বৈদেশিক অর্থায়নে দুর্বলতা রিজার্ভে স্বস্তি নিয়ে প্রশ্ন

 বিশেষ সংবাদদাতা

Advertisement

রেমিট্যান্স ও রফতানি আয় বাড়লেও বাংলাদেশের বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্যে চাপ বাড়ছে। এই চাপের আরেকটি বড় দিক হলো বৈদেশিক অর্থায়নের প্রবাহে দুর্বলতা। চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে আর্থিক হিসাবের উদ্বৃত্ত আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৮২ শতাংশ কমেছে। বিদেশী প্রত্যক্ষ বিনিয়োগে বড় কোনো অগ্রগতি নেই, দীর্ঘমেয়াদি ঋণপ্রবাহ কমেছে, নিট বৈদেশিক সহায়তার হিসাব উদ্বৃত্ত থেকে ঘাটতিতে নেমেছে। একই সময়ে সামগ্রিক লেনদেনের ভারসাম্য উদ্বৃত্ত থেকে ঘাটতিতে চলে গেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের জুলাই-সেপ্টেম্বর ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রভিশনাল ব্যালান্স অব পেমেন্টের তথ্য অনুযায়ী, আগের অর্থবছরের একই সময়ে আর্থিক হিসাবের উদ্বৃত্ত ছিল ১৭৯ কোটি ৬০ লাখ ডলার। চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে তা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৩২ কোটি ৩০ লাখ ডলারে। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে উদ্বৃত্ত কমেছে ১৪৭ কোটি ৩০ লাখ ডলার বা প্রায় ৮২ শতাংশ।
এটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ চলতি হিসাবের ঘাটতি পূরণে বিদেশী বিনিয়োগ, ঋণ, বাণিজ্যিক ঋণ ও অন্যান্য আর্থিক প্রবাহের ভূমিকা থাকে। চলতি হিসাবের ঘাটতি একা কোনো অর্থনীতির জন্য অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু সেই ঘাটতি পূরণের অর্থায়ন দুর্বল হয়ে পড়লে বৈদেশিক মুদ্রার বাজার ও রিজার্ভের ওপর চাপ তৈরি হতে পারে।
আর্থিক হিসাবের উদ্বৃত্তে বড় ধস
বৈদেশিক লেনদেনের আর্থিক হিসাবে বিদেশী প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ, পোর্টফোলিও বিনিয়োগ, ঋণ, বাণিজ্যিক ঋণ, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের বৈদেশিক সম্পদ-দায়সহ বিভিন্ন ধরনের অর্থপ্রবাহ অন্তর্ভুক্ত থাকে। আলোচ্য সময়ে এই হিসাবের সামগ্রিক উদ্বৃত্ত কমে যাওয়ার পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে অন্যান্য বিনিয়োগের প্রবাহে দুর্বলতা।
২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে অন্যান্য বিনিয়োগের নিট প্রবাহ ছিল ১৪৭ কোটি ৭০ লাখ ডলার। চলতি অর্থবছরের একই সময়ে তা কমে মাত্র চার কোটি ডলারে নেমেছে। অর্থাৎ এই খাতে উদ্বৃত্ত প্রায় নিঃশেষ হয়ে গেছে।
অন্য দিকে, নিট প্রত্যক্ষ বিদেশী বিনিয়োগ বা এফডিআই আগের বছরের ৩৬ কোটি ৫০ লাখ ডলার থেকে কমে হয়েছে ৩৫ কোটি ৩০ লাখ ডলার। পরিমাণের দিক থেকে পতন খুব বেশি না হলেও বাংলাদেশের মতো বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান-নির্ভর অর্থনীতির জন্য এই প্রবাহকে সন্তোষজনক বলার সুযোগ নেই। কারণ, এফডিআই শুধু বৈদেশিক মুদ্রা সরবরাহ করে না; এর সাথে প্রযুক্তি, ব্যবস্থাপনা দক্ষতা, উৎপাদন সক্ষমতা, বাজার সংযোগ ও কর্মসংস্থানের বিষয়ও যুক্ত থাকে।
পোর্টফোলিও বিনিয়োগের নিট হিসাবও নেতিবাচক হয়েছে। আগের বছরের একই সময়ে এই খাতে নিট বহিঃপ্রবাহ ছিল চার কোটি ৫০ লাখ ডলার; চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে তা বেড়ে হয়েছে ছয় কোটি ৯০ লাখ ডলার। অর্থাৎ এ খাতেও বৈদেশিক অর্থপ্রবাহের তুলনায় বহিঃপ্রবাহের চাপ বেড়েছে।
