ইউপিডিএফ, জেএসএস, পার্বত্যাঞ্চল, সঙ্ঘাত, আতঙ্ক
  •  সাজেক সড়কে বিক্ষোভের নেপথ্যে আধিপত্য বিস্তার 
  •  সাড়ে ৩ মাসে ১২ দফা গোলাগুলি, নিহত অন্তত ৪
  •  চাঁদাবাজি-অপহরণের পাশাপাশি অস্ত্র উদ্ধারে বাড়ছে উদ্বেগ
     

তিন পার্বত্যাঞ্চলে পাহাড়ি জনপদে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সশস্ত্রসংগঠন ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্র্যাটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ-মূল) ও পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (জেএসএস-সন্তু গ্রুপ) মধ্যে সঙ্ঘাত ফের উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। গত ৮ অক্টোবর খাগড়াছড়ি এলাকায় সেনাবাহিনীর অভিযানে ইউপিডিএফের (মূল) একটি সশস্ত্র গোপন আস্তানা ধ্বংস করার পর ওই এলাকায় আধিপত্য বিস্তারের উদ্দেশ্যে জেএসএস দখলে নেয়ার চেষ্টা করে। পরে সেখানকার বাসিন্দারা পর্যটনকেন্দ্র সাজেক সড়কে টায়ার জ্বালিয়ে অবরোধের পর বিক্ষোভ করে। ফলে নিরাপত্তা জটিলতায় পর্যটকদের যাতায়াত সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। 
সেখানে জেএসএস-সন্তু গ্রুপের সশস্ত্র তৎপরতা, চাঁদাবাজি ও স্থানীয়দের হুমকির অভিযোগ এনে ‘সাজেক কার্বারি অ্যাসোসিয়েশন’ ও ‘সাজেক গণ অধিকার রক্ষা কমিটি’ এই অবরোধ ডেকেছিল। অবরোধের কারণে সাজেকে আটকে পড়া পর্যটকদের সেনাবাহিনীর সহায়তায় নিরাপদে খাগড়াছড়িতে ফিরিয়ে আনা হয়। তবে এই দুই গ্রুপের সঙ্ঘাত-সহিংসতা ফের  গোলাগুলিতে রূপ নেয়ার আশঙ্কা করছে স্থানীয়রা। 
স্থানীয় সাধারণ বসবাসকারীদের অভিযোগ, জেএসএসের সশস্ত্র গোষ্ঠী ফাঁকা মাঠ পেয়ে ভারী আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে এই অঞ্চল তাদের নিয়ন্ত্রণে নেয়ার চেষ্টা করছে। তাদের উদ্দেশ্য সাজেক পর্যটন এলাকা নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নতুন করে চাঁদাবাজির পথ খুঁজতেই তারা সশস্ত্র হামলার ছক কষছে। এর প্রতিবাদেই মূলত সাধারণ ক্ষুদ্র-নৃগোষ্ঠীসহ স্থানীয় ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষ সাজেক সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভের পর সড়কে টায়ার জ্বালিয়ে অবরুদ্ধ করেছেন। স্থানীয় সূত্রগুলোর দাবি, এই ইস্যুকে সামনে নিয়ে তিন পার্বত্যাঞ্চল এখন চরম ঝুঁকিতে রয়েছে। সাময়িকভাবে সমাধান হলেও চাঁদাবাজি ও আধিপত্যের লড়াইয়ে যেকোনো সময় সঙ্ঘাত ছড়িয়ে পড়তে পারে তিন পার্বত্যাঞ্চলে। 
