যন্তর মন্তরে নিষেধাজ্ঞা, ফের আটক ককরোচ নেতারা
ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) নেতা ও আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে।

নয়া দিগন্ত ডেস্ক 

Advertisement

ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে প্রতিবাদের ঐতিহাসিক কেন্দ্র যন্তর মন্তরে বিক্ষোভের ওপর নিষেধাজ্ঞা ঘিরে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। যন্তর মন্তরকে নির্ধারিত প্রতিবাদস্থলের তালিকা থেকে বাদ দিয়ে বিকল্প তিনটি স্থান নির্ধারণ করেছে দিল্লি পুলিশ। এর প্রতিবাদে মঙ্গলবার সেখানে প্রবেশ করে বিক্ষোভ দেখানোর সময় ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) তিন নেতা ও প্রায় ২০ জন স্বেচ্ছাসেবককে আটক করেছে পুলিশ। আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকের হুঁশিয়ারি, যন্তর মন্তরে প্রতিবাদ বন্ধ করে আন্দোলন থামানো যাবে না; বরং ‘গোটা দেশ এবার যন্তর মন্তর হবে’।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ও রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মঙ্গলবার সকালে ব্যারিকেড অতিক্রম করে যন্তর মন্তরে প্রবেশের চেষ্টা করেন আন্দোলনকারীরা। আটক নেতাদের মধ্যে রয়েছেন আশুতোষ  রাঙ্কা, সৌরভ দাস ও অজিঙ্ক শিন্ডে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে তারা বিক্ষোভ করতে চেয়েছিলেন। ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়ায় বিপুলসংখ্যক নাম বাদ পড়ার অভিযোগকে কেন্দ্র করে এই আন্দোলন শুরু হয়। 
এর আগে শনিবার ১০ অক্টোবর আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা দীপকে ও অন্য নেতাদের দিল্লিতে আটক করা হয়। পরবর্তী সময়ে তারা মুক্তি পেলেও বিক্ষোভের অনুমতি, প্রতিবাদস্থল এবং পুলিশের ভূমিকা নিয়ে বিরোধের অবসান হয়নি। সোমবারও সিজেপির নেতারা পার্লামেন্ট স্ট্রিট থানায় গিয়ে পুলিশের কাছে জানতে চান, তারা কবে ও কোথায় আন্দোলন করতে পারবেন। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে স্পষ্ট সিদ্ধান্ত জানানোর সময়সীমা দিয়ে তারা হুঁশিয়ারি দেন, অন্যথায় নিজেদের মতো করে পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা করবেন।  সূত্র : রয়টার্স, ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, হিন্দুস্তান টাইমস।
যন্তর মন্তরের বদলে তিন বিকল্প স্থান 
সোমবার প্রকাশিত নির্দেশনায় যন্তর মন্তরের পরিবর্তে দিল্লির রামলীলা ময়দান, পূর্ব দিল্লির সিবিডি গ্রাউন্ড এবং উত্তর দিল্লির বুরারি গ্রাউন্ডকে প্রতিবাদ ও বিক্ষোভের নির্ধারিত স্থান হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। দিল্লি পুলিশ কমিশনার অনুরাগ কুমারের জারি করা নির্দেশনায় বলা হয়, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের গঠিত একটি কমিটি বিকল্প প্রতিবাদস্থল নির্ধারণের বিষয়টি পর্যালোচনা করেছে। 
কিন্তু এই সিদ্ধান্ত মেনে নিতে নারাজ আন্দোলনকারীরা। তাদের অভিযোগ, সংসদ ভবন ও কেন্দ্রীয় সরকারি দফতরের কাছাকাছি প্রতিবাদ করার সুযোগ সীমিত করতেই যন্তর মন্তরকে তালিকা থেকে বাদ দেয়া হয়েছে। তাদের মতে, প্রতিবাদস্থল দূরে সরিয়ে দিলে আন্দোলনকারীদের পক্ষে জাতীয় পর্যায়ের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কেন্দ্রের কাছে নিজেদের দাবি তুলে ধরা কঠিন হবে। 
অভিজিৎ দীপকে এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানিয়ে বলেন, ‘অব পুরো দেশ যন্তর মন্তর বনেগা’ অর্থাৎ এবার গোটা দেশই যন্তর মন্তর হয়ে উঠবে। তার বক্তব্য, সরকার যন্তর মন্তরকে প্রতিবাদস্থলের তালিকা থেকে বাদ দিতে পারে, কিন্তু মানুষের প্রতিবাদের অধিকার কেড়ে নিতে পারে না। তার কটাক্ষ, সরকার কি এবার গণতন্ত্রকেও তালিকা থেকে বাদ দিতে চায়? 
আন্দোলনকারীদের দাবি, বিকল্প স্থানগুলোর দূরত্ব ও বাস্তব পরিস্থিতিও বিবেচনায় নেয়া হয়নি। রামলীলা ময়দান তুলনামূলক কাছে হলেও সেখানে কর্মসূচি আয়োজনের নানা সীমাবদ্ধতা রয়েছে বলে তাদের বক্তব্য। সিবিডি ও বুরারি গ্রাউন্ড সংসদ ভবন এলাকা থেকে অনেক দূরে। নবরাত্রি উপলক্ষে রামলীলা ময়দান ও সিবিডি গ্রাউন্ডে মেলা চলায় সেখানে তাৎক্ষণিকভাবে কর্মসূচি আয়োজনও কঠিন হতে পারে বলে দাবি করেছেন আন্দোলনকারীরা। 
