বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের গ্র্যাজুয়েটরা পিছিয়ে

হারুন ইসলাম

Advertisement

বিশ্বের শ্রমবাজারে প্রতিযোগিতা দিন দিন বাড়ছে। উচ্চশিক্ষার পাশাপাশি গুরুত্ব পাচ্ছে পেশাগত দক্ষতা, ইংরেজি ভাষাজ্ঞান, প্রযুক্তির ব্যবহার, গবেষণা, কাজের অভিজ্ঞতা ও সমস্যা সমাধানের সক্ষমতা। শুধু উচ্চ ডিগ্রি থাকলেই আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানে কাজের সুযোগ মিলছে না। প্রয়োজন আন্তর্জাতিক মানের দক্ষতা ও কাজের উপযোগী শিক্ষা। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে ভারত ও শ্রীলঙ্কার কর্মীরা বিভিন্ন খাতে নিজেদের অবস্থান তৈরি করেছেন। পাকিস্তানও তথ্যপ্রযুক্তি ও প্রকৌশল খাতে এগিয়ে যাচ্ছে। অন্য দিকে বাংলাদেশ থেকে তৈরী পোশাক, নির্মাণ, স্বাস্থ্যসেবা ও কিছু প্রযুক্তি খাতে কর্মী গেলেও উচ্চশিক্ষিত গ্র্যাজুয়েটদের অবস্থান এখনো দুর্বল।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) শ্রমশক্তি জরিপ ২০২৪ অনুযায়ী, দেশে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিগ্রি নেয়া মানুষের বেকারত্বের হার ১৩ দশমিক ৫৪ শতাংশ। ২০২৩ সালে এ হার ছিল ১৩ দশমিক ১১ শতাংশ। অর্থাৎ উচ্চশিক্ষিতদের মধ্যে বেকারত্ব কমার বদলে বেড়েছে। জরিপে দেখা যায়, শিক্ষার স্তর যত বাড়ছে, বেকারত্বের হারও তত বাড়ছে। উচ্চমাধ্যমিক পাস করা মানুষের বেকারত্বের হার ৭ দশমিক ১৩ শতাংশ। অন্য দিকে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নেই, এমন মানুষের ক্ষেত্রে এ হার মাত্র ১ দশমিক ২৫ শতাংশ।
এই পরিসংখ্যান উচ্চশিক্ষা ও শ্রমবাজারের মধ্যে বড় ধরনের অসংগতির চিত্র তুলে ধরছে। একজন শিক্ষার্থী চার-পাঁচ বছর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষে কর্মজীবনে প্রবেশ করেও ডিগ্রি অনুযায়ী কাজ পাচ্ছেন না। অনেকে দীর্ঘ দিন বেকার থাকছেন, কেউ বিষয়বহির্ভূত কাজে যুক্ত হচ্ছেন, আবার কেউ কম বেতনে কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ২০২৬ সালের বাংলাদেশবিষয়ক মূল্যায়নেও শিক্ষিত তরুণদের কর্মসংস্থানের দুর্বল চিত্র উঠে এসেছে। সংস্থাটির হিসাবে, ২০২৪ সালে দেশে সামগ্রিক বেকারত্বের হার ছিল ৩ দশমিক ৬৯ শতাংশ। তবে উচ্চশিক্ষিতদের মধ্যে এ হার ৮ দশমিক ৭ শতাংশ। উচ্চশিক্ষিত নারীদের বেকারত্বের হার ১৬ দশমিক ৬৬ শতাংশ, যেখানে পুরুষদের ক্ষেত্রে তা ৬ দশমিক ৩৭ শতাংশ। অর্থাৎ কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে উচ্চশিক্ষিত নারীরা তুলনামূলক বেশি বাধার মুখে পড়ছেন।
আইএমএফের মূল্যায়নে আরো বলা হয়েছে, ২০১৫ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে কৃষি, শিল্প ও সেবা- তিন খাতেই শিক্ষার গড় মান বেড়েছে। কিন্তু কর্মসংস্থানের কাঠামোয় তার যথাযথ প্রতিফলন ঘটেনি। এ সময়ে কৃষিতে কর্মসংস্থানের অংশ বেড়েছে ৪ দশমিক ৮ শতাংশ পয়েন্ট। বিপরীতে উৎপাদনশিল্পে কমেছে ২ দশমিক ২ এবং সেবা খাতে ২ দশমিক ৬ শতাংশ পয়েন্ট। অর্থাৎ শিক্ষিত মানুষের সংখ্যা বাড়লেও তাদের উপযোগী কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র একই হারে সম্প্রসারিত হয়নি।
আন্তর্জাতিক বাজারে এগিয়ে ভারত ও পাকিস্তান
