
ক্রীড়া প্রতিবেদক
বাংলাদেশকে একাই টেনে নিয়েছেন হৃদয়। ৩০৪ বলে ডাবল সেঞ্চুরি পূর্ণ করা হৃদয় অপরাজিত থাকেন ২৪২ রানে। অন্যরা মিলে করেন ১৪৪ রান। চতুর্থ বাংলাদেশী ব্যাটার হিসেবে ডাবল সেঞ্চুরি করলেন হৃদয়। প্রথম বাংলাদেশী ব্যাটার হিসেবে নিজের প্রথম সেঞ্চুরিকেই ডাবলে রূপ দিলেন। ২২ চার ও ১১ ছক্কায় ইনিংস সাজানো তার ইনিংস। বাংলাদেশী ব্যাটারদের মধ্যে এক ইনিংসে সর্বোচ্চ ছক্কার রেকর্ডও হৃদয়ের দখলে।
ডাবল সেঞ্চুরির পর এবার টেস্টে বাংলাদেশী ব্যাটারদের মধ্যে এক ইনিংসে সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত রানের মালিক বনে গেলেন হৃদয়। এত দিন রেকর্ডটি ছিল মুশফিকুর রহীমের দখলে। ২০১৮ সালে মিরপুরে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ২১৯ রানে অপরাজিত ইনিংস খেলেন অভিজ্ঞ এই ব্যাটার। তাকে ছাড়িয়ে আড়াইশর পথে হাঁটলেন হৃদয়। চতুর্থ বাংলাদেশী ব্যাটার হিসেবে টেস্টে ডাবল সেঞ্চুরি করলেন হৃদয়। মুশফিক ছাড়াও অন্য দু’জন হলেন- সাকিব আল হাসান ও তামিম ইকবাল। সবচেয়ে বেশি তিনটি ডাবল সেঞ্চুরি মুশফিকের নামের পাশে। সাকিব ও তামিম করেছেন একবার করে। ক্যারিয়ারের তৃতীয় টেস্টে এসে প্রথম সেঞ্চুরির দেখা পান হৃদয়। সেটাকে ডাবলেও রূপ দিলেন। এর আগে আর কোনো বাংলাদেশী ব্যাটার এমন কীর্তি গড়তে পারেননি।
দুর্দান্ত, অনবদ্য, অসাধারণ- পরিস্থিতি বিবেচনায় হৃদয়ের এই ডাবল সেঞ্চুরির জন্য কোনো বিশেষণই যেন যথেষ্ট নয়। জবাব দিতে নেমে একপ্রান্ত আগলে রেখে রানের চাকা সচল রাখেন হৃদয়। কখনো মুশফিকু, আবার কখনো মিরাজ, তাইজুল ইসলামকে সাথী হিসেবে পেয়েছেন। অন্যপ্রান্তে সাথীদের হারালেও মাটি কামড়ে ক্রিজে টিকে ছিলেন হৃদয়। প্রয়োজনে দেখেশোনে খেলেছেন আবার সুযোগ পেলে চার-ছক্কা মেরেছেন।
কিছু ইনিংস কেবল রানসংখ্যায় বিচার করা যায় না। কিছু ইনিংসের জন্ম হয় চাপের মধ্যে, কিছু ইনিংস হয়ে ওঠে জবাব দেয়ার ভাষা। আর কিছু ইনিংস একজন ক্রিকেটারের ক্যারিয়ারের গতিপথই বদলে দেয়। সিলেট আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামে তৌহিদ হৃদয়ের ডাবল সেঞ্চুরির ইনিংসটি ঠিক তেমনই। মিরপুরের ব্যর্থতা, সমালোচনার তির আর নিজের সামর্থ্য নিয়ে ওঠা প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে ইতিহাসের পাতায় নাম লিখিয়েছেন বাংলাদেশের এই ব্যাটার। ক্যারিয়ারের প্রথম ডাবল সেঞ্চুরি তুলে নিয়ে শুধু ব্যক্তিগত মাইলফলক স্পর্শ করেননি, কঠিন পরিস্থিতিতে দলকেও এনে দিয়েছেন স্বস্তি।
মিরপুরে ব্যাট হাতে ব্যর্থ হয়ে সমালোচনার মুখে পড়েছিলেন তৌহিদ হৃদয়! ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে আগের টেস্টের দুই ইনিংসেই বাজে শটে উইকেট বিলিয়ে দিয়ে হতাশ করেছিলেন দলকে। তবে সেই ব্যর্থতা পেছনে ফেলে সিলেটে নিজেকে নতুন করে চিনিয়েছেন এই তরুণ ব্যাটার। ক্যারিয়ারের প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরি পরিণত করেছেন ডাবল সেঞ্চুরিতে।
হৃদয়ের প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরির মুহূর্তটি ছিল নাটকীয়তায় ভরা। জেডেন সিলসের বলে ফাইন লেগের দিকে বল পাঠিয়ে রান নিতে ছুটেছিলেন। সতীর্থ ও কোচরা অভিনন্দন জানাতে দাঁড়িয়ে গেলেও আম্পায়ারের সিদ্ধান্তে জানা যায়, সেটি ছিল লেগ বাই। সেঞ্চুরির অপেক্ষা দীর্ঘ হয় আরো এক বল। পরের ওভারের প্রথম বলেই সিঙ্গল নিয়ে পূর্ণ করেন কাক্সিক্ষত শতক। হেলমেট খুলে ব্যাট উঁচিয়ে ধরে উদযাপনে মাতেন হৃদয়।
এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাকে। শামার জোসেফের বলে চার মেরে ১৫০ রানের মাইলফলকও স্পর্শ করেন এই ব্যাটার। দলের পরিস্থিতি বিবেচনায় হৃদয়ের ইনিংসের গুরুত্ব আরো বেশি। সাদমান ইসলামের চোটে একজন ব্যাটার কম নিয়ে খেলতে নামা বাংলাদেশ শুরু থেকেই চাপে ছিল। ৫১ রানে তিন উইকেট হারানোর পর মুশফিকুর রহীমের সাথে চতুর্থ উইকেটে ৭৩ রান যোগ করেন হৃদয়। পরে মেহেদী হাসান মিরাজের সাথে ষষ্ঠ উইকেটে গড়েন ৪১ রানের জুটি।
কিন্তু একের পর এক উইকেট হারিয়ে আবারো বিপাকে পড়ে বাংলাদেশ। মুশফিক, লিটন ও মিরাজের বিদায়ের পর ১৮৪ রানে সপ্তম উইকেট হারায় স্বাগতিকেরা। তখন ২০০ রান পেরোনোও কঠিন মনে হচ্ছিল। সেই পরিস্থিতিতে তাইজুলকে নিয়ে দলের হাল ধরেন হৃদয়। তার দায়িত্বশীল ব্যাটিংয়ে বদলে যায় ম্যাচের চিত্র।
ব্যাটিংয়ে হৃদয়ের ইতিবাচক মানসিকতার পরিবর্তনও চোখে পড়ার মতো। দ্বিতীয় দিন ৮০ বলে ২৯ রান করে অপরাজিত ছিলেন তিনি। তৃতীয় দিন সকালে আক্রমণাত্মক ও আত্মবিশ্বাসী ব্যাটিংয়ে বদলে দেন নিজের রানের গতি। প্রথম ৫০ রান করতে ১০৯ বল খেললেও পরের ৫০ রান তুলেছেন মাত্র ৬২ বলে। লাঞ্চ বিরতিতে ১৭১ বলে ১০০ রানে অপরাজিত ছিলেন। এর পরও রান তোলার গতি ধরে রেখে পৌঁছে যান দেড় শতে।
মিরপুরের সমালোচনার জবাব দিয়েছেন সিলেটের উইকেটে ব্যাটের ভাষায়। ডাবল সেঞ্চুরি করে হৃদয় বাংলাদেশকে দেখিয়েছেন আশার আলো।
ক্যারিয়ারের প্রথম সেঞ্চুরিকে ডাবলে রূপান্তর
বাংলাদেশের হয়ে প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরিকে ডাবল সেঞ্চুরিতে পরিণত করা প্রথম ব্যাটার তৌহিদ হৃদয়।
টেস্টে বাংলাদেশের হয়ে সর্বোচ্চ রানের ইনিংস
মুশফিকুর রহীমের ২১৯ ছাড়িয়ে টেস্টে বাংলাদেশের হয়ে সর্বোচ্চ রানের মালিক এখন তৌহিদ হৃদয়। অপরাজিত ২৪২ রান করে এখন তিনি সবার ওপরে।
এক ইনিংসে সর্বোচ্চ ছক্কা
টেস্টের এক ইনিংসে বাংলাদেশী ব্যাটারদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ছক্কার রেকর্ড । হৃদয় মেরেছেন ১১ ছক্কা। যা বিশ্বরেকর্ডের চেয়ে মাত্র একটি কম। ১২টি ছক্কা মেরে সর্বোচ্চ ছক্কার রেকর্ড পাকিস্তানের ওয়াসিম আকরাম ও ভারতের জয়সওয়ালের।
প্রথম সেঞ্চুরিতে সর্বোচ্চ রানের রেকর্ড
২০১৩ সালে নিউজিল্যান্ডের সাথে মুমিনুল হকের করা ১৮১ রান টপকে বাংলাদেশী ব্যাটারদের মধ্যে প্রথম সেঞ্চুরিতে সর্বোচ্চ রানের নতুন ইতিহাস।
ডাবল সেঞ্চুরিয়ানদের তালিকায় চতুর্থ
টেস্টে বাংলাদেশের চতুর্থ ব্যাটার হিসেবে ডাবল সেঞ্চুরি অর্জনের কীর্তি।
সিলেট ভেনুর প্রথম ডাবল সেঞ্চুরি
সিলেট আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামের ইতিহাসে প্রথম ব্যাটার হিসেবে টেস্টে ডাবল সেঞ্চুরি করার রেকর্ড।
বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপে প্রথম ডাবল সেঞ্চুরি
আইসিসি বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ইতিহাসে বাংলাদেশী ব্যাটারদের মধ্যে প্রথম ডাবল সেঞ্চুরির মালিক।
সিলেটে ৮ম উইকেটে সর্বোচ্চ জুটি
টেস্টে সিলেট ভেনুতে অষ্টম উইকেটে সর্বোচ্চ রানের রেকর্ড জুটি (তাইজুল ইসলামের সাথে ১৬৭ বলে ১১৭ রান)।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








