
মোহাম্মদ জাফর ইকবাল
রাজধানী ঢাকায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগকে মোকাবেলায় সরকারি দলের সামর্থ্য নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ভারতে পালিয়ে যাওয়া কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সভানেত্রী শেখ হাসিনার আগামী ডিসেম্বরে দেশে ফিরবে এমন ঘোষণার পাশাপাশি রাজধানীতে দলটির মাঝে মধ্যে ঝটিকা মিছিল বের করা, একের পর এক ককটেল বিস্ফোরণ, বাস-ট্রেনে আগুন দেয়ার ঘটনায় দলটি প্রতিরোধ গড়ে না তোলায় সংশ্লিষ্টরা এ প্রশ্ন উত্থাপন করছেন। তারা বলছেন, এসব নাশকতা ও নৈরাজ্যের প্রতিবাদে বিএনপি পাল্টা কর্মসূচি পালন করলেও রাজপথে তাদের উপস্থিতি নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে। একই সাথে সরকার কিভাবে তা মোকাবেলা করবে এবং দলটির রাজনৈতিক ভবিষ্যৎকে কীভাবে দেখছে- এসব প্রশ্নও সামনে এসেছে। সেই সাথে অনেকের জিজ্ঞাসা, এসব ষড়যন্ত্র মোকাবেলার জন্য ক্ষমতাসীন বিএনপি কি প্রস্তুত? বিশেষ করে রাজধানী ঢাকায় দলটির নেতৃত্ব ও সামর্থ্য কতটুকু?
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ব্যাপক জনসমর্থন থাকলেও ঢাকায় বর্তমানে রাজনৈতিক শূন্যতা বিরাজ করছে দলটিতে। আগের মতো ত্যাগী ও পরীক্ষিত নেতাকর্মীর খুবই অভাব। ফলে রাজপথে প্রকাশ্যে অবৈধ কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে আওয়ামী লীগ।
জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা মির্জা আব্বাস নয়া দিগন্তকে বলেন, বিএনপি ঘরে বসে লড়াই করার দল নয়। রাজপথে যেকোনো ষড়যন্ত্র মোকাবেলার সামর্থ্য দলটির রয়েছে। সাধারণ জনগণই বিএনপির মূল শক্তি। ভাববেন না বিএনপি ভেসে আসছে, এটা জামায়াতে ইসলামী না, আওয়ামী লীগও না- এটা বিএনপি, এটা মাথায় রাখতে হবে। রাজপথে যেকোনো ষড়যন্ত্র মোকাবেলায় বিএনপির পূর্ণ সামর্থ্য রয়েছে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী কিংবা দলের ভেতরে থাকা ষড়যন্ত্রকারী- যেই হোক, সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে প্রতিহত করা হবে।
সূত্র মতে, সাম্প্রতিক সময়ে গুলশানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসংগঠনের কয়েক শ নেতা-কর্মী জড়ো হয়ে ঝটিকা মিছিল করে। এ সময় তারা সরকার ও রাষ্ট্রবিরোধী স্লোগান দেন। একপর্যায়ে তারা গুলশান ও আশপাশ এলাকায় ককটেল বিস্ফোরণ ঘটায়। ছত্রভঙ্গ করতে গেলে তারা পুলিশকে লক্ষ্য করেও ককটেল নিক্ষেপ করে। এই ঘটনার পরের দিন ১২ সেপ্টেম্বর জাতীয় প্রেস ক্লাবে ১২ দলীয় জোটের আলোচনা সভায় বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী প্রশ্ন তোলেন, কার্যক্রম নিষিদ্ধ একটি রাজনৈতিক দল কীভাবে রাজধানীতে লোকজন জড়ো করে মিছিল করতে পারছে। তার প্রশ্ন, নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দল হঠাৎ করে উঁকি মারার চেষ্টা করছে। কিন্তু করছে কীভাবে? এখানে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো কী করছে? এরপর ১৮ সেপ্টেম্বর রাজধানীর সাতটি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ১৪টি ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। একই দিন কাফরুল থানার সামনে একটি বাসেও আগুন দেয়া হয়। দুই দিন পর ২০ সেপ্টেম্বর কমলাপুর রেলস্টেশনে এক ট্রেনের একটি বগিতে আগুন দেয়ার ঘটনা ঘটে। এরপর ২৪ সেপ্টেম্বর বাড্ডা ও গুলশানেও আওয়ামী লীগের পৃথক ঝটিকা মিছিলের খবর আসে। সাম্প্রতিক সমেয় রাজধানীতে আবারো একই ধরনের তৎপরতা দেখা যায়। প্রশ্ন ওঠে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গোয়েন্দা সক্ষমতা নিয়ে। একই সাথে এদের মোকাবেলায় ক্ষমতাসীন দলের ভূমিকা ও সামর্থ্য নিয়েও।