নিরাপত্তা বাহিনী সূত্র জানায়, দুর্গম এলাকায় অভিযান ও টহল জোরদার করা হয়েছে। এরপরও আধিপত্যের এই লড়াই না থামলে সাধারণ মানুষের জীবন ও জীবিকা আরো ঝুঁকিতে পড়বে বলে স্থানীয়দের আশঙ্কা।
নিরাপত্তা বাহিনীর প্রতিবেদনের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০০৯ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৫ সালের আগস্ট পর্যন্ত ইউপিডিএফ ও জেএসএস ২৯৬ বার গোলাগুলিতে জড়িয়েছে। এতে ২৮ জন নিহত ও ৬০ জন আহত হয়েছেন। ওই সময়ে ২৭৮টি অপহরণের ঘটনা ঘটেছে। গত বছর পাহাড়ে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো বিভিন্ন খাত থেকে প্রায় হাজার কোটি টাকা চাঁদা আদায় করেছে বলে ওই প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। নিরাপত্তা বাহিনীর তথ্য বলছে, চলতি বছরের ১ জুন থেকে ৮ অক্টোবর পর্যন্ত শুধু খাগড়াছড়ি জেলার বিভিন্ন জোনে দুই পক্ষের মধ্যে অন্তত ১২ দফা গোলাগুলির ঘটনা ঘটেছে। এই সময়ে হত্যাকাণ্ডে অন্তত চারজন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন সেনাসদস্য ও এক শিশুসহ কয়েকজন। উদ্ধার হয়েছে অস্ত্র, গোলাবারুদ ও চাঁদা আদায়ের রসিদ।
একের পর এক গোলাগুলি : ঘটনার পরিসংখ্যানে দেখা গেছে ‘এলাকার আধিপত্য’ নিয়েই সঙ্ঘাত। বাঘাইহাট জোনে (১৪ ইবি) ৫ জুলাই থেকে ৮ অক্টোবরের মধ্যে ছয়টি ঘটনা ঘটেছে। ৫ জুলাই ভুয়াছড়িতে ২৫০-৩০০ রাউন্ড গোলাগুলি হয়। এর কারণ ছিল ইউপিডিএফের এক সদস্যের জেএসএসে যোগদান করার কারণে। ১১ ও ২৬ সেপ্টেম্বর এবং ৮ অক্টোবরও সেখানে ভারী অস্ত্র দিয়ে ব্যাপক গোলাগুলি হয়।
এ ছাড়াও লোগাং জোনে (৩ বিজিবি) এলাকায় ২৬ জুন ১০০-১২০ রাউন্ড গুলি বিনিময়ে দু’জন আহত হন। ৩ ও ৪ সেপ্টেম্বর আরো দু’টি ঘটনায় ১০০-১২০ রাউন্ড গুলি ছোড়া হয়। খাগড়াছড়ি জোনে (১৮ ইবি) ৬ সেপ্টেম্বর ১৪০-১৫০ রাউন্ড এবং লংগদু জোনে (৩ বিআইআর) ১৮ জুলাই ও ৬ সেপ্টেম্বর সংঘর্ষ হয়। ১ জুলাই পানছড়ির বায়াংগাপাড়ায় জেএসএসের দুই সশস্ত্র গ্রুপ একে অপরকে ইউপিডিএফ ভেবে গুলি বিনিময় করে। পরে সেনাসদস্যরা সেখানে জেএসএসের একটি আস্তানা ধ্বংস করে।
প্রাণহানি ও শিশু আহত :  গত ৬ জুলাই লোগাংয়ের মধুমঙ্গলপাড়ায় জেএসএসের তিন ‘দলত্যাগী’ সদস্য নিহত হন। ঘটনাস্থল থেকে গুলির খোসা ও গুলি উদ্ধার হয়। ২৪ জুন দীঘিনালার বাবুছড়ায় ইউপিডিএফ সদস্য সুজন চাকমা (৪৫) গুলিতে নিহত হন। অভিযোগ রয়েছে, মোটরসাইকেলে আসা জেএসএসের সদস্যরা তাকে হত্যা করেছে। ২৯ সেপ্টেম্বর বাঘাইহাটে দুই পক্ষের গোলাগুলিতে ৯ বছরের এক আদিবাসী শিশুর হাতে গুলি লাগে। তাকে মাসালং এলাকার একটি ফার্মেসিতে চিকিৎসা দেয়া হয়। পরে সেনা টহল ঘটনাস্থলে পৌঁছালে অজ্ঞাত সশস্ত্রদের সাথে ২৫-৩০ রাউন্ড গুলি বিনিময় হয়।
