সমন্বিত উদ্যোগে স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে পারে দেশের চিনিশিল্প
চট্টগ্রামের চন্দনাইশ উপজেলার একটি আখক্ষেত : নয়া দিগন্ত।

এস এম রহমান পটিয়া-চন্দনাইশ (চট্টগ্রাম)

Advertisement

আন্তঃমন্ত্রণালয়ের সমন্বিত উদ্যোগ, উন্নত জাতের আখ চাষ সম্প্রসারণ এবং আখের বহুমুখী ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে ঘুরে দাঁড়াতে পারে দেশের সম্ভাবনাময় চিনিশিল্প। চিনি ও গুড় উৎপাদনের পাশাপাশি আখ থেকে উন্নতমানের স্পিরিট, অ্যালকোহল, ভিনেগার ও জৈবসারসহ বিভিন্ন মূল্য সংযোজিত পণ্য উৎপাদনের সুযোগ রয়েছে। কৃষি, শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সমন্বিত পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা গেলে এ শিল্প দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, দেশে বর্তমানে সরকারি ব্যবস্থাপনায় ১৫টি চিনিকল রয়েছে। এর মধ্যে লোকসান ও আখসঙ্কটের কারণে কুষ্টিয়া, পঞ্চগড়, পাবনা, রংপুর, শ্যামপুর ও সেতাবগঞ্জ চিনিকলের উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। বাকি ৯টি চিনিকল সচল থাকলেও অধিকাংশই পুরনো যন্ত্রপাতি ও সেকেলে প্রযুক্তির কারণে উৎপাদন ব্যয় সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে। এক মেট্রিক টন চিনি উৎপাদনে গড়ে প্রায় ১৮ মেট্রিক টন আখ প্রয়োজন হওয়ায় উৎপাদন খরচ বাজারমূল্যের তুলনায় অনেক বেশি পড়ছে।
অন্য দিকে দেশের একমাত্র সরকারি প্রতিষ্ঠান কেরু অ্যান্ড কোম্পানি (বাংলাদেশ) লিমিটেড আখ মাড়াইয়ের পাশাপাশি ডিস্টিলারি ও অন্যান্য বিভাগে বিভিন্ন ধরনের পণ্য উৎপাদন করে লাভজনক অবস্থানে রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি বিদেশী ব্র্যান্ডের মদ, দেশী মদ, স্পিরিটসহ প্রায় ১৮ ধরনের পণ্য উৎপাদন করে। বহুমুখী উৎপাদনব্যবস্থাই প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক সাফল্যের অন্যতম কারণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
দেশে চিনির পাশাপাশি গুড়ের চাহিদাও ব্যাপক। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বছরে জনপ্রতি গড়ে ১৩ কেজি চিনি ও গুড়ের চাহিদা হিসাবে জাতীয় চাহিদা দাঁড়ায় প্রায় ২০ থেকে ২২ লাখ মেট্রিক টন। অথচ দেশে উৎপাদন হয় মাত্র ছয় থেকে সাত লাখ মেট্রিক টন। ফলে আমদানিনির্ভরতা বাড়ছে। বেসরকারি পরিশোধনাগারগুলো বিদেশ থেকে অপরিশোধিত চিনি আমদানি করে পরিশোধনের মাধ্যমে বাজারে সরবরাহ করছে।
আখ উৎপাদন বাড়ানোর ক্ষেত্রেও রয়েছে বিপুল সম্ভাবনা। বাংলাদেশ সুগারক্রপস গবেষণা ইনস্টিটিউট উদ্ভাবিত ৪৮টি উন্নত জাতের আখের মধ্যে কয়েকটির হেক্টর-প্রতি উৎপাদন ৮০ থেকে ১২০ মেট্রিক টন। রয়েছে লবণসহিষ্ণু ও চিবিয়ে খাওয়ার উপযোগী জাতও। অথচ অনেক চিনিকল এলাকায় হেক্টর-প্রতি আখের উৎপাদন মাত্র ৪০ মেট্রিকটন। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রায় ৩০ হাজার হেক্টর জমিতে আখ চাষ হচ্ছে, যেখানে গড় উৎপাদন হেক্টর-প্রতি প্রায় ৬০ মেট্রিক টন।