সূত্র মতে, আওয়ামী লীগের এসব তৎপরতার প্রতিবাদে বিএনপি ও দলটির অঙ্গসংগঠনগুলোও মাঠে কর্মসূচি দিয়েছে। এসব কর্মসূচিতে দলটির নেতারা বলেছেন, দেশে ফেরা নিয়ে শেখ হাসিনার ঘোষণা ‘রাজনৈতিক স্টান্টবাজি’ ছাড়া আর কিছুই নয়। মূলত এর মাধ্যমে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ তাদের হতাশ নেতা-কর্মীদের সংগঠিত করার চেষ্টা করছে। তারা এ ধরনের তৎপরতা রাজনৈতিক ও প্রশাসনিকভাবে মোকাবেলা করা হবে বলেও হুশিয়ারি দেন।
জানতে চাইলে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ড. আসাদুজ্জামান রিপন নয়া দিগন্তকে বলেন, যে যাই বলুক না কেন, আওয়ামী লীগ আর ফিরে আসবে না। তারা দেশে অশান্তি সৃষ্টির চেষ্টা করছে। তিনি বলেন, বিএনপি এসব মোকাবেলার সামর্থ্য রাখে।
সূত্র মতে, নির্বাচনের পরদিন থেকে রাজধানীর বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে পতাকা উত্তোলন ছাড়াও সারা দেশের বিভিন্ন জেলায় দলীয় কার্যালয়ে নেতাকর্মীদের উপস্থিত হতে দেখা গেছে। কোথাও তালা ভেঙে প্রবেশ, কোথাও জাতীয় পতাকা উত্তোলন, আবার কোথাও ব্যানার টাঙিয়ে দ্রুত সরে যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। তবে কেন্দ্রীয় পর্যায়ে বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বকে এ বিষয়ে প্রকাশ্যে কঠোর অবস্থান নিতে দেখা যায়নি। বরং বিএনপির হাইকমান্ডকে নির্বাচনের আগে থেকেই আওয়ামী লীগের প্রশ্নে তুলনামূলক কৌশলী ও নমনীয় অবস্থান নিয়ে আসছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। সরকার গঠনের পর বিএনপির একটি অংশ মনে করছে, ইসলামী দলগুলোর উত্থান বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোটকে মোকাবেলা করতে হলে আওয়ামী লীগকে পুরোপুরি রাজনৈতিক মাঠের বাইরে ঠেলে দেয়া কৌশলগতভাবে সুবিধাজনক নাও হতে পারে।
ফলে মাঠপর্যায়ে অনানুষ্ঠানিক সহনশীলতার একটি পরিবেশ তৈরি হয়েছে। বিএনপির ভেতরে আরেক অংশ মনে করছে, আওয়ামী লীগকে রাজনৈতিক পরিসরে ফিরতে দিলে ভবিষ্যতে তা বিএনপির জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আওয়ামী লীগ এখন সরাসরি বড় কর্মসূচির বদলে ‘উপস্থিতি জানানোর’ কৌশল নিয়েছে। ছোট ছোট প্রতীকী কর্মসূচির মাধ্যমে তারা সংগঠনের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে চাইছে। একই সাথে তারা দেখছে, বিএনপির প্রতিক্রিয়া কতটা কঠোর বা সহনশীল হয়। এই প্রতিক্রিয়ার ওপর নির্ভর করবে ভবিষ্যতের কৌশল।
এ দিকে গণআন্দোলনের মুখে পতিত ও কার্যক্রমনিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ, নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ এবং অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনগুলোর নেতাকর্মীদের প্রকাশ্য দিনের আলোতে রাজধানীতে বিক্ষোভ এবং শক্তি প্রদর্শন, গুলশানের মতো চরম নিরাপত্তাবেষ্টনী ঘেরা এলাকায় মিছিল করলেও বিএনপির অবস্থান দেখা যায়নি। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, রাজধানীর রাজনীতিতে বিএনপির পুরনো সেই সাংগঠনিক ও জনসম্পৃক্ত নেতৃত্বের শূন্যতা এখন স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
জানতে চাইলে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী নয়া দিগন্তকে বলেন, নেতৃত্ব পরিবর্তনশীল। বিএনপি নতুন নেতৃত্ব তৈরির পাশাপাশি অভিজ্ঞ নেতাদেরও সামনে রাখছে। একই সাথে তিনি বলেন, যারা বলছেন, বিএনপি ষড়যন্ত্রকারীদের মোকাবেলায় প্রস্তুত নয়, সেটি সঠিক নয়। রাজধানীসহ সারা দেশেই বিএনপির শক্তিশালী ও অভিজ্ঞ নেতৃত্ব রয়েছে।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