চাঁদাবাজি, অপহরণ ও অস্ত্র উদ্ধার : নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানে বিপুল অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। তার মধ্যে গত ২২ জুন দুই ইউপিডিএফ সদস্য আত্মসমর্পণের সময় দু’টি একে-৪৭, দু’টি ম্যাগাজিন ও ১৩২ রাউন্ড গুলি জমা দেন। ১২ জুলাই খাগড়াছড়ি জোনে চীনা এলএমজির দু’টি অংশ উদ্ধার হয়। ১ জুন মহালছড়িতে তিনজন আটক হন এবং একটি পিস্তল ও দুই রাউন্ড গুলি পাওয়া যায়। ২২ আগস্ট একই এলাকায় আরেকজন সদস্য আটক হন। ৬ অক্টোবর বাঘাইহাটে একটি পিস্তল, তিন রাউন্ড গুলি, ২০ বোতল মদ, ২৭ হাজার ৩৩০ টাকা ও চাঁদার রসিদ উদ্ধার হয়। চাঁদা আদায়কারী পালিয়ে যান। ৭ জুন দীঘিনালায়ও ইউপিডিএফের এক চাঁদা আদায়কারী আটক হন।
গত ৯ আগস্ট মহালছড়ির মাইসছড়ি বাজারে ২০২৫ সালের ২ জানুয়ারির একটি আন্তঃসম্প্রদায় বিয়েকে কেন্দ্র করে ২৪ ঘণ্টার আলটিমেটাম দিয়ে চাঁদা দাবি করা হয়। ২৯ আগস্ট লেমুছড়ি ও জগন্নাথপাড়া থেকে অপহৃত দু’জনকে উদ্ধার করা হয়। প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, গোয়েন্দা তথ্য দেয়ার সন্দেহে ইউপিডিএফ তাদের অপহরণ করেছিল।
সেনা টহলে হামলা, প্রচারণা ও কর্মসূচি: ৬ সেপ্টেম্বর খাগড়াছড়ি-চট্টগ্রাম সড়কের আলুটিলায় টহলরত সেনাসদস্যদের ওপর পাহাড়ের চূড়া থেকে ইট ছোড়া হয়। এতে তিনজন আহত হন। টহল কমান্ডার ফাঁকা গুলি ছুড়লে হামলাকারীরা ১০-১৫ রাউন্ড গুলি ছোড়ে। ১৩ জুলাই রাতে ইউপিডিএফ-সংশ্লিষ্ট গণতান্ত্রিক যুব ফোরামের ১০-১২ সদস্য পানছড়ির কয়েকটি এলাকায় হাতে লেখা পোস্টার সাঁটে। সেখানে জেএসএসকে ‘সেনাবাহিনীর দোসর’ বলা হয়। ২৮ সেপ্টেম্বর রামগড় ও সিন্দুকছড়ি এলাকায় ইউপিডিএফ-ঘনিষ্ঠ সংগঠন পিসিপি রামসু বাজারের ঘটনায় ‘নিহত’ তিনজনের স্মরণে মোমবাতি প্রজ্বলন করে। সেখানে ৩০০-৩৫০ জন উপস্থিত ছিলেন। কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি।
আত্মসমর্পণ ও পুনর্বাসন : সঙ্ঘাতের মধ্যেও আত্মসমর্পণের ঘটনা ঘটছে। ১৮ জুলাই আত্মসমর্পণকারী ইউপিডিএফ সদস্য প্রসেনজিৎ চাকমাকে (১৮) ২ আগস্ট পুনর্বাসন কর্মসূচির অংশ হিসেবে বাবা-মায়ের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
এই সঙ্ঘাত নিয়ে নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলছেন, শুধু সামরিক অভিযানে পাহাড়ের সমস্যার সমাধান হবে না। তারা মনে করেন সশস্ত্র গোষ্ঠী দমনে অভিযান জরুরি, কিন্তু সাথে রাজনৈতিক উদ্যোগ ও সীমান্ত নজরদারি জোরদার করাও সমান প্রয়োজন।

Advertisement