সংশ্লিষ্টদের মতে, চট্টগ্রামসহ দেশের নদী, সমুদ্র উপকূল ও পাহাড়ের পাদদেশের অনাবাদি জমি পরিকল্পিতভাবে আখ চাষের আওতায় আনা গেলে উৎপাদন কয়েক গুণ বাড়ানো সম্ভব। বিশেষ করে গবেষণা ইনস্টিটিউটের উদ্ভাবিত উন্নত জাতগুলো চিনিকল এলাকার বাইরেও সম্প্রসারণ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপজেলাপর্যায়ের জনবল, কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং চিনিকল কর্তৃপক্ষের মধ্যে সমন্বয় প্রয়োজন।
তবে আখের বহুমুখী ব্যবহার নিশ্চিত করাই হতে পারে শিল্পটির ঘুরে দাঁড়ানোর অন্যতম পথ। কেরু অ্যান্ড কোম্পানি দীর্ঘদিন ধরে ডিস্টিলারি পরিচালনা করলেও অন্য চিনিকলগুলো এ ধরনের উৎপাদনে যেতে পারেনি। সংশ্লিষ্টদের মতে, এর পেছনে বিশেষায়িত লাইসেন্স, আইনি বিধিনিষেধ, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা ও প্রয়োজনীয় বিনিয়োগের অভাব রয়েছে। ফলে চিনিকলগুলোকে শুধু চিনি উৎপাদনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে সম্ভাব্য বায়োপ্রডাক্ট উৎপাদনের উপযোগী করে গড়ে তোলা প্রয়োজন।
এ দিকে লোকসানি চিনিকলগুলোকে চিনি ছাড়াও অন্যান্য পণ্য উৎপাদনের মাধ্যমে লাভজনক করার উপায় নির্ধারণে শিল্প মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত জাতীয় সংসদের স্থায়ী কমিটি প্রতিবেদন তৈরির নির্দেশনা দিয়েছে। গত ৬ অক্টোবর জাতীয় সংসদ ভবনে কমিটির দ্বিতীয় বৈঠকে এ নির্দেশনা দেয়া হয়। বৈঠকে বন্ধ ও লোকসানি চিনিকলগুলোর আখের বহুমুখী ব্যবহার, বায়োপ্রডাক্ট উৎপাদন এবং শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা কাজে লাগানোর বিষয়ে গুরুত্বারোপ করা হয়।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের একজন মাঠ কর্মকর্তা গতকাল বিকেলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, চিনি উৎপাদনকে বাই প্রডাক্ট ধরে ওই শিল্পের কাঁচামাল দিয়ে উন্নতমানের ভদকা, স্প্রিরিট অ্যালকোহল ও জৈবসার উৎপাদনকে প্রধান দিয়ে আখ মাড়াই করলে দেশের এ শিল্প ঘুরে দাঁড়াবে নিঃসন্দেহে।
সংশ্লিষ্টদের অভিমত, উন্নত জাতের আখ চাষ সম্প্রসারণ, পতিত জমির সদ্ব্যবহার, চিনিকলের আধুনিকায়ন এবং বহুমুখী পণ্য উৎপাদনে বিনিয়োগ নিশ্চিত করা গেলে দেশের চিনিশিল্পে নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি হবে। এতে এক দিকে চিনির আমদানিনির্ভরতা কমবে, অন্য দিকে জৈবসার ও শিল্পের কাঁচামাল উৎপাদনের পাশাপাশি রফতানির সুযোগও তৈরি হবে। প্রয়োজন শুধু কৃষি, শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সমন্বিত ও বাস্তবমুখী উদ্যোগ।

 

Advertisement