আন্তর্জাতিক কর্মসংস্থানে ভারতের অবস্থান তুলনামূলক শক্তিশালী। তথ্যপ্রযুক্তি, সফটওয়্যার, প্রকৌশল, চিকিৎসা, আর্থিক সেবা ও গবেষণায় দেশটির কর্মীরা দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছেন। এর পেছনে রয়েছে বড় প্রযুক্তি শিল্প, বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের উপস্থিতি, ইংরেজিতে দক্ষ জনশক্তি এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে শিল্পপ্রতিষ্ঠানের যোগাযোগ।
ভারতের রিজার্ভ ব্যাংকের ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জরিপ অনুযায়ী, দেশটির সফটওয়্যার সেবা রফতানির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২২১ দশমিক ৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। আগের অর্থবছরের তুলনায় প্রবৃদ্ধি ৮ দশমিক ২ শতাংশ। এর ৫৪ দশমিক ১ শতাংশ গেছে যুক্তরাষ্ট্রে এবং ৩১ দশমিক ৮ শতাংশ ইউরোপে। এ খাতের সাথে যুক্ত রয়েছে বিপুলসংখ্যক প্রতিষ্ঠান ও দক্ষ পেশাজীবী।
ভারতের সাথে বাংলাদেশের ব্যবধানও এ ক্ষেত্রে স্পষ্ট। রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোসহ বিভিন্ন সূত্রে বলা হয়েছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশের তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (আইসিটি) রফতানি ছিল প্রায় ৬২ কোটি ৯৫ লাখ ডলার। একই সময়ে পাকিস্তানের এ খাতের রফতানি প্রায় ৩ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়। ভারতের তথ্যপ্রযুক্তি রফতানি ছিল ২২৪ বিলিয়ন ডলারের বেশি। পাকিস্তানও তথ্যপ্রযুক্তি খাতে বাংলাদেশের তুলনায় এগিয়ে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশটির আইটি রফতানি রেকর্ড ৩ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সরকারি পরিকল্পনায় ইংরেজিতে দক্ষ তিন লাখের বেশি আইটি পেশাজীবী এবং বছরে ৭৫ হাজারের বেশি আইটি গ্র্যাজুয়েট তৈরির লক্ষ্যের কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নিরাপত্তা, ক্লাউড কম্পিউটিং ও বিগ ডেটায় দক্ষতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
দক্ষ কর্মী পাঠানোয় এগোচ্ছে নেপাল ও শ্রীলঙ্কা
অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থার (ওইসিডি) ২০২৫ সালের ‘লেবার মাইগ্রেশন ইন এশিয়া’ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নেপাল থেকে বিদেশে কাজে যাওয়া কর্মীদের মধ্যে দক্ষ কর্মীর অংশ ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ছিল ৩৩ শতাংশ। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭২ শতাংশে। অর্থাৎ বিদেশে কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে দেশটি ধীরে ধীরে দক্ষতাভিত্তিক পেশার দিকে এগিয়েছে। একই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে বিদেশে যাওয়া কর্মীদের মধ্যে ৩২ শতাংশ দক্ষ এবং ২২ শতাংশ আধা দক্ষ হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ ছিলেন। আগের সময়ের তুলনায় এ হার বাড়লেও নেপালের সাথে ব্যবধান এখনো উল্লেখযোগ্য। শ্রীলঙ্কার ক্ষেত্রেও দক্ষ কর্মী পাঠানোর প্রবণতা রয়েছে। দেশটির বিদেশগামী কর্মীদের মধ্যে দক্ষ কর্মীর অংশ ২০২১ সালে ৪৯ শতাংশে উঠেছিল, যা ২০২২ সালে কমে ৪১ শতাংশ হয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষায় কোথায় ঘাটতি?
