
নয়া দিগন্ত ডেস্ক
ইরানের নেতৃত্বকে লক্ষ্যবস্তু বানানোর ক্ষেত্রে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র হয়তো অতিরিক্ত বাড়াবাড়ি করে ফেলেছে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। মার্কিন প্রেসিডেন্ট স্বীকার করেছেন, তেহরানের সাথে দরকষাকষি বা আলোচনা করার জন্য ঠিক কার সাথে যোগাযোগ করতে হবে, ওয়াশিংটন তা চিহ্নিত করতে হিমশিম খাচ্ছে। আলজাজিরার। সোমবার ওহাইওর ইয়ংসটাউনে আয়োজিত এক নির্বাচনী জনসভায় বক্তব্য দেয়ার সময় ট্রাম্প বলেন, আমরা নেতাদের ক্ষেত্রে হয়তো অতিরিক্ত দূরে চলে গেছি, কারণ আমরা এখন আর বুঝতে পারছি না কার সাথে কথা বলব। তিনি আরও দাবি করেন, কেউই এখন ইরানের প্রেসিডেন্ট হতে চাইছেন না, যদিও ২০২৪ সালের জুলাই থেকে মাসুদ পেজেশকিয়ান দেশটির প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ট্রাম্প সততার সাথে স্বীকার করে বলেন, কার সাথে আলোচনা চালিয়ে যাওয়া উচিত তা বের করা তাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে এবং তিনি মনে করেন, তারা সত্যি বাড়াবাড়ি করে ফেলেছেন। বক্তব্যে তিনি তার পুরনো দাবির পুনরাবৃত্তি করে বলেন, ইরান তাদের বিমানবাহিনী এবং ১৫৯টি জাহাজের সবগুলো হারিয়েছে, যেগুলো এখন সমুদ্রের তলদেশে সুন্দরভাবে বিশ্রাম নিচ্ছে। উপসাগরীয় অঞ্চলে বাণিজ্যিক জাহাজে একের পর এক হামলার পটভূমিতে ট্রাম্পের এই বিতর্কিত বক্তব্য সামনে এল। ইউকে মেরিটাইম ট্রেড অপারেশন্স (ইউকেএমটিও) জানিয়েছে, গত ১ অক্টোবর থেকে বাণিজ্যিক জলযানগুলোতে অন্তত ১৯টি হামলার ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে।
ইরান চুক্তি করতে চায়, দাবি ট্রাম্পের
ট্রাম্প বলেন, ‘তারা (ইরান) চুক্তি করতে চায়, কিন্তু কিভাবে করতে হয়, তা তারা জানে না। তারা জানে না কীভাবে করতে হয়।’ ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে দেয়া হবে না বলেও পুনর্ব্যক্ত করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। তিনি ইরানকে ‘সন্ত্রাসবাদের প্রধান পৃষ্ঠপোষক রাষ্ট্র’ হিসেবে উল্লেখ করেন। ট্রাম্প দাবি করেন, বর্তমানে ইরানের কোনো নৌবাহিনী বা বিমানবাহিনী নেই। দেশটির আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থাও দুর্বল বলে মন্তব্য করেন তিনি। পাশাপাশি ইরানে উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং অর্থের সঙ্কট রয়েছে বলেও দাবি করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
এ সময় বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম কমা নিয়েও পূর্বাভাস দেন ট্রাম্প। তার ভাষায়, তেলের দাম পাথরের মতো দ্রুত নিচে নেমে আসবে; অর্থাৎ আগামীতে তেলের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমতে পারে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি। আগামী ৩ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে নির্বাচনী প্রচারের অংশ হিসেবে ট্রাম্প এসব মন্তব্য করেন।
হরমুজে হামলা বাড়াচ্ছে ইরান
হরমুজ প্রণালী দিয়ে তেল রফতানি সচল রাখতে যুক্তরাষ্ট্র ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) সহায়তায় পরিচালিত জাহাজ চলাচল ব্যবস্থাকে লক্ষ্যবস্তু করার ঘোষণা দিয়েছে ইরান। এ ব্যবস্থায় যুক্ত পাঁচ থেকে ছয়টি জাহাজে প্রতি রাতে হামলা চালানোর দাবি করেছে দেশটি। বিকল্প পথে তেল পরিবহন বন্ধ করতে হামলা আরো জোরদারের হুঁশিয়ারিও দিয়েছে তেহরান। সোমবার আলজাজিরার এক খবরে এসব তথ্য জানানো হয়েছে। ইরানের নিরাপত্তাপ্রধান মোহসেন রেজায়ি রোববার রাতে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের সামরিক বাহিনীর সহায়তায় ছোট জাহাজ থেকে বড় ট্যাংকারে তেল স্থানান্তর করা হচ্ছে। হরমুজ প্রণালী দিয়ে তেল পরিবহনের এ ব্যবস্থায় যুক্ত জাহাজগুলোকে লক্ষ্য করে কয়েক সপ্তাহ ধরে হামলা চালাচ্ছে ইরান। রেজায়ি বলেন, ‘আপনারা তেল চোরাচালান করছেন। কিন্তু প্রণালী ইরানের নিয়ন্ত্রণে, আমরাই এটি পরিচালনা করি।’ যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ ও নিষেধাজ্ঞার মধ্যে হরমুজ প্রণালীতে নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে এ পদক্ষেপ নিয়েছে তেহরান। ইরানের জ্বালানি ও বেসামরিক অবকাঠামোয় আবার হামলা হলে কঠোর জবাব দেয়ার হুঁশিয়ারিও দিয়েছেন রেজায়ি। সংযুক্ত আরব আমিরাত ও হরমুজ প্রণালীর আশপাশে যুক্তরাষ্ট্র-সংশ্লিষ্ট যোগাযোগ কেবল, তথ্যকেন্দ্র ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা অবকাঠামোতে হামলার হুমকিও দিয়েছেন তিনি। আলজাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়, হরমুজ প্রণালীর দক্ষিণাঞ্চলে ওমানের উপকূলসংলগ্ন পথ ব্যবহার করে উপসাগরীয় দেশগুলোর তেল রফতানির ব্যবস্থা করা হয়েছে। এ প্রক্রিয়ায় ছোট জাহাজে করে তেল নিয়ে বড় ট্যাংকারে স্থানান্তর করা হয়। পরে সেসব ট্যাংকার ওমান উপসাগর দিয়ে প্রণালীর বাইরে চলে যায়। ইরানের হামলা এড়াতে অনেক জাহাজ রাতে চলাচল করে এবং নিজেদের অবস্থান শনাক্তকারী ট্রান্সপন্ডার বন্ধ রাখে। তেল স্থানান্তরের পর কিছু জাহাজ আবার নতুন করে তেল নিতে ফিরে আসে।
রোববার রাত থেকে সোমবারের মধ্যে এ ব্যবস্থায় যুক্ত একাধিক জাহাজে হামলার খবর পাওয়া গেছে। এর মধ্যে হরমুজ প্রণালী থেকে বেরিয়ে যাওয়া দু’টি ট্যাংকার এবং ওমানের সোহার বন্দরের কাছে নোঙর করা একটি জাহাজ রয়েছে। এর আগের সপ্তাহেও একাধিক জাহাজে হামলার ঘটনা ঘটে। ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) দাবি, সপ্তাহান্তে মাইনের আঘাতে তিনটি ট্যাংকার বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছে। এ ঘটনায় একটি জাহাজে আগুন লাগার ভিডিও প্রকাশ করেছে সংস্থাটি। তবে ভিডিওতে সরাসরি মাইন বিস্ফোরণের দৃশ্য দেখা যায়নি।
খামেনি হত্যার পর ইরানের পতনের হিসাব ভুল ছিল যুক্তরাষ্ট্রের : আইআরজিসি কর্মকর্তা
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হওয়ার পর দেশটির পতন ঘটবে- যুক্তরাষ্ট্রের এমন ধারণাকে ‘কৌশলগত ভুল’ বলে মন্তব্য করেছেন ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইয়াদোল্লাহ জাভানি। তিনি বলেন, ইরানের স্থিতিশীলতা ও সমাজের বাস্তবতা সঠিকভাবে মূল্যায়ন করতে ব্যর্থ হয়েছে ওয়াশিংটন। তিনি আরও বলেন, ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রেসিডেন্ট হওয়ার আগেও তেহরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের ধারাবাহিক চাপ ছিল। তবে ইরানের দৃঢ় অবস্থান ও কঠোর প্রতিক্রিয়ার কারণে সেই প্রচেষ্টা সফল হয়নি।
মার্কিন অবরোধের মধ্যেও ৫১ লাখ টন জ্বালানি পণ্য রফতানির দাবি ইরানের
এ দিকে যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ ও অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে পাঁচ লাখ নয়, ৫১ লাখ ৪০ হাজার টন জ্বালানি পণ্য রফতানির দাবি করেছে ইরান। দেশটির আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থা ফার্সের খবরে বলা হয়, হরমোজগান বন্দর ও সামুদ্রিক সংস্থার মহাপরিচালক হোসেইন আব্বাসনেজাদ এ তথ্য জানিয়েছেন। ইরানের বৃহত্তম বাণিজ্যিক বন্দর শহিদ রাজায়ি বন্দর থেকে এসব পণ্য রপ্তানি করা হয়েছে। পাকিস্তানে আলোচনা থেকে যুদ্ধ বন্ধে সমঝোতা না আসার পর এপ্রিলে ইরানের বন্দরগুলোতে সামরিক অবরোধ আরোপ করে যুক্তরাষ্ট্র। গত সপ্তাহে ইরানি অপরিশোধিত তেল, জ্বালানি পণ্য ও পেট্রোকেমিক্যাল পরিবহনের অভিযোগে ১৭টি জাহাজসহ বিভিন্ন ব্যক্তি ও নেটওয়ার্কের ওপর নতুন নিষেধাজ্ঞা দেয় ট্রাম্প প্রশাসন।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








