশ্বব্যাপী হাসপাতালের মানদণ্ড প্রত্যয়নকারী সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল সোসাইটি ফর কোয়ালিটি ইন হেলথকেয়ারের (আইএসকিইউএ) প্রত্যয়নপ্রাপ্ত। গুয়াংডং প্রদেশের আন্তর্জাতিক চিকিৎসাসেবার পাইলট প্রজেক্টের আওতাভুক্ত হাসপাতালগুলোকে আন্তর্জাতিক মানের চিকিৎসাসেবা ও রোগী নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণের স্বীকৃতিস্বরূপ এই দেয়া করা হয়।
হাসপাতালটিতে হেমাটোলজি বা রক্তরোগ, জেরিয়াট্রিকস (বৃদ্ধদের জন্য চিকিৎসা), গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি ও ইউরোলজিসহ জাতীয় পর্যায়ের চারটি বিশেষায়িত বিভাগ এবং প্রাদেশিক পর্যায়ের ২১টি গুরুত্বপূর্ণ বিভাগ রয়েছে। সরকারি ভাতাপ্রাপ্ত বিশেষজ্ঞ এবং চিকিৎসায় দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞ চিকিৎসকরা আধুনিক প্রযুক্তি ও বিশেষায়িত সেবার সমন্বয় করে রোগীদের চিকিৎসা দিয়ে থাকেন।
ইন্টারন্যাশনাল মেডিক্যাল সেন্টার অব গুয়াংজোর ফার্স্ট পিপলস হাসপাতালের নির্বাহী পরিচালক চেংজুয়ান ঝাং বাংলাদেশ হেলথ রিপোর্টার্স ফোরামের (বিএইচআরএফ) সফররত প্রতিনিধিদলকে বলেন, স্টেট কাউন্সিল সরকারের বিশেষ ভাতাপ্রাপ্ত ১০ জন বিশেষজ্ঞ এখানে চিকিৎসা দিচ্ছেন। এর বাইরে এক হাজারের বেশি সিনিয়র চিকিৎসক আছেন। আন্তর্জাতিক পর্যায়ের ৮৩ জন গবেষক চিকিৎসকের সাথে এই হাসপাতালের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। বাংলাদেশসহ বিদেশী রোগীদের জন্য হাসপাতালটির অ্যাপয়েন্টমেন্টের ব্যবস্থাও আছে। প্রয়োজনে ইংরেজিভাষী কর্মীর সহায়তাও পাওয়া যায়।
১২৭ বছরের পুরনো হলেও প্রযুক্তিগত দিক থেকে হাসপাতালটি খুবই আধুনিক। প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তা থেকে শুরু করে চিকিৎসক, নার্স ও টেকনোলজিস্টদের আচরণও শিক্ষণীয়। গত ২৫ অক্টোবর সকালে হাসপাতালে চীনা নাগরিকরা চিকিৎসা নিতে আসলে দেখা যায়, নাম নিবন্ধনের পর মেডিক্যাল টেকনোলজিস্টরা প্রত্যেককেই পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য বিভিন্ন কক্ষে নিয়ে যাচ্ছেন। কোনো সময়ক্ষেপণ নেই, রোগীদের সাথে কোনো অতিরিক্ত কথা নেই, শুধু সাথে থাকা ডক্টরস অ্যাডভাইস দেখেই শুরু হয়ে গেছে তাদের পরীক্ষা। দেখা গেছে, স্বল্প সময়ের মধ্যেই পরীক্ষা-নিরীক্ষা সম্পন্নের পর তারা বিদায় নিচ্ছেন। পরে হয়তো এসে চিকিৎসকদের দেখাবেন।
নির্বাহী পরিচালক চেংজুয়ান ঝাং বলেন, আন্তর্জাতিক চিকিৎসাকেন্দ্রের ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশের সাংবাদিক প্রতিনিধিদলের সদস্যদের নানশা ইউনিটে স্বাস্থ্য পরীক্ষার ব্যবস্থা করা হয়। কেন্দ্রটিতে রয়েছে পজিট্রন এমিশন টমোগ্রাফি-কম্পিউটেড টমোগ্রাফি (পিইটি-সিটি) এবং ৩ টেসলা ম্যাগনেটিক রেজোন্যান্স ইমেজিংয়ের (এমআরআই) মতো আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম। পরিদর্শনকালে বিএইচআরএফ সদস্যরা হাসপাতালের অভ্যর্থনা কেন্দ্র থেকে শুরু করে প্যাথলজি, সিটি স্ক্যান, আলট্রাসনোগ্রাম, ইসিজি এবং অন্য ডেস্কে রোগীদের পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও চিকিৎসাসেবা কার্যক্রম দেখেন। চিকিৎসকরা জানান, প্রত্যেক রোগীর স্বাস্থ্য পরীক্ষার ফল সেখানকার বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা একাধিক ধাপে পর্যালোচনা ও মান যাচাই করে থাকেন। পরীক্ষায় কোনো অস্বাভাবিকতা দেখা গেলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে আরো পরীক্ষা ও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেয়ারও ব্যবস্থা করে দেয়া হয়।
নির্বাহী পরিচালক চেংজুয়ান ঝাং আরো বলেন, এই হাসপাতালে গুরুতর অ্যাপ্লাস্টিক অ্যানিমিয়ার চিকিৎসায় দাতার কাছ থেকে সংগৃহীত স্টেম সেল প্রতিস্থাপন (অ্যালোজেনিক এইচএসসিটি) এবং থ্যালাসেমিয়া ও গাউচারে (জিনগত রোগ) মতো বিরল রোগের চিকিৎসা হয় সফলতার সাথে। হাসপাতালের আন্তর্জাতিক চিকিৎসা কেন্দ্রে পৃথক বহির্বিভাগ (ওপিডি) ও অন্তর্বিভাগের (আইপিডি) চিকিৎসাসুবিধা রয়েছে। এর মধ্যে আন্তর্জাতিক রোগীদের জন্য দুই হাজার ৫০০ বর্গমিটারের বেশি জায়গাজুড়ে বিশেষায়িত রক্তরোগ ও স্টেম সেল প্রতিস্থাপন ওয়ার্ড রয়েছে।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছেন, গুয়াংজুর গ্রেটার বে এরিয়ার ভৌগোলিক কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত নানশা ক্যাম্পাসকে আন্তর্জাতিক চিকিৎসাসেবার অন্যতম কেন্দ্রে পরিণত করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। হাসপাতালটি ‘গ্রেটার বে এরিয়া ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জাম ব্যবহারের অনুমতি’ নীতি বাস্তবায়নে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে।
স্টেমসেল প্রতিস্থাপন কক্ষে দেখা একটি শিশুর চিকিৎসায় ভেতরে চিকিৎসক ও নার্সের সাথে মাকে রাখা হয়েছে। শিশুর মা সেখানেই থাকছেন, তিনি শিশুর সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত বের হতে পারবেন না। বাইরের কোনো ভিজিটর কিংবা কোনো চিকিৎসকও সেখানে যেতে পারবেন না। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, জীবাণু সংক্রমণ যেন না হয় সে জন্য এই ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