তবে আর্থিক হিসাবের কোনো একটি উপখাতের পরিবর্তন দিয়ে পুরো বিনিয়োগ পরিবেশের অবস্থা নির্ধারণ করা যায় না। এফডিআইয়ের ক্ষেত্রে নতুন বিনিয়োগ, পুনর্বিনিয়োগ করা মুনাফা ও আন্তঃপ্রতিষ্ঠান ঋণের মতো উপাদান থাকে। পোর্টফোলিও বিনিয়োগে শেয়ার ও ঋণপত্রের লেনদেনের প্রভাব পড়ে। তাই প্রবাহের ধরন ও উপাদান আলাদা করে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।
ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের বৈদেশিক অবস্থানে পরিবর্তন
আর্থিক হিসাবের আরেকটি উল্লেখযোগ্য উপাদান হলো ডিপোজিট মানি ব্যাংক বা ডিএমবি এবং নন-ব্যাংক ডিপোজিটরি করপোরেশনের বৈদেশিক লেনদেন। আগের অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে এই উপখাতে নিট প্রবাহ ছিল ১১৯ কোটি ডলার। চলতি অর্থবছরের একই সময়ে তা ৮০ কোটি ৩০ লাখ ডলার ঋণাত্মক হয়েছে।
অর্থাৎ আগের বছরের ইতিবাচক অবস্থান থেকে চলতি বছরে বিপরীতমুখী প্রবাহ দেখা যাচ্ছে। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের বিদেশী সম্পদ, দায়, আমানত, ঋণ এবং অন্যান্য আন্তঃপ্রতিষ্ঠান লেনদেনের পরিবর্তনের কারণে এমন পরিস্থিতি হতে পারে।
এখানে সতর্ক থাকা জরুরি। এই হিসাবকে সরাসরি ‘পুঁজি পাচার’ বা ‘ব্যাংক থেকে অর্থ বিদেশে চলে যাওয়া’ বলে চিহ্নিত করা যাবে না। কারণ, নিট বৈদেশিক অবস্থানের পরিবর্তনে ব্যাংকের বৈদেশিক সম্পদ ও দায়-দুই দিকের লেনদেনই প্রভাব ফেলে। প্রকৃত কারণ জানতে হলে ব্যাংকভিত্তিক বৈদেশিক সম্পদ, বিদেশী দায়, স্বল্পমেয়াদি ঋণ, আন্তঃব্যাংক লেনদেন এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট তথ্য আলাদা করে পরীক্ষা করতে হবে।
স্বল্পমেয়াদি ঋণের নিটপ্রবাহ আগের বছরের ১০২ কোটি ডলার ঋণাত্মক অবস্থা থেকে চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে দুই কোটি ৮০ লাখ ডলার ইতিবাচক হয়েছে। বাণিজ্য ঋণ বা ট্রেড ক্রেডিটের নিট প্রবাহও ১০৭ কোটি ৭০ লাখ ডলার থেকে বেড়ে ১৩৪ কোটি ২০ লাখ ডলার হয়েছে। অর্থাৎ আর্থিক হিসাবের সব উপখাত একই দিকে চলেনি। কিছু ক্ষেত্রে উন্নতি থাকলেও বড় কয়েকটি উপখাতের দুর্বলতা সামগ্রিক উদ্বৃত্তকে কমিয়ে দিয়েছে।
সামগ্রিক লেনদেন উদ্বৃত্ত থেকে ঘাটতিতে
বৈদেশিক লেনদেনের সামগ্রিক ভারসাম্য বা ওভারঅল ব্যালান্স দেশের বৈদেশিক খাতের অবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক। চলতি হিসাব, মূলধনি হিসাব, আর্থিক হিসাব এবং ভুল-ত্রুটি ও বাদ পড়া হিসাবের সমন্বয়ে এটি নির্ধারিত হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই-সেপ্টেম্বরে সামগ্রিক লেনদেনের ভারসাম্যে ৮৫ কোটি ৩০ লাখ ডলার উদ্বৃত্ত ছিল। চলতি অর্থবছরের একই সময়ে তা ১১৬ কোটি ৪০ লাখ ডলার ঘাটতিতে নেমেছে। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে সামগ্রিক অবস্থার অবনতি হয়েছে প্রায় ২০১ কোটি ৭০ লাখ ডলার।
এই পরিবর্তনকে শুধু চলতি হিসাবের ঘাটতি দিয়ে ব্যাখ্যা করা যাবে না। একই সময়ে চলতি হিসাবের ঘাটতি বেড়েছে, আর্থিক হিসাবের উদ্বৃত্ত কমেছে এবং ভুল-ত্রুটি ও বাদ পড়া হিসাবের ঘাটতিও কিছুটা বেড়েছে। এসব উপাদানের সম্মিলিত প্রভাবেই সামগ্রিক ভারসাম্য ঋণাত্মক হয়েছে।
এখানে রিজার্ভ সম্পদের হিসাবও গুরুত্বপূর্ণ। ব্যালান্স অব পেমেন্টে রিজার্ভ সম্পদের পরিবর্তন সামগ্রিক ভারসাম্যের বিপরীত দিকে সমন্বয়কারী উপাদান হিসেবে দেখা যায়। ফলে রিজার্ভ সম্পদের লাইনে ইতিবাচক বা ঋণাত্মক সংখ্যা দেখেই রিজার্ভের মোট মজুদ বেড়েছে না কমেছে-এ সিদ্ধান্ত নেয়া ঠিক নয়। নির্দিষ্ট সময়ের রিজার্ভের মজুদ বা স্টক তথ্যের সাথে এই প্রবাহ বা ফ্লো হিসাব মিলিয়ে দেখতে হয়।
রিজার্ভে স্বস্তি, নাকি চাপের নতুন ইঙ্গিত?