বাংলাদেশের গ্র্যাজুয়েটরা আন্তর্জাতিক বাজারে পিছিয়ে থাকার অন্যতম কারণ হিসেবে শিক্ষার সাথে চাকরির বাজারের চাহিদার অসংগতিকে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে এখনো তাত্ত্বিক শিক্ষার ওপর বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়। অথচ আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানে নিয়োগের ক্ষেত্রে পাঠ্যবইয়ের জ্ঞানের পাশাপাশি বাস্তব কাজের অভিজ্ঞতা, প্রযুক্তিগত দক্ষতা, দলগতভাবে কাজ করার সক্ষমতা এবং নতুন বিষয় শেখার যোগ্যতা প্রয়োজন।
গবেষণা ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগের সীমাবদ্ধতাও উচ্চশিক্ষার বড় দুর্বলতা। বিশ্বের অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীরা পড়াশোনার পাশাপাশি গবেষণাগার, শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও আন্তর্জাতিক প্রকল্পে কাজের সুযোগ পান। এতে তাদের বাস্তব অভিজ্ঞতা ও পেশাগত দক্ষতা বাড়ে। বাংলাদেশের অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ে এ ধরনের সুযোগ নেই বললেই চলে।
ভাষা ও প্রযুক্তিগত দক্ষতায় পিছিয়ে
আন্তর্জাতিক চাকরির বাজারে ইংরেজিতে যোগাযোগের সক্ষমতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান, গবেষণা সংস্থা ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানে কাজ করতে প্রতিবেদন লেখা, উপস্থাপনা, ই-মেইল আদান-প্রদান এবং দলগত আলোচনায় অংশ নেয়ার দক্ষতা প্রয়োজন।
বাংলাদেশের অনেক গ্র্যাজুয়েটের বিষয়ভিত্তিক জ্ঞান থাকলেও ইংরেজিতে তা প্রকাশের সক্ষমতা সীমিত। ফলে চাকরির সাক্ষাৎকার, আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের নিয়োগপ্রক্রিয়া কিংবা বিদেশী সহকর্মীদের সাথে কাজ করার ক্ষেত্রে তারা পিছিয়ে পড়েন। তবে ভাষাগত দক্ষতা শুধু ইংরেজি জানার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; স্পষ্টভাবে মত প্রকাশ, সমস্যা ব্যাখ্যা, নেতৃত্ব ও পেশাগত আচরণও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
অন্য দিকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডেটা বিশ্লেষণ, সাইবার নিরাপত্তা, ক্লাউড কম্পিউটিং ও স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। এসব ক্ষেত্রে দক্ষ কর্মীর চাহিদাও বাড়ছে। কিন্তু বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার পাঠ্যক্রমে নতুন প্রযুক্তির সাথে তাল মিলিয়ে পরিবর্তন আনার গতি পর্যাপ্ত নয়। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্জিত জ্ঞানের একটি অংশ কর্মজীবনে প্রবেশের আগেই পুরনো হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
প্রয়োজন শিক্ষার গুণগত পরিবর্তন
বিশেষজ্ঞদের মতে, আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে প্রতিযোগিতা বাড়াতে বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমকে চাকরির বাজারের চাহিদার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে হবে। শিক্ষার্থীদের জন্য ইন্টার্নশিপ, শিল্পপ্রতিষ্ঠানে কাজের অভিজ্ঞতা, গবেষণা ও প্রকল্পভিত্তিক প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা জরুরি। পাশাপাশি ইংরেজি যোগাযোগ, তথ্যপ্রযুক্তি, সমস্যা সমাধান এবং আন্তর্জাতিক মানের পেশাগত সনদ অর্জনের সুযোগ বাড়াতে হবে।
বিদেশী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে যৌথ গবেষণা, শিক্ষার্থী বিনিময় এবং বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের সাথে অংশীদারত্বও জোরদার করা প্রয়োজন। বিশেষ করে নারীদের কর্মসংস্থানে নিরাপদ পরিবেশ, বৈষম্যহীন নিয়োগ ও প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব এডুকেশন অ্যান্ড রিসার্চের অধ্যাপক ড. মো: আব্দুস সালাম মনে করেন, আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করতে না পারায় দেশের অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি বিদেশে যথাযথ মূল্যায়ন পাচ্ছে না। নয়া দিগন্তকে তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশে শুধু হাতেগোনা কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রিকে উন্নত দেশগুলো তাদের প্রতিষ্ঠানগুলোর ডিগ্রির সমমানের মনে করে। অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রিই তাদের মূল্যায়নে পিছিয়ে থাকে। এর বড় কারণ, আমরা প্রতিষ্ঠানগুলোয় আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারিনি। বেশির ভাগ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভালো ল্যাব নেই, অভিজ্ঞ শিক্ষক নেই, পর্যাপ্ত বাজেট নেই। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক পর্যায়ে যোগাযোগেও আমরা পিছিয়ে আছি। এসব কারণেই আন্তর্জাতিক বাজারে আমাদের শিক্ষার্থীরা পিছিয়ে পড়ছেন। এ জায়গাগুলোয় উন্নতি করতে পারলে আমাদের শিক্ষার্থীরা আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে ভালো অবস্থানে পৌঁছাতে পারবেন।’