কেন উত্তাল দিল্লি 
ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন নিয়ে বিরোধই আন্দোলনের প্রধান কারণ। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই প্রক্রিয়ায় ১৩ কোটির বেশি নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছে। এর মধ্যে প্রায় দুই কোটি ৮০ লাখ মৃত ব্যক্তি, ছয় কোটি ৩০ লাখ স্থানান্তরিত ব্যক্তি এবং তিন কোটি শনাক্ত করা যায়নি- এমন ব্যক্তির নাম রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। 
বিরোধী দল ও আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, এই প্রক্রিয়ায় বৈধ ভোটারদের নাম বাদ পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাদের আরো দাবি- সংখ্যালঘু ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ভোটাধিকার ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এবং ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) রাজনৈতিক সুবিধা পেতে পারে। এ কারণে তারা প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ দাবি করছেন। 
তবে নির্বাচন কমিশন পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ অস্বীকার করেছে। কমিশনের বক্তব্য, ভোটার তালিকা সংশোধন একটি প্রশাসনিক প্রক্রিয়া এবং ভুলভাবে বাদ পড়া ভোটাররা নাম আবার অন্তর্ভুক্ত করার আবেদন করতে পারেন। বিজেপিও বিরোধীদের অভিযোগকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেছে। 
বিরোধীদের মিছিল, পুলিশের ধরপাকড় 
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আন্দোলনের সংবাদ সংগ্রহের সময় প্রায় তিন ডজন সাংবাদিক আটক বা হয়রানির শিকার হওয়ার অভিযোগ করেছেন। সাংবাদিকদের অভিযোগ, পরিচয়পত্র দেখানোর পরও তাদের আটক করা হয়, টানা-হেঁচড়া করা হয় এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে তাদের সরঞ্জাম জব্দ করা হয়। এসব ঘটনায় সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ও সাংবাদিকদের পেশাগত নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। 
আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে পুলিশের পদক্ষেপ এবং সাংবাদিকদের আটক করার ঘটনায় সুপ্রিম কোর্টও হস্তক্ষেপ করেছে। ১১ অক্টোবরের শুনানিতে আদালত জনসাধারণের চলাচল স্বাভাবিক রাখা, অপ্রয়োজনীয় ব্যারিকেড পর্যালোচনা, অবৈধ আটক বন্ধ এবং সাংবাদিক, আইনজীবীসহ পেশাগত দায়িত্ব পালনকারীদের কাজে বাধা না দেয়ার নির্দেশ দেন। 
মঙ্গলবার ১৩ অক্টোবর বিক্ষোভের সংবাদ সংগ্রহের সময় নারী সাংবাদিকদের ওপর হামলা ও তাদের আটক করার অভিযোগের বিষয়ে সুপ্রিম কোর্ট দিল্লি পুলিশের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাকে বৃহস্পতিবার আদালতে উপস্থিত হয়ে ব্যাখ্যা দিতে বলেছে। এ ঘটনায় পুলিশের ভূমিকা নিয়ে বিচার বিভাগের নজরদারি আরো বেড়েছে। 
প্রতিবাদের অধিকার বনাম জনশৃঙ্খলা 
যন্তর মন্তর দীর্ঘদিন ধরে ভারতের রাজনৈতিক প্রতিবাদ, ছাত্র আন্দোলন, শ্রমিকদের দাবি এবং নাগরিক অধিকারকেন্দ্রিক কর্মসূচির পরিচিত স্থান। ১৯৯৩ সাল পর্যন্ত সংসদ ভবনের কাছের বোট ক্লাব ছিল বিক্ষোভের অন্যতম কেন্দ্র। বিভিন্ন আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে প্রতিবাদের স্থান পরিবর্তনের পর যন্তর মন্তর সেই ভূমিকা পালন করে আসছিল। 
তাই স্থানটি নির্ধারিত প্রতিবাদস্থলের তালিকা থেকে বাদ দেয়ার সিদ্ধান্ত শুধু ককরোচ জনতা পার্টির সাথে পুলিশের বিরোধে সীমাবদ্ধ নেই; এটি জনসমক্ষে প্রতিবাদ করার অধিকার, প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ এবং জনশৃঙ্খলা রক্ষার মধ্যে ভারসাম্য নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে। 
মঙ্গলবার যন্তর মন্তরে ফের আটকের ঘটনায় আন্দোলন আপাতত থামার বদলে আরো বিস্তৃত হওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে। সিজেপি নেতৃত্বের বক্তব্য, নির্দিষ্ট একটি স্থান বন্ধ করে আন্দোলন বন্ধ করা যাবে না। অন্য দিকে বিকল্প প্রতিবাদস্থলে কর্মসূচি আয়োজনের বিষয়ে প্রশাসনের সিদ্ধান্ত এবং পুলিশের সাথে আন্দোলনকারীদের সমঝোতা না হওয়ায় পরবর্তী কর্মসূচি নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।