রিজার্ভের মজুদের হিসাবে আগের বছরের সেপ্টেম্বরের তুলনায় চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে উন্নতি দেখা যাচ্ছে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে মোট সরকারি রিজার্ভ ছিল তিন হাজার ১৪২ কোটি ৭০ লাখ ডলার। ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে তা বেড়ে হয়েছে তিন হাজার ৬০১ কোটি ৫০ লাখ ডলার।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের বিপিএম৬ পদ্ধতিতে হিসাব করা রিজার্ভও একই সময়ে দুই হাজার ৬৬০ কোটি ৪০ লাখ ডলার থেকে বেড়ে তিন হাজার ১১৯ কোটি ৯০ লাখ ডলারে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ বছরওয়ারি তুলনায় রিজার্ভের মজুদ বেড়েছে।
কিন্তু স্বল্পমেয়াদি প্রবণতায় কিছুটা চাপ রয়েছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জুলাই-আগস্ট সময়ে মোট সরকারি রিজার্ভ ছিল ৩ হাজার ৭৩৫ কোটি ২০ লাখ ডলার। সেপ্টেম্বর শেষে তা কমে হয়েছে তিন হাজার ৬০১ কোটি ৫০ লাখ ডলার। বিপিএম৬ পদ্ধতিতে একই সময়ে রিজার্ভ তিন হাজার ২৪৪ কোটি ২০ লাখ ডলার থেকে কমে ৩ হাজার ১১৯ কোটি ৯০ লাখ ডলারে নেমেছে।
অর্থাৎ আগের বছরের সেপ্টেম্বরের তুলনায় রিজার্ভ বেশি থাকলেও চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসের তুলনায় সেপ্টেম্বর শেষে মজুদ কমেছে। এই দুই তথ্যের মধ্যে কোনো বিরোধ নেই। একটি হলো বছরওয়ারি তুলনা, অন্যটি একই অর্থবছরের ভেতরে মাসভিত্তিক পরিবর্তন।
আমদানি ব্যয়ের তুলনায় রিজার্ভ কত মাসের আমদানি ব্যয় মেটাতে পারে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে, পণ্য ও সেবা আমদানির ভিত্তিতে রিজার্ভের কভারেজ ৪ দশমিক ৭ মাস থেকে বেড়ে ৪ দশমিক ৮ মাস হয়েছে। শুধু পণ্য আমদানির ভিত্তিতে কভারেজ ৫ দশমিক ৩ মাসে অপরিবর্তিত রয়েছে।
এই হিসাব থেকে বোঝা যায়, রিজার্ভের সামগ্রিক অবস্থানে এখনো একটি সুরক্ষা বলয় রয়েছে। তবে রিজার্ভের পরিমাণের পাশাপাশি তার ব্যবহারযোগ্যতা, বৈদেশিক দায় পরিশোধের সময়সূচি, আমদানি ব্যয়ের ভবিষ্যৎ প্রবণতা এবং বৈদেশিক অর্থায়নের স্থিতিশীলতাও বিবেচনায় নিতে হবে।
রিজার্ভের মজুদ ও বৈদেশিক লেনদেনের প্রবাহ এক বিষয় নয়
বৈদেশিক লেনদেনের সামগ্রিক ঘাটতি এবং রিজার্ভের মজুদের পরিবর্তনকে একই বিষয় হিসেবে দেখা যাবে না। রিজার্ভের মজুদ একটি নির্দিষ্ট সময়ের স্থিতি বা স্টক; আর ব্যালান্স অব পেমেন্টের সামগ্রিক ভারসাম্য নির্দিষ্ট সময়ের লেনদেন বা ফ্লো নির্দেশ করে।
একটি নির্দিষ্ট প্রান্তিকে সামগ্রিক লেনদেন ঘাটতিতে থাকলে তা রিজার্ভের ওপর চাপ তৈরি করতে পারে। কিন্তু একই সময়ে রিজার্ভের মজুদ আগের বছরের তুলনায় বেশি থাকতে পারে। কারণ, আগের সময়ের সঞ্চিত রিজার্ভ, বৈদেশিক ঋণ, সহায়তা, অন্যান্য অর্থপ্রবাহ এবং বিনিময় হারের মূল্যায়নজনিত পরিবর্তনও রিজার্ভের মজুদে প্রভাব ফেলতে পারে।
তাই রিজার্ভের প্রকৃত সক্ষমতা বিচার করতে হলে শুধু মোট অঙ্ক নয়, বিপিএম৬ হিসাব, আমদানি কভারেজ, বৈদেশিক দায়, স্বল্পমেয়াদি ঋণ এবং রিজার্ভের পরিবর্তনের উৎস একসাথে দেখতে